জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩৩ নং কিস্তি
তুই মীরচাচাকে জিজ্ঞাসা কর। আমরা ছোটো সময়ে বলতাম মুসলমান বস্তি। এখন তুই বস্তি বলতে পারবি না। মুসলমান পাড়া কিংবা পল্লী বলতে হবে। এই কয় বছরে লড়াই করে অন্ততঃ গেঁয়ো ভূতগুলোর মধ্যে এই চেতনা আনতে পেরেছি। এটা কি কম পাওয়া।
আমি মীরচাচার সামনে বলছি পেছনে বলছি না। মীরচাচারা এক সময় আমাদের শত্রু ভাবতো। আজ মীরচাচা নিজে দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে নিচ্ছে। কেন, নিশ্চই অন্যায় কাজ করছি না। তাই। তোর কাছ থেকে এইটুকু অন্ততঃ পক্ষে শিখেছি।
ফসল হলে বিক্রীর কোনও চিন্তা নেই। শুধু ঘাড়ে করে ফেলে দিয়ে যাও। লোক আছে, এসে নিয়ে চলে যাবে। দেবাদারা ছাড়াও কলকাতা থেকেও অনেক মহাজন আসে।
যদিও সিংহভাগটা দেবাদারা কিনে নিয়ে চলে যায়।
আগে যা উৎপাদন হতো গ্রামের লোক খেত, কেউ কেউ বাইরের হাটে গিয়ে বিক্রি করতো। ওই টুকু। এখন ধান কেউ চকে গিয়ে বিক্রি করে না। আমার কাছে বিক্রি করে। চকে গিয়ে বিক্রী করলে যে পয়সা পাবে আমি সেই পয়সায় কিনে নিই। কেনো লোকে কষ্ট করে চকে যাবে। আমার কাছেই এখন প্রায় পঞ্চাশজন কাজ করে।
শুধু গুলের পর গুল মেরে যাচ্ছিস।
বাসু, সঞ্জু হেসে ফেললো।
চিকনা মিথ্যে কথা বলছে, তাই না-রে বাসু?
বাসু হাসছে।
একটুও মিথ্যে কথা বলছে না। চিকনা এখন বেওসা ভালো বোঝে।
বাসুর টিপ্পনি কাটা কথায় চিকনা রাম খিস্তী দিয়ে উঠলো।
দেখলি, ওর গুণ গাইলাম, ফল কি পেলাম।
চিকনা একটা গোটা পরটা মুখে পুরে হঁ হঁ করতে থাকলো।
খাওয়া হলো, চা খাওয়া হলো, সুবীর ওর নতুন স্টাফদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। কম বেশি সবাই এই তল্লাটের ছেলে-মেয়ে। সকলেই গ্র্যাজুয়েট কেউ কেউ মাস্টার ডিগ্রী পর্যন্ত করেছে।
সুবীরের টিমটাকে আমার বেশ পছন্দ হলো।
কথা বলতে বলতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে এলো, খেয়াল নেই। চিকনা খোঁচা মারলো। কোথায় যাবি বলেছিলি খেয়াল আছে।
পাঁচটার সময় যাব বলেছি।
এখন সোয়া পাঁচটা বেজে গেছে।
চল ওঠ।
বাসুর দিকে তাকালাম।
যা দোকানে বলে আয়।
বলার দরকার হবে না।
সঞ্জু।
সব ব্যবস্থা করা আছে।
কোথায় যাবি? মীরচাচা বললো।
সঞ্জুর ব্যাপারটা সমাধান করি।
হ্যাঁ। তুই একটা ব্যবস্থা কর। ঋজুর শালিপতিটা খুব ঘোরেল মাল। আমাকেও দু-একদিন স্টশন রোডে দেখা হতে গরম গরম কথা বলেছে।
কতদিন আগে?
মাস দুয়েক হবে।
তখন ওর ক্ষমতা ছিল।
এখনও আছে। ওই তল্লাটে আমরা এখনও দাঁত ফোটাতে পারি নি।
অপেক্ষা করো, পেরে যাবে।
উঠে দাঁড়ালাম।
একে একে সবাই নীচে এলাম।
এখন গোধুলি। আলো একবারে নেই। দোকানে দোকানে সন্ধ্যা দেওয়া চলছে। বেশ শীত শীত করছে। চিকনাকে বললাম একবার বাড়ি চল। একটা চাদর নিতে হবে।
চিকনা হাসলো।
সুবীর তার নিজের বাইকে বসলো। সঞ্জু বসলো বাসুর বাইকে, আমি চিকনার পেছনে।
হুস করে বাড়িতে চলে এলাম। চিকনা খামারে বাইকটা দার করালো।
চারদিকে লাইট জ্বলছে। এখন আর জেনারেটর চালাতে হয় না। তবে কারেন্ট চলে গেলে জেনারেটর চালাতে হয়। চিকনা একটা বেশ বরোসরো জেনারেটর কিনে রেখেছে।
দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যে দেওয়া হয়ে গেছে। আকাশের দিকে তাকালাম। রাশি রাশি তারার ঝুরি। অবিকল ঠিক কুড়ি বছর আগের মতো আছে। ওখানে কারুর আধুনিকতার স্পর্শ ছুঁতে পেরেনি। বারান্দায় অনেক লোকজন।
হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাৎ করে উঠলো।
ঠিক এই সময় কাকাকে বারন্দার চেয়ারে বসে থাকতে দেখতাম। কাকার বয়সী, কাকার থেকে একটু ছোটো গ্রামের আরও সব লোক আসতো। টিভিতে খবর শোনা, দৈনিক কাগজ পড়া, চা খাওয়া, কাকার স্নেহের ধমকানি, গল্প চলতো রাত নটা অবধি।
তারপর যে যার বাড়ি ফিরে যেত।
সমস্ত ছবিগুলো যেন চোখের সামনে জ্বল জ্বল করে ভসে উঠলো।
আজ কাকা নেই।
মানুষটা না থাকলে কি হবে, স্মৃতির ছবিগুলো নিটোল ভাবে এঁকে দিয়ে গেছে। ভুলতে পারি না। হয়তো আমার পক্ষে এই জীবনে ভোলা সম্ভবও নয়।
সুবীর আগে আগে ভেতরে গিয়ে ঢুকলো।
তাকিয়ে দেখলাম নতুন বাড়িতে লাইট জ্বলছে।
চিকনার দিকে তাকালাম।
ও বাড়িতে কে আছে?
চালের প্যাকেট প্যাকিং হচ্ছে। দেবাদার অর্ডার।
একটু অবাক হলাম।
আছিস তো, সব দেখিয়ে বুঝিয়ে দেব।
কি বললাম তখন তোকে। চিকনা এখন বড়ো বেওসায়ী। বাসু বললো।
চিকনা হাসলো।
আমি বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই নীপা হন্তদন্ত হয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
দেখি, মাথাটা নিচু করো।
তর সইল না।
আমার মাথাটা টেনে নিয়ে কপালে গাল ঠেকাল।
আবার কি হলো।
শুনলাম তোমার নাকি শীত শীত করছে।
ঠাণ্ডা পরছে।
তোমার ঠাণ্ডার বাতিক নেই।
শীত করছে, কি করা যাবে। একটা ছোটো চাদর দাও।
নীপা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখে মুখে স্নেহের পরশ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পরছে।
অতো দেরি করে খেলে কেন?
নীপা জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো।
তখন অতোটা খাওয়ালে। খেতে পারি।
ভানুদা তোমার জন্য দুধ দিয়েছে, একগ্লাস গরম দুধ খাও।
ভানু দুধ দিয়েছে! মানে?
কথা বলতে বলতে বেঞ্চটাতে বসলাম।
চিকনা হাসছে।
যাইই বলি তোরা হাঁসা হাঁসি করিস।
তোর বাড়ি, তুই কোনও খবরা খবর রাখবি না। ব্যাপারটা এরকম, যার বিয়ে তার হুঁস নেই পাড়া পড়সির ঘুম নেই।
বাসু, চিকনা বহুত কথা শিখে গেছে।
বসো আমি এখুনি এনে দিচ্ছি। নীপা ভেতরে গেল।
ভানুটা কোথায় গেল বল?
এখন পাবি না। বাসু বললো।
কেন!
গরুর পরিচর্যা চলছে।
বুঝলাম না।
ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে দশটা জার্সি গুরু কিনেছে, সকাল বিকেল আড়াইশো লিটার দুধ।
আমি হাঁ করে বাসুর দিকে তাকিয়ে।
তাকিয়ে লাভ নেই ভানু এখন বড়ো খলিফা।
হাসলাম।
দেবাদার ফার্মে দুধ বিক্রী করে। গরুর গোবর দিয়ে গ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করেছে। রান্নার গ্যাস কিনতে হচ্ছে না। প্লাশ দেশীয় প্রথায় সার বানিয়ে বিক্রী করছে। ওর আবার পাঁচজন স্টাফ।
আমার মাথাটা এবার নির্ঘাত খারাপ হয়ে যাবে।
তোকে মাথা খারাপ করতে হবে না।
সবারটা বলছিস নিজেরটা বল। চিকনা খ্যাঁক করে উঠলো
তোর মতো নাকি, চেপে যাবো। ঠিক সময়ে উগরে দেব।
দেবা কি দুধের প্ল্যান্ট বানিয়েছে।
বহুদিন। এই তল্লাট থেকে প্রতিদিন একগাড়ি দুধ যায়।
তিরিশ হাজার লিটার!
হ্যাঁ।
গরুর খাবার?
কেন চিকনার ধানের তুঁষ। এখন আর মিলে পাঠাতে হয় না। এখানেই সব বিক্রী হয়ে যায়।
এই টুকুতে এতো দুধ?
আরো আছে।
কি রকম?
চিকনা তেল কল করেছে। তার থেকে খইল বের হয়। সেটা বিক্রী করে। খড়কুটা কল বসিয়েছে। কুঁচো খড় বিক্রী করে। আরও অনেক ব্যবসা ফেঁদেছে।
আমি হাসছি।
তার মানে গ্রামে এখন প্রচুর গরু বল।
সবচেয়ে বেশি দুধ সাপ্লাই করে মীরচাচার এলাকা। প্রায় পনেরো হাজার লিটার।
সব ব্যাঙ্ক ঋণ!
হ্যাঁ। এখন কেউ ফাউ বসে নেই। মাঝে মাঝে কাজের লোকের আকাল পড়ে যায়।
শুধু এই এলাকা, না পাশা পাশি অঞ্চলও আছে?
আপাততঃ দশ কিলোমিটার জুড়ে চলছে।
অনাদি এই জায়গাটাকে ক্যাশ করে বেরিয়ে গেছে।
চিকনা হাসছে।
নীপা গ্লাসে করে দুধ নিয়ে এলো। ওদের জন্য চা নিয়ে এলো।
নীপার মুখের দিকে তাকালাম।
এক জায়গায় পৃথক ফল কেন?
সবাই কম বেশি খায় তুমি খাও না। তাই।
তারমানে আমি বাছুর।
সব সময় মাথায় কূট বুদ্ধি না।
সুবীর এরই মধ্যে পোষাক পরিবর্তন করে ফেলেছে। বেঞ্চিতে এসে বসলো।
তুমি যাবে না?
যাবার দরকার আছে?
অসুবিধে কোথায়, তোমরা তোমাদের মতো যাবে, আমি আমার মতো।
তাহলে আবার জামাকাপর ছারতে হয়।
ছেরে নাও।
নীপা হাসছে।
দুধে চুমুক দিলাম। বেশ ভালো লাগছে। নীপার দিকে তাকালাম।
একদিন এই দুধের জন্য এই বাড়িতে চায়ের রেওয়াজ প্রায় উঠে যেতে বসেছিল, তাই না নীপা?
নীপার হাসি হাসি মুখটা থম থমে হয়ে গেল।
ওই সব কথা এখন আর মনে করতে চাই না।
আমি যে কিছুতেই ভুলতে পারি না নীপা। এর কোনও ওষুধ তোমার জানা আছে?
নীপা পাশে বসে গলা জড়িয়ে ধরলো।
এই জন্য তুমি সকলের অনিদা।
হ্যাঁ নীপা সত্যি আমি অনিদা হয়েই বেঁচে থাকতে চাই।
জানো নীপা জীবনটাকে হয়তো অন্যভাবে কাটাতে পারতাম, চেষ্টা করিনি বললে ভুল হবে। ঠিক এই জায়গাটায় আমি ফেল করা ছাত্র। কে যেন পেছন থেক কোমরটা জড়িয়ে ধরে বার বার টেনে ধরেছে। বলেছে অনি তোর জন্য এসব নয়। তুই তোর মতো করে জীবনটা কাটিয়ে দে।
আমার জন্য মিত্রা সেক্রিফাইস করেছে, তনু তার জীবনটাকে নষ্ট করেছে। হয়তো ছেলে মেয়ের ইচ্ছে থাকলেও তারা তাদের মতো চলতে পারে না। যদি বাবা কষ্ট পায়।
কতো নাম তোমাদের বলবো।
তুমিই আমাকে কতো কথা বলেছো।
একটু থামলাম। আবার গ্লাসে চুমুক দিলাম।
মনে পরে, তুমি যেদিন প্রথম এ্যাডাল্ট হলে। তোমার আঠারো বছর পরিপূর্ণতার দিন। এ বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। বলতে পারো সারাটা গ্রাম ঘুমিয়ে পড়েছে।
জ্যোৎস্নার রূপলী আলো চারদিকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। ও বাড়িতে শুধু তুমি আমি। আমি অন্ধকারে জানলা দিয়ে চাঁদের রূপলী আলো দু-চোখ ভরে পান করছিলাম। ঝিঁ ঝিঁ পোকার তারস্বর ডাক। এক স্বপ্নিল পরিবেশ। তুমি কখন ঘরে ঢুকেছো আমি জানিই না।
ঘরে আলো থাকতেও আলো ছিল না। তোমার ডাকে ডিমলাইটের আলোয় তোমাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। স্থবিরের মতো তোমার দিকে চেয়েছিলাম।
পরের দিন কাকার চোখ অপারেশন।
একটা মেয়ে কৈশোর ছেড়ে যৌবনের পথে পা বাড়াচ্ছে। তোমার চোখে কতো রঙীন স্বপ্ন। সেই রাতটা আজও আমি ভুলতে পারি না নীপা।
সুবীর আমার দিকে বিষ্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকাল।
তোমার চোখে না পাওয়ার বেদনা, আমারও এই বেদনা ছিল। সেই রাত আমার মনটাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। মনে হয় এই তো সেদিনকার ঘটনা। নীপা তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলছো, আমাকে ভালোলাগছে অনিদা। এতদিন এইগুলো সবার ছিল, শুধু আমার ছিল না। আজ আমার হলো। শুধু হলো না, ওদের থেকে একটু বেশিই হলো। তোমার চিবুক দুটো শক্ত হয়ে উঠলো। চোখে জিঘাংসা। তুমি ধীর পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এলে।
চিকনা, বাসু, সঞ্জু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার কথা অবাক হয়ে শুনছে। নীপা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়েছে। হয়তো কাঁদছে। হয়তো-বা কাঁদছে না। সুখের দিনে দুঃখের কথা অনুভব করছে।
জানো নীপা সোদিন তোমার কাছে আমি একটা জিনিষ শিখেছিলাম। তোমার চোখ সেদিন অন্য কথা বলেছিল, আমাকে নতুনভাবে চলার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। সেই রাতে শুধু তোমার বাইরেটা দেখিনি। তোমার বুকের ভেতর যে অতৃপ্ত মানুষটা লুকিয়ে ছিল, তাকেও আমি অনুভব করেছিলাম। কষ্ট পেয়েছিলাম।
তোমার মেয়ের ক্ষেত্রে হয়তো সেটা হবে না।
আমার অনুরোধ, তাকে এই অভাবটুকু বুঝতে শিখিয়ো। না হলে মানুষ পরিপূর্ণ হয় না।
অভাবে মানুষের স্বভাব নষ্ট হয়। আমি এটা মানি না। তাহলে তোমার অনিদা অনেকদিন আগে বকে যেত। অভাবটাকে যদি সঠিক পথে চালনা করা যায়, জীবনে পরিপূর্ণতা আসে।
একদিন এই গ্রামে সবার বাড়িতে আলো জ্বললেও এই বাড়িতে টিম টিম করে লম্ফ জ্বলতো। আমি লম্ফের আলোয় পড়াশুনা করেছি। চিকনা কিছুটা জানে। হারিকেন দূর কি বাত। আজ চারদিকে কতো আলো। যেন দিনের আলো। কোথাও এতোটুকু অন্ধকার নেই। আজ আমার সবথেকে আনন্দ কোথায় জান, অন্ততঃ আমার চারপাশে যারা আছে, তাদের হাসি মুখটা দেখতে পাচ্ছি। লাখ টাকা খরচ করেও এই স্বতঃস্ফূর্ত হাসিটা কেনা যায় না।
একটু থামলাম।
চিকনাকে তার পরিবারের লোকেরা আর আগের মতো গাল দিচ্ছে না। দূরছাই করছে না। যতটুকু সম্মান তার প্রাপ্য সেটা দিচ্ছে।
ভানু, পচা, পাঁচু আর কোনওদিন এসে বলবে না, অনি আমার টিবি হয়েছিল। অনাদি আমাদের বন্ধু হয়েও এতটুকু সাহায্য করে নি।
আমি অন্ততঃ এইটুকু সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জায়গাটা ওদের করে দিতে পেরেছি, ওরা নিজেদের চিকিৎসা নিজেরা করাতে পারবে। কারুর কাছে নিজের শরীরের চিকিৎসার জন্য ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বেরতে হবে না।
কাকে কতটুকু সাহায্য করতে পারল সেটা পরের ব্যাপার। এখন ওদের পরশ্রমজীবী উদ্ভিদ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে না।
দুধের গ্লাসটা শেষ করলাম।
জানো নীপা পাঁচু, পচার মতো অজস্র মানুষ এই গ্রামে আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তারাও একদিন ঘুরে দাঁড়াবে। হয়তো অগাধ পয়সার মালিক তারা হবে না। কিন্তু পেটের ভাতটুকু তারা জোগাড় করে নেবে। কারুর কাছে হাত পাততে হবে না।
আমি মাটির দেওয়াল খড়ের চালের স্কুলে পড়েছি। মাটিতে বসে কোলের ওপর স্লেট নিয়ে লিখতাম। এখন এখানে একটা পাকা স্কুল হয়েছে। ছেলেমেয়েরা বেঞ্চিতে বসে পড়ছে। জানো নীপা, আমি একদিন এগুলো স্বপ্নে দেখতাম। আজ বাস্তব।
ওরা সবাই তখনও আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
নীপা এবার ওঠো। যেতে হবে। অনিদা হয়তো অনেক ভুলভাল কথা বলে ফেললো। মনে কিছু করো না। আজকাল কেন জানিনা হঠাৎ হঠাৎ আমি এই রোগে আক্রান্ত হই। তখন কিছু ভালো লাগে না। মন হয় পৃথিবীটাকে দুমড়ে মুচড়ে নিজের মুঠোর মধ্যে এনে ফেলি।
নীপা মুখ তুললো। চোখের পাতা ভিঁজে ভিঁজে।
যাও কাপর বদল করে নাও। আমাকে একটা চাদর এনে দাও।
নীপা উঠে দাঁড়াল। আমার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে ভেতরে চলে গেল।
কারুর মুখে টুঁ শব্দটি নেই।
টানা বারান্দার এক পাশে আমরা। আর একপাশে কল কল করে চলেছে সকলে।
সুবীর রেডি হয়ে নাও। দেরি করো না।
সুবীর ভেতরে চলেগেল।
নীপা একটা চাদর এনে দিল।
গায়ে জড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। চিকনাকে বললাম।
চল আর দেরি করবো না। আমরা এগিয়ে যাই।
সঞ্জুর দিকে তাকালাম।
তোকে ফোনটন করে নি?
বন্ধ করে রেখেছি।
চারজনে খামারে চলে এলাম।
কারুর মুখে কোনও কথা নেই।
চিকনা একটা সিগারেট দে।
প্যাকেটটা পকেট থেকে বার করে আমার হাতে দিল। একটা বার করে সঞ্জুকে দিলাম।
এখন থাক, পরে খাবো।
বাসু একটা নিল।
আমি তোর থেকে কাউন্টার নেব। চিকনা বললো।
যেরকম ভাবে বাজার থেকে ফিরে এসেছিলাম সেরকম ভাবেই রওনা দিলাম। আমি চিকনার পেছনে। মোরাম রাস্তায় এসে, দূর থেকে স্যারের বাড়িটা চোখে পরলো। গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে দেখলাম চারদিকে লাইট জ্বলছে।
এখন তবু লাইট জ্বলছে। একসময় মনে হতো অন্ধকার হয়ে যাওয়া মানেই সমস্ত গ্রামটা শ্মশান পুরী। আকাশে অসংখ্য তারা, মাঠে জোনাকী ছাড়া কোনও আলো নেই।
আসতে বেশিক্ষণ সময় লাগলো না।
চিকনা খামারে এসে গাড়িটা দাঁড় করাতেই নেমে দাঁড়ালাম।
বারান্দায় বেশ কয়েকজন বসে আছে। চিনতে পারলাম না।
ভেতর থেকে বেশ চড়া গলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
সঞ্জু নেমে সোজা ভেতরে চলেগেল।
দেখলাম সব কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল।
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে বারান্দায় এলাম। আমার দু-পাশে চিকনা, বাসু।
মিনু ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। পেছন পেছন ঋজু আরও চার-পাঁচজন।
এদের মধ্যেই হয়তো সেই জামাইবাবু শালি আর ঋজুর বৌ আছে। ঋজুর বৌয়ের মুখটা চেষ্টা করে কিছুতেই মনে করতে পারলাম না।
মিনু প্রণাম করার জন্য ঝুঁকে পরলো। আমি হাতটা চেপে ধরলাম।
এই সময় প্রণাম করতে নেই। কাকীমা কোথায়?
মা ভেতরে খাটে বসে আছেন।
কে এসেছেরে মিনু। ভেতর থেকে কাকীমার গলা পেলাম।
দেখেছো, গলার স্বরে চিনতে পেরে গেছে। মিনু হাসছে।
আমি মিনুর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
অনিদা এসেছে। মিনু চেঁচালো।
ভেতরে নিয়ে আয়।
আর সবাই দেখলাম আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমি ভেতরে এলাম। সবাই আমার পেছনে।
কাকীমা স্যারের খাটে বসে। সামাজিক ঋীতি নীতি মনে সাদা থান পরেছে। মাথার সিঁথিতে বিবর্ণ সিঁদুরের স্পর্শ এখনও সম্পূর্ণ ফর্সা হয়ে যায় নি। এখনও তার হাল্কা রেখা দেখা যাচ্ছে। কাকীমার মুখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। মুখ নিচু করে নিলাম।
আয় আমার পাশে এসে বোস।
আমি খাটে উঠে কাকীমার পাশে বসলাম।
স্যার নেই বলে যেন আসতে ভুলে যাস না। আমি বেঁচে আছি।
কাকীমা আমার হাতটা চেপে ধরলো।
চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরছে।
বুকের ভেতরটায় আবার চিন চিনানি শুরু হয়ে গেল।
বাইরের ওই বারান্দায় বসে স্যার পড়াতেন। শীতকালে খামারে। কেননা একটু বেলা হলেই রোদটা খামারে এসে পড়তো। রোদের দিকে পিঠ দিয়ে স্যার পড়াতেন। শীতের রোদ বড়ো আরামের।
দাদা যেদিন প্রথম এই বাড়িতে পা রেখেছিল ওই বারান্দায় বসেই কত হইচই হয়েছে। আজ চারদিক কেমন শূন্য শূন্য।
মাথা নিচু করে আছি।
হ্যাঁরে তুই নাকি নিরামিষ খাচ্ছিস।
কাকীমার স্নেহের স্পর্শ আমার পিঠে।
চুপ করে রইলাম।
তোর স্যারের শেষ ইচ্ছেটুকু তোকে বলেছিলাম। তার নিজের সন্তানের থেকেও তোকে তিনি বেশি স্নেহ করতেন।
কোনও কথার উত্তর দিলাম না।
দাদার শরীর এখন ঠিক হয়েছে?
মাথা দোলালাম। হয়েছে।
ওঁরা জানতে পেরেছেন?
মাথা দুলিয়েই উত্তর দিলাম। হ্যাঁ।
শেষ সময়টা ওঁদের কথা খুব বলতেন। বার বার বলতেন, জানো সারাজীবনে আমি যতো ছাত্র পড়িয়েছি তার মধ্যে অনি সেরা। ও শুধু এই গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করে নি সারা ভারতের মুখ উজ্জ্বল করবে। বেঁচে থাকতে আমি হয়তো দেখে যেতে পারবো না। তবে তুমি দেখে যাবে।
আমার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হচ্ছে না।
কি খাবি?
কিচ্ছু খাবো না।
একটু কিছু মুখে না দিলে হয় কি করে।
একটু চিঁড়েভাজা বাদাম দাও।
তোর কি আর কিছু চাওয়ার নেই! এতোবড়ো মানুষ হয়ে সেই চিঁড়ে ভাজাতেই পরে রইলি।
কাকীমার কথায় ওরা মুচকি হাসলো।
মিনু।
বলো।
ওর যা প্রাণ চায় ওকে তাই এনে দে।
দেখলাম সুবীর, নীপা বারান্দা পেরিয়ে ভেতরে এলো। ঢুকতে ঢুকতেই বললো।
জ্যেঠি বকেছো অনিদাকে?
কেন বল।
সে কি-গো সকালে তোমাকে অতো করে বোঝালাম। তুমি বললে আসুক, তারপর দেখছি, এরি মধ্যে ভুলে গেলে।
বলেছি।
আজ সকাল থেকে দুধ মুড়ি আর গোটা চারেক পরটা খেয়েছে। চিকনাদা সকাল থেকে সঙ্গে রয়েছে, জিজ্ঞাসা করো।
রাতে ভাত দিবি, আমি বলছি। কিচ্ছু হবে না।
একজন ভদ্রমহিলা ভেতর থেকে একটা চেয়ার এনে দিল সুবীরের জন্য। সুবীর বসলো।
কাকীমা, গল্প করলে কাজের কাজ কিছু হবে না। যে কাজের জন্য ও এসেছে সেটা আগে সেরে ফেল। চিকনা বলে উঠলো।
তুই ঋজুর বৌকে দেখেছিস। কাকীমা আমার মুখের দিকে তকাল।
দেখেছি হয়তো, খেয়াল নেই।
ও পলি এদিকে আয়।
দেখতে বেশ মিষ্টি একটা ফর্সা মতো ময়ে এগিয়ে এলো। পায়ে হাত ঠেকাতে গেলো। হাত ধরে ফেললাম। এই সময় প্রণাম করতে নেই।
আপনি যখন স্যারের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করেছিলেন তখন দেখেছিলাম।
হাসলাম।
সেদিন কারুর সঙ্গে কথা বলতে পারিনি।
আপনার সঙ্গে সেদিন অনাদিদার ভীষণ ঝামেলা হলো।
হ্যাঁ। তুমি আমাদের এখানে থাকতে নাকি?
ধামসাইতে আমার বাপের বাড়ি।
তাই নাকি? কার ঘর?
চক্রবর্তীদের ঘর। কাকীমা বললো।
কানাই কাকাদের আত্মীয়।
ওনার ছোটভাইয়ের মেয়ে।
আমাকে দেখার আগে চিন্তে?
চিন্তাম না। তবে জ্যেঠুর মুখে আপনার অনেক গল্প শুনেছি।
ভালো না খারাপ?
এবার পলি থমকে গেল। কি বলবে ঠিক ভেবে পাচ্ছে না।
একচ্যুয়েলি ও যখন আপনার গল্প শুনেছে তখন ও খুব ছোটো।
ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকালাম। ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত মুখ।
আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না।
আমার জামাইবাবু। পলি বললো।
বুকের ওপর হাতজোড় করে নমস্কার করলাম।
না না আপনি নমস্কার করবেন না। আমি আপনার থেকে অনেক ছোটো।
আপনি থাকেন কোথায়?
স্টেশনের কাছে।
পূর্বদিকে না পশ্চিমদিকে।
পশ্চিমদিকে।
আপনার বাড়ি থেকে ভীমপুর নার্সিংহোম কতটা।
চারটে বাড়ি পর।
তার মানে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে।
ভদ্রলোকের মুখটা কমেন থম থমে হয়ে গেল।
হ্যাঁ।
চিকনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখের পলক পরে না।
সুবীর, বাসু, সঞ্জু একভাবে আমাকে মেপে চলেছে।
আমার স্ত্রী, পলির দিদি।
ভদ্রমহিলার দিকে তাকালাম। একই মুখশ্রী। দেখলেই মনে হয় দুই বোন।
উনি আমার চোখে চোখ রাখতে পারলেন না। মাথা নিচু করে নিলেন।
আপনি পলির থেকে বয়সে কতোটা বড়ো।
পাঁচ বছরের।
নীপা, মীনু চা চিঁড়েভাজা নিয়ে এলো।
অনিদা কাঁচা লঙ্কা, না ভাজা লঙ্কা।
নীপার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
শরীর বুঝে খাও। এখন কিন্তু বয়সটা পঁচিশ ছাব্বিশ নয়।
সবাই মিলে তোমরা এতো ধমকালে চলে।
কাকীমা আমার মাথায় হাত বোলাচ্ছে।
ও এখনও সেই অনি আছে। কতোদিন পড়তে পড়তে ছুটে এসে আমার সঙ্গে একগাল পান্তা খেয়ে গেছে।
থাক তোমাকে আর সুখ্যাতি করতে হবে না।
নীপা পা দাপাতে দাপাতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
সবাই খেতে শুরু করলো।
এখনও দুজন পুরুষ মানুষের সঙ্গে আমার পরিচিত হতে বাকি আছে। আমি তেমন একটা গা করলাম না। বুঝলাম সময় পরিচয় করিয়ে দেবে।
চিঁড়েভাজা মুখে তুলে, কাকীমার মুখের দিকে তাকালাম।
স্যার কি বলেগেছেন বলো।
সঞ্জু তোকে কিছু বলে নি?
শোনার মতো মানসিকতা ছিল না, ব্যাঙ্কের অনেক কাজ ছিল, সেগুলো সারতেই সন্ধ্যে হয়ে গেল।
কাকীমা সংক্ষেপে স্যারের সমস্ত কথা বললো। কোথায় সমস্যা তাও বললো। সঞ্জুর ব্যাপারটা কিন্তু একবারে এড়িয়ে গেল। সবাই চুপচাপ শুনছে। আমিও চিঁড়ে ভাজা খেতে খেতে সব শুনছি। চা খেতে খেতেই কাকীমার কথা শেষ হলো।
স্যার বেশ পাকাপাকি ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু কোথাও তোমার ভাগের কথা বলে নি!
সবাই আমার মুখের দিকে তাকাল।
আইনের চোখে স্যারের প্রপার্টির তুমিও একজন ভাগীদার। যদি ভাগই করতে চাও তাহলে সমান তিনভাগে ভাগ হবে। একভাগ তোমার, একভাগ ঋজুর, একভাগ মিনুর।
আমার লাগবে না।
লাগবে না বললে হবে না। সম্পত্তি পাওয়ার পর কাল তোমার মেয়ে, ছেলে যদি তোমায় না দেখে, তখন কি হবে।
তোর কাছে চলে যাব। দুটো খেতে দিবি, তাহলেই হবে।
তাহলে তোমার সম্পত্তির ভাগ আমাকে দাও।
চিকনারা হেসে ফেললো।
কি জামাইবাবু আমি ঠিক কথা বলেছি?
ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
ভাগ যখন হচ্ছেই তখন চুলচেরা ভাগ হওয়াই ভাল। তাই কিনা বলুন, আজ ছেলেমেয়েরা সম্পত্তির জন্য মারামারি করছে, কাল সম্পত্তি পাওয়া হয়ে গেল। ব্যাশ কাকীমা তখন ভাগের মা, শেষ পর্যন্ত গঙ্গা পাবে না।
না ওনাকে ঋজু রাখবে বলেছে। তাছাড়া মেসোমশাইয়ের পেনশন উনি পাবেন।
হাসলাম।
স্যারের দ্বিতীয় স্ত্রী আছে বলে আমার জানা নেই। কাকীমা পেনশন কার সঙ্গে ভাগাভাগি করবেন?
ভদ্রলোক আমার কথায় কেমন থতমত খেয়ে গেলেন।
চিকনা মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ঋজু রাখবে এটা ভালো কথা। কাকীমা থাকবে কিনা তার কোনও অনুমতি নেওয়া হয়েছে? তার ইচ্ছে অনিচ্ছা বলে একটা ব্যাপারা আছে। তিনি না-ও থাকতে পারেন।
সেটা ওনার ব্যাপার।
সেই জন্য তিন ভাগ। তাহলে পরবর্তী সময়ে কাকীমা যে দিকে ঢলে পরবে সেদিকে কাকীমার সম্পত্তির ভাগ যাবে। কাকীমাও বেশ ভাল-মন্দ খেতে পাবে। সঠিক আদর-যত্ন পাবে।
ভাগটা কি রকম হবে।
জামাইবাবুর মুখের দিকে তাকালাম। চিকনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
স্যারের যতো ভালো ভালো দো ফসলি তিন ফসলি জমি আছে ঋজু বেছে নেবে। তারপর বাকিটা মিনু কাকীমার মধ্যে সমানভাগ হবে।
তারমানে আপনি বলতে চাইছেন তিন ভাগেই ভাগ হবে।
সেটাই স্বাভাবিক।
তাহলে সমস্যা মিটবে না।
কে সমস্যা পাকাতে চাইছে তার নামটা আমাকে একবার বলুন। তার দায়িত্ব আমার।
আমি খুব ধীর স্থির অথচ গম্ভীর গলায় কথাটা বললাম। ভদ্রলোক চমকে আমার দিকে তাকালেন।
আমি চোখে চোখ রাখলাম।
ফোনটা বেজে উঠতে পকেট থেকে বার করলাম।
দেখলাম অর্কর নামটা ব্লিঙ্ক করছে।
চিকনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো কে করেছে।
অর্ক।
শোনা।
আমি লাউডস্পিকার অন করলাম।
হ্যালো।
কেমন আছো?
ভালো আছি।
স্যারের বাড়িতে গেছিলে?
স্যারের বাড়িতেই বসে আছি।
তাহলে থাক পরে ফোন করবো।
বলনা কি হয়েছে?
অনাদিদাকে আজ জামিন দিয়েছে হইকোর্ট।
জেল থেকে বেরিয়েছে?
চিকনার চোখদুটো ছোটো ছোটো হয়ে গেল। বাসু, সঞ্জুরা আমার মুখের দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকিয়ে।
এখনও বেরোয় নি। দেরি করে কাগজ রেডি হয়েছে। কাল বেরবে।
শোন বেরিয়েই অনেক বড়ো বড়ো লেকচার মারবে জেলের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে। বলবে আমি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের স্বীকার।
সে তো বলবেই।
আজই ওই সিডি কেশটা ঝেড়ে দে। কাল সকালে জেল থেকে বেরিয়েই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ওকে এই কেশটা সাল্টাতে হবে।
ওঃ সত্যি অনিদা তুমি অন্তর্যামী।
একথা কেন বলছিস?
আমি সেই জন্য তোমাকে ফোন করে অনুমতি চাইছিলাম।
দূর পাগল। অনুমতি নেওয়ার কোনও প্রয়োজন আছে। পর পর কোশ্চেন পেপার সাজান আছে। খালি উত্তর লিখে যা। ওকে আমি মারবো না। যতোই হোক বন্ধু। পাবলিক পিটিয়ে মেরে দেবে। জানিস পাবলিকের মার দুনিয়ার বার।
অর্ক হো হো করে হাসছে।
কান থেকে মোবাইলটা সরিয়ে নিলাম।
দ্বীপায়ণকে বলে দে। সুন্দর করে স্টিল ছবি বার করে নিতে। মেয়েটার চোখে ও বুকে পট্টি মেরে দেবে। তাহলে সেন্সার বোর্ডের ছাড় পেয়ে যাব। অনাদির ছবিটা পরিষ্কার থাকবে।
দ্বীপায়ণদা বানিয়ে ফেলেছে।
তোর লেখা হয়ে গেছে?
সব সেরে তোমায় ফোন করছি।
আর একটা কথা শোন।
বলো।
অনাদির প্রথম পক্ষের বউ, ছেলে, মেয়েকে বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে নজরবন্দি করে রেখেছে।
ওটারও ভালো খবর আছে।
তাই নাকি একটু বল শুনি।
একটু পাকুক তারপর বলবো।
আমার যেতে এখান থেকে দিন দশেক সময় লাগবে। আর একটা কথা।
বলো।
সিডিটার কিছু ক্লিপিংস ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে দিয়ে দে। পাবলিক দেখুক প্রাক্তন স্বরাষ্টমন্ত্রী কেমন মেয়ে নিয়ে ফূর্তি করেছিল। ওরাও অনেকদিন খাবার পায় নি। কালকে সারাদিনের খাবার পেয়ে যাবে। এখন সাতদিন রগড়াক।
অর্ক কনটিনিউ হেসে যাচ্ছে।
হাসিস না। ব্যাটা মিত্রাকে ধমক দিয়েছিল আমার ছেলে, মেয়ের গায়ে হাত পরবে। তোকে কথা দিলাম একমাসের মধ্যে ওকে পাগল বানিয়ে রাস্তায় ভিক্ষে করাব।
তাহলে কাল সকালে পাবলিক ঘুম থেকে উঠে চায়ের সঙ্গে নিমকি বিস্কুট খাবে।
হ্যাঁ।
শরীরটার দিকে একটু নজর রেখ।
তোরা সবাই মিলে শুধু শরীর শরীর করিস না।
কেন গায়ে ফস্কা পরে যাচ্ছে। নীপা চেঁচিয়ে উঠলো।
কে-গো, নীপাদি।
এখানে মুখ ঝামটানি দেওয়ার আর কে আছে বল।
দাও দেখিনি আমায়।
নীপা ছোঁ মেরে ফোনটা নিয়ে নিল আমার হাত থেকে।
কাকীমা হাসছে।
ও তোকে একবারে ভয় পায় না। তাই না?
মাঝে মাঝে পায়।
নীপা সাউন্ড অফ করে অর্কর সঙ্গে ফর ফর করে কথা বলে চলেছে।
মিনু আর একটু চা খাওয়া।
নীপা দেখলাম ফোনটা চিকনার হাতে দিল। চিকনা ওখান থেকে উঠে চলে গেল। বাসুও দেখলাম পেছন পেছন চলে গেল।
আমি জামাই তার সাঙ্গ-পাঙ্গর মুখটা একবার লক্ষ্য করলাম। একবারে থম থমে।
ঋজু আমার কথা সব শুনলি, তোর কিছু বলার আছে।
ঋজুর দিকে তাকালাম।
আমার কিছু বলার নেই। পলিকে জিজ্ঞাসা করো।
সারাটা জীবন আমার ঘারে বন্ধুক রেখে চালালে। নিজের বৌয়ের ইজ্জত যে রক্ষা করতে পারে না সে কীরকম স্বামী। পলি ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
ঋজু মুখ নিচু করে নিল।
পলির দিকে তাকালাম।
এই সব কি আজেবাজে কথা বলছো পলি। জামাইবাবু বলে উঠলেন।
নীপা, মীনু রান্নাঘর থেকে একবার উঁকি মারল।
কেন বলবো না, যা সত্যি তাই বললাম।
সঞ্জু দেখলাম উঠে বাইরে চলে গেল।
আপনি কিছু মনে করবেন না। জামাইবাবু বললেন।
কাকীমা স্থবিরের মতো বসে।
আমার মাথায় ব্যাপারটা ঠিক ঢুকলো না।
ও একটা ব্যাপার আছে। জামাইবাবু আবার উত্তর দিলেন।
কিরে ঋজু পলি ঠিক কথা বলছে।
কি বলবো তোমায়। বাবার মুখে শুনেছি তুমি আমায় জম্মাতে দেখেছো। আমাকে দেখে তোমার কি মনে হয়?
তাহলে পলি এসব কথা বলছে কেন?
মানুষের ভীমরতি হলে এসব কথা বলে।
এই ঋজু এসব ফালতু কথা বলছো কেন। জামাইবাবু ধমকে উঠলো।
ঋজুর সঙ্গে খুব জোড় লেগে গেল।
ঋজুও কমতি যায় না। মুখে যা এলো বলে গেল।
ঋজুর বৌকে দেখলাম জামাইবাবুর পক্ষ নিয়ে বলতে শুরু করে দিল।
আমি শুধু ওদের অবস্থা দেখছিলাম। তারপর দেখলাম পলির দিদি ওর জামাইবাবুর সঙ্গে আসা আরও দুজন ঋজুর সঙ্গে লগে পরলো।
খুব জোড় তর্কা তর্কি শুরু হয়ে গেল।
বুঝতে পারলাম ধীরে ধীরে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
কাকীমা কিছু বলতে গেল, আমি হাতটা আস্তে করে চেপে ধরলাম।
চিকনারা বাইরে থেকে ছুটে এসে থামা থামি করার চেষ্টা করলো। কে কার কথা শোনে।
গলা যেন আরও চড়ে গেল সবার।
মিনিট পাঁচেকের প্রবল ঝড়ে সব কেমন ওলট পালট হয়ে গেল।
আমাকেও যে ঠেস দিয়ে কথা বললো না তা নয়, কাকীমাকে থামালাম। পরিবেশটা কেমন থম থমে হয়ে গেল। সবাই উত্তেজিত। আমার কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই।
আমি খুব নিরুত্তাপ ভাবে চিকনার দিকে তাকালাম।
চিকনা আমার ফোন থেকে শ্যামকে একটু ফোন করে আমাকে দে।
আমার কথাটা শোনার পরই এতক্ষণ যারা হইহই রইরই করছিলি তাদের মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। সবার চোখে কে যেন হাজার পাওয়ারের বাল্ব জ্বেলে দিয়েছে।
আমার বলার সঙ্গে সঙ্গে চিকনা মোবাইলের বোতাম টিপল। আমার চোখের কথা ও বুঝে ফেলেছে। ইচ্ছে করেই ভয়েজ অন করে আমার হাতে মোবাইলটা দিল।
বইল অনিদা কেমন আছিস।
সবাই সত্যিকারের শ্যামের গলাটা শুনে কেমন যেন হতচকিত হয়ে গেছে।
শরীরটা ঠিক জুতে নেই।
কেনে তুই এতো টেনশন লিচ্ছিস বলতো। তোর কাজগুলান চিকনাদা করতি পারে।
পারে, তবু কিছু কাজ নিজেকে করতে হয়।
তুই বাড়ি চলি যা। তোর মনটা কাল থেকে ঠিক লাই।
চুপ করে রইলাম।
উনা স্যারটা বড়ো ভালো মানুষ ছিল রে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল একটুক যাই।
আসতে পারতিস।
এদিকে লুকজন লাই। সামলাইতে হতিছে।
কোনও নতুন খবর পেয়েছিস?
অনাদিকে ছাড়িছে। তুই বইললে কাইলই ওইটাকে মারি দিই।
এটা করিস না।
কেনে বইলছিস বল।
কাল অর্ক, অনাদির সেই সিডিকেসটা ছাপছে।
তাই! বড়ো ভাল খপর দিলি।
আমি বলেছি ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতেও দিতে।
পাবলিক সিলেমা দেখবে।
আমি হাসছি।
সত্যি অনিদা তুর মাথা বটে। শালা জেল থেকে বেরিয়ে ডায়লগ মারবে তাও বন্ধ।
তুই একটা কাজ কর।
বইল।
ঝিকে মেরে একটু বৌকে শিক্ষা দে।
শ্যাম হে হে করে হেসে ফেললো।
হাসছিস কেন?
হাতের কাছে ভীমপুর ছাড়া আর কিছু চোখ পড়ে লা।
কেন?
ভীমপুরের নার্সিংহোমের কতকগুলান ফইরা টুকু ঝিকুরঝুকুর করতিছে। শালারা আবার শুরু করিদিছে। অনাদির খাস লোকজনের সঙ্গে লুকি লুকি ফস্টানি করেঠে।
এই মওকায় মেরে দে। তারপর….
কথা শেষ হবার আগেই দেখলাম জামাইবাবু আর অপরিচিত দুজন রে রে করে আমার পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পরলো।
মোবাইলটা হাত থেকে ছিটকে চলে গেল।
এ কি করলেন দাদা আমরা কি দোষ করলাম। পলির দিদি মরা কান্না কেঁদে উঠলো।
চিকনা মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়েছে।
ও মাসিমা আপনি একটু ওনাকে বোঝান। এর আগে কি মারটাই না ওদের মেরেছে। এবার মেরে ফেলার হুকুম দিল।
তখনও মোবাইলে শ্যামের গলা ভেসে আসছে, কি হইলরে অনিদা তোর গায়ে কেউ হাত দিছে লাকি রে। শালা ঢ্যামনার পুত দারুটা আমাকে ঠিক মতো খপরটা পর্যন্ত দেয় লাই….।
দেখলাম চিকনা ফোনটা নিয়ে ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল।
নীপা, মিনু রান্নাঘর থেকে ছুটে চলে এসেছে।
আমি কেমন থতমত খেয়ে গেছি।
বাসু, সঞ্জু, সুবীর প্রাণপণে ওদের হাত ধরে টেনে সরাতে পারছে না। আমার পা ধরে ওরা টানাটানি শুরু করে দিয়েছে।
কাকীমা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো।
অতই যদি প্রাণে ভয় ওর সঙ্গে লাগতে যাও কেন। তোমরা নাকি সব বড়ো বড়ো নেতা। এখানে সালিশি করতে এয়েছো শালির হয়ে।
বাইরেও দেখলাম হই চই লেগে গেছে। চিকনার গলা শুনতে পাচ্ছি।
তুই সরি যা চিকনাআকা, না হলে একটা অনর্থ হইয়ে যাবে।
আমি বলছি অনির গায়ে কেউ হাত দেয় নি। আমার কথা বিশ্বাস কর।
শলানকার এততো বড়ো ক্ষ্যামতা হইইছে। বার কর শোর গুলোকে।
বাইরের কর্কশ গলা খাটের কাছে এসে আছাড় খেয়ে পড়ছে।
দেখলাম ওরা সবাই কেমন ভয়ে জবুথবু হয়ে গেছে। কারুর মুখে কোনও কথা নেই।
আমি কার দিকে তাকাব। সুবীর, বাসু ছুটে বাইরে চলে গেল। আবার ভেতরে চলে এলো।
একবার নীপার দিকে তাকায়, একবার মিনুর দিকে তাকায়।
এরা একটা কিছু অঘটন না ঘটিয়ে শান্তি দেবে না। বাসু নিজের মনেই কথা বললো।
আমি কিছুতেই গলা শুনে বুঝতে পারছি না। বাইরে কে। চিকনা সমানে অনুরোধ উপরোধ করে চলেছে। শিবু, দারুর গলা আমি চিনি।
নীপা দেখো তো কে এসেছে। চিকনাকে বলো ভেতরে নিয়ে আসতে।
নীপা বেরিয়ে গেল। ওরা দেখলাম সবাই খাটের একপাশে এসে জড়ো-সড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামনের চেয়ারগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। মাথার ভেতরটা কেমন শূন্য শূন্য মনে হচ্ছে। কি করতে এলাম কি হয়ে গেল। কাকীমার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না।
একটা মিশ কালো বছর একুশের ছেলে বারান্দা পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। মুখটা পাথরের মতো, চোয়ালদুটো শক্ত, চোখে আগুন ঝড়ছে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে।
ছেলেটা ওদের দিকে তাকাল।
(আবার আগামীকাল)