জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫০ নং কিস্তি
পিপটু কাঁহা।
মাম্পি, মিকি কো সাথ গার্ডেন মে।
অনিমেষদারা দাদারা সব খেতে বসেছে। বৌদি মাসি দিচ্ছে। মোট আটজন বসেছে। আমি টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ালাম।
অনুপদা ফিক ফিক করে হাসছে।
বাবুর্চি ভালই রেঁধেছে কি বলো অনিমেষ। ডাক্তারদাদা বললো।
তোর কথায় যেমন লঙ্কা, খাওয়াতেও তেমন লঙ্কা। অনিমনেষদা হাসতে হাসতে বললো।
ঝাল হয়েছে?
খুব সামান্য।
চলেবেল। মাংস একটু আধটু ঝাল না হলে আবার ভাল লাগে না। অনুপদা বললো।
অনিমেষ তুমি যে গল্পটা ভজুর পেট থেকে বার করলে, তাহলে সত্যি বলো। বিধানদা বললো।
হ্যাঁ। কোনও পান নেই। নিখাদ।
ছেঁড়া ছেঁড়া কথা, আমি হাসছি।
সুরর বিবাহ বার্ষিকী তুমি চেপে গেলে কেন। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
তোকে বলতাম। এরা বারণ করলো। যদি তুই বেঁকে বসিস।
আমি ঠিক সময়ে বাঁকবো। তখন কুকুরের লেজ বনে যাবো। সোজা করতে পারবে না।
ওরকম করিস না। পাকা ঘুঁটি কেঁচিয়ে দিলে হয়।
অনুপদা, রূপায়ণদা হাসছে।
বড়োমা, আর সব কোথায়?
দাঁড়া। খিদের জলুনি ছিল, একটু একটু খেয়ে চলে গেছে। এবার সব নামবে।
ছোটো, আমাকে একটু ভাত দাও। দাদা বললো।
কিগো তুমি যে নিস্তব্ধ প্রাণ ঘাতিকা। আমি দাদার দিকে তাকালাম।
দাঁড়া, আগে পেট ভরে খাই, তারপর কথা বলবো।
কেন, সকাল থেকে কিছু দেয় নি বড়োমা।
কোন সকালে কয়েকটা চামড়ার মতো লুচি বানিয়েছিল।
হ্যাঁ তারপর গান্ডেপিন্ডে গিলে হাউ হাউ করো। আমি সামন্তর পেছনে দৌড়ই। বড়োমা চেঁচালো।
দাদা, ডাক্তারদাদা দুজনেই হাসছে। দাদা আমার দিকে তাকাল।
তুই এটা শুনতে চেয়েছিলি? শোনা হয়ে গেছে?
আমি দাদার দিকে তাকিয়ে হাসছি।
তোর বড়োমার ঘটে বুদ্ধি নেই বুঝলি।
তোমার ঘটে আছে। বড়োমা আবার চেঁচিয়ে উঠলো।
এতদিন কাগজটা চালালুম। তুমি হেঁসেলটাও ভাল করে সামলাতে পারলে না। ছেলের কাছ থেকে শেখো।
অনেক শিক্ষে হয়েছে। তোমাকে আর দাঁত বার করতে হবে না।
সত্যি সত্যি কেউ আর গম্ভীর হয়ে নেই, সবাই দাঁত বার করেই রয়েছে। আমি সোফায় গিয়ে বসলাম। বরুনদার দিকে তাকালাম।
তাকিয়ে লাভ নেই। বৌদি জোড় করে বসিয়ে দিল।
নীরুরা সবাই ঢুকল।
দেখলাম স্নানটান সারা। আমার দিকে তাকিয়ে একটা বিকট হাসি দিল।
তুই তিনটে ট্রে বার করেছিলি। আমরা আর একটা ট্রে ম্যানেজ করলাম। চার ট্রে অলরেডি ফাঁকা। মাংস এনে দিচ্ছি, কম পরে যাবে, আবার লেগে পর।
দাদারা আছে, কিছু বলতে পারবো না। অগত্যা চুপ করে থাকি। নীরুর দিকে তাকালাম।
কিছু বললেই ধমকাস কেন বলতো।
অনুপদা, রূপায়ণদা হেসে গড়িয়ে পরে।
সুরো চায়ের কাপ নিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল।
নীরু আমার দিকে তৃষিত নয়নে তাকিয়ে।
হবে না। ভাগ।
কাপের তলায় এক চুমুক। তখন বেকড চিকেনটা মারার পর চায়ের ভীষণ দরকার ছিল, দেখলাম হাওয়া গরম, কোনও কথা না বলে স্নান সেরে চলে এলাম।
আবিদ, আয়েষা ঘরে ঢুকলো। পেছনে অনিকা, অনিসা নাচতে নাচতে ঢুকলো।
বাবা।
মেয়ে আমার দিকে একটা সিডি দেখাচ্ছে।
ওটা কিরে?
কালকের নাচের সিডি। আবিদ আঙ্কেল নিয়ে এলো।
আবিদরা দু-জনে এসে সোফায় বসলো।
এতো দেরি?
আর বলো না, সকাল থেকে বেরব বেরব করছি, কিছুতেই বরতে পারি না।
আয়েষা আমার পায়ে হাত ঠেকিয়ে বড়োমাদের কাছে চলে গেল। আবিদও পেছন পেছন গেল।
নীরুকে কাপটা দিয়ে টেবিলের কাছে গেলাম।
খাওয়াটা জব্বর হলো বুঝলি অনি। মাঝে মাঝে একঘেয়েমির হাত থেকে বাঁচতে তোর হাতের রান্না খাব। ডাক্তারদাদা বললো।
ডাক্তারদাদা টিকিয়াটা দারুণ হয়েছে না। রূপায়নদা বললো।
খুব সুস্বাদু। দেখো তেল ঝালও চপ চপে না। তারপর খেয়ে দেয়ে একটা ঢেঁকুর ওঠে, দেখবে নাক মুখ যেন একবারে জলে যায়।
জাফরান দিইনি।
সেইজন্য একবারে কোনও গন্ধ নেই। অনুপদা বললো।
বান্ধবী।
ডাক্তারদাদার ডাকে বড়োমা টেবিলের কাছে এলো।
মিষ্টি-ফিষ্টি দু-চারটে পাওয়া যাবে না। অতগুলো হাঁড়ি এলো।
কেন উঠে খাওয়া যায় না।
সে তো সবসময় যায়। ভাতের পাত বলে কথা।
বড়োমা গম্ভীর হতে গিয়েও হেসে ফেললো। বৌদি দেখলাম দইয়ের হাঁড়ি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ছোটোমার হাতে রসগোল্লা।
অনিসারা আবার হই হই করে ঘরে ঢুকলো।
দাদাই এইখানে বসে আমাদের নাচ দেখবে?
ডাক্তারদাদা অনিসার দিকে তাকাল। দেখা।
তোমরা কি খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে যাবে? অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
কেন বল!
দরকার ছিল।
পাঁচটা থেকে একটা মিটিং আছে।
তাহলে সেরে এসো। একটু বসবো। পারলে প্রবীরদাকে একটু আসতে বলো।
সুরো ফোন করেছিল, রাতে আসবে বলেছে।
তাহলে এসো। একটু বসবো। আমি এবার স্নানটা সেরে নিই।
যা, অনেক পরিশ্রম হয়েগেল। ডাক্তারদাদা বললো।
বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। চিকনারা সব মাঠে হাসাহাসি করছে।
মীরচাচা, ভানুকে দেখতে পেলাম। আমাকে দেখে হাত তুললো। নেপলা বুড়ো আঙুল দেখাল। অর্থটা এই, দারুন দিলে।
এসে দেখলাম ঘরের দরজা বন্ধ।
নক করলাম।
কে?
আমি।
মিলি, বাবু এসে গেছেন তারাতারি কর। মিত্রা চেঁচালো।
তনু মুখ বার করলো, হাতে কাপরের কুঁচি ধরা।
এখনই আসতে হবে?
ঠিক আছে পরে আসছি।
দিদি ও চলে যাচ্ছে।
ওকে ভেতরে আসতে বল, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, যা দেখার কাল রাতে দেখে নিয়েছে।
আমি তনুর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।
করে নাও, আমি মাঠে দাঁড়াচ্ছি।
আমি বারান্দা থেকে মাঠে এলাম। নেপলার কাছে সিগারেট চাইলাম। মীরচাচা রতনের পেছনে লুকিয়েছে। ভানু মাথা নিচু করে মিটি মিটি হাসছে।
কাল টুকু বেশি খায়া লিছি।
সিগারেট ধরালাম।
ময়নাকে পাইছু।
ধ্যুস ভুল বইকা মরছি।
সবাই শুইনা মরছে। এবার যদি জিজ্ঞাসা করে ময়না কে, কি কইবি?
কেউ জিগাই নি।
জিগাইলে—
কয়ে দেব।
ময়নাকে দেখাতে পারবি?
ভানু হাসছে।
মীরচাচা—
তোকে কথা দিচ্ছি আর কোনও দিন হবেনি।
সে তো বুঝলাম—
কি হলো কে জানে, ভানুর জন্য খায়া মরলি।
কাকে কেটে মালঞ্চের জলে ফেলবে?
আমাকে নেপলা বলছে।
আমি হাসি।
আজ ফিরে যাবে?
কাল ভোর ভোর যাব।
ওখানকার খোঁজ খবর নিয়েছ?
সব ঠিক আছে।
ভানু।
বল।
তুই ব্যাটা দুধে খালের জল মেশাচ্ছিস।
মিছে কথা।
কাল যে দুধটা নিয়ে এসেছিস সেটা কেমন পানসে পানসে।
এটা লতুন গরুর দুধ।
আবার কিনেছিস নাকি?
দুটা কিনছি। ব্যাটা আর ব্যাটার বউকে দিছি।
ব্যাটার আবার বউ করলি কবে!
বউ পোয়াতি হয়ে মরলো। চিকনা বললো।
আমি হাসছি। ছেলের বউ পোয়াতি আর তুই বেটা এখনও ময়নার খোঁজ করছিস!
প্রথম প্রেম বলে কথা।
চিকনার কথায় বাসু হেসে গড়িয়ে পরে।
শালা এখনও যায়। বাসু বলে, আর আমি হাসি।
না রে, বাসু মিছে কথা বলে।
তাহলে যাস কেন?
খাইতে পায় নি। কিছু ট্যাকা দিই।
ওর বরটা আছে?
না সাপকাঠি হয়ে মরিইছে।
অনিদা আমরা রেডি।
বারান্দার দিকে তাকালাম।
দেখলাম টিনা, অদিতি, নীপা, মিলি দাঁড়িয়ে। ওই ঘর থেকে তারস্বর চেঁচা-মিচির আওয়াজ এসে বাগানে আছড়ে আছড়ে পরছে। ওরা দৌড় লাগালো।
কালকের নাচের সিডি চালিয়েছে।
তাই!
চিকনা দৌড় দিল, পেছন পেছন সবাই।
আমি ঘরে এলাম। মিত্রা তখনও আলমাড়ির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাপর ঠিক করছে।
ইসি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
হাসিস না। কাল যা বিশ্বরূপ দেখলাম মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। এতগুলো সখী….।
মন খারাপ করিস না।
আর একদিন ভাল করে দেখা।
খায় কতো। সখ উথলে উঠছে, না। মিত্রা বললো।
যা বাবা, শালী মানে কি?
আর মানে বোঝাতে হবে না। দুটোকে নিয়ে সামলাতে পারে না, আবার শালী আধা ঘরবালী।
বেকড চিকেন মারলি, একটু ছোঁয়া ছুঁয়ি দে।
রাতে শুবি, দেব।
তনু হাসছে।
তুই জানিস না তনু, ওর সঙ্গে এইভাবে কথা না বললে তোক পিষে দেবে।
মিত্রা, তনুর দিকে তাকাল।
সব ভালো, শুধু হিটলারি মেজাজটা ষোল আনা। ইসি বললো।
আমি মিটি মিটি হাসছি।
মোবাইলটা টেবিলে রেখে পাঞ্জাবী খুললাম।
কিরে টাওয়েল ভিঁজিয়ে রেখে এসেছিস না শুকনো?
তনু আলমাড়ি থেকে ওকে একটা টাওয়েল বার করে দে।
পাজামা-পাঞ্জাবী বার করবো।
দে।
যেটা নিয়ে এলাম? তনু বলে মিত্রার দিকে তাকাল।
নতুন?
হ্যাঁ।
ও পড়বে না।
তনু আমার দিকে তাকালো।
কোথাও যাচ্ছি না তো তাহলে নতুন ভেঙে কি হবে?
তোকে কি বললাম—প্রথম যেদিন আমার বাড়িতে গেল, কি পড়ে গেছিল? আমি মরার আগের দিন পর্যন্ত মনে রাখব। তুই ওকে বদলাতে পারবি না।
অ্যাতো আছে, আজ একটা পড়ো না।
ঠিক আছে বার করে দাও।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে।
আমি বাথরুমে ঢুকলাম।
আজ অনেকটা হাল্কা। তবু রতনের মুখ থেকে অনাদি আর সুনীতের কথা শুনে মনটা খচ খচ করছে। কত দিকে মাথা গলান যায়?
ইসলামভাইকে নিয়ে একবার বসতে হবে। তখন কি করে রেখেছে জানতে হবে। তারপরে হাত দিতে হবে। ইসলামভাই হয়তো ভুলেই গেছে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মনে করাতে হবে।
কেউ তো আমার গর্ভ যন্ত্রণা বুঝবে না।
অনিকা মনে হয় খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। পক্কে, ঘণ্টার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
কতো কাজ। এরা বলে সব ছেড়ে ছুড়ে দে।
ওদিকে পিকু আবার কি জিলিপির প্যাঁচ মেরে রেখেছে তারও সন্ধান করতে হবে। সকলকে আগলাতে গিয়ে আমার ছেলে-মেয়েদেরই সময় দিতে পারি না। ভাবলাম সব কাজ শেষ এবার পায়ের ওপর পা তুলে দিব্যি কাটিয়ে দেব।
ও মা, কোথায় পায়ের ওপর পা তুলব। মাটি থেকে পা তুলতেই পারছি না। তবু দাদারা ছিল বলে এ যাত্রায় রক্ষে পেয়ে গেছি। না হলে একবারে ল্যাজে গোবরে হয়ে একশা।
কিরে কতোবার বলবো, বাথরুমটা তোর শোয়ার বিছানা নয়।
মিত্রা দরজা ধাক্কাচ্ছে, গজ গজ করছে।
দাঁড়া না, ঝামেলা করছিস কেন, বেরচ্ছি।
কতক্ষণ লাগে শুনি। তোর জন্য সবাই বসে থাকবে নাকি?
খেয়ে নিতে বল।
আমরা হচ্ছি পড়ে পাওয়া চোদ্দআনা, তুই ষোলআনা।
বক বক করিস না। বেরচ্ছি।
গা মুছে বেরিয়ে এলাম।
ঘরের দরজা বন্ধ।
মিত্রা সোফার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
আমি খাটের কাছে আসতেই ও এগিয়ে এলো।
চোখে মুখে দুষ্টুমি ছড়িয়ে পড়েছে।
টাওয়েল চেপে ধরে বললাম, নো ঝামেলা।
মিত্রা কোনও কথা বললো না।
কাছে এগিয়ে এলো।
খাট থেকে ড্রয়ারটা তুলে নিলাম।
নতুন দেখছিস মনে হচ্ছে।
মিত্রা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
অনেক ভাগ্য করে তোকে পেয়েছি।
আবার কি হলো?
ও ঘরে সবার মুখে শুধু তোর কথা।
তাতে কি মহাভরতটা শুদ্ধ হল বল।
বলতে পারবো না।
টাওয়েল খুলে পরে যাবে।
যাক।
তনু এসে যাবে।
তনু তোকে এই অবস্থায় কোনও দিন দেখেনি?
তোর সামনে দেখেনি।
আজ দেখবে। তাতে দুজনের কারুর কোনও ক্ষতি হবে না।
তাহলে তনুকে ডাক।
মিত্রা বুক থেকে মুখ তুললো। হাসছে।
ডাকি।
না ও লজ্জা পেয়ে যাবে।
তুই এতো বুঝিস এটা বুঝিস না।
মিত্রার চোখে চোখ রাখলাম।
সেই যদি মনে করতাম তাহলে কিছুতেই তনুকে মেনে নিতে পারতাম না।
মিত্রাকে জড়িয়ে ধরলাম।
তুই তো আমার সব ভুলগুলোকে মেনে নিয়েছিস।
আমি মানিনি, মানতে চাইনি। তুই তোর কাজের মাধ্যমে মানাতে বাধ্য করেছিস।
তার মানে তুই জোড় করে মেনে নিয়েছিস।
কখনই না। একটু একটু করে বুঝতে শিখেছি। যখন সবটা বুঝলাম তখন দেখলাম ভুলটা তোর নয় ভুলটা আমার। তুই তো তনুর কোনও ক্ষতি করিসনি। বরং তনু তোর জন্য সেক্রিফাইস করেছে। তার প্রতিদান তুই দিয়েছিস। তুলনায় আমার সেক্রিফাইস নেই বললেই চলে।
মিত্রার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালাম।
জানিস বুবুন, মেয়ে, অনিকা তোর দলে। কাল কি ঝগড়া করলো তনু আর আমার সঙ্গে।
অনিকার ব্যাপার নিয়ে তোদের সঙ্গে কথা বলাই হলো না।
আজ রাতে তুই শুবি তো?
তোরা বেসামাল না হলেই শোব।
মিত্রা পেটে খোঁচা মারলো।
আবার ফিচলেমি।
তোরা কাল আমার কথা মতো কেউ খাস নি।
হবে কি করে, তোর মুডটা যে এইরকম হঠাৎ চেঞ্জ হয়ে যাবে বুঝবো কি করে।
দিদি। বাইরে তনুর গলা পেলাম।
মিত্রা হেসে ফেললো।
দাঁড়া ধরে আনি। ও তোকে বড্ড মিস করছে।
মিত্রা দরজা খুলতেই তনু আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকালো।
এখনও টাওয়েল পড়ে দাঁড়িয়ে আছো!
ভেতরে আয়, দরজাটা বন্ধ করি।
কেন!
দুর।
মিত্রা, তনুর হাত ধরে ঘরে ঢোকালো। নিজেই ছিটকিনিটা দিল। তনু হাসছে।
ও বাথরুম থেকে এখন বেরলো?
আমি দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছি।
ও ঘরে তোমার নাচ দেখে সকলে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
আমি ড্রয়ারটা কোমরে তুলতে তুলতে বললাম, কেন?
দু-হাত তুলে ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ করছো। আর কোমর দোলাচ্ছ।
কোমরটা কাল বেশ যন্ত্রণা করছিল, তাই একটু ব্যায়াম করলাম।
তনু হাসতে হাসতে খাটে বসে পরলো।
তোমরা মেদ ঝড়িয়ে কোমরটা কেমন শরু শরু করেছো আমিও করার চেষ্টা করছি।
মিত্রাদি অনিমেষদা বলে কি জানো! ঢ্যাঙা লম্বা লম্বা পায়ে বেশ নাচে তো।
মিত্রা আমার দিকে হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে।
তনু আমার দিকে তাকাল।
ছোটোমা বলেছে খাওয়ার পর তোমার সঙ্গে একটু নাচবে।
আমাদের সঙ্গে নাচের দৃশ্যটা তোলেনি? মিত্রা বললো।
তোমার মুখ ধরে খালি এদিক ওদিক ঘোরায়। একচোট নেচেছে সব ভাইবোনেরা। উরি বাবা অনিকা, অনিসার সে কি উদ্দাম নাচ, পাশে শুভ, সুন্দর। পক্কে, ঘণ্টা, অনন্য শুধু কোমর দোলায়।
ওদের কথা বলার ফাঁকেই আমি পাজামা পাঞ্জাবী গলিয়ে নিলাম।
তনু সেফটিপিন দাও।
তনু আমার কথাটা বুঝতে পারে নি। বসেছিল। দাঁড়িয়ে পরলো।
কিসের সেফটিপিন?
পাঞ্জাবী বার করেছিস, বোতাম কই।
তনু হেসে ফেললো।
তাই জন্য সেফটিপিন লাগাবে। সেফটিপিন লাগিয়ে ওই ঘরে যেতে পারবে?
তনু ও কথা বলিস না। তোর প্রেসটিজ আছে, ওর নেই। তুই বরং ওকে দেখলে লজ্জা পেয়ে যাবি। মেয়ে বলে শুনিস না। তোমরা দু-জনে বাবাকে একটু ভালো জামাকাপর পড়াতে পার না। দু-দিন পরে অনিকাটাও বলতে শুরু করবে। ওর বাবা যে কি ঢপের সে তো ওরা জানলো না।
কথা বলতে বলতে মিত্রা আলমাড়ি খুললো। তনু আমার দিকে হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে।
তোর কাছে এতোদিন ছিল কিছু বুঝিস নি?
আমার কাছে যখন ছিল জামাকাপর পরতো কই, ওই তো একটা আলখোল্লা। তাও গেড়ুয়া।
কৌপিন পড়তো?
তনু হাসতে হাসতে মাথা দোলালো, না।
মিত্রা একটা সোনার বোতাম বার করলো।
এটা লাগাব নাকি?
আর নেই।
প্লাস্টিকের আনেতে পারিস নি?
চোখে পরেনি।
মিত্রা, তনুর হাতে বোতামটা দিল। লাগিয়ে দে।
তনু এগিয়ে এলো।
দাও আমি লাগিয়ে নিচ্ছি।
সোজা উল্টো চিনিস। মিত্রা আলমাড়ি বন্ধ করতে করতে বললো।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসছি।
তখন থেকে বহুত বক বক করছিস। ঘরের দরজা বন্ধ আছে, দু-টোকে চটকে লেচি বানিয়ে দেব।
দম থাকার দরকার বুঝলি, এই বুড়ো বয়সে সেই দম তোর আর নেই।
তনু বোতাম লাগাচ্ছে।
পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
প্রার্থনীয় কেনো হাতের কাছে আছে, পরীক্ষা করে দেখে নে।
দাঁড়া আজকে গরম কিছু খেতে হবে।
তাতেও জাগবে না।
তনু মুচকি মুচকি হাসছিল। এবার ফিক করে হেসে ফেললো।
ওঃ দিদি, তুমি না কি।
হাসিস না তনু। মাঝখান থেকে কি হলো? তুইও পেলি না, আমিও পেলাম না।
মিত্রা ভাসা ভাসা চোখে আমার দিকে তাকালো।
আমি মিত্রাকে কাছে টেনে নিলাম। দু-জনেই এখন আমার বুকে।
তোদের অভিমানের জায়গাটা আমি বুঝি। কিন্তু আমার কি করার আছে বল। আমি যদি এই মুহূর্তে হাল ছেড়ে দিই। তোকে পিষে মেরে দেবে।
তোর এখনও কাজ শেষ হয়নি!
কোনওদিন হবে না। কি করে হবে? যতো দিন যাচ্ছে ততো যেন সবাই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। তোরা ওখানে ছিলি। তোর বাড়ি থেকে সেই পুরনো দলিলগুলো নিয়ে এলাম। তুই তো জানিস। তোর সঙ্গে সেদিন কথাও হল।
মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
সব বে-হাত হয়ে গেছে। দুটো জমি জট পাকিয়ে রেখেছে ইসলামভাই, সেই সময়।
মিত্রার চোখে বিষ্ময়।
তখন তোর টালমাটাল অবস্থা। আমি সবে মাত্র দেখাশুন করছি। ওরা বুঝতে পেড়েছিল, অনি এতো সহজে ছেড়ে দেবে না, কাজ সেরে রেখেছে। তোর জমি আর একজনকে তুই সাজিয়ে বেচে দিয়েছে।
কি বলছিস!
একবার সেই দিনগুলোর কথা চোখ বন্ধ করে ভাব। আজ কিন্তু তুই অনেক ভালো আছিস।
ইসলামভাই ছাড়াও একটা সুনীত-অনাদি দুজনে মিলে গণ্ডগোল করে রেখেছে। আর একটা চাঁদের দলের ছেলে বেনামে বিক্রী করে দিয়েছে।
মিত্রা, তনু দুজনেই অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তোদের একটুও মিথ্যে কথা বলছি না। বানিয়েও বলছি না।
প্রায় সত্তর কোটি টাকার সম্পত্তি, তুই বল ছেড়ে দেওয়া যায়। জিনিসটা আমার নয় তোর। আমি তোর হয়ে লড়ছি। তনুর দিল্লীর সম্পত্তি এখনও কোনও সমাধান হয়নি। তুই টাকা দিয়েছিস। তনুর নামে রেস্ট্রি হয়েছে। এখনও তার মিউটেশন থেকে সব বাকি পড়ে রয়েছে।
রতন একটা দারোয়ান ঠিক করে পাহাড়ার ব্যবস্থা করেছে।
ওই বাড়িটা নিয়ে একটা কিছু করার ইচ্ছে আছে।
এদিকে পিকু একটা জট পাকিয়ে রেখেছে।
পিকু!
বলবো তোদের। আর বলেই বা কি করবো। জট আমাকে ছাড়াতে হবে। আবার নতুন করে ছক কষতে হবে। অঙ্ক মেলাতে হবে।
ওদিকে আফতাবভাই দিদি মাথা খারাপ করে দিচ্ছে এখানে কিছু করার জন্য। অনিমেষদারা ছুঁক ছুঁক করছে। যত তারাতারি সম্ভব প্রজেক্টের কাজ শুরু করে দেওয়ার জন্য। তাহলে সামনের ভোটে এ্যাডভান্টেজ অনিমেষদা।
আফতাবভাই, দিদি যুক্তি করে এখানে বসিরকে পাঠাচ্ছে। সরেজমিনে সব দেখে যাওয়ার জন্য। প্রয়োজনে নিজে আসবে। আমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। ইনিসিয়াল প্রায় ছ-হাজার কোটি টাকা ইনভেস্ট করবে। এটা খাতা-কলমে, পরে এটা আরও বাড়বে। আমার জায়গায় তুই থাকলে কি করতিস?
ছ-হাজার কোটি! মিত্রা তনু দুজনেই বলে উঠলো।
হ্যাঁ ম্যাডামরা।
দু-জনেই বুকে মাথা রেখেছে।
তোর কাগজের কয়েকশো কটির ব্যবসা সামলাতে তুই হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিস। তনু লন্ডনে ব্রাঞ্চ অফিস সামলাতে গিয়ে খাওয়ার সময় পাচ্ছে না। আমি কি….।
বুবুন আমার ভয় লাগছে। মিত্রা বুকে মুখ ঘোষছে।
তোমাকে আমরা আর পাবো না। তনু বললো।
কেনো আমি কি সব সময় আকাশে উড়ে উড়ে বেরাবো।
প্রজেক্ট করতে হবে না।
তনুর দিকে তাকালাম।
আফতাবভাই তোমাকে লণ্ডনে বাড়ি কিনে দিল। কেনো? বোঝো না—এতদিন আমাকে বাঁধতে পারে নি। ফুরুত ফুরুত করে উড়ে উড়ে বেরিয়েছি। আমাকে দাঁড়ে বসাবারা আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। এখন সেই সুযোগ আফতাবভাই পেয়ে গেছে।
একটু থামলাম। ওরা আমার মুখের দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়।
এতদিন আমার মুখে সব গল্প শুনেছে, এখন তোদের সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় হয়েছে।
আমার প্রতিটা কাজে দু-হাত ভরে সাহায্য করেছে। কিসের জন্য বল?
মিত্রার চোখে জিজ্ঞাসা।
তুই আমাকে কাগজের অংশীদার বানিয়েছিলি। কেন?
তোর বুবুন ওই সব শয়তানগুলোর সঙ্গে লড়তে পারবে। অন্ততঃ এই পৃথিবীতে আর কেউ ভালোবাসুক আর ছাই না বাসুক, বুবুন তোকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। তোর পাশে ও দাঁড়াবে। তোর ভালোবাসার অমর্যাদা বুবুন কোনওদিন করবে না।
তনু শেকড় ছেঁড়া গাছের মতো ভেসে বেরাচ্ছিল। তোর অনুপস্থিতি আমার মনের মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরি করেছিল। তনুকে সেটা বুঝতে দিই নি। সেই শূন্যস্থানে হঠাৎ একদিন দেখলাম তনু আশ্রয় করে নিয়েছে।
তখন কাগজের অফিসে আর কতটুকু কাজ পেতাম। যেটুকু ছিল করতাম, তারপর অঢেল সময়, এইসব অকাজ-কুকাজ করে বেরাতাম। মাঝে মাঝে অনিকাদের ওখানে গিয়ে দু-চারদিন পড়ে থাকতাম। কিংবা শ্যামেদের কাছে।
তখন তনুকে প্রায় এড়িয়ে চলতাম। মেয়েদের চোখ, পুরুষদের ভেতরটা তোরা দেখতে পাস, তনুর কাছে ধরা পরেগেলাম। স্বীকারও করেনিলাম।
তবে তনুর কোনও ক্ষতি করিনি। যদি বলি তনু চায়নি, কিংবা আমি চাইনি, তাহলে মিথ্যে বলা হবে। সব সময় তুই এসে সামনে দাঁড়িয়েছিস। কানের কাছে একই কথা, বুবুন আমি কি অন্যায় করেছি। তনুকে ব্যাপারটা একদিন বলেই ফেললাম।
হয়তো শহুরে কালচার আমার মধ্যে থাকলে, এখন তোকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম না। তনুকে নিয়ে সুখে ঘর সংসার করতাম।
গ্রামের ছেলে, বুকের কোথায় যেন কাঁটা বিঁধে থাকল। তনু সব বুঝেও আমাকে ছেড়ে থাকতে পারলো না। আমিও ছাড়তে পারলাম না। ওকে বহুবার বুঝিয়েছি। জড়িয়ে ধরে বুক ভাসিয়েছে।
তোর বুবুন জীবনে এই একটা অন্যায় করে ফেলেছে। তুই ক্ষমা….।
মিত্রা আমার মুখটা চেপে ধরলো।
সুযোগ যখন দিয়েছিস আমাকে বলতে দে, তোরা আমার অনেক কিছুই জানিস না।
এ্যাক্সিডেন্টে মরেই যেতাম। যাদের একদিন ভেবেছিলাম এনকাউন্টার করাব, তারাই প্রথম টিপটা পায় রাজনাথ আমাকে মারবে, বসিরহাট পর্যন্ত আমাকে ফলো করেছে।
খবরটা পেয়েই সাগির, অবতার, নেপলা পাগলের মতো বেরিয়ে আসে। এসপার নয় ওসপার এ্যাকসিডেন্টের হাত থেকে আমাকে বাঁচাতে পারেনি। তবে বুদ্ধি করে যখন দেখেছে তাপস ঠিক আছে। অন্যগুলোকে মেরে আমাকে নিয়ে পালিয়েছে।
ওই সময় মারাণ ব্যাঙ্গালোর থেকে ফোন করেছিল। নেপলা কাঁদতে কাঁদতে সব বলে। মারান আমাকে নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় আমার জামাকাপর পড়িয়ে একটাকে মেরে ফেলে দিয়ে যায়। সেই থেকে ওরা আমার ছায়া সঙ্গী। আমি আর অনি হয়ে বাঁচার রিক্স নিলাম না। হয়েগেলাম অনিন্দ ব্যানার্জী।
অনুপের মাধ্যেমে রাঘবনের সঙ্গে পরিচয়। মারান আশ্রয় দিল আফতাবভাইয়ের কাছে।
জানিস আজ আফতাবভাইয়ের মেয়েটা বেঁচে থাকলে অনিসার বয়সী হতো। ও জন্মাবার মাস ছয়েক পর অনিসা, অনন্য জন্মেছিল। জন্মালো দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে ব্লাড ক্যানসার।
পৃথিবীর কোনও ডাক্তারের ক্ষমতা নেই তাকে বাঁচাবার। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা থাকলে কি হবে। এক বোনম্যারো ট্রান্সফার। সেটা ওই টুকু বাচ্চার ক্ষেত্রে ডাক্তার রিক্স নিল না।
মেয়েটা ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পরে। কি ভাগ্য দেখ মেয়েটা জন্মেছিল দামী রক্তের গ্রুপ নিয়ে। সর্ব দাতা, সর্ব গ্রহীতা নয়। ঈশ্বর আমাকে আফতাবভাইয়ের আরও কাছে নিয়ে এলো।
মেয়েটার ঘন ঘন ফ্রেস ব্লাড লাগতো। আমার গ্রুপের সঙ্গে বাচ্চাটার ব্লাড গ্রুপ ম্যাচ করে গেল। যখন তখন রক্তের দরকার হতো। আমি ব্যাঙ্কার। বছর দুয়েক তাকে আমার রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। তারপর মরে গেল। আফতাবভাই জম্মের বাঁধনে আমাকে বাঁধলো। হঠাৎ একদিন আমি বসিরের মামা হয়েগেলাম। বসির তখন ন-বছরের শিশু। আজ বসির পরিণত যুবক। পিকুর থেকে সামান্য বড়ো।
মেয়েটা মারা যাবার আগে আফতাবভাইয়ের জীবন ছিল উচ্ছৃঙ্খল। মেয়েটা মারা যাবার পর আফতাবভাই কেমন যেন হয়ে গেল। সেই সময় আমি সব সময় আফতাবভাইয়ের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমার জীবনর গল্প বলেছি। ধীরে ধীরে আফতাবভাইয়ের জীবনে পরিবর্তন এলো। নিজে আমিষাশী থাকলেও দিদি আস্তে আস্তে নিরামিষাশী হয়ে গেল। মাংস খায় খুব কম। আমাদের হিন্দুদের অনেক আচারবিধি দিদি পালন করতে শুরু করলো। গোঁড়া মুসলমান হয়েও আফতাবভাই দিদিকে কোনও দিন বারণ করলো না।
আমি তখন ওদের ঘরের ছেলে। আমাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। নেপলা, অবতার, সাগিরকে নিয়ে ছোটো করে ব্যাবসা শুরু করলাম। আস্তে আস্তে সেটা এখন এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।
একদিন কথায় কথায় টোডির ব্যাপর বললাম। শুনে বললো তুই চাইলে আমি চব্বিশ ঘণ্টা সময় নেব। আমি বললাম না। ওকে এমনভাবে মারবো কেউ কোনওদিন প্রমাণ করতে পারবে না। আমি ব্যাপারটা করেছি।
আফতাবভাইয়ের কথামতো চাড় ফেলতে শুরু করলাম। কুড়িটা বছর কোনখান দিয়ে যে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।
জানিস আমার এনআরআই এ্যাকাউন্ট এবং পাসওয়ার্ড একমাত্র দিদি জানে। সেদিন হয়তো খুলে দেখেছে, টাকা নেই। তাই ফোনে অতো কথা শোনালো।
অনিসাকে ওরা ওদের হারানো মেয়ের মতো ভালোবাসে। ভয়ে আমি ফোন করি না। ফোন করলেই এক কথা, মেয়েকে আমায় দিয়ে দে। ও তোর নয়, আমার। অনিকার কথা জানে, কোনওদিন চোখের দেখা দেখে নি। ছবিও দেখাই নি। জানিনা দেখার পর আমার কপালে কি লেখা আছে।
তোরা ফিরে এসে বললি, আফতাবভাইয়ের ছোটোমাকে ভীষণ ভালো লেগেছে। তোদের কিছু বলিনি, তখন থেকেই আমার বুকটা কাঁপছিল। কি করবো নিজেও জানিনা। ওকে মুখের ওপর নাও বলতে পারি না। একটা আত্মিক বন্ধন ছাড়াও অনেক স্বার্থ ওর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ওরে, তোরা তিনজনে কি ঘুমিয়ে পরলি? খেতে হবে না।
বৌদির তারস্বর চিৎকার, আর ঘটাং ঘটাং করে দরজা ধাক্কানোতে তিনজনেই চমকে উঠলাম।
মিত্রা, তনু দুজনেই আলতো করে গালে ঠোঁট ছোঁয়ালো, যাতে লিপস্টিক লেগে না যায়।
কাপরটা একটু ঠিক করে মিত্রা দরজা খুললো।
ছোটোমা ছাঁকনী দিয়ে একবার দেখে নিল তিনজনকে।
সাজুগুজু করে তিনজনে কি করছিলি!
সুযোগ পাই না, তাই এইভাবে জাপ্টে ধরেছিলাম।
মিত্রা, ছোটোমাকে জাপ্টে ধরলো।
দু-জনেই ভেতরে ঢুকে এসেছে।
বৌদি তোমার কাছে সেফটিপিন আছে। মিত্রা বললো।
সেফটিপিন! কেন?
বুবুন পাঞ্জাবীতে লাগাবে।
ওই তো বোতাম লাগিয়েছে।
সোনার বোতাম। প্লাস্টিকের হলে ভালো হতো। খুব ভালো হয় একটা সেফটিপিন হলে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে। চোখ চক চক করছে। ব্যাপারটা এরকম, কেমন এ্যাক্টো করছি বল।
তোরা আর ওর পেছনে লাগিস না। সকাল থেকে রান্নাকরে বেচারার মুখ শুকিয়ে গেছে।
কিরে তনু, ঢপের মতো দাঁড়িয়ে রইলি কেন। ছোটোমা তাড়া লাগালো।
তিনজনে শুর শুর করে বেরিয়ে এলাম।
দাদারা সবাই বাগানে বসে রয়েছে। অনিমেষদা, বিধানদা রয়েছে নতুন অতিথি সুরোর শ্বশুর মশাই। কাছে গিয়ে প্রণাম করলাম। রূপায়ণদা, অনুপদাকে দেখতে পেলাম না।
এ ঘরে এসে ঢুকতেই, সবাই একবার তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো।
টেবিল চেয়ার তুলে দিয়ে লম্বা করে আসন পেতে নিচে খেতে বসেছে সকলে।
হই চই ক্যাচর ম্যাচর।
সুরো খেপে গিয়ে দাঁত কিড়মিড় করছে। শয়তানের হাড্ডি সব।
আমি হেসেফেললাম।
তুই ওরকম দাঁত কিরমির করছিস কেন।
তোমাকে জানতে হবে না। ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
নীরুরা আজ সব জোড়ায় জোড়ায় বসেছে। শ্রীপর্ণা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
সুরো পুঁচকে দুটো কোথায়? সকাল থেকে দেখলাম না।
ঘুমচ্ছে।
এখন! কোথায়?
বড়োমার ঘরে।
আমি বড়োমার ঘরের দিকে এগোতেই সুরো কাকুতি-মিনতি করে উঠলো।
অনেক কষ্টে ঘুম পারিয়েছি অনিদা, উঠিও না। তাহলে শান্তি করে একটু খাচ্ছি, খেতে দেবে না।
কে আছে ঘরে।
জ্যেঠিমনি আছে।
জ্যেঠিমনির খাওয়া হয়ে গেছে?
আমি খেয়ে গেলে জ্যেঠিমনি আসবে।
আমি ঘুরে ঘুরে চারদিক তাকালাম। বড়োমা, দামিনীমাসি, ইসি পরিবেশন করছে।
একদিকে অনিসারা সব ভাইবোন আর শুভ। আর একদিকে ইকবালভাই, ইসলামভাই, রতনরা। আর একদিকে কনিষ্করা, সুজিতদা, গুবলু, গুবলুর বৌ, অর্ক, অরিত্র, সন্দীপ, দ্বীপায়ন সবাই।
কিরে সন্দীপ, কাগজ বন্ধ।
কেন?
দুপুরে খেতে এসেছিস!
সুরো বললো—
ওমনি নাচতে নাচতে চলে এলি—
দেখ খাওয়ার সময় গণ্ডগোল করিস না।
বৌকে বলিস গণ্ডগোল করলে কি বলতে হয় শিখিয়ে দেবে।
সন্দীপ আমাকে পাত্তাই দিল না। মাংসের হাড় চিবোতে চিবোতে বললো, তনু কতদিন আছো।
কেন বলোতো!
কয়েকটা ফটো ফিচার করে দিয়ে যাও না। অনেকদিন তোমার ফটো ফিচার বেরোয় নি।
পয়সা দিবি—আমি সন্দীপের দিকে তাকিয়ে বললাম।
কেন দেব না। অন্যকে যা দিই তার থেকে বরং বেশি দেব।
তনুর দিকে তাকালাম। কমিশনটা মনে থাকে যেন।
সন্দীপ বিড় বিড় করছে।
অর্করা হাসছে।
বড়োমা, ভজুকে দেখতে পাচ্ছি না।
রান্নাঘরে।
ও রান্নাঘরে কি করছে!
গুছিয়ে দিচ্ছে।
খাবে না—
তোর সঙ্গে বসবে বলেছে।
পায়ে পায়ে সুজিতদার কাছে এগিয়ে গেলাম।
তুই যে এতো ভাল রান্না করতে পারিস জানতাম না।
আজ জেনে নিলে। এবার আমি কিছু কথা জানতে চাই—
বল।
তোমাকে কে নেমন্তন্ন করলো?
দিদি।
হতেই পারে না।
গুবলুর বৌ মুখ নিচু করে হাসছে।
বিশ্বাস কর।
বৌদি কোথায়?
শরীরটা খারাপ।
না। মন খারাপ। তাই আসে নি।
তুই খালি আমাকে মিথ্যে দোষারপ করছিস। ফোন কর।
কালকে গুবলু, গুবলুর বৌয়ের মুখে মদের গন্ধ পেয়ে তুমি ঝামেলা করেছো বাড়িতে।
সুজিতদা ঢোক গিললো। নিশ্চই তোকে বুলা রিপোর্ট করেছে।
বাড়িতে যাও, বলে রেখেছি। হামান দিস্তেতে পান ছেঁচার মতো ছিঁচবে।
নীরু চেঁচিয়ে উঠলো, কেশটা কিরে অনি?
এই তো তুই গণ্ডগোল করলি।
সন্দেহ বাতিক ব্যাটা ছেলে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম।
এই তুই বাজে কথা বলতে শুরু করলি। দিদি দেখো অনি কি শুরু করলো।
গুবলু আর ওর বৌ মুখ তোলে না। নিচু হয়ে শুধু হেসেই চলেছে।
ছেলের বিয়ে দিয়েছো মাল খেয়ে একটু ঢুকেছে তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল।
সে তো আজকে জানলুম কেন খেয়েছে?
কালকে জানার চেষ্টা না করে কীর্তন গাইতে কে বলেছিল—
ভালোমুখে জিজ্ঞাসা করলাম গুবলু মুখ ঝামটালো তাই….।
তুমি যেন বৌদির ওপর কোনওদিন মুখ ঝামটাও নি।
আচ্ছা বাবা আমার ঘাট হয়েছে।
এর জন্য পানিসমেন্ট?
যা বলবি মেনে নেব।
টিনা।
বলো।
কালকে একটা পঞ্চাশ কোটির এগ্রিমেন্ট পাঠিয়ে দেবে। সাইন করে যেন বিকেলের মধ্যে পাঠিয়ে দেয়।
সবাই জোড়ে হেসে উঠলো।
দেবাশিস চেঁচিয়ে উঠলো, সত্যি অনি তুই বড়ো বেওসায়ী।
দেখ, যা খেয়েছি সব বমি হয়ে যাবে।
আর একটা কথা।
তুই ওটা আগে উইথড্র কর।
কোনটা।
টিনাকে যেটা বললি।
ওটা টিনা তোমার সঙ্গে বুঝে নেবে।
প্লিজ।
ভেবে দেখছি। যাওয়ার সময় বৌদির জন্য টিফিন কেরিয়ারে করে নিয়ে যাবে। নিজে সামনে বসে খাওয়াবে। তারপর আমাকে জানাবে। দু-জনে মিলে কনফারেন্সে কথা বলবে।
ওরা সবাই এতক্ষণ আমার কথা শোনে আর হেসে গড়াগড়ি খায়।
তোকে সুজিতদা হেভি চমকায়। কনিষ্ক বললো।
সাধে চমকায়, ব্যবসা পাচ্ছে না। আমি জানি না কোথায় কতো মাল লাগিয়ে কতো রিটার্ণ আসছে। দেব টিপে।
তোর ভাইপো, ভাইপোর বৌ খেতে পাবে না।
ওরা সারাজীবন নুন-ভাত পাবে, তুমি টাকার শোকে হার্ট এ্যাটাক করে মরে যাবে।
সুজিতদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
গুবলু আজ থেকে বাবাকে কিছু জানাবি না। তোকে যে সুযোগগুলো দিয়েছি সেগুলোও বলবি না।
এই তো তুই সব্বনাশ করলি। ব্যবসা লাটে তুলে দেবে।
এই মেয়ে।
গুবলুর বৌ মুখ তুলে তাকল।
তোর শ্বাশুরীকে যদি একটা কথা সুজিতদা বলেছে, আমাকে ফোনে জানাবি। তারপর আমি গিয়ে ব্যবস্থা করে দেব।
সে ও জানাক ক্ষতি নেই। গুবলুকে তুই এই সব কথা বলিস না।
তোমাকে বহুদিন আগে বলেছি, খাও দাও ঘুমোও, ইচ্ছে হলে অফিসে যাবে না হলে যাবে না।
তাই তো করি।
তাহলে কাল ঝামেলা করেছো কেন। আগের দিন তোমার সঙ্গে ফোনে কথা হয় নি।
অনিকাকে দেখলাম, তুই তো জামপেশ ছেলে। সুজিতদা একেবারে গদ গদ।
কথা ঘুরিয়ে কোনও লাভ নেই।
সুজিতদা হাসছে।
তাহলে কাল পঞ্চাশ কোটি। টিনা বলে উঠলো।
এই মেয়ে থাম। টাকা কি গাছ থেকে পরে। সুজিতদা টিনাকে ধমকালো।
কঞ্জুশ, স্বার্থপর—শুধু নিজের ধান্দা ছাড়া সারা জীবনে কিছু বুঝলো না।
এবার থাম, অনেক বলেছিস। বড়োমা সামনে এসে দাঁড়ালো।
সুজিতদা যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে।
সুজিতদার দিকে তাকাল—তুই কিছু নিবি?
সব হজম হয়ে গেল। একটু চিকেন দাও।
এবার থেকে প্রেসার চেকআপ করলেই পাঁচশো টাকা ভিজিট নেব। নীরু বললো।
ফুটপাথের হাতুড়েকে দিয়ে চেক আপ করাব দশটাকা দিয়ে।
সবাই হেসে উঠলো।
নীরুমামা সুজিতদাদাই যা দিল না এরপর আর কোনও প্রশ্নই আসে না। অনিসা চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি অনিসার দিকে তাকালাম।
বাবা, দারুণ খেলাম, তোমার পাতে একপিস রেখো।
অনিসার কথায় বৌদি কট কট করে তাকালো।
এখনও পাত ছেড়ে উঠিস নি। আবার!
এক পিস। পেছন ফিরে দেখি ছোটোমা, তনু, মিত্রা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
(আবার আগামীকাল)