জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৬৯ নং কিস্তি
মাসি, আমার যদি রাগ অভিমান থাকতো তাহলে আজকে হয় তো তুমি মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারতে না। আমাকেও ডাকতে না। মেরিনাদির মেয়েকে ওই বয়সে দত্তক নিয়ে এতদিন তাকে তিলে তিলে এতো বড়ো করতে পারতাম না। হয়তো ইসলামভাই-এর কাহিনীটা অন্যভাবে লেখা হতো। মিত্রা যে জিনিষটা আমার কাছে চেয়েছে ওটা দেওয়া যায় না। পেতে হয়।
আমি তোমাকে জীবনে অনেক কিছু দিয়েছি। তুমি যদি আমার কাছে ওটা চাও, আমি দিতে পারবো? পারবো না বলেই তুমি নিচের ঘর থেকে ওপরে উঠে এসেছো। আমার ঘরটাকে থাকর জন্য বেছে নিলে। কেন? নিজেকে প্রশ্ন করো উত্তর পেয়ে যাবে।
মাসি কাপরের খোঁট দিয়ে চোখ মুছছে।
কাল যাবে নাকি?
না।
কেন?
দিদিকে বলে এসেছি। ওরা এলে আবার সাত-আটদিন ওখানে থাকতে হবে।
হাসলাম।
অনেক কাজ জমেছে। সেগুলো শেষ করি। না হলে ডাক্তারবাবু রাগ করবেন।
আমি কাল সকালে মিত্রাদের নিয়ে বেরবো।
আমাকে বলেছে।
দেখো ছোটো ছোটো মেয়েগুলো কেমন তাকিয়ে দেখছে। ভাবছে মাসির নাগরটা তো বেশ রসিক মানুষ।
ওরা সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
অনিকা, অনিসা আমাকে না জানিয়ে এখানে এসেছিল, কই তুমি আমাকে বললে না।
মাসি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
নিশ্চই মামার ঘরটা দেখে কান্নাকাটি করেছে।
মাসি আমার মুখ থেকে চোখ নামিয়ে নিল।
মন্দির প্রতিষ্ঠা করার বুদ্ধিটা কি ওরা দিল?
মাসি কোনও কথা বললো না।
ওর মার ঘরটা ওকে দেখিয়েছ?
মাসি মাথা দোলালো।
পক্কে, ঘণ্টার?
দেখিয়েছি।
সত্যিটা জানা ভাল কিন্তু সকলে সহ্য করতে পারে না। ওদের দেখে তোমার কি মনে হলো।
ওরা পারবে। তারপর তুই আছিস।
মেরিনাদির ঘরে এখন কে থাকে?
উর্বশী।
উর্বশী নয় মাসি, আজ থেকে আমি বাসন্তী। দাদা ওই নামে ডেকেছে।
মাসি হাসলো।
বাসন্তী ওই ঘরটা নিয়ে অনেক গল্প আছে। এটা জানো? বাসন্তীর দিকে তাকালাম।
জানি। বাসন্তী মাথা নিচু করে নিল।
বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
এবার যাই অনেক রাত হলো। তোমাদের ব্যবসার অনেক ক্ষতি হলো।
আজ ব্যবসা থেকে যা পেতাম তার থেকেও অনেক বেশি পেলাম তোমার কাছে।
বাসন্তীর মুখে দিকে তাকিয়ে রয়েছি।
আমি কি পাবো?
বাসন্তী তোমাকে চিরটাকাল মনে রাখবে। তোমার সাহায্যে লাগলে নিজেকে ধন্য মনে করবে।
হাসলাম।
পায়ে পায়ে নিচে নেমে এলাম।
সবাই আমার পেছন পেছন নামলো। ধূপের গন্ধের সঙ্গে অদ্ভূত একটা গন্ধ মিশে আছে।
বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম।
রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আবিদরা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। রতন এসে মিত্রার হাত থেকে লম্বা টিফিন বক্সটা নিল। তনু তাকিয়ে তাকিয়ে চারদিক দেখছে।
ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
মিত্রারা অনেকক্ষণ ধরে নিজেদের কথা বলে ঘুমলো। আমি ঠিক মতো ঘুমতে পারলাম না। নিজের কাজ করলাম। মাথার মধ্যে সব কেমন যেন জটলা পেকে যাচ্ছে।
সারারাত প্রায় ঘুম হলো না। সিগারেটের পর সিগারেট খেলাম।
সকাল হতে মিত্রারা একটু অবাক হলো, আমি একা বাগানে পায়চারি করছি।
আমার মুখের দিকে শুধু চেয়ে থাকলো কোনও কথা বললো না।
আবার সব কিছু নর্মাল। বাড়ির সবাই যথা সময়ে উঠলো। অনুপদা ঠিক সময়ে এলো।
বেরবার সময় দেখলাম দুটো গাড়ি মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটায় আমরা বসলাম আর একটায় চিনারা।
তিনটে নতুন ছেলেকে দেখলাম। চাঁদকে এই নিয়ে কোনও প্রশ্ন করলাম না।
আমার গাড়িতে রতন আবিদ থাকলো।
বড়োমাদের প্রণাম করতে বললো। সাবধানে থাকবি।
বড়োমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
ছোটোমা বললো, আমাকে নিয়ে যেতে পারতিস।
পরের বার তোমাদের নিয়ে যাব।
মাঠে নেমে এলাম।
অনিমেষদাকে প্রণাম করতে আস্তে করে বললো, ওদের সঙ্গে পাঠালাম। ওরা এসবির লোক, আমি যেটুকু বন্দোবস্ত করার করেছি, তুই মনে কিছু করিস না।
মুচকি হাসলাম।
গাড়িতে বসার সময় মিত্রা জোড় করে আমাকে মাঝখানে বসাল। দু-জনে দু-পাশে।
ওদের কথা মেনে নিলাম। যাত্রা শুরু হলো।
ট্র্যাংগুলার পার্কে আসতেই রতন জিজ্ঞাসা করলো, রবীন্দ্রসদন হয়ে সোজা সেকেন্ড হুগলি ব্রিজ ধরি?
তাই ধর।
তুমি ঘুমবে তো?
কেনো ঘুমবে, আজ কি ও একা আছে। মিত্রা কট কট করে উঠলো।
অনুপদা পেছন ফিরে একবার হাসলো।
পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে একবার চিকনাকে ধরলাম।
কিরে ঘুম থেকে উঠেছিস?
পরিদার দোকানে বসে চা খাচ্ছি।
এতো সকালে!
তোর আগে গুরুমা ডেকে তুলেছে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
খালি চা খাচ্ছিস না আরও কিছু আছে?
প্রথমে দুটো ছানার জিলিপি। তারপর কড়া করে ভাজা নিমকি দিয়ে চা।
তোর গুরুমা শুনছে।
ছানার জিলিপি এক কিলো নিয়ে নিয়েছি।
এটা কি গুরুমার অর্ডার?
হ্যাঁ।
তনু কিছু বলেনি?
এককিলো রসগোল্লা নিয়েছি।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হেসেই যাচ্ছে।
ভাল করেছিস। আমরা সেকেন্ড হুগলী ব্রিজ ক্রশ করলাম।
তোরা আস্তে আস্তে পৌঁছে যাব।
ওখানকার খবর কি?
একবারে ঠান্ডা।
বাথরুম বানান শুরু করেছিস?
সে আর বলতে, কাল পর্শুর মধ্যে শেষ করে দেব। অনুপদা আছে?
হ্যাঁ।
অনুপদার সঙ্গে পরে কথা বলছি।
ঠিক আছে। নার্সিংহোমের মোড়ে কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করবো না। শ্যামকে বলেছি একটার মধ্যে ঢুকে পরবো।
তার আগেই পৌঁছে যাব।
হবে না। মাঝে মনসা মন্দির পরবে। ওখানে একটুক্ষণ দাঁড়াতে হবে।
তুই ঘুমো। তোর ঘুম পাচ্ছে না।
দু-পাশে দু-টো আধমনি বস্তা। ঘুম হবে না।
চিকনা কানফাটানো হাসি হাসলো।
গুরুমা।
বলো।
তুমি কিছু বলো।
তুমি এসো তারপর শুরু করবো।
চিকনার ফোনটা কেটে দিয়ে, শ্যামকে ফোনে ধরলাম।
কিরে অনিদা বারাইছু।
এখন বম্বে রোডে।
তুই তো দলবল লিয়া বারাইছু।
খবর পেয়েগেছিস।
হ। বৌমনিরা কি খাবে, ছ্যাগল কাটব না মুরগী।
গিয়ে পৌঁছলে কাটিস।
অততো দূর থিকা আইসবি ক্ষুধা লাগি যাবে। ত্যাখন তর সইবেনি।
সইবে সইবে তোকে চিন্তা করতে হবে না।
আজ তাইলে মুরগী কাটি কাল নয় ছ্যাগল কাটবো।
তাই করিস।
অনুপদা সামনের সিটে বসে হাসছে।
ফোনটা স্যুইচ অফ করে পকেটে রাখলাম। মিত্রার দিকে মুচকি হেসে ঘারে মাথাটা রাখলাম।
একবারে ঘুমবার চেষ্টা করবি না। করলেই চিমটি কাটবো। মিত্রা খেঁকিয়ে উঠলো।
দেখছিস তনু কিছু বলছে না। তাহলে ওর দিকে চেষ্টা করি।
না হবে না। তনু ঠেলা মারলো।
তনুদি অনিদাকে ধারে দিয়ে দাও। তাহলে আর ঝামেলা নেই। একটু ঘুমিয়ে নিক। ধাবা এলে তুলে দেব।
দেখছিস রতন কতটা ভালোবাসে। তোরা একটুও ভালোবাসিস না।
জীবনে প্রথম নিয়ে বেরলি। তাও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাবি।
ছ-ঘণ্টার জার্নি। এক ঘণ্টা ঘুমলে কিছু হবে না। তারপর ওখানে গিয়ে আবার তোদের নিয়ে বরতে হবে। শক্তি সঞ্চয় না করলে বেরবো কি করে।
মিত্রা আমার দিকে হাসিহাসি মুখ করে তাকাল।
কাল রাতে ঘুমতে দিলি না। কানের কাছে শুধু ব্যারোর ব্যারোর করে গেলি। আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে নিজেরা বেশ নাক ডেকে ভস ভস করে ঘুমলি।
অনুপদা জোরে হেসে উঠলো।
কিরে মিত্রা?
ছাড়োতো ওর কথা। এখন ঘুমতে দিয়ে দাও, আর কোনও কথা মুখ থেকে বেরবে না।
সত্যি সত্যি ওরা কেউ ঘুমতে দিল না। ইয়ার্কি-ফাজলামো হাসি হাসি করতে করতে ধাবায় চলে এলাম। ঘড়ির দিকে তাকালাম সাড়ে ছটা। ঠিক সময়েই পৌঁচেছি।
এক সঙ্গে খেতে বসলাম সকলে। একটা টেবিলে আমি মিত্রা, তনু, অনুপদা। আর দুটো টেবিলে ওরা ভাগাভাগি করে বসলো।
চাঁদ, চিনাদের সঙ্গে ওই তিনটে নতুন ছেলে বেশ জমিয়ে নিয়েছে। আমার সঙ্গে আলাপ হয়নি। এই মুহূর্তে আলাপ করার কোনও ইচ্ছেও হলো না।
খাওয়ার সময় পুরনো কাসুন্দি কপচে মিত্রার পেছনে বেদম লাগলাম।
মাঝে মাঝে মিত্রা কপট রাগ করে টেবিল ছেড়ে উঠে পরলো।
অনুপদা কনটিনিউ হেসে যাচ্ছে।
তনু, মিত্রা বেশ গুছিয়ে খেল। খাবার নিয়েও ওদের সঙ্গে বেশ খানিকটা খুনসুটি করলাম।
অনুপদার ফোনটা বেজে উঠলো। নম্বরটা দেখে বললো দাদা ফোন করেছে।
হ্যাঁ দাদা বলুন।….ধাবায় বসে খাচ্ছি….হ্যাঁ চেঁচামিচি হচ্ছে….ঠিক আছে।
কিগো, অনিমেষদা কি বলে? অনুপদার দিকে তাকালাম।
বললো খেয়ে বাইরে এসে আমাকে রিং-ব্যাক করো।
দেখো আবার কোন নেতাকে পাঠায় দেখা করার জন্য।
অনুপদা হাসলো, খেয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আমরা বসে বসে কফি খেলাম।
রতন কাছে এসে দাঁড়ালো।
সঙ্গে কিছু নেবে?
নিয়ে নে।
ম্যাডাম কি নেব?
যা খেলাম তাইই পাঁচ প্লেট নিয়ে নাও।
কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে নিই।
নিয়ে নাও। একটা লেমন একটা সোডা নিও।
রতনরা চলে গেল।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
লোড করলি, কিছুটা খালি করে নে। এরপর কিন্তু খোলামাঠ।
কি শয়তান দেখেছিস তনু।
আচ্ছা মনে থাকে যেন। তখন বলতে পারবি না বুবুন প্লিজ।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমরা সেরে নিয়েছি। তনু বললো।
কখন সারলে বাবা, চোখের দেখা তো দেখলাম না।
তোকে দেখিয়ে দেখিয়ে করবো।
করলেই বা ক্ষতি কি।
হাত ধুতে গিয়ে। তনু বললো।
দু-জনেই হাসে।
বেশ বেশ। তাহলে আমি একটু সেরে নিই।
তোর তো আবর ওসব পায় না।
হাসলাম। টেবিল থেকে উঠে বাথরুমে চলে গেলাম। বেরিয়ে এসে দেখলাম মিত্রারা টেবিল ছেড়ে উঠে গেছে। আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।
দূর থেকে দেখলাম অনুপদা, রতন, আবিদ কথা বলছে।
চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু।
আমি কাছে আসতেই অনুপদা একগাল হেসে বললো। ছোটো-বাইরে না বড়ো-বাইরে?
দুটো এক সঙ্গে সেরে নিলাম। এখন চারঘণ্টা নিশ্চিন্ত।
মিত্রা, তনু দু-জনেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। অনুপদার দিকে তাকালাম।
অনিমেষদা কি বললো?
কিছু না। বললো, সব কিছু সাবধানে বিচার বিবেচনা করে ডিসিসান নেবে।
ব্যাশ এইটুকুর জন্য বাইরে এসে রিং ব্যাক করতে বললো।
বাকিটা আমাদের পার্টিগতো ব্যাপার। তোকে বলা যাবে না।
ওখানে আর অপেক্ষা করলাম না।
এবার আমি নিজেই বললাম জানলার ধারে বসবো।
মিত্রা অমনি চেঁচিয়ে উঠলো আমি মাঝখানে বসবো।
হাসলাম। তুই যতই অন্তর টিপুনি দে আমি একটু ঘুমবই।
গাড়ি চলতে শুরু করলো।
রতন যেন একটু জোরেই গাড়ি ছোটাচ্ছে।
রতন আস্তে।
কেন তোমার অসুবিধে হচ্ছে?
আমার অসুবিধে কিসের। তোর হাতে স্টেয়ারিং। ঘুমলে অসুবিধে হতো না।
ম্যাডাম তুমি অনিদাকে ঘুমতে দাও। সারাটা রাস্তা ঘুম ঘুম করে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে।
আবার হাসাহাসি ঠাট্টা ইয়ার্কি।
দূর থেকে মোড়টা দেখতে পেয়ে রতনকে বললাম, গাড়িটা মেনরোডের ওপর দাঁড় করাস।
রতন কোনও কথা বললো না।
কাছা কাছি এসে রতন গাড়ি বাইপাশে দাঁড় না করিয়ে একবারে নার্সিংহোমের গেটের কাছে দাঁড় করাল। একটু অবাক হয়ে রতনের দিকে তাকালম।
রতন কোনও কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
অনুপদাও নেমে পরেছে।
মিত্রা তনু আমার দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে।
মিত্রা আমার হাতটা শক্ত করে ধরলো।
চারদিকে বেশ ভিড় দেখছি। দুটো পুলিসের গাড়িও দাঁড়িয়ে। আমি চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছি।
অনুপদা গাড়ি থেকে নামতেই একজন পুলিশ অফিসার এসে সামনে দাঁড়ালো।
মিত্রা তখনও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
কিরে কি হয়েছে!
কিছু না।
তাহলে পুলিশ। অনুপদা নামতেই ওরা ঘিরে ধরলো। ব্যাপার কি!
তুই নাম, তারপর বলছি।
আমি নামলাম। বাসু, চিকনা, মীরচাচা কাউকে ধারে কাছে দেখতে পাচ্ছি না। প্রায় তিন চারশো লোক নার্সিংহোমের সামনে ভিড় করে আছে।
অনুপদা এগিয়ে এলো। মুখটা কেমন শুকনো শুকনো।
কি হয়েছে অনুপদা?
কিছু হয় নি। তোর চোখমুখ ঠিক কর আগে।
আমি ঠিক আছি।
চোখ আমার চারদিক ঘুরছে। গ্রামের বেশ কিছু ছেলেকে দেখলাম।
দূর থেকে দেখলাম বাসু নার্সিংহোমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
হন্তদন্ত হয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো।
কিরে বাসু কি হয়েছে! কাকীর কিছু….?
না কাকী ঠিক আছে।
তাহলে!
বাসু মাথা নিচু করলো।
তোকে বলছি। তুই ভেতরে চল। অনুপদা বললো।
চাঁদ-চিনা আমার শরীরের সঙ্গে শরীর লাগিয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখে মুখে চাপা উত্তেজনা।
সঙ্গে আসা ওই তিনজন ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি না। আবিদ রতন ফোনে কথা বলছে।
আজব ব্যাপার, সত্যি কথাটা বলতে তোমাদের এতো সঙ্কোচ হচ্ছে কেন? অনুপদাকে বললাম।
চিকনার এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।
চিকনার!
আমার ভ্রু-দুটো সামান্য কুঁচকে গেল। অনুপদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
নিজের মনে নিজে হেসে ফেললাম। আমার মুখে তার বর্হিপ্রকাশ ঘটলো। ওরা আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। মিত্রা, তনু দু-টো হাত দু-জনে শক্ত করে ধরেছে।
বেঁচে আছে না মরে গেছে? অনুপদার দিকে তাকালাম।
এখন ঠিক আছে।
চাঁদ, চিনার মুখের দিকে তাকালাম। থমথমে মুখ।
ওরা আমার মুখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না।
কিছুক্ষণ গুম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
কোথায় এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে বাসু?
জামনার কাছে।
খড়গপুরের কানেক্টর?
হ্যাঁ।
আগে না পরে?
একবারে মুখটায়।
মীরচাচা কোথায়?
মীরচাচাও ইনজিওর্ড।
তুই কোথায় ছিলি?
আমি ওদের থেকে একটু পেছনে ছিলাম।
কিসে আসছিলি?
বাইকে।
কে চালাচ্ছিল?
চিকনা নিজে।
মোট কজন ছিলি?
সাতটা বাইক চোদ্দজন।
একবার দেখা করা যাবে?
সবেমাত্র অপারেসন শেষ হলো।
বাসুর মুখের দিকে তাকালাম। বুকের ভেতরটা টন টন করছে তবু তার বর্হিপ্রকাশ করলাম না।
তোকে সব বলছি, ভেতরে চল।
আমি ধীর পায়ে নার্সিংহোমের দিকে এগিয়ে চললাম। আমার দুই পাশে মিত্রা, তনু। সামনে বাসু, অনুপদা। পেছনে চাঁদ, চিনা।
বুঝতে পারছি এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে ওরা কেউ কথা বলতে চাইছে না।
চারিদিকে গিজ গিজ করছে ভিড়। নার্সিংহোমের গেটের সামনে গোটা দশেক পুলিশ দাঁড়িয়ে।
নার্সিংহোমের ভেতরে এসে রিসেপসন কাউন্টারে বসার জন্য এগোতেই মিত্রা বাধা দিল।
আমার ঘরে বসবি চল।
তুই, তনু একটু বোস। আমি কয়েকটা কাজ সেরে যাচ্ছি।
প্লিজ।
অনুপদা, বাসু আমার মুখের দিকে তাকাল।
রিসেপসনিস্ট ময়েটা কাউন্টার থেকে এগিয়ে এলো।
মাস দশেক আগে এসেছি। এই মেয়েটিকে আগে ওই জায়গায় দেখিনি। বেশ মিষ্টি মুখটা। এই এলাকার নয় অবশ্যই। মাঝে মাঝে বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
ম্যাডাম।
আমার ঘরটা একটু খুলুন। গেটে একজন সিকুরিটিকে পাঠিয়ে দিন।
আমি এ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ অফিসারকে বলে দিচ্ছি।
আরএমও আছেন?
আপনি বসুন আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি ম্যাডাম।
আমি দ্বিতীয়বারের জন্য আর কোনও কথা খরচ করলাম না। সোজা মিত্রার চেম্বারের দিকে হাঁটা লাগালাম। আমার পেছন পেছন বাসু, অনুপদা, চাঁদ, চিনা। খানিকটা এগিয়ে অনুপদা বললো।
তোরা গিয়ে বরং বোস। আমি আসছি।
চাঁদ, চিনার দিকে তাকালাম। তোরা রিসেপসনে বোস। ডাকলে আসিস।
আমরা ম্যাডামের ঘরের গেটের সামনে দাঁড়াচ্ছি।
হাসলাম।
চারিদিকে বেশ ভিড়। খবরটা আগুনের লেলিহান শিখার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভেতরে এসে বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসলাম।
বাসু আমার পাশে দাঁড়িয়ে।
তুই ভেঙে পরলে আমরা লড়বো কি করে।
কারা করেছে কিছু খবর পেলি?
সেই মুহূর্তে খবর নেওয়ার কোনও ফুরসৎ পাইনি। কোনও প্রকারে একটা ট্রেকার জোগাড় করে এখানে নিয়ে চলে এসেছি।
এখন পেয়েছিস?
শুনলাম বাইরে থেকে লোক হায়ার করে নিয়ে এসেছিল।
কারা করেছে?
কে আর করবে, শুনছি অনাদি খড়গপুরের কোন দাদাকে ধরে করেছে।
গ্রামে খবর পৌঁছেছে?
হ্যাঁ।
ওখানকার অবস্থা কিরকম?
একটু গণ্ডগোল হয়েছিল। থামা থামি করে দিয়েছি।
চিকনা, মীরচাচা বাঁচবে না মরবে?
সমান্য ইনজিওর্ড হয়েছে। ডাক্তার বলেছে, ওরা ইচ্ছে করলে বিকেলের দিকে চলে যেতে পারে।
চিকনার কোথায় কোথায় গুলি লেগেছে?
থাইতে, হাতে।
মীরচাচার?
কাঁধে, পিঠে।
বার করে দিয়েছে?
হ্যাঁ।
সেন্স এসেছে?
লোকাল এনাসথেসিয়া করেছিল।
তোর সঙ্গে কথা বলেছে?
বলেছে।
দুজনেই?
হ্যাঁ।
কেউ মরেছে?
না। পাঁচজন ইনজিওর্ড হয়েছে।
আর কারা?
হাঁড়িপাড়া আর ভাটপাড়ার দুটো ছেলের বেশি লেগেছে। ফকিরও সামান্য ইনজিওর্ড হয়েছে।
সঞ্জুরা কেউ এসেছে?
বেরিয়ে পরেছে। আসছে।
তুই যা ও দিকটা সামলা, অনুপদাকে একবার ডাক।
বাসু ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আরএমও ঘরে ঢুকলেন।
মিত্রা হাত দেখিয়ে চেয়ারে বসতে বললো।
খুব টাফ কন্ডিসন পেরিয়ে এলাম ম্যাডাম। ভদ্রলোক বসতে বসতে বললেন।
কেন!
একদিকে পুলিশ। পাবলিকের ক্যাওস, অতগুলো ইনজিওর্ড পিপল।
ওরা এখন কেমন আছে?
ভালো আছে।
কি বুঝলেন?
চিকানাবাবু, মীরবাবুকে আজই ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। আর তিনজনকে এখন ছাড়া যাবে না।
কোনও বিল রেইজ করবেন না। সব আমার নামে ফরোয়ার্ড করবেন।
ঠিক আছে। একটা সমস্যা হচ্ছে ম্যাডাম।
কি বলুন?
এসপিটা ভীষণ প্রেসার করছে।
কি বলতে চাইছে?
সবাইকে ফার্স্টএড করে ছেড়ে দিতে বলছে।
সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু অপেক্ষা করুণ।
আপনাদের লাঞ্চের এ্যারেঞ্জ করি?
করতে হবে না।
আসছি ম্যাডাম।
ভদ্রলোক আমার দিকে একবার তাকালেন তারপর উঠে চলে গেলেন।
ঘরে এখন আমরা তিনজন।
মিত্রার দিকে তাকালাম। পাশাপাশি দু-জনে আমার ঠিক অপরজিট চেয়ারে বসে আছে।
মিত্রা বেল বাজাল।
চাঁদ দরজা ঠেলে মুখ বারালো।
চাঁদ একটা উপকার করবে?
বলুন।
রিসেপসনে একটু বলবে এই ঘরে কফি পাঠাতে।
বলছি ম্যাডাম। চাঁদ দরজা বন্ধ করলো।
মিত্রা সরাসরি আমার মুখের দিকে তাকাল। চোখটা চক চক করছে।
তোদের ভাগ্যটা খারাপ। কি করবো বল। জীবনে প্রথম তোদের নিয়ে বেরলাম।
পকেট থেকে ফোনটা বার করলাম।
স্যুইচ অন করতেই অনেক গুলো ম্যাসেজ মিস কলের সাউন্ড ভেসে এলো। বাসন্তীর নম্বরটা দেখলাম এরমধ্যে আছে।
বটম টিপতে যেতেই মিত্রা বলে উঠলো।
একটা কথা বলবো?
মিত্রার মুখের দিকে তাকালাম। বল।
আজ হঠাৎ একটা কথা মনে পরে যাচ্ছে।
কি কথা!
তোর ইচ্ছা মৃত্যুর সঙ্গে চিকনার এই এ্যাকসিডেন্টের একটা মিল খুঁজে পাচ্ছি।
চমকে মিত্রার দিকে তাকালাম। তনুর চোখে হাজার পাওয়ারের বাল্ব জলছে।
বলবি কি করে বুঝলি?
আমার চোখে জিজ্ঞাসা।
তোর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সবাই বুক চাপরে কেঁদেছিল, আমি অজ্ঞান হয়েছিলাম তিনদিন। একমাত্র চিকনা মরাকান্না কেঁদেছিল। সেই কান্নার মধ্যে কোনও প্রাণ ছিল না।
হাসলাম।
এই খবরটা শোনার পর তোর মুখ-চোখ যতটা কঠিন হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি।
আমি হাসতে হাসতে মাথা দোলাচ্ছি।
তুই এতটা কুল আছিস, তার অর্থ তোর কাজ তুই এরই মধ্যে গুছিয়ে নিয়েছিস। এইরকম সিচুয়েসনে, এর আগেও তোর চোখ-মুখের চেহারা দেখেছি। আজও দেখছি। আকাশ পাতাল পার্থক্য। তনু কাল পরেপরে ঘুমলেও আমি ঘুমইনি। তুই কাল সারারাত যাদের যাদের সঙ্গে কথা বলেছিস আমি সব শুনেছি। একটু মিলিয়ে নিতে চাই।
মিত্রার চোখে-মুখে উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট।
আমি না বোঝার ভান করে হাসলাম।
আমি তনু দু-জনে সারাজীবন চেষ্টা করলেও তোর যোগ্য স্ত্রী হতে পারব না।
মিত্রা মাথা নিচু করলো। গলাটা সামান্য ধরে এলো।
তবে কথা দিচ্ছি তোর ছেলেমেয়েরা তোর যোগ্য সন্তান তৈরি হবে।
মিত্রার চোখে আগুন।
তুই যাদের সঙ্গে এখন কথা বলবি, তাদের কথা একটু শোনা।
মিত্রার চোখে চোখ রাখলাম।
কাল রাতে তোর কথাবার্তা শুনে যেটুকু মর্মোদ্ধার করেছি তাতে মনে হচ্ছে সাগর, অনাদি, অনুজ সেন এখানকার এসপি এই কেশটার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
মিত্রার কথায় আমার চোখর পলক পড়ছে না।
কাল তুই বাসন্তীর সঙ্গে চোখে চোখে কথা বলেছিস। আমি সেটা লক্ষ্য করেছি।
দিদি তুমি কি বলছো! তনু বললো।
কাল সকাল থেকে তুই তোর মধ্যে ছিলি না। নেপলার সঙ্গে কথাবলার আগে তোর মুখের যে ছবি দেখেছি, নেপলার সঙ্গে কথা বলার পর তোর মুখের ছবি বদলে গেছে।
যে মেয়েকে আগের বার এয়ারপোর্টে তুলতে এসে ফিরে যাওয়ার সময় চোখের জল ফেলেছিলি, এবার তুই অপেক্ষা করেছিস কতক্ষণে প্লেনটা ছাড়বে। তুই বেরিয়ে আসবি।
পাঞ্জাবী সেজে অর্জুন তোর পাশ থেকে তিন চারবার ঘুরে গেছে। তোর ফোন বেজেছে। তখন কিছু বুঝিনি। মেয়ে রাতে পিকচার ম্যাসেজ পাঠাতে সব অঙ্কের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে।
আগে এসব বুঝতাম না। টেনসনে মরতাম। এখন কিছুটা বুঝতে পারি। ভারি মজার খেলা। তাই কাল সারাদিন তোর পেছন পেছন ঘুরেছি।
এক সময় তুই কথায় কথায় শোনাতিস তুই গণিকা পল্লীতে আঠারো মাস কাটিয়েছিস বয়সের তুলনায় তোর ম্যাচুরিটি আঠারো বছর বেশি। এখন সেটা অনুভব করছি, কতটা সত্যি।
সকালে তুই চিকনাকে ফোন করে বুঝতে চেয়েছিস অবস্থা কিরকম।
ও কোনও কিছু আঁচ করতে পেরেছে কিনা।
সেরকম বুঝলে তুই ওকে ফিরে যেতে বলতিস। তোর উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম। তাই ওকে তুই ফিরে যেতে বলিসনি।
তুই বলবি আমি ফোন করেছিলাম। অবশ্যই করেছিলাম। অনেকক্ষণ কথা বলেছি। রাতে তোর কথা শোনার পর হয়তো বলেও দিতাম, তুমি এসোনা চিকনা।
তারপর ভাবলাম, তুই এতো সব জানা সত্ত্বেও যখন ওকে বারণ করিসনি। তখন সামথিংস হ্যাজ। তুই নিশ্চই ওকে ফুল প্রটেকসন দিয়ে দিয়েছিস। কোনও মতেই এতো সহজে তুই চিকনাকে হারাবি না। আমরা যেমন তোর বুকের এক একটা পাঁজর। চিকনা তার থেকে কোনও অংশে কম নয়। আমরা জীবনে যা সেক্রিফাইশ করেছি তার থেকে অনেক বেশি সেক্রিফাইস করেছে চিকনা। তুই এখানে থাকতে চিকনার গায়ে হাত পরবে। আর সে বেঁচে ফিরে যাবে, এটা হতে পারে না। আমি তোর মনের জোড়টা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছিলাম। আর ভেতর ভেতর অদ্ভূত শিহরণ অনুভব করছিলাম। তুই কি ধাতুতে গড়া!
আর এই বুবুনের বুকে আমরা দু-জনে লুটোপুটি খাই।
তাই মনে মনে ঠিক করেছিলাম, আমি শেষ দেখবো, তারপর মুখ খুলবো।
তনুর চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে।
অনুপদা বেশ উত্তেজিত হয়ে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো। পেছনে দু-জন পুলিশের পোশাক পড়া ভদ্রলোক। দেখশুনে মনে হলো বেশ উচ্চপদস্থ অফিসার।
যা ভেবেছি ঠিক তাই, এসপি-র তকমা কাঁধে-বুকে সাঁটানো।
আমি ভ্যাবলার মতো দু-জনের দিকে তাকিয়ে।
চাঁদ-চিনা একবার উঁকি মেরে ঘরের ভেতরটা দেখে নিল।
অনি তোর সঙ্গে কিছু কথা আছে।
অনুপদার গলার স্বরে উত্তেজনার পারদ।
আমি ততধিক মৃদু স্বরে বললাম, ওদের দেখে এসেছো?
হ্যাঁ।
এখন কেমন আছে?
ভালো।
তোমার সঙ্গে কথা বলেছে?
বলেছে।
কি বুঝলে বেঁচে থাকবে না মরে যাবে?
তিনজনেই বিষ্ময়ে আমার দিকে তাকাল।
আপনারা বসুন।
এসপির দিকে তাকালাম।
উনি এই ডিস্ট্রিক্টের এসপি। মিঃ শ্রীরামকৃষ্ণাণ। অনুপদা বললো।
মিত্রা, তনু একদৃষ্ট আমার দিকে তাকিয়ে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বুকের ওপর হাত জোড় করে প্রণাম করলাম।
উনি ডিএসপি মিঃ সনৎ তালুকদার।
অনুপদা বাংলায় কথা বলছে, তারমানে ভদ্রলোক দক্ষিণী হলেও ভালো বাংলা বোঝেন।
আমি অনিন্দ ব্যানার্জী। লোকে আমাকে অনি ব্যানার্জী নামে চেনে। আমি বাংলায় বললাম।
অনুপদার দিকে তাকালাম।
ওনারা তোকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করতে চান।
কি ব্যাপারে!
আজকের এই ঘটনাটার ব্যাপারে। অনুপদা বললো।
আমি কি জানি বলো।
দেখলাম দুই অফিসার আমার দিক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
দেখলে তো, তোমার সঙ্গে সকালে এক গাড়িতে কলকাতা থেকে এলাম। আসার সময় চিকনাকে ফোন করলাম। কথা হলো। তোমরা সবাই শুনেছো। এর বেশি আমার জানার কথা নয়।
অনুপদা একটা চেয়ারে বসলো। ওনারাও বসলেন।
অনুপদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুই এর বেশি কিছুই জানিস না!
বিশ্বাস করো। তবে এসে যখন পড়েছি জানার চেষ্টা করবো।
মিত্রা ফিক করে হেসে উঠলো। আস্তে করে মুখ নিচু করে বললো, সরি।
এসপি, ডিএসপি মিত্রার দিকে কেমন ভাবে তাকাল।
ব্যাপারটা এরকম পাগলি নাকি মেয়েটা।
অনুপদার চোখ মুখ বলছে কিছু একটা গেইজ করে ফেলেছে। আমার মুখের দিকে তাকাল, চোখে মুখে বিষ্ময়। আমি নির্বিকার।
চাঁদ দরজা খুললো। বেয়ারা কফির ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। প্রত্যেকের সামনে কফির কাপ নামিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল। আমি লক্ষ্য করলাম মিত্রা ছেলেটির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। একটুও চোখের পলক পড়ছে না।
আমি চামচ দিয়ে কফিটা একটু নাড়া চাড়া করে চুমুক দিলাম।
আপানাদের কিছু জিজ্ঞাসা করার থাকলে করতে পারেন।
এসপি, ডিএসপির দিকে তাকালাম।
ওনারা আছেন। এসপি বললেন।
অসুবিধা নেই। উনি আমার বান্ধবী মিত্রা ব্যানার্জী। এই নার্সিংহোমের মালকিন।
মিত্রা টেবিলের ওপর কাপটা রেখে বুকের ওপর হাতদুটো জড়ো করলো।
আর উনি হচ্ছেন আমার বিবাহিত স্ত্রী তনুশ্রী ব্যানার্জী।
তনুও মিত্রার মতো বুকে হাত তুলে প্রণাম করলো।
দু-জনকেই একই উপায়ে প্রীতি নমস্কার জানালেন এসপি, ডিএসপি।
আমার স্ত্রী আমার বান্ধবীর কাগজের ইংলন্ডের করেসপন্ডেন্ট। আগে ছিলেন বিবিসিতে।
আমিও আমার বান্ধবীর কাগজের স্পেশ্যাল করেসপন্ডেন্ট।
এসপি, ডিএসপির চোখে রং লেগেছে। অনুপদার চোখের মনি স্থির।
বলুন স্যার, আপনার কি জানার আছে।
আপনি এদিকে কোথায় এসেছিলেন?
আসিনি, যাচ্ছিলাম।
কোথায়?
ভালোপাহাড় আমার এক ছোটোভাই কাম বন্ধুর কাছে।
এখানে হল্ট করলেন?
যারা অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছে তাদের মধ্যে দু-জনের আমার সঙ্গে যাবার কথা ছিল।
নাম জানতে পারি কি?
চিকনা আর মীরচাচা। বাসুকে মনে হয় আপনি দেখেছেন, যে ওদের নিয়ে এসে এই নার্সিংহোমে ভর্তি করেছে, এদিক সেদিক দৌড়োদৌড়ি করছে।
ভালোপাহাড়ে কার কাছে যাচ্ছিলেন?
শ্যাম মাহাতো।
উনিতো একসময় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা ছিলেন।
ভারতের কোন কোর্ট এই রায় দিয়েছে আমাকে একটু বলতে পারবেন?
অনুপদা কিছু বলতে যাচ্ছিল। আমি হাত তুলে বাধা দিলাম।
আপনার কছে কোনও ডকুমেন্টস আছে, উনি নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা। ভারত সরকার কিংবা পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষণা করেছে ওদের সংগঠনটা নিষিদ্ধ?
আপনার জ্ঞাতার্থে আর একটা কথা জানিয়ে রাখি, হয়তো আপনার কাজে লাগতে পারে, ব্রিটিশ প্রিয়েডে কংগ্রেসকে নিষিদ্ধ সংগঠন আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। তারা সেন্ট্রালে বহুদিন সরকার চালিয়েছে। মোগল প্রিয়েডে ছত্রপতি শিবাজীকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ইতিহাসে পড়েছি।
আপনি সরকারী চাকরী করছেন। ভারতীয় সংবিধানটা আপনার ভাল করে পড়া উচিত। ভাববেন না আমি আপনাকে জ্ঞান দিচ্ছি। আপনার নিজের স্বার্থে একটু উল্টে পাল্টে দেখবেন।
অনুপদা বুঝতে পারছে আমার চোখ মুখের চেহারা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
আপনার পরের প্রশ্নের অপেক্ষায় আছি।
আজ সকালে আমরা ছুড়কি বলে একটি ছেলেকে এ্যারেস্ট করি। তাকে ইন্টরোগেট করে আমরা জানতে পারি আপনি এই ঘটনার সঙ্গে ইনভলভ।
কোনও প্রমাণ আছে? আপনাকে কোর্টে টেনে নিয়ে গেলে আপনার এই বক্তব্য এস্টাব্লিশ করতে পারবেন?
ব্যাপারটা এখন এনকোয়ারির পর্যায়ে। ডিএসপি বললেন।
ও।
আপনার সঙ্গে ছুরকির পরিচয়?
কোনও পরিচয় নেই। আমি তাকে চিনি না।
বাসু খুব উত্তেজিত হয়ে ঘরে ঢুকলো।
অনাদি নিজেকে কি ভাবছে বলতো অনি।
আমি বাসুর মুখের দিকে তাকালাম।
কি হয়েছে!
এই নিয়ে তিনবার ফোন করে হুমকি দিল। চিকনার মতো হাল করে ছেড়ে দেবে।
বাসুর কথাটা শুনে এসপি চমকে উঠলো। এসপির দিকে খুব ঠাণ্ডা চোখে তাকালাম। আমার চোখের ভাষার অর্থ মনে হয়ে উনি বুঝে ফেললেন।
আপনি লোকাল থানার ওসিকে ডেকে পাঠান। আমি বললাম।
ব্যাপারটা আমাকে একটু বলুন। এসপি বাসুর দিকে তাকাল।
বাসু উত্তেজিত হয়েই যা ফোনে বলেছিল তা বললো।
রেকর্ডিং করেছিস। আমি বললাম।
সবকটাই করেছি।
গোটা পাঁচেক সাদা কাগজ নিয়ে আয়। পেন আর কার্বন।
মিঃ ব্যানার্জী….। এসপি বলে উঠলেন।
আমি হাত দেখিয়ে ওনাকে থামতে বললাম।
ব্যাপারটা উনি ধরতে পেরে গেছেন।
আপনি আমার কথাটা একবার শুনতে পারতেন।
আমি লিখিতভাবে আপনাকে দিচ্ছি। আপনি লিখিতভাবে আমাকে জানাবেন। মৌখিক ব্যাপার স্যাপার আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না।
আপনাকে কথা দিচ্ছি, ব্যাপারটা আমি দেখছি।
বাসুর দিকে তাকিয়ে বললাম, তাড়াতাড়ি জোগাড় করে নিয়ে আয়।
আমি রিসেপসনিস্টকে ডেকে পাঠাই। মিত্রা বললো।
আমি খুব নিচু স্বরে বললাম। ডাক।
মিত্রা ফোনের বটমে হাত দিল। অনুপদার ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে বার করে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে কানে চেপে ধরলো।
হ্যাঁ দাদা বলুন….নার্সিংহোমে আছি….মিত্রার ঘরে….আপনি এসে গেছেন!
অনুপদা কানে ফোনটা দিয়েই চেয়ার ছেড়ে উঠে কথা বলতে বলতে হুড়মুড় করে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। এসপি, ডিএসপিও দেখলাম অনুপদার পেছন পেছন বেরিয়ে গেল।
বাসু আমার দিকে তাকিয়ে।
অনাদি কি তোকে নিজের নম্বর থেকে ফোন করেছে?
না।
নম্বরটা দে। আর টাইমটা দে।
বাসু ফোন থেকে আমাকে নম্বরটা আর টাইমটা একটা ছেঁড়া কাগজে লিখে দিল।
রিসেপসনিস্ট মেয়েটা ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
ইয়েস ম্যাম।
মিত্রা ভেতরে আসতে ইসারা করলো।
আমার দিকে তাকাল। বল।
মেয়েটির দিকে তাকালাম। আপনি সর্টহ্যান্ড জানেন?
না স্যার।
বলে গেলে টাইপ করতে পারবেন?
পারবো স্যার।
ল্যাপটপ আছে?
আছে স্যার।
একটু নিয়ে আসুন।
রিসেপসনিস্ট মেয়েটি বেরিয়ে গেল।
বাসুর দিকে তাকালাম।
একটা কাজ করতে পারবি।
বল।
সামনের মাঠে চলে যা। কারুর একটা ফোন নিয়ে নে। এই নম্বরে ফোন কর।
বাসু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
যদি দেখিস অনাদি ধরেছে। বাপ-বাপান্তর করে ছেড়ে দে। যদি অনাদি না ধরে কার নম্বর সেটা জেনে নে। শুধু বলবি এই নম্বর থেকে আমাকে খুনর হুমকি দিয়ে একটা ফোন এসেছে, আমি রেকর্ডিং করেছি, এসপি-র কাছে একটা চিঠি লিখছি।
শুধু রিপার্কেসন কি হয় কানে শুনে অনুভব করে নে।
রেকর্ডিং?
দূর পাগলা। যা বললাম তাই কর।
নীপা এসেছে।
কোথায়?
চিকনার কাছে।
এখন কেমন আছে?
নীপার সঙ্গে কথা বলছে।
আমি এসেছি জানে?
বলেছি।
ভানুরা সব এসেছে?
এসেছে। বাইরে বসে কেঁদে মরছে।
কান্নাকাটি করতে বারণ কর। ওদিকটা কে সামল্লাচ্ছে।
সঞ্জু।
রিসেপসনিস্ট মেয়েটি ল্যপটপ নিয়ে ঘরে ঢুকলো। বাসুকে বললাম মিনিট দশেক দাঁড়া। মেয়েটিকে ডিক্টেসন করলাম। মেয়েটি টাইপ করলো। সত্যি মেয়েটির হাত বেশ ভালো।
আমি নিজে দেখে একবার কারেকসন করে দিলাম। কার কার নামে চিঠি দিতে হবে ওকে বুঝিয়ে দিলাম। বললাম, তিন কপি করে প্রিন্ট করুণ। বাসুকে দিয়ে সই করিয়ে নিন।
বাসুকে বললাম এখুনি চিঠিগুলো রিসিভ করিয়ে নে। যদি না করতে চায়, এখান থেকে রেজিস্টার্ড উইথ এডি পোস্ট করে দে।
রিসেপসনিস্ট মেয়েটি আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। চিঠির অর্থ ও বুঝতে পেরেছে।
আমি হাসলাম।
যান বাসুকে একটু সাহায্য করুণ।
মেয়েটি উঠে বেরিয়ে গেল। বাসুর দিকে তাকালাম।
কাজ তাড়াতাড়ি সার, দরকার আছে।
বাসু বেরিয়ে গেল।
মিত্রার মুখের দিকে তাকালাম। মিটি মিটি হাসছে।
কিরে তনু কিছু বুঝছিস?
কেমন যেন সব গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে।
রামকৃষ্ণাণ বললো ছুড়কিকে এ্যারেস্ট করেছে। অনাদি বাসুকে ধমকাচ্ছে, চিকনার হাল করে ছেড়ে দেবে। দু-জনের কথার কোনও লিঙ্ক পাচ্ছিস?
না!
লিঙ্কটা ওর হাতে।
তনু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
রামকৃষ্ণাণের ওষুধ এখনও পড়েনি। অনাদির ওষুধ পড়েগেছে। তাই অনাদির এতো তেজ। আর দু-জন ঘর গোছাতে লেগে পড়েছে, কতটা ক্ষতি করে ফেলেছে তার হিসেব করতে বসে গেছে।
তুমি বুঝছো কি করে!
কাল থেকে ওকে ফলো করছি। আমাদের সঙ্গে কথা বলছে ঠিক কিন্তু ও যে ভাবে কথা বলে ঠিক সেরকম নয় কেমন যেন অসংলগ্ন। তুই খুব ভালো করে ফলো না করলে বুঝতে পারবি না। একটা সময় বড়োমাকে বলতো আমি দাবা খেলি। দুটো ঘোঁড়ায় আমি ষোল ঘর ব্লক করি। এই দুটো ঘোঁড়ার হদিস তুই এই মুহূর্তে পাবি না। একবারে শেষে গিয়ে পাবি। এই দুটো ঘোঁড়াকে তুইও চিনস আমিও চিনি, হয়তো তোর আমর আশেপাশে ঘুরছে। কফি দিতে এসেছিল ছেলেটাকে দেখলি?
হ্যাঁ!
কিরকম ভিঁজে বেড়ালের মতো কফির কাপ নামিয়ে চলে গেল।
তনু ড্যাব ড্যাব করে মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
ঘরে ঢুকে সামনে কে বসেছিল? বুবুন, অনুপদা।
হ্যাঁ।
দেখ কফির কাপ প্রথমে আমাকে দিল, তারপর তোকে, তারপর এসপি, ডিএসপিকে তারপর অনুপদাকে, শেষে ওকে। ছেলেটার চোখ দেখেছিলি। মুখে একটা কথাও বলেনি।
আচ্ছা তোর মনে প্রশ্ন আসেনি, প্রথমে আমাদের দিল কেন? ওর একবারে হাতের কাছে বুবুন, অনুপদা বসেছিল। ওদের দিয়ে শেষে আমাদের দিতে পারতো। দিল না, সময়টা কিল করল।
মিত্রাদি আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না।
ঢুকবে না। হরিদা, বটাদা যদি ওর ইনফর্মার হয়, এরা হতে দোষ কি। এবার তুই ভাব।
মিত্রাদি!
আরে বটাদা ওকে দিয়ে চায়ের হিসাব করাতো, তখন ও কিন্তু ওই হাউসের মালিক। বটাদার কি জোড়। আমি পর্যন্ত অবাক হয়ে যেতাম। আর বুবুন, নিশ্চিন্ত মনে চায়ের হিসেব করে দিত।
কি বলছো কি তুমি!
আমি একটুও মিথ্যে বলছি না তনু। এখানে এখন যা ঘটে যাচ্ছে চোখ কান খুলে শুধু দেখে যা, স্পিকটি নট। দেখবি সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
ও সিমপ্লিফাই করে। স্টেপ বাই স্টেপ।
(আবার আগামীকাল)