জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১০০ নং কিস্তি
আমরা বেড়িয়ে এলাম। চিকনা, সঞ্জু সঙ্গে এলো।
বড়ো বিলে আসার আগেই ঝুপ করে কেমন যেন সন্ধ্যে হয়ে গেল। চারিদিক অন্ধকার ঘুটঘুট করছে তার মধ্যেই মাঠের বুক চিড়ে গাড়ির হেডলাইট আছাড় খেয়ে পড়ছে পিঁচ রাস্তার বুকে। আমার গাড়ির ড্রাইভার নেপলা। মাঝে ছোটোমা, বড়োমা, জ্যেঠিমনি। সামনে আমি পেছনে সাগির, দামিনী মাসি।
ওই গাড়ি আবিদ চালাচ্ছে। ইকবালভাই, অনুপ, হিমাংশু, ইসলামভাই আছে।
সামনে বাইকে সঞ্জু, চিকনা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই চকে পৌঁছে গেলাম। গাড়ি থেকে নমলাম। পরিদার ছেলে এগিয়ে এলো।
কতক্ষণ থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
কেন!
দিদিমনি যাওয়ার সময় মুগের জিলিপির অর্ডার দিয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে তুই বানিয়ে দিলি।
পরিদার ছেলে হাসছে।
বড়োমাকে বললাম, তোমরা একটু বসো আমি আসছি।
আমি চিকনার বাইকে উঠে বসলাম সোজা পরিদার বাড়িতে চলে এলাম। পরিদার ঘরে এসে একটু অবাক হলাম। পরিদা উঠে বসেছে।
কিগো….।
তোর ডাক্তার বন্ধুটা বেশ ভালো। বেশ কড়া কড়া ওষুধ দিছে।
তা বলে তুমি উঠে বসে পড়েছো।
মাঝে মাঝে বুইসতে কইছে। তাহলে পিঠের ঘা গা তারাতারি শুইকে যাবে।
একা একা উঠে বসলে?
না ওন্যে একটু ধরছে।
কথা বলতে গিয়ে তুমি হাঁপিয়ে যাচ্ছ। আর কথা বলতে হবে না।
বৌমা, ছেলে, মেয়ে ত্যাখন আসছিল।
তাই!
ডাক্তারও আসছিল। ওষুধ দিছে। একবার কলকাতা যাইতে কইছে।
আসতে পারবে?
ছেলেকে বলছি। লিয়ে যাবে কইছে।
তাহলে চলে এসো, সব ব্যবস্থা করে দেব।
বাঁদিকটা পক্ষাঘাত হইছে আর সারবেনি।
ঠিক সারবে, আমি তোমার ছেলেকে বলে যাচ্ছি।
টাকা পাবে কাই।
টাকার দরকার নেই। চিকনা আমাদের এখানে কোনও এ্যাম্বুলেন্স নেই?
না।
ঠিক আছে আমি গিয়ে তোকে ফোন করবো। কনিষ্করা কি বলে শুনি।
পরিদার দিকে তাকালাম।
ওষুধগুলো ঠিকমতো খাবে।
পরিদা শীর্ণ হাতটা এগিয়ে দিল। আমি হাত রাখলাম।
বোকনাটার একটা বিহিত কর। না হলে মরেও শান্তি পাবনি।
পরিদার চোখ থেকে চোখ নামিয়ে নিলাম।
পরিদাকে দেখে যতটা আনন্দ হয়েছিল, তার থেকে আরও বেশি কষ্ট পেলাম। ফুট ফুটে কচি মুখটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
সেই লজ্জা লজ্জা মুখ কিছুতেই টিনার হাত থেকে মিষ্টি নেবে না। অনেক বলার পর যখন পরিদা বললো, তখন নিলো। তারপর কলকল করে কতো কথা বললো টিনাদের সঙ্গে। তারপরে আর কোনওদিন দেখিনি বোকনাকে। সেই বোকনা কিছু উন্মত্ত যুবকের লালসার স্বীকার। তাকে ধামা চাপা দিয়েছে অনাদি। আবার চোয়ালদুটো কেমন শক্ত হয়ে উঠলো।
পরিদার হাতদুটো শক্ত করে ধরে চোখের দিকে তাকালাম। ঠোঁট দুটো নড়ে উঠলো কিন্তু কোনও শব্দ বার হলো না। আমার বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আর পরিদার সামনে দাঁড়াতে পারলাম না। মাথা নীচু করে চলে এলাম।
আসার সময় চিকনার সঙ্গে একটা কথাও বললাম না।
পরিদার দোকানে একটা একশো পাওয়ারের বাল্ব টিম টিম করে জ্বলছে। বুঝলাম লো ভোল্টেজ।
মন খারাপ করিস না। চিকনা বললো।
নেপলা মনে হয় শুনতে পেয়ে গেছে।
কি হয়েছে চিকনাদা?
কিছু না।
পরিদার ছেলেকে পয়সা দিয়েছিসি। নেপলার দিকে তাকিয়ে বললাম।
নিতে চাইছে না।
তা হয় কি করে, ওর তো একটা খরচ আছে।
তুমি বলো।
আবার পরিদার ছেলেকে ডাকলাম। বললাম পয়সাটা নে। পারলে বাবাকে নিয়ে একবার কলকাতায় আয়, আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
থাক না।
কলকাতায় যেতে হলে কিছু খরচ আছে। আমি একটু খানি দিলাম। বাকিটা পারলে জোগাড় করিস। না পারলে চিকনাদাকে বলিস ব্যবস্থা করে দেবে।
পরিদার ছেলের চোখদুটো ছল ছল করে উঠলো।
চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, যা ফিরে যা। সাবধানে যাবি। পৌঁছে একবার জানিয়ে দিস। সঞ্জু, স্যারকে ঠিকমতো চোখে চোখে রাখিস।
দু-জনেই মাথা দোলালো।
গাড়িতে উঠে বসলাম। নেপলা গাড়ি স্টার্ট দিলো।
সামনে আবিদ, পেছনে আমরা।
চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। তীরবেগে গাড়ি চলছে। কারুর মুখে কোনও কথা নেই। বেশ কিছুটা এলেই বেলকির সেই বড়ো বিল প্রায় সাত কিলমিটার। জনমানব শূন্য। শুধু মাঠের পর মাঠ। মাঝখান দিয়ে কুড়িফুটের পিচের রাস্তাটা সাপের মতো আঁকাবাঁকা ভাবে টানটান হয়ে শুয়ে রয়েছে।
দূরে দেখলাম একটা টর্চের আলো জ্বলছে আর নিবছে। নেপলার দিকে তাকালাম।
শিবু ফোন করেছিল। অপেক্ষা করছে।
আবিদের গাড়িটা সামনে ছিল, প্রথমে দাঁড়াল। পেছন পেছন আমাদের গাড়িটা দাঁড়াল।
আমি গাড়ি থেকে নামলাম।
আজ শিবুর মুখ ঢাকা নেই।
কাছে এগিয়ে এলো। জড়িয়ে ধরলো। সবার সামনে তুকে জড়াইতে পারি না।
হাসলাম।
নেপলাকে ফোন দিছিলাম। বড়োমাকে অনেক দিন দিখি লাই সেই কবে দেখছি। এইকটা প্রণাম করবো।
আশেপাশে দেখলাম আরো পাঁচসাতটা ছেলে। কেউ খালি হাতে নেই।
বড়োমাকে ধরে নামালাম। ছোটোমা, জ্যেঠিমনি নেমে এসেছে। দামিনীমাসি, সাগির পেছন থেকে নামলো।
আকাশভরা তারা। চাঁদের দেখা নেই। তবু অন্ধকারের মধ্যেও কেমন যেন একটা আলো চারদিকে খেলা করে বেরাচ্ছে।
বড়োমা আমার দিকে তাকালো।
শিবুকে তোমার মনে পড়ছে না?
মনে থাইকবে কি কইরে, সে কততো বইছর আগে একবার দেইখছে।
রাজনাথবাবুর ঘটনার পরদিন ভালোপাহাড় থেকে শ্যাম, শিবু, দারু গেছিল মনে পড়ছে। আমি বড়োমার দিকে তাকালাম।
এইবার বড়োমার মনে পড়ে গেল।
সেই শিবু!
হ্যাঁরে বড়োমা আমি সেই শিবু। তুকে অনিদা যেমনে মা বইলে আমরাও তেমনি তুকে মা বইলি।
শিবু হাঁটু মুড়ে বসে বড়োমার পায়ে মাথা রাখলো।
বড়োমা শিবুর মাথায় হাথ রাখলো।
অনিদা।
বল।
ছোটোমার মুখটা মনে লাই, একটু বইলে দে।
আমি একে একে সবার নাম বললাম। ওরা সবাইকে প্রণাম করলো।
উদের কথা বল। আমরা তো সাগির, নেপলা, অবতার ছাড়া কাউকে দেখি লাই।
আমি ইকলবালভাই, ইসলামভাই, হিমাংশু, অনুপের সঙ্গে ওদের পরিচয় করিয়ে দিলাম।
অনিদার মুখে সবার নাম শুইনেছি দেখি লাই। আজ প্রেত্থম দেইখলাম।
উই দাদা উকিল আছে।
শিবু, অনুপকে দেখাল।
হ্যাঁ। আমি অনুপ একসঙ্গে পড়েছি।
কাল্লু।
সেই ছেলেটা এগিয়ে এলো।
বুতলটা লিয়ে আসছিস।
মুখে কোনও কথা নেই। পেটের ভেতর থেকে একটা বোতল বার করে আমার হাতে দিল।
এটা লিয়ে যা অনিদা।
কি আছেরে।
বৌমনি সে বার মাগছেলো দিতে পারি লাই।
কি বলবি তো।
মহুয়া আছে, খাঁটি।
বড়োমা হেসে ফেললো।
তুমি মনে রেখেছো।
বৌমনি যখন যায় গাছ তলায় বইসে দেখছি।
তুই…. মহুয়া…. এখানে পেলি কোথায়?
শ্যাম পঠাইছে।
নেপলা, বড়োমা ওদের জন্য যেগুলো নিয়ে এসেছে দে। আমি বললাম।
বড়োমা এবার আমার মুখের দিকে তাকাল।
নেপলা জামা প্যান্টের প্যাকেটটা গাড়ির পেছন থেকে নিয়ে এলো।
শিবু হাসছে।
তুই আগে থিকে পিল্যান কইরে নিয়ে আসছিস।
সবাই মিলে ভাগ করে নিবি। নেপলা।
বলো।
পার্স থেকে কিছু বার কর।
কাইল আবিদের কাছ থেকে লিছি।
ঠিক আছে রাখ না। খরচ আছে। যদি প্রয়োজন পরে চিকনাকে ফোন করবি।
শিবু, নেপলাকে নিয়ে আড়ালে চলে গেল। ফুসুর ফুসুর নিজেরা কি কথা বললো। সাগির সঙ্গে গিয়ে যোগ দিল। কাকে ফোন করলো। শিবু আবার আবিদকে ডাকলো। হিমাংশু, অনুপ এক দৃষ্টে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। বড়োমাদের মুখে কোনও কথা নেই।
আমি অচ্ছ্যুতের মতো দূরে দাঁড়িয়ে আছি।
শিবু ফিরে এলো।
কথা হলো?
হ। টুকু হইছে, বাকিটা পরে বইলে লিব।
সাবধানে থাকবি।
হ।
গাড়িতে উঠে বসলাম। নেপলা স্টার্ট দিলো। সারাটা রাস্তা টর্চের আলোর সিগন্যাল পেলাম। স্টেশন পেরিয়ে যখন নার্সিংহোমের কাছে এলাম তখন দেখলাম সুকান্ত আর দিলীপবাবু দাঁড়িয়ে।
ইচ্ছে না থাকলেও গাড়ি থামাতে হলো।
দিলীপবাবু এগিয়ে এলেন। বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে নামলাম।
দাদা গাড়ি আর থামাব না। এখান থেকে কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে নিচ্ছি। নেপলা বললো।
সেকিরে! একবার অন্ততঃ থামাতেই হবে। ছোটোমা বললো।
নেপলা হাসলো।
ঠিক আছে।
একটু চা খান। দিলীপবাবু বললেন।
বড়োমার দিকে তাকালাম। হাসছে। বুঝলাম ইচ্ছে করছে।
বলুন, কিন্তু গাড়ি থেকে কেউ নামবে না।
আপনি চলুন।
ইচ্ছে না থাকলেও দোকানটার কাছে এগিয়ে এলাম।
সবাই দেখছে। সুকান্ত একটু দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছে। আমাদের কাছে দু-কাপ চা এলো। বাকি একজন দেখলাম গাড়ির কাছে এগিয়ে গেল।
সুকান্তর মুখ থেকে আপনার কথা শুনলাম।
দিলীপবাবুর চোখে চোখ রাখলাম।
খুব প্রেসারে আছি বুঝতেই পারছেন।
কিভাবে রিকভার করবেন সেটা কি আমাকে বলে দিতে হবে।
দিলীপবাবু হাসছেন।
আপনি দিবাকর বাবুকে একটু ফ্রন্টে নিয়ে চলে আসুন। তাহলে সুবিধে হয়।
এই তো আপনি অনেক খবর রাখেন দেখছি।
কি করবো বলুন, আপনার সঙ্গে পেরে ওঠা যাবে না। আপনার অনেক অপশন।
হাসলাম।
আমাদের যারা চিরশত্রু, তারা আপনার মিত্র। নিজেদের প্রাণের থেকেও আপনাকে ভালোবাসে।
চায়ে চমুক দিলেন।
তবু বাঁচার তাগিদে এটুকু না করলে নয়।
চুপ করে থাকলাম, চায়ে চুমুক দিলাম।
কৌস্তভবাবু স্যারেন্ডার করেছেন। আমাকে কথা দিয়েছেন, আপনি যা বলবেন উনি তা করতে প্রস্তুত। ওনার দুর্ভাগ্য উনি আপনাকে ঠিক গেইজ করতে পারেন নি।
কলকাতায় আসতে বলুন।
কবে যাবে বলুন।
উনি তো কলকাতায় সপ্তাহে একবার যান।
আপনি বললে তার আগেও যেতে পারেন।
দরকার লাগবে না।
আমি রবিবার কলকতায় থাকবো।
আসুন কথা হবে।
পায়ে পায়ে গাড়ির কাছে চলে এলাম। সুকান্ত বড়োমার সঙ্গে কথা বলছিল। আমাদের দেখে সড়ে দাঁড়ালো। আমার চোখে চোখ রাখলো। গাড়িতে উঠে বসলাম।
ঠিক আছে চলি তাহলে।
নেপলা গাড়ি স্টার্ট দিল।
বাইরুটে গাড়ি ছুটলো রুদ্ধশ্বাসে। নেপলা এসি চালালো। বেশ কিছুক্ষণ পর বড়োমা কথা বললো।
তোর দাদা ফোন করেছিল।
কেন।
কখন ফিরছি।
বলোনি।
বলেছি।
আবার চুপ চাপ। গাড়ি চলছে।
সুকান্তকে তুই কি বলেছিস?
কই! কিছু না!
নেপলা হাসছে।
তুই হাসছিস কেন। আমি বললাম।
সুকান্তবাবু বড়োমার কাছে কাঁদুনি গাইছিল।
কি বলছে।
তুমি নাকি বলেছো, খামোকা ঝামেলা করলে, তোমার বোন বিধবা হবে।
হ্যাঁ বলেছি।
কেন বলেছিস! ছোটোমা তরপে উঠলো।
কোন কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছি সেটা বলে নি?
না।
শিবুকে তোমরা দেখলে, আগেও দেখেছো। কেমন মনে হয়?
খুব ভালো ছেলে।
দেখো শুধু বড়োমাকে প্রণাম করবে বলে ওই অন্ধকারে ওরা অপেক্ষা করছিল। কেন জানিনা আমার মন বলছিল, আমি যতক্ষণ হাইওয়েতে না এসে পরবো ততক্ষণ ওরা আমাকে পাহাড়া দেবে। আমার এতটুকু ক্ষতি ওদের সহ্য হবে না। কেন?
খেতে বসে তুমি আমাকে প্রশ্ন করেছিলে, তখন আমি তোমাকে কিছু বলিনি, এখন বুঝতে পারলে কেন আমি জামা প্যান্টের পিস কিনেছিলাম।
ছোটোমা চুপ করে রইলো।
আঠারো বছর আগে ভালোপাহাড়কে যা দেখেছি, এখনও সেরকম আছে।
মানুষের বেসিক নিডস কি বলো তো ছোটোমা?
ছোটোমা চুপ করে রইলো।
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান। ইতিহাসে ছোটোবেলায় তাই পড়েছি।
শিবুর বৌকে এখনও দু-কিলোমিটার পাহাড়ী পথে হেঁটে খাবর জল আনতে হয়। যদিও আমি ইঁদাড়া করে দিয়েছি। সেটার জলও মাঝে মাঝে এমন নিচে নেমে যায়….।
ওদের বাড়ি থেকে দু-কিলোমিটার দূরে একটা ঝোড়া আছে।
তোমার তেষ্টা পেলে মিনারেল ওয়াটার কিনে খাও।
ওদের ভাগ্যে একটা টিউবওয়েল পর্যন্ত জোটে না।
কোটি কোটি টাকা সরকারী খাতে খরচ হচ্ছে ওদের উন্নতি কল্পে। ওরা ট্রাইব্যাল। বন্যপশু সংরক্ষণের মতো ওদেরও সংরক্ষণ করা হয়। ওরা কিন্তু যে তিমিরে থাকার সেই তিমিরেই পড়ে আছে। তাহলে টাকাগুলো যাচ্ছে কোথায়?
আগে কনিষ্করা যেতো, এখন কনিষ্কদের ছাত্ররা সেখানে যায়। কিসের স্বার্থে বলতে পারো। ওরা কি ওখানে গিয়ে চিকিৎসা করলে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করতে পারে।
মনের তাগিদে যায়। আর ভালোবাসা।
ওদের সহজ সরল ভালোমানুষীকে নিয়ে কিছু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ব্যবসা করছে।
এখন ওদের মধ্যে অনেকে শিক্ষিত। শিক্ষার আলো ওদেরও চোখ ফুটিয়ে দিয়েছে।
গোঁজামিলগুলো ওরা ধরতে পেরেছে। না পাওয়ার বেদনায় জোর করে ওদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। তাই ওরা জঙ্গী।
শিবু, শ্যাম, দারু একটা নিষিদ্ধ জঙ্গীগোষ্ঠীর মাথা। তোমাদের চোখে ওরা ভালোছেলে কিন্তু সুকান্ত, দিলীপবাবু, অনাদির চোখে ওরা টেরর। এই অনাদিও কিন্তু এক সময় শ্যাম, শিবু, দারুর সঙ্গে খেলা করেছে। আমাদের ওই খমারে একটা খড়ের টং করে ওরা থাকতো। শ্যাম, শিবু, দারু অনাদিদের বাড়ির খেতের ধান কেটে, ঝেড়ে হামারে তুলে দিয়ে এসেছে। তখন ওরা দল বেঁধে মুনিশ খাটতে আসতো।
এ্যাঁ।
আমি ঠিক কথা বলছি। আমি ভালোপাহাড়ে আজ নয়, সেই কলেজলাইফ থেকে যাই। স্কুল জীবনের শেষপ্রান্তে মৌসুমিমাসির হাত ধরে আমি প্রথম ভালোপাহাড়ে যাই। এটা তোমরা জান।
হ্যাঁ।
মৌসুমিমাসি ওদের নিজের পিসী।
কি বলছিস!
আমার শৈশবে ওদের দেখেছি বাবা মায়ের হাত ধরে আমাদের জমিতে কাজ করতে আসতো। কাকীমা ওদের চাল, ডাল, তেল, নুন দিত। খেতের সব্জি ওরাই তুলে নিত।
কেন যাই কিসের টানে যাই?
আচ্ছা ছোটোমা ইসলামভাই কেন খারাপ হলো, তুমি কি করে মল্লিকদার বৌ হলে। অন্যভাবে নেবে না। ভীষণ কষ্ট পাবো। বড়োমার থেকে তুমি বেশি অনুভব করতে পারবে, অনেক বেশি আমার কথাটা হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারবে বলে তোমায় বলছি।
বাংলাদেশে তোমরা সমৃদ্ধশালী পরিবার ছিলে। কেন ভাগ হলো বাংলা? কিসের স্বার্থে?
দেখাতে পারবে যারা বাংলা ভাগ করলো তারা কেউ সাফারার হয়েছে। তা না হয়ে কেন তোমাদের পরিবারের মতো হাজার হাজার পরিবার সাফারার হলো।
এটা কেউ কখনও ভেবে দেখেছে। দেখে নি। বড়ো বড়ো ঐতিহাসিক মোটা মোটা বইতে হাজার হাজার তত্ত্বকথা লিখেছে।
ঠিক ওই জায়গা থেকে তুমি শিবুদের কথাটা একবার ভাববার চেষ্টা করো। দেখবে উত্তর পেয়ে যাবে। দেখবে ঘুরে ফিরে সেই এক কথা বেঁচে থাকার জন্য মানুষের কিছু বেসিক নিডস, নূন্যতম অধিকার।
অনাদি দিলীপবাবুকে প্রেসার করেছে শিবুকে ধরতে হবে, দিলীপবাবু, সুকান্তকে বলেছে। সুকান্ত যদি সেদিন সুমন্তর নাম করে আমাকে পেন্নাম না করতো তাহলে ওকে হয়তো শিবু সাঁটিয়ে দিত। দিলীপবাবুও শিবুর হটলিস্টে আছে।
তুমি কি ভাবো, শিবুর কাছে কোনও খবর নেই। ওর নেটওয়ার্ক দেখলে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। তাছাড়া শিবু ওইরকম অবরা-খবরা ধানক্ষেতের ওপরে দিয়ে যে স্পিডে দৌড়বে সুকান্ত পারবে। তার ওপর ওই গাদা বন্ধুক দিয়ে ওদের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে।
সবচেয়ে বড়ো কথা সুকান্ত তার চাকরি রক্ষা করার জন্য অস্ত্র ধরবে। আর শিবু বেঁচে থাকার অধিকার ছিনিয়ে নেবার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। দুটোর মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। সেখানে আমি যদি সুকান্তকে এইকথা বলে অন্যায় করে থাকি, তাহলে বলবো আমি ঠিক করেছি। অন্ততঃ আমার বিবেকের কাছে আমাকে কোনও জবাবদিহি করতে হবে না।
আমি চুপ করে গেলাম। ঘুট ঘুটে অন্ধকার রাস্তায় ওপাশের গাড়ির হেডলাইটের আলো মাঝে মাঝে চোখে এসে ঠিকরে পড়ছে। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।
সামনেই থার্মলপাওয়ার স্টেশনের ঝক ঝকে আলো চোখের সামনে এসে পরলো। আবিদ গাড়িটা ধাবায় ঢোকাল। বড়োমারা চারজন নেমে ভেতরে গেল। আমি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। আবিদ চা নিয়ে এলো।
মনটা সত্যি আর ভালো লাগছে না। কেমন যেন ক্লান্তি সারা শরীরটাকে ঘিরে ধরেছে।
ইসলামভাইরা এগিয়ে এলো।
কিরে চুপচাপ হয়ে গেলি।
কোথায়!
কথা বলছিস না। দিলীপবাবু কিছু বললো।
কি আর বলবে সেই ঘ্যানর ঘ্যানর।
শালা মহা তেঁদর। ক বছরে বহু জ্বালিয়েছে। ও হ্যাঁ মামনি ফোন করেছিল।
কি বললো।
তনুর ফ্লাইট ছেড়েছে, সিপি রিকোয়েস্ট করেছিল, আজ তোর সঙ্গে একবার দেখা করতে চায়।
কি বলেছে?
তুই এখন অন দ্যা ওয়ে কখন ফিরবি জানা নেই।
এখন একেবারে পাত্তা দিবি না। আমি আগামী সপ্তাহে আসছি। তারপর দেখছি। অনুপ বললো।
হিমাংশু নার্সিংহোমের ব্যালেন্সসিটগুলো এবার রেডি করতো। আমি বললাম।
দুটো বাদে সব রেডিই আছে। তোর সঙ্গে একবার বসবো।
কাল দুপুরের পর একটু সময় রাখিস।
ফোন করে দিস চলে আসবো।
বড়োমারা এলো।
কিছু খাবে?
না। পেটটা বেশ ভাড়ি ভাড়ি।
তাহলে চলো দেরি করে লাভ নেই।
সবাই যে যার মতো জায়গায় বসলো।
নেপলা গাড়ি ছারলো।
পাক্কা দু-ঘণ্টা সময় নিলো বাড়ির গেট পর্যন্ত আস্তে।
গাড়ি থামিয়ে নেপলা হর্ণ বাজালো। দেখলাম ভজুরাম, ছগনলালের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে গেট খুললো।
আবিদ প্রথমে ঢুকলো তারপর আমরা।
ভজুরাম গাড়ির গেট খুললো। বড়োমাকে ধরে ধরে নামালো। তারপর জ্যেঠিমনিকে।
জগাই এগিয়ে এলো। জিনিষপত্রগুলো নামাল। মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
তোর দুদুন ফিরেছে। বড়োমা বললো।
না।
আ মোলো যা কি করে ওখানে।
মেয়ে হাসছে।
দাদাই ফোন করেছিল, বললো একটু পরে বেরবে। জিজ্ঞাসা করলো তুমি এসেছো কিনা।
সাগির, জগাইকে বলছে ডাবের কাঁদি গুলো ভেতরে নিয়ে যা।
ভজুরাম শুনতে পেয়ে গেছে। বড়োমাকে ছেড়ে দিয়ে সোজা গাড়ির পেছনে দৌড় দিল।
মাসি তোমাকে আর দাঁড়িয়ে থেকতে হবে না। চলে এসো। আমি বললাম।
দাঁড়া, বলে দিয়ে যাই নাহলে সব ঘেঁটে ঘুঁটে একসা করে দেবে।
আমরা এবার এগবো। অনুপ, হিমাংশু দু-জনে একসাথে বললো।
দাঁড়া দুটো মুগের জিলিপি আর চা খেয়ে যা।
আমরা ওখানে খেয়েছি।
আমি অনুপের দিকে তাকিয়ে না হসে পারলাম না।
হাসিস না ভালো জিনিষের কদর করতে জানতে হয়।
আমরাও একটা করে খেয়েছি। বড়োমা আমার দিকে তাকাল।
শুধু আমি বাদ!
তোকে গাড়িতে দিতাম। তখন তুই ছোটোকে যা বললি, তারপর ছোটো বললো, তোর মন এখন ঠিক নেই, বাড়িতে গিয়ে দেবে।
ইসলামভাই ছোটোমার মুখের দিকে তাকাল।
বুঝলাম ইশারায় কথা হলো।
আমরা ভেতরে এলাম। দেখলাম মিত্রা রান্নাঘরে। কবিতা টেবিলে জল সাজাচ্ছে।
কেউ সোফায় কেউ চেয়ারে বসলো। আমি ছোটোমা সোফায় বসলাম।
বড়োমা তোমার বৌমা কি আজকাল রান্নাবান্না করে নাকি?
অনেককাল থেকে করে, তুই ছিলি না, তাই দেখিস নি।
মুখে দেওয়া যাবে?
মেয়ে হাসছে।
বাবা, মা চিকেন বাটার ফ্রাই বানাচ্ছে।
চিকেনটা কে কিনে এনেছে?
ভজুমামা।
কিরে ভজু মোরোগ কিনেছিস না মুরগী কিনেছিস।
মিত্রা রান্নাঘর থেকে একবার করে উঁকি মারে, আর হাসে।
দেশি চিকেন।
অনুপ হাসতে হাসতে বললো, এবার তুই আর কোনও প্রশ্ন করতে পারবি না। ভজু শেষ উত্তরটা দিয়ে দিয়েছে।
কবিতা সকলকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিল। নেপলা কিছুটা কবিতার পেছনে লাগলো।
বড়োমা বোতলটা কষ্ট করে বয়ে আনলে, বৌমাকে দাও, একঢোকে অনেক এনার্জি।
কি গো বড়োমা?
এবার মিত্রার গলা পেলাম।
এদিকে আয় বলছি। ছোটোমা বললো।
দাদা কোথায় অনিসা? মেয়ের দিকে তাকালাম।
তনুমনিকে ছেড়ে দিয়ে এসে কনিষ্ক মামার সঙ্গে বেরিয়েছে।
কেন!
নার্সিংহোমে কে একজন নতুন পেসেন্ট এসেছে, ডাক্তারদাদাইও গেছে।
পড়তে পড়তে ডাক্তারি।
ওতো প্রথম থেকেই তাই করে। মিত্রা এসে আমার পাশে সোফার হাতলে বসলো।
সুন্দর?
সেও পিছু পিছু গেছে। মিত্রা বললো।
একটু চা খাওয়া।
দাঁড়া কবিতা বসিয়েছে।
আমাদের কথা বলার ফাঁকেই দেখলাম দামিনীমাসি জামাকাপর ছেড়ে, মুখ-হাত ধুয়ে চলে এসেছে।
মাসি মুগের জিলিপি এনেছো। মিত্রা বললো।
মাসি হাসছে।
সকালে বেশি ছিল না। যে কয়টা ছিলো আমরা ভাগাভাগি করে খেয়েছি। বলে এসেছিলাম বেশি করে বানিয়ে তোমাদের হাতে পাঠাতে।
মা আমার ফোনটা একটু নিয়ে আসবি। মেয়ের দিকে তাকালাম।
ও পারবে না। আমি যাচ্ছি।
মিত্রা উঠে গেল। বাইরে গাড়ির হর্ণ বাজলো।
মনে হচ্ছে দাদারা এলো। ইসলামভাই বললো।
আমি এখান থেকেই চেঁচিয়ে বললাম, কবিতা বেশি করে চা কর।
নেপলা, সাগির, আবিদ দেখলাম বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে।
দাদা, মল্লিকদা হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো।
তোমায় বলেছি না। অনির লেখা মানেই একটা রিপার্কেসন, এই দুদিনে কাগজের সার্কুলেসন পঞ্চাশ হাজার বেড়েগেছে।
তাতে তোমার কি লেজটা গজাল শুনি। বড়োমা ক্যাট ক্যাট করে উঠলো।
দেখলি মল্লিক, শোন তোর দিদির কথা। বলে কিনা আমার কি লেজ গজালো।
বড়োমার দিকে তাকাল।
জীবনে শিখলে না কিছু, নিজের হাতের তৈরি প্লেয়ার যখন ভালো খেলে কোচের যে কি আনন্দ হয় সে তোমাকে বোঝান যাবে না। বুঝলে।
বড়োমার কোলের ওপর একটা কাগজ ছুঁড়ে দিল।
লেখাটা পড়ে দেখো, দেখবে ধার কতটা। এই ধরণের লেখাই জনমত গড়ে তোলে।
বড়োমার চোখেমুখে পরিতৃপ্তির হাসি ছড়িয়ে পড়েছে।
দাদা আমার দিকে তাকাল।
তুই তো ইতিহাস লিখতে শুরু করেছিস। একেবারে অন্য স্বাদের লেখা।
মল্লিকদা আমার দিকে তাকাল।
আজ পুরোটা কম্পজ করে কারেকসন করে দিয়ে এলাম। বুঝলি অনি, অনেকদিন পর এতরাত পর্যন্ত অফিসে থাকলাম। আবার যেন মনে হচ্ছে আগের এনার্জিটা ফিরে পাচ্ছি।
মিত্রা ফোনটা নিয়ে এসে আমার হাতে দিল।
ছোটো একটু চা দেবে না। দাদা করুণ সুরে বললো।
কবিতা নিয়ে আসছে।
ইসলামভাই, ইকবালভাই কাগজের পাতা উল্টে উল্টে দেখছে।
দামিনীমাসি প্লেটে করে সবার জন্য মুগের জিলিপি আর ছানার জিলিপি নিয়ে এলো।
এটা আবার কোথা থেকে এলো মাসি? মল্লিকদা বললো।
কেনো সকালে আসার সময় গেলো নি? ছোটোমা বললো।
মল্লিকদা হাসছে।
কম ছিল, একটা খেয়েছিলাম। মিত্রা অর্ডার দিয়েছিল।
এটা সেই অর্ডারি মাল?
অনিসা, ছোটোমা, মল্লিকদার কথায় হাসছে।
বুঝলি মল্লিক, সকালেরটা মনেহয় বাশি ছিল। এটার টেস্টটা একটু অন্যরকম।
দাদা কথা বলছে, আর টেরিয়ে টেরিয়ে বড়োমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
আমি হাসছি।
চা এলো। কিছুটা গল্প হলো।
অনুপরা চলে গেল। আবিদ ওদের পৌঁছতে গেল।
আমি অনুপদের গেট পর্যন্ত ছেড়ে এসে নিজের ঘরে এলাম। বিছানার একটা কোনে আমার পাজামা, পাঞ্জাবী টাওয়েল রাখা। আমি পরনের পাজামা পাঞ্জাবী ছেড়ে টাওয়েল নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। ফিরে এসে দেখলাম মিত্রা আলনার সামনে দাঁড়িয়ে।
তোর জন্য ধুতি কিনেছি ওটা পরে শুবি, না পাজামা পাঞ্জাবী পরবি।
এতদিন যেগুলো পরেছি।
সব কেচে কুচে তুলে রাখা হয়েছে।
ধুতি দে।
এখন পাজামা পাঞ্জাবী পরে খেয়ে নে। রাতে ধুতি পরিস।
তাই হোক। ছেলে ফিরেছে।
হ্যাঁ। তুই তারাতারি আয় সবাই অপেক্ষা করছে।
মিত্রা বেড়িয়ে গেল।
সবাই একসঙ্গে হই হই করে খেলাম। আঠারো বছর আগের দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। নতুন অতিথি বলতে সুন্দর, অনিসা, অনন্য।
আমি মাংস খেতে পারলাম না। একবার মুখে দিয়েই কেমন গন্ধ গন্ধ লাগলো। বুঝলাম, না খাওয়ার ফল। বড়োমা বারন করলো খেতে, তবে ফ্রায়েড রাইসটা খেলাম।
খেতে খেতেই যেটুকু খবর নিলাম তাতে বুঝলাম ডাক্তারদাদাকে কৌস্তভ বহুবার ফোন করেছে। শনিবার আসবে। একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
ইসলামভাই, ইকবালভাই ডাক্তারদাদার বাড়িতে শুতে যাবে। মেয়ের কাছে জ্যেঠিমনি। সুন্দর, অনন্য এক ঘরে। কবিতা, মাসি এক জায়গায়। সাগিরদের জায়গা হয়েছে বাড়ির পেছনের ঘরে।
ডাক্তারদাদা বললো কাল তোর প্রোগ্রাম।
এখনও কিছু ঠিক করিনি।
সন্ধ্যেবেলা অনিমেষের বাড়ি যাওয়ার কথা?
হ্যাঁ।
তোর সঙ্গে আমি একটু বসবো, আমার একটু বুদ্ধি দরকার।
মিত্রা হাসছে।
হাসিস না মামনি, আমারও কিছু সম্পত্তি আছে। তারতো একটা গতি করতে হবে।
হঠাৎ এই বুদ্ধিটা কে দিল?
বয়স হয়ে গেছে। এতদিন মনের জোরে লড়াই করলাম। এবার বিদায় নেওয়ার পালা।
বক্ত্যবি রাখো, সুগারটা চেক করেছিলে? বড়োমা গর্জে উঠলো।
করেছি। এখন নর্ম্যাল। ছোটো একটা ফ্রাইয়ের টুকরো হবে না।
একবারে দিবি না।
কতদিন পর এরকম আয়েস করে খাচ্ছি বলো বান্ধবী, তুমি এরকম ধমকালে চলে।
ইসলামভাই হাসতে গিয়ে বিষম খেল।
মিত্রা, তনু পৌঁছে গেছে? আমি বললাম।
তোরা আসার একটু আগে সানা ফোন করেছিল। ওরা দুজনে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে যাচ্ছে।
তোর সঙ্গে কথা হয়েছে?
হ্যাঁ।
ড্যাড কালকে আমার একটা লেখা তোমাকে দেব একটু এডিট করে দেবে?
সুন্দরের দিকে তাকালাম।
দাদাইকে দাও।
হবে না।
কেন!
দূর।
মল্লিকদা হাসছে।
আমার এডিটং ওর মন পসন্দ হচ্ছে না।
টুকরো টুকরো কথার মধ্যে দিয়েই খাওয়া শেষ হলো। আমি মুখ ধুয়ে সোজা ঘরে চলে এলাম।
কিছুক্ষণ বাদে অনিসা, অনন্য, সুন্দর এসে গুডনাইট করে গেল।
পরেপরেই ইসলামভাই, ইকবালভাই এলো।
কাল সকাল সকাল বেরিয়ে যাব।
কাজ আছে?
একটু আছে। তিন চারদিন নিজেদের জায়গায় যাইনি। ইকবালভাই বললো।
তোমাদের পাসপোর্ট আপডেট করা আছে।
তুই কি সত্যি সত্যি আমাদের পাঠাবি?
ইচ্ছে আছে।
দুজনে দুজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।
ওখানে একজন গার্জেনের দরকার। কাকে ভরসা করবো বলো। তোমরা দুজন অল্টারনেট করে যাবে।
তাহলে এদিককার কাজ সব গোছাগুছি করতে হবে।
এখনও সময় আছে। ধরো মাসখানেক।
তুই আমার ওখানে কবে যাবি। ইকবালভাই বললো।
কালকেই যেতে পারি।
আমাকে একবার জানিয়ে যাস।
তা হয় নাকি।
মিত্রা ঘরে এলো।
আমার পুরনো নম্বরটা মোবাইল থেকে মুছে দাওনি তো?
ইসলামভাই হাসছে।
কালকে থেকে চালু করবো।
দুজনে বেরিয়ে গেলো।
মিত্রা দরজা বন্ধ করে এলো। আমি খাটে বসলাম।
চেঞ্জ করে নে। মিত্রা বললো।
তুই করবি না।
করছি।
আমি পাজামা পাঞ্জাবী ছেড়ে ধুতিটা পরলাম। মিত্রা আলমাড়ি থেকে একটা নাইটি বার করে নিয়ে বাথরুমে গেলো। ঢোকার আগে মুখটা বাড়িয়ে বললো, ঘুমবি না।
আমি বড়ো লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে শুলাম।
মাথার ওপর পাখাটা বন বন করে ঘুরছে।
আঠারো বছর। খুব একটা কম সময় না। কেন যে আমি লোকটার পেছনে দৌড়ে জীবনের আঠারোটা বছর নষ্ট করলাম আজও নিজেকে প্রশ্ন করলে তার সঠিক উত্তর পাই না। খুব কি প্রয়োজন ছিল? হয় তো ছিল, হয় তো নয়—
সত্যিতো সাগিররা সেদিন গন্ধ না পেলে হয়তো এই ঘরে এই মুহূর্তে শুয়ে থাকাটা স্বপ্নই থেকে যেত। আর মুথাইয়া, সত্যি ওর ঋণ আমি জীবনে কোনওদিন শোধ করতে পারবো না।
এখনও ওইদিনটার কথা মনে পড়েগেলে গা শিউড়ে ওঠে। চোখের সামনে দেখতে পেলাম গাড়িটা সজোরে এসে ধাক্কা মারলো। মুখোমুখি নয় আমি যেদিকে বসেছিলাম ঠিক সেইদিকে।
তারমানে যে খবরটা পাঠিয়েছিল একবারে সঠিক পাঠিয়েছিল। হয়তো ফলো করেছিল অন্ধকারে খেয়াল করি নি।
প্রথমটায় ভেবেছিলাম, তাপসের চোখে আলো পড়ে বেসামাল হয়ে গেছে, তারপর যখন নিজে গালাগালি করে চেঁচিয়ে উঠলো তখন আর সময় নেই। মাথাটা আর কাজ করে নি। তারপর কোথায় ছিলাম কিভাবে ছিলাম জানি না।
যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখলাম আমি একট নার্সিংহোমে। চোখের সামনে যে মুখটা ভেসে উঠলো, সেটা মুথাইয়া। তারপর নেপলা, সাগির, অবতারকে দেখলাম। আমাকে মুথাইয়া ম্যাড্রাসে নিয়ে চলে গেল। ওখানেই ছিলাম দু-মাস। নেপলারা আমার ছায়া সঙ্গী। সমস্ত খরচ বহন করলো মুথাইয়া।
পরে মুথাইয়া বলেছিল, অনি মরে গেছে। তুই এখন নিজের একটা নতুন নাম বাছ।
কথাটা শুনে অবাক হয়েছিলাম।
সেদিন ভাগ্যিস তোকে ফোন করেছিলাম। নাহলে জানতেই পারতাম না। আর তোর নেপলাটা সত্যি মাথায় বুদ্ধি রাখে।
কিরকম?
তুই তো দিল্লী থেকে সমস্ত কাজ গুছিয়ে দিয়ে চলে গেলি।
হ্যাঁ।
পরো শালা রাঘবন বলে এটা অনি ঠিক করে দিয়ে যায়নি। ওকে দিল্লী আস্তে বলো।
তুমি ফোন করলে জানতে পারলে আমার এই অবস্থা।
সকালের ফ্লাইটে গেছি। বিকেলের ফ্লাইটে তোকে তুলে নিয়ে চলে এসেছি।
তাহলে অনি মরলো কি করে?
ওটা রাজনাথের প্রথম পক্ষের ছেলে। তোর সঙ্গে চেহারার কিছুটা মিল ছিল। নেপলা ব্যাটা তোর জামাকাপর পড়িয়ে ওকে গিড়িয়ে দিয়ে নিজে পালিয়ে এসেছে।
শুনলাম মুখটা চেনা যায় নি।
যাবে কি করে, গাড়িতে বেঁধে রাস্তায় যদি ঘসরে দেয় তারপর যদি বডি তিন চারদিন পরে থাকে চেনা সম্ভব।
বুদ্ধি কার।
ওদের তিনজনের।
ওদের সঙ্গে আর কেউ ছিল না।
অতোসতো কি বলে। শুধু বললো, অনিদার গায়ে হাত পড়েছে জান নিকলে দেব।
তখনই বুঝলাম খাঁটি হীরে।
ওমনি পাখার ব্লেড গুণতে শুরু করেছিস।
চমকে মিত্রার দিকে তাকালাম। এরই মধ্যে কাপর ছেড়ে ম্যাক্সি পড়া হয়ে গেছে। চুল আঁচড়াচ্ছে। শরীরটা আগের তুলনায় বেশ ভাড়ি। তবু শরীর চর্চার মধ্যে দিয়ে ধরে রাখার চেষ্টা।
কি ভাবছিলি?
নিজের কথা।
এর শেষ কোথায়?
মনে করলে আজই শেষ, না হলে মৃত্যুর আগেরদিন পর্যন্ত চলবে।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি, ও আমার দিকে তাকিয়ে।
চুলটা বাঁধিস না। যেমন আছে তেমন থাক।
মিত্রা হাসলো।
একটা গাডার অন্ততঃ বেঁধে নিই।
তাই কর।
মিত্রা নিজের কাজ সেরে বিছানায় উঠে এলো। আমি সরে শুলাম।
বুবুন।
বল।
আঠারোটা বছর কোনখান দিয়ে কেটে গেল তাই না।
হুঁ।
মিত্রা পাশ ফিরলো।
আমরা আঠারো বছর আগে ফিরে যেতে পারি না।
মনটা সব সময় যেতে চায়, কিন্তু শরীরটা চায় না।
মিত্রা আমার চোখে চোখ রাখলো।
তোর কাছ থেকে একটু জীবন চেয়েছিলাম। ঠিক মতো ফিরিয়ে দিতে পেরেছি?
মিত্রার শরীর ছুঁলাম কাছে টেনে নিলাম। হ্যাঁ সেই গন্ধ। যে গন্ধ একদিন আমাকে মাতাল করে দিতো। আমি ওর পাগলামির অংশীদার হতাম।
বল না।
তোকে খুব কষ্ট দিলাম।
তা একটু দিয়েছিস। তারপর যখন বুঝতে পারলাম তুই নিজেক নিঃস্ব করে আমাদের আগলে রেখেছিস, তখন আর কষ্ট পাই নি।
একটু থামলো। চোখ থেকে চোখ সরালো না।
তুই কিন্তু অনেক বদলে গেছিস।
কিরকম?
তোর চালচলনে একটা গাম্ভীর্যতা এসেছে। মাঝে মাঝে তার থেকে তুই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিস না যে তা নয়, কিন্তু ধরা পরে যাচ্ছিস।
দু-দিন ধরে এই লক্ষ করছিলি।
তা বলতে পারিস।
ইসি কি বললো।
তোর চোখদুটো আগের থেকে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ।
তোর মতামত।
আমারও তাই। তবে তোর মুখটা দাড়ি-গোঁফে যখন ঢাকা ছিলো, তখন যতটা গম্ভীর গম্ভীর লাগছিল, এখন ততটা নয়। এখন তোর মুখটা অনেক কচি কচি লাগছে।
মিত্রা আমার বুকে মাথা রাখলো।
বুবুন।
উঁ।
টোডিকে কোথায় পেলি?
এখন থাক। পরে বলবো। তুই আমার ফিরিয়ে দেওয়া জীবনদুটোর কথা বল।
শুনতে ইচ্ছে করছে?
ভীষণ। কতো স্বপ্ন ছিলো জানিস, কিছুই করতে পারলাম না। একটা লোকের পেছনে আঠারোটা বছর বে-ফালতু দৌড়লাম। কেন যদি প্রশ্ন করিস বলতে পারবো না।
তোর ভালোবাসাকে কলঙ্কিত করেছে, তা তুই সহ্য করতে পারিস নি।
এটা একটা কারণ।
এটাই মস্ত বড়ো কারণ। ঠিক এই জায়গায় আমি তোর কাছে হেরে গেছি।
মিত্রা আমার বুকে থুতনিটা দিয়ে চোখে চোখ রাখলো।
তোর ছেলে-মেয়েকে যেমন দেখছিস তার একটুও কৃতিত্ব আমার নয়।
তাহলে কার, তার বাবার?
বাবার রক্তটা আছে। একজন বাবার বাইরের মেজাজ পেয়েছে, একজন বাবার অন্তরের মেজাজ পেয়েছে।
মায়েরটা কিছুই পায় নি?
ছেলে কিছুটা পেয়েছে। জানিষ বড়োমা, ছোটোমা না থাকলে আমি যে কি করতাম….।
তাহলে হয়তো জীবনটা অন্যভাবে রচনা করা হতো।
হলে মনে হয় ভালো হতো অন্ততঃ তোকে হারাতাম না।
মিত্রার নাকটা ধরে একটু নেড়ে দিলাম।
আমাদের যেমন ভরসার জায়গা ছিলো ছোটোমা, ঠিক ছেলমেয়েরও তাই। তোর মেয়ে ছোটোমার হাতে কম মার খেয়েছে, সেই নিয়ে বাড়িতে তুলকালাম কাণ্ড। আমার যে মনখারাপ হতো না, তা নয়, কিন্তু পরক্ষণেই দেখতাম মেয়ে ছোটোমার পেছন পেছন দিদাই দিদাই করে ঘুরছে।
ছোটোমা একদিন এসে বলেছিল, আমি যে ওদের একটু আধটু মারধোর করি তুই কষ্ট পাস?
বললাম, তা একটু পাই, তবে সবাই আদর করলে শাসন করবে কে?
ছোটোমা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে ফেলেছিল।
বললো, ওদের আড়ালে আমাকে তুই ঘা দুচ্চার দিয়ে দিস।
বুবুন তোমাদের ছেলে, তার ছেলে মেয়েকে মানুষ করছো।
আমার কথা শুনে কি বললো জানিস।
কি।
আমি ওকে গর্ভে ধরিনি। ধরলে কি এভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যেতে পারতো।
তখন অবশ্য আমি জানলেও বড়োমা, ছোটোমা কেউ জানতো না তুই বেঁচে আছিস।
কবে জানলো।
সুনীতদার ঘটনার দিন।
তুই তো তার আগে জানতিস।
হ্যাঁ। তুই জানতিস!
চিকনা বলেছিল। চিকনাই নেপলাকে প্রথম খবর দিয়েছিল।
কবে?
যেদিন আমার এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। সেই রাতে।
নেপলাকে কতো জিজ্ঞাসা করলাম, কিছুতেই খুলে বললো না, সব কেমন ভাষা ভাষা বললো।
হাসলাম।
তুই বল।
(আবার আগামীকাল)
মাননীয় জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় বাবু, কাজলদীঘির আমি অন্ধ ভক্ত, ৩/৪ আগে আমি প্রথম পড়ি bangla e library তে, তখন থেকে নেশা লেগে গেছে, এখন তো রোজ রাতে অপেক্ষা করি কখন পোস্ট করবেন, বারবার পড়তে ভালো লাগে, বাঙালির বিউলির ডাল, আলুপোস্ত র মত, আপনি এভাবে লিখলেন কি করে ভেবেই আমার আশ্চর্য্য লাগে, অনেক ভালোবাসা ও নমস্কার নেবেন, আপনার গুণমুগ্ধ পাঠক, উত্তম পল্যে ।।
ফেসবুক এ কমেন্ট অপশন নেই তাই এখানেই লিখলাম ।।
অসাধারণ খুব ভালো