বৃষ্টি মাথায় করে ঢুকে পড়েছি হাওড়া স্টেশনে লোহার ঘরে। ৬টা ১৫ মিনিটে চলতে শুরু করবে ভোঁওওও বাঁশি বাজিয়ে ইস্পাত এক্সপ্রেস। ব্যাগপত্র গুছিয়ে বসেছি সবে, জানলা দিয়ে এক পশলা বৃষ্টি এসে আমাদের কোল ভিজিয়ে গেলো। তীব্র দাবদাহের পর বর্ষায় চনমনে মাঠঘাট, থইথই পুকুর, বৃষ্টিস্নাত চলন্ত গাছপালা, শাপলা, শালুক, আনন্দচাষী ও সোঁদাগন্ধী চাষীবৌদের যত্নের খুশিতে দোলানো মাথায়, ঢেউ খেলানো কচি ধানের ক্ষেত দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ঘাটশিলা সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে। স্টেশনের ওভার ব্রীজ থেকে দেখলাম, সুখী প্রেমিকের দাম্ভিকতা! প্রেমিকা সুবর্ণরেখার পাহারায় দিগন্তজোড়া সবুজ পাহাড় দামাল দলমা; আহা পায়ের তলায় প্রেমিকের প্রেম পেতে যেন এই ঘাটশিলা শহর; ‘আরণ্যক’-এর স্রষ্টার মণিমাণিক্য খচিত প্রাকৃতিক সম্ভারে বিভূষিত।
অনুপদা আমাদের আড়াই দিনের ফ্রেন্ড ফিলোজফার গাইড বাহন নিয়ে স্টেশনে। সুবর্ণরেখার তীরের কোন হোটেলে থাকবো এমন আব্দারে মহা বিপত্তিতে পরলাম, অটোর চাকা গেল কাদামাটিতে বসে। আমি ছাড়া তাকে টেনে তুলে দাঁড় করানোর চেষ্টায় বাকি সকলে। ৫ মিনিটে অবশ্য অটো উঠে দাঁড়ালো পাকা রাস্তায়। আর নদীমুখো হোটেলে না গিয়ে হাইওয়ের ওপর প্যালেসে উঠেছি। ঘরের জানলা দিয়ে তাকিয়ে শুভ দৃষ্টিতে আমি ফিদা প্রেমিক বিশ্ব রূপে!

অপুর পথ
যতদূর চোখ যায় বৃত্তাকারে ঘিরে রয়েছে দামাল পুরুষ দলমা পাহাড়। প্রেমিককে ছোঁবার আসক্তি নিয়ে গরম জলের সাওয়ারের নীচে ধুয়ে নিলাম পথের ক্লান্তি। অনুপদা প্রতিটি গাছ চেনাতে চেনাতে নিয়ে চলেছেন আমাদের। আবারো বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে গেল আঁধারকালো মেয়েকে—ছপাৎ ছপাৎ জল পেরিয়ে তালডুংরি টিলায়; ঠিক যেন এক লাল কলিজা, শাল মহুয়ায় ঘেরা হৃদয় বাসর। এখানেই ‘আরণ্যক’, ‘চাঁদের পাহাড়’ বিখ্যাত সব উপন্যাস লিখেছেন সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সিমেন্টের বেঞ্চে বসে রইলাম চোখ বুজে নারায়ণ পাশে, সখা কৃষ্ণ সাথে।
চারিদিকে দামাল দলমা এখানেও অতন্দ্র প্রহরায়, যেন কেউ এখানের নিসর্গ চুরি না করে পালায়!!

দামাল দলমা
প্রকৃতপক্ষে এইসব স্থানগুলি দলমা পাহাড়ের পাদদেশ। তালডুংরি টিলা থেকে নেমে অরণ্যপথে চললাম ধারাগিরি ফলস্। লালমাটির রাস্তার দু-পাশে মাটি ও পাথরের একচালা ঘর, ঘরের দেওয়ালে চালের পিটুলির আঁকা হাঁস ফুল পাখি পেরিয়ে ধানক্ষেত আর শ্যামলা রঙে দলমাপাহাড়। মাঝেমাঝে বৃক্ষশাখা আলিঙ্গনে জানাচ্ছে—অতিথি পেয়ে প্রকৃতিও খুশি।
বেশ কিছুক্ষণ যাবার পর অটো থেকে নামতে হলো। এখান থেকে হাঁটাপথ—গাইড হবেন ৮০ ছুঁই ছুঁই এক আদিবাসী মহিলা, তিনি এমন দ্রুত হাঁটছেন—আমাদের হিমসিম খেতে হচ্ছে তাঁকে অনুসরণ করতে। এক কুড়চিফুলের বন পেরোলাম অদ্ভুত এক মাদকতা মেখে। কালো মেঘের কানে কানে সাদা মেঘ ফিসফিসিয়ে কী না জানি সব বলছিল তখন…!
সুরভিত মাঠ পেরোচ্ছি সবে, একদল বাচ্চা ‘হাতি আসছে হাতি আসছে’ বলে ছুটছে—ভয় মিশ্রিত আনন্দে অবাক তাকিয়ে থেমে গেছি, ওমনি আমাদের গাইড ধমকে বললেন, ‘থামলে কেন, বাচ্চারা ওরকম ভয় দেখায়’—থতমত হয়ে হাঁটছি আবার।

ধারাগিরি
ধারাগিরির ধারাপাতে ডুবে যাবো অবগাহনে; ভাবছি এমন আর পতিদেব ধমকে চলেছে পাশ থেকে ‘এক ফোঁটা ঝর্ণার জলও গায়ে লাগাবে না, প্রথম বর্ষায় ঝর্ণার জলে নাকি অনেক জীবানু মিশে থাকে, একে রক্তে তোমার মধু—যদি ইনফেকশন হয়!’
ধারাগিরির জলের ধারা সরু, সবে বর্ষা তো, তাই। প্রথমে জল যেখানে জমা হচ্ছে, সেটি একটি ভারী সুন্দর গুহার মতো প্রকৃতির নিজস্ব কারুকাজে পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে আমি এক্কেবারে মাঝখানে। গুহার মতো কুঁয়োর ভেতর নারায়ণ শিলায় বিশ্বরূপের আলোয় আলোয়—
কৃষ্ণঘন আঁধারকালো মেয়েতে
আর নাই আঁধার—
এ মেয়ে সচ্ছ সরোবরে মুক্তা-আধার।

দলমা পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথ
দলমা পাহাড় এখানেও ঝর্ণাটিকে ঘিরে রেখেছে এমনভাবে, যেন প্রকাশ হয়ে যাবে কোনও গোপন প্রেম! বেশি সময় ধারাগিরিতে সিক্ত হতে না পারার হা-হুতাশ নিয়ে ফেরার পথে আবারো একটু কুড়চি আদর মেখে নিলাম।
এবার দলমার ঘেরাটোপে ভেসে পড়েছি মুরুগুমা লেকে আসমানী আকাশ মাথায় নিয়ে। এ লেকের জল হীরের দ্যুতিতে সমুজ্জ্বল।
দামাল দলমার অপরূপ সাজ বর্ষায়—মেঘ মাটি ছুঁলে পৃথিবী যে গর্ভবতী হয়! কোথা থেকে এখানেও হঠাৎই আঁধারকালো মেঘে আসমানী রঙ উধাও! অগত্যা জল থেকে উঠে গরম চা-এ চুমুক দিচ্ছি, দূরে গোল সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে লাল রঙের চূড়ায় ছোট ছোট টিলা গোধূলিতে কৈশোরোতীর্ণা মেয়ের মতো সাজুগুজু করে তার সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বসেছে, আর মেঘ নেমে এসেছে লেকের জলে, বর্ণনাতীত এ দৃশ্য!
ফিরে আসছি এখান থেকে, গোধূলির রং মেখে একপাল গরু ও এক রাখাল ছেলেকে পাশ কাটিয়ে সুবর্ণরেখা নদীর পাড়ে ‘রাতমোহনায়’—চাঁদনী রাতে সাহেবরা চাঁদ ভেসে যেতে দেখবেন বলে নদীর বুকে পুল তৈরী হয়েছিল। স্বাধীন ভারতে ইংরেজরা নেই, ভারত ছেড়ে চলে গেছেন, তবে এখনো বয়ে যায় নদীর রূপোলী জল, পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ আর প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটক। আজও পূর্ণিমা—নদীতে ভেসে যাওয়া চাঁদ দেখে নীল রাতে ফিরে এলাম হোটেলে। ঘরের জানলা খুলতেই বিছানায় জোছনা এলো। স্নান সেরে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমোলাম জোছনা মেখে চাঁদের সাথে!

সেই রাখাল বালক
খুব ভোরে হাইওয়ের ওপর একটি ঝুপড়িতে বসে চা-এর সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি। এখানেও ভোরের কুয়াশা ভেদ করে দামাল (পাহাড়) পুরুষের তীক্ষ্ণ নজরে আমরা। কিছু পরে স্নান সেরে রওনা হলেম গালুডি হয়ে সাতবুরুঙ নদীর পাড় ধরে দুয়ারসিনী—দামাল দলমার অতন্দ্র প্রহরায় ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া সীমান্ত। মনাইয়ের মতো ঘরের দেওয়ালে পৌরানিক কাহিনী আঁকা আদিবাসী গ্রাম, মেঠো বাঁশির মিঠে সুরে মাতোয়ারা হলাম—রাখালছেলে সামনে বসে বাঁশি বাজালো। আমরা এগিয়ে গেলাম ‘ভালোপাহাড়’, বান্দোয়ান। এটি একটি রুক্ষভূমি—যেখানে একদা সব আধুনিকতা বিসর্জন দিয়ে সাহিত্যিক কমল চক্রবর্তী লক্ষাধিক শ্যামল প্রাণ যত্নে লালন করে চলেছেন আজও। ‘ভালোপাহাড়ে’ কাটানো বেশ কয়েক ঘন্টা অন্য আর একটি পর্বে লিখবো বরং—
এখন চলি সুবর্ণরেখার এক শাখানদীর তীরে। অস্তগামী সূর্যের অপরূপ ছায়ার সাথে নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া কমলা ঢেউ দেখেছি মুগ্ধ হয়ে। চাক্ষুষ না করলে জীবন নিরর্থক মনে হচ্ছিল সেই ক্ষণে! ওখান থেকে ফিরে হাঁটাপথে পৌঁছেছি সিদ্ধেশ্বরী পাহাড়ে, প্রায় আড়াই কিমি—পূর্ণিমায় এখানে নাকি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোড়ায় চড়ে উঠতেন আর, ফলস্বরূপ পাঠকের উপহার ‘চাঁদের পাহাড়’! সন্ধ্যার ঘন্টাধ্বনি শুনতে শুনতে হোটেলে ফিরে এলাম দলমা পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য্য ছুঁয়ে এখান থেকেও। পরের দিন যাবো দলমার শিখর ছুঁতে।

দুয়ারসিনি
খুব ভোরে সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়েছি দামাল পুরুষ দলমার শিখর ছুঁতে। পথে জামসেদপুরের আগে ডিমনালেকের পাড়ে অপূর্ব মাদকতায় প্রাতঃভ্রমণ সেরে বৃষ্টি মাথায় নেমে এলেম পথে। আহা, কী শ্যামল মাদকতার কী যে পিছুটান! বার বার ফিরে ফিরে দেখেছি তাকে! পথে বেশ কিছু পথিক বললেন, সেই দামাল পুরুষের শিখর ছোঁয়ার অনুমতি পাওয়া যাবে না, এই বর্ষায় সে থাকে একাকী নির্জনে তবে মনের মতো প্রেয়সী পেলে অনুমতি দিতে পারে প্রেমিক দলমা! অদ্ভুতভাবে অনুমতি পেলাম এবং ঢুকে পড়লাম পাহাড়ের পেটে—‘দলমা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়েরী’-তে।
অনন্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে চলেছি অরণ্যপথে অপরূপ দলমার শরীরের আঁকা বাঁকা পথে। মহাকালের পদচিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এখানে সেখানে—তবে সাক্ষাৎ হয় নি তাঁদের সাথে, ভাঙা ডালপালায় অস্তিত্ব টের পাচ্ছিলাম ক্ষণে ক্ষণে। নীলাকাশ উধাও, যেনো কোনো শাখা-শিকড় সমৃদ্ধ চির শ্যামল বৃক্ষগুহার সুড়ঙ্গপথে প্রাগৈতিহাসিক যুগে আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে চলেছি নির্জন, নিশ্চুপ; আদিতম আশ্রয়ে।

দলমা ওয়াইল্ড লাইফ সেনচ্যুয়ারি
শুধু আলাদা করে শোনা যায় পাতার খসখস, হাওয়ার শনশন ও বৃষ্টির রিমঝিম! হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভার বললো, ‘আর উঠবেন?’ সবার আগে আমি বলে উঠলাম, কেন উঠবো না! ড্রাইভার বললেন, বাকি পথটুকু পায়ে হেঁটে উঠতে হবে যে–
গাড়ি রইলো দলমার বুকে, আমরা হেঁটে উঠছি দামাল পুরুষের দম্ভ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। শ্যাওলার কার্পেট বিছানো খাঁড়াই সরু পথ, দু দিকে গভীর অরণ্য—নীচে খেলনার মতো শহর আর চারিদিকে শ্যামল পরাণ; কে বলে পাথর, পাষাণ!
এখানেও উড়ে উড়ে মেঘ এসে প্রেমসিক্ত করলো কৃষ্ণঘন আঁধারকালো মেঘমেয়েকে। মেঘালয়ে বসত-আনন্দে ভিজে চলেছি খাড়াই-উৎরাই পথে; এতক্ষণ যাকে দূর থেকে দেখেছি, ছুঁয়ে ফেলেছি তাঁর শিখর—শেখরে শ্যামল ভূষণে বৃক্ষরাজি জড়িয়ে খুশিতে নাচতে লেগেছি চারিদিকে ঘিরে থাকা, পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে মেঘের সাথে রিমঝিম গানে টুপটাপ পায়ে—আহা আহা কী সুখ! সত্যি—

এই পথ যদি না শেষ হয়
দামাল দলমা;
তুমি প্রকৃতি তুমি পুরুষ, তুমি দাম্ভিক,
তুমিই প্রেমিক আমার বিশ্বরূপ _
আমি নারী বিশ্বরূপের পাগলপ্রেমী
…….আমি মেঘ।
Durdanto lekhoni apnar!!!ami abassya ghatshila abdhi sesh hoye gechilam 4 work!!!bt apnar chobi gulo dekhe ebar chuti pele jaoar ichha roilo!!!parle ektu details r contact person er name ta janaben!!!