২০১১ সালের ২ এপ্রিলের কথাটা অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন। হয়তো মনে রেখেছেন কয়েকজন। সেদিন কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা স্মরণীয় দিন। ইতিহাস লিখেছিলেন এমএস ধোনি। সেদিনটা ছিল বিশ্বকাপের ফাইন্যাল। বিপক্ষে শ্রীলঙ্কা। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের সেই ফাইন্যালে মাহেলা জয়বর্ধনের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ভড় করে শ্রীলঙ্কা ভারতের সামনে টার্গেট রাখে ২৭৫ রানের। জবাবে খেলতে নেমে ৩১ রানের মধ্যে দুই ওপেনার বীরেন্দর শহবাগ ও শচীন তেন্দুলকরকে হারিয়ে ধুঁকতে থাকে ভারত। দলের ১১৪ রানের মাথায় তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে প্যাভিলিয়নে ফেরন বিরাট কোহলি। ততক্ষণে ক্রিজের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গেছেন গৌতম গম্ভীর। ম্যাচ তখন ফিফটি-ফিফটি। যে কোনও দিকে যে কোনও সময়ে ঢলে পড়তে পারে। গম্ভীরের সঙ্গে ধোনি খেলে চলেছেন। উত্তজনা কিংবা টেনসনের লেস মাত্র নেই তার চোখে মুখে। গম্ভীর ৯৭ রানে যখন প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলেন তখন ভারতের দরকার ৫২ বলে ৫৩ রান। যুবরাজ সিংকে সঙ্গে নিয়ে অতি কঠিন কাজটা সহজেই সেরে ফেললেন ধোনি।
৯১ রানের ইনিংসে শেষ ছক্কাটায় লেখা রইল ইতিহাস। শেষ বলটা করতে চলেছেন কুলাসেকারা অপরপ্রান্তে ধোনি। বলটা করার পর বিশ্বকাপটাই এবারের মতো হাত থেকে ফসকে গেল শ্রীলঙ্কার তারপর ধোনির ব্যাট ছুঁয়ে বলটা যখন আকাশে উঠেগেল তখন বোঝাগেল ভারত বিশ্বকাপ জিতছে ২৮ বছর পর। তা ও ভারতের নিজেদের মাটিতে। জয়ের আনন্দে তখন সকলে আত্মহারা বলটা গ্যালারির কোথায় গিয়ে পড়লো, কার হতে বলটা গেল, তার হদিস তখন আর কেউ রাখে নি। তবে ৯ বছর পর কেন খোঁজ সেই ইতিহাসের?
গত মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন মাহি। এরপরই এমসিএ-র অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সদস্য অজিঙ্কা নায়েক এমসি-এর কার্যনির্বাহী সংস্থার কাছে একটি চিঠি লিখে প্রস্তাব দেন, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের যে আসনে ধোনির ছক্কা উড়ে গিয়ে পড়েছিল, সেই আসনটিকে ধোনির নামে নামাঙ্কিত করা হোক। ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এই সম্মান তাঁকে এমসিসি তাঁকে দিতেই পারে। এমনকি সেই আসনটিকে স্থায়ীভাবে তাঁর নামে উৎসর্গও করা যেতে পারে। প্রস্তাবটি পাওয়ার পর নড়চড়ে বসে এমসিএ এবং প্রস্তাবটিকে গ্রহণযোগ্যও মনে হয়েছে তাঁদের কাছে।

অজিঙ্কা নায়েক লিখেছেন, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের সঙ্গে ধোনির সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের কিন্তু সেই দিনের সেই মুহূর্তটাকে স্মরণ করে রাখার জন্য আমরা অনন্য উপায়ে আসনটাকে রঙ করতে পারি, সাজাতে পারি। এমনকি মুহূর্তটাকে সম্মান জানাতে আসনটাতে বিশেষ কিছু শব্দ ব্যবহার করে একটা নামফলকও রাখতে পারি।
এইখানেই গাভাস্করের স্মরণাপন্ন হয়েছে এমসিএ। জানা গেছে, এমসিএ ব্লকের ২১০ নম্বর আসনে সেদিন ধোনির সেই ছক্কাটি আছড়ে পড়েছিল। দর্শকাসনে যিনি বসেছিলেন তিনি গাভাস্কারের পরিচিত। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সেই ভদ্রলোক শুধু বল নয়, বলের সঙ্গে সেই দিনের টিকিটটিও ল্যামিনেট করে তাঁর ঘরের শোকেসে রেখে দিয়েছেন। এখন গাভাস্করের স্মরণাপন্ন হয়েছে এমসিএ যাতে বলটা পুনরোদ্ধার করে তাঁদের হেপাজতে দেওয়া হয়।
তবে এ ঘটনা নতুন নয়। এতদিন ভারতের বহু খেলোয়াড়ের নামে প্যাভিলিয়নের নাম করা হয়েছে। কিন্তু একটা বিশেষ আসন কোনও খেলোয়াড়ের নামে এই প্রথম। তবে বিশ্ব ক্রিকেটে এই ধরণের ঘটনা আগে ঘটেছে। ১৯৯৩ সালে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সাইমন ও’ডনেলের ১২২ মিটার লম্বা ছক্কাকে সম্মান জানাতে ওই ছক্কাটি যে আসনে পড়েছে, সে আসনকে হলুদ রঙে রাঙানো হয়েছে। ২০১৮ সালে মেলবোর্ন স্টেডিয়ামের তৃতীয় সারিতে একটা আসন লাল রং করেছিল বিগ ব্যাশের দল মেলবোর্ন রেনেগেডস, ওই ম্যাচেই রেনেগেডসের হয়ে শেষবার মাঠে নামা ব্র্যাড হজের ৯৬ মিটার লম্বা ছক্কা ওই আসনে আছড়ে পড়েছিল। নিউজিল্যান্ড সেই সম্মান জানিয়েছে গ্র্যান্ট এলিয়টকে। অকল্যান্ডে ২০১৫ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এলিয়টের ছক্কাতেই নিশ্চিত হয়, প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে যাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। সেই ছক্কার স্মরণে ছক্কাটি যে আসনে পড়েছে সেখানে একটা নামফলক বসানো হয়েছে। তাই ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার নুয়ান কুলাসেকারাকে ছক্কা মেরে ইতিহাস গড়া ধোনির নামটাও এবার যোগ হতে চলেছে এই তালিকায়।