জনৈক মায়ের আবদার-ডাক্তারবাবু কোন হেল্থ ড্রিংক্সটা খাওয়াই বলুন তো। বাচ্চাতো কিছু খেতে চায় না। ইদানীং হেল্থ ড্রিংক্স-সহ প্যাকেট জাত খাবারের ব্যাপক মনমোহিনী বিজ্ঞাপনী প্রচার চলছে। সুন্দর মোড়কে ভরলেই খাবারের পুষ্টিগুন বেড়ে যায় না।বরং ঘরের তৈরী খাবারই পুষ্টিকর।বাস্তবে ২৩ বা ৪৬ টি খাদ্যপ্রাণ বা একস্ট্রা ক্যালসিয়াম শরীর গ্রহন করে কি? এই প্রশ্ন আমাদের মনে জাগে না। আবার মেয়েদের, বাচ্চাদের ও বৃদ্ধদের জন্য খাবারের শ্রেনী বিন্যাস বেশ হাস্যকর শোনায়। আচ্ছা নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য বলতে আমরা কি বুঝি। যে খাবার রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, আগাছা নাশক, কৃত্রিম রং, হর্মোন প্রয়োগ না করে আঞ্চলিক ভাবে উৎপাদিত হয়। অবশ্যই এতে কোন জীবাণু ও ছত্রাক, ভারী ধাতু-সীসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, কোবাল্ট, ক্রোমিয়াম ও আর্সেনিক ইত্যাদি থাকবে না। খাদ্য ফসল হিসেবে জিন পরিবর্তিত শস্য যেমন ভিটামিন এ সমৃদ্ধ গোল্ডেন রাইস, বিটি বেগুন, ভুট্টা, আলু ইত্যাদিও নিয়ে বহু বির্তক আছে। খাবার থেকে এ্যালার্জ্জী যেন না হয়। সেই সঙ্গে খাবার জলটাও বিশুদ্ধ হওয়া চাই। কিন্ত খাবার জল যেন প্লাস্টিকের বোতলে না রাখা হয়। মানুষের খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলেই খাবারটাও নিরাপদ ও পুষ্টিকর হবে এমনটাও নয়। এখানে খাবার বলতে মানুষ ছাড়া গৃহপালিত প্রাণী ও অনান্য প্রাণীকূলের কথা বলা হয়েছে।
এই বছরই ৭ই জুন প্রথম পালিত হয়েছে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস। শ্লোগান হল—“খাদ্য নিরাপত্তায় প্রত্যেকের দায়িত্ব”। এর উদ্ধেশ্য হল জনসাধারণকে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে অবহিত করা। নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার অধিকার সবার। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৭ সালের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে গোটা বিশ্বে প্রায় ৮২ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। ভারতে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জলের সুযোগ নেই। পেট খারাপ, জন্ডিস, আমাশা ইত্যাদি জল বাহিত রোগের স্বীকার বহু মানুষ। বিশেষত শিশুরা। রাজস্থানে পানীয় জল আনার জন্য বাড়ির মহিলাদের দৈনিক ৪ কিমি হাটতে হয়। শুধু কি তাই? খাবার থেকেই ক্যানসার সহ বহু জটিল রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
নিরাপদ পুষ্টিকর খাবারই মানুষকে রোগ মুক্ত রাখে এবং চিকিৎসা খরচ কমায়। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার অধীনে কোডেক্স আলিমেনটারিয়াস সব ধরনের খাবারের মান নির্নয়ক একটি বিশেষ সংস্থা। ফসলে কীটনাশকের সহনীয় মাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে গ্লাইফোসেট আগাছানাশক ৩০ মিগ্রা/কেজি দানাশস্যে, ২০০ মিগ্রা/ কেজি মুগ জাতীয় গোখাদ্যে, আখের গুড়ে ১০ মিগ্রা/কেজি ইত্যাদি। এই মাত্রাটাই নিরাপদ কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন হল উঠেছে। খাবারে বিভিন্ন কীটনাশকের মিলিত অবশেষ থাকে, সেক্ষেত্রে মাত্রা কি হবে এই নিয়ে অনেক গবেষণার প্রয়োজন। দাবী উঠেছে খাবারে কীটনাশকের অবশেষের পরিমান কেন শূন্য হবে না।

যখন খাবারটাই আমাদের বড় শত্রু, খাবার থেকেই যত রোগভোগ। কিভাবে নিরাপদ খাবার পেতে পারি?
১) জৈব উপায়ে উৎপাদিত ফসল খাওয়া, অসময়ের ফসল না খাওয়াই ভালো। কার্বাইডে পাকানো ফল, রং করা সবজি, বরফের মাছ, প্রসেসড মাংস যথা সম্ভব পরিহার করা। অসময়ের ফুলকপি এবং টমাটো, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ ও পটল কম খাওয়া বা না খাওয়া। এই সব ফসলে প্রচুর কীটনাশক ব্যবহার হয়।
২) দেশী লাল ও কালো চাল খাওয়া অভ্যাস করা। সরু চকচকে চাল মানে পুষ্টিকর চাল নয়। সুস্বাদুও নয়। সেই সঙ্গে প্রাতরাশে মুড়ি, টক দই ও চিড়ে, মুড়কি, রুটি, ইডলি খাওয়ায় কথা ভাবতে পারেন। কৃত্রিম রঙ ও তবক দেওয়া খাবার, চিনি ও কৃত্রিম চিনির মিষ্টি, আইসক্রিম, অতিরিক্ত পোলট্রির মাংস ও ডিম, ঠান্ডা পানীয় বর্জন করা।
৩) থার্মোকল ও প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার না করা, প্লাস্টিকের কাপে চা বা গরম কিছু না খাওয়া, খবরের কাগজে খাবার প্যাক না করা এবং না খাওয়া। রান্নার পাত্রটাও লোহার, মাটির হলে ভালো হয়। রান্না করার তাপমাত্রাও সঠিক হওয়া চাই নাহলে সংক্রমনের ভয় থাকবে।
৪) বাড়ির ছাদে ও বারান্দায় টবে চাষ করতে পারেন লংঙ্কা, উচ্ছে, লাউ, কুমড়ো, টমাটো, বেগুন, মূলো, বরবটি, পুঁই, পালং, ধনে পাতা। এটা যথেষ্ট আনন্দের।
৫) সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও স্বার্থত্যাগের মাধ্যমেই এই পৃথিবী নবজাতকের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
৬) বির্তকিত নন স্টীক প্যান, মাইক্রোআভেন ব্যবহার না করা। বিদেশের প্রসেসড ফুড না খাওয়া, বিদেশ থেকে আমদানী করা খাবার, ভোজ্য তেল ইত্যাদি ও দেখে শুনে ব্যবহার করতে হবে। খাবারে সন্দেহজনক কিছু থাকলে তা পরিহার করা।