সেই শৈশবের দিন গুলোর কথা মনে পড়ে? যখন মা বলতেন ওই চাল’তো আয় দেয় না অথবা ভাত বাড়ে না। কেউ ভাবতেন চালের সংখ্যা যদি এক হয় তাহলে ভাত বাড়ে কি করে? আসল ব্যাপারটা তা নয়। এক কুনকে ভর্তি মোটা চালের থেকে সরু চালের সংখ্যা বেশী।ভাত হওয়ার সময় জল শোষন করে বেটে চালের থেকে মাঝারি চাল লম্বায় বেশী বাড়ে। কোন একটি চালে বাড়ির সবার পেট ভরত, আবার অন্য কোন সমপরিমান চালে তা হত না।অবশ্যই পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে। সব নতুন চালই আয় দেয় না। কিছু দেশী চালের ফলন কম। গ্রামে বেশী ফলনের আধুনিক চালের থেকে ওই বিশেষ চালই বেশী আয় দেয়। পেটে অনেকক্ষন থাকে।

ইদানিং রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিয়ে আধুনিক জাতের ধানের চাষ হচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবে সার ও কীটনাশক বিষের অবশেষ চালে থেকে যাচ্ছে। ভাতের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। শিশুরাও বিষের স্বীকার। আসলে চালে ও অনান্য ফসলে কীটনাশক-অবশেষের একটা নির্ধারিত মাত্রা থাকে। মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই তা বিষাক্ত খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। আমাদের দেশের রপ্তানীযোগ্য বাসমতি চালে বেশী মাত্রায় কীটনাশক উপস্থিতি ধরা পড়ে। ফলে চাল আমেরিকা, ইউরোপ ও ইরানে ওই চালের রপ্তানীতে অসুবিধা হয় ২০১০ সালে। বর্ধমানের জনৈক কৃষকের গোবিন্দভোগ চাল জার্মানীতে রপ্তানী করা সম্ভব হয় নি। ২০১৪ সালের কথা। কৃষক নিজে জৈব প্রথায় চাষ করেছিলেন। পাশের ক্ষেতের প্রয়োগ করা কীটনাশক ওই কৃষকের চালে নিজের অজান্তে সংক্রামিত হয়। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ধান ক্ষেতে আগাছা নাশক প্রয়োগ। শ্রমিকের অভাব ও দ্রুত বেশী লাভের আশায় অনেকেই আগাছা নাশক প্রয়োগ করছেন। ব্যাপক বিজ্ঞাপনও দেওয়া হচ্ছে। কিছু আগাছানাশক ধানে ও সবজিতে প্রয়োগ করার কথা নয়। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে গ্লাইফোসেটের মত বিষাক্ত আগাছানাশক ধানের জমিতে চাষের আগে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে মাটির জীবানু, কেঁচো ও ব্যাঙের উপর মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বর্ষায় ওই দূষিত জল গড়িয়ে অন্যত্র খাল, বিলে পড়ছে। সেখানে জন্মানো মাছ, ফসল ও উদ্ভিদে অবশেষ থেকে যাচ্ছে। তবে এই নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা রাজ্য ওই আগাছানাশকের সীমিত ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে মোট ব্যবহৃত কীটনাশকের ১৫% ধানে ব্যবহার করা হয়। সেটা বেশীর ভাগই অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রয়োজনীয়। সব রাজ্যেই কৃষিবিভাগ বিষের অপব্যহার রুখতে সুসংহত রোগ-কীটনিয়ন্ত্রন ব্যবস্থাপনা চালু করেছে, চলছে কৃষক প্রশিক্ষণ। এতে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে।

গোটা পৃথিবী জুড়েই কীটনাশকের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। জৈব কৃষি ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। কীটনাশকের কারনেই ক্যানসার-সহ বহু রোগের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের রোগভোগ বেড়েছে।
সাবেক দেশী ধান চামরমনি, ঝিঙেশাল, দুধেরসর, বালাম, দাদখানি, গোবিন্দভোগ, সীতাশাল, কালোমোটা, দোরাঙী ইত্যাদি ধানে কোনও সার ও বিষ লাগে না। চালও সুস্বাদু। তবে সরু চাল হলেই সুস্বাদু হবে এমন নয়। অনেক দেশী ধানের ফলন রাসায়নিক সার বিষ দিয়ে আধুনিক ধানের ফলনের সমান। চাষের খরচও কম। যেমন কেরালা সুন্দরী, বহুরূপী, কেশবশাল, তালমুলি ইত্যাদি। আবার দুধেরসর, বালাম, চমৎকার, জয়প্রকাশ ধান, এইচএমটি ইত্যাদি সরু চালের ফলন ভালোই, বাজারে দামও বেশী। খেতেও ভালো। সুতরাং ওই চালে অর্থনৈতিক ও প্রকৃতিগত লাভও বেশী। কোনও বিষ ও সার লাগে না তাই চালে কীটনাশক বিষের অবশেষ থাকার সম্ভাবনাও নেই। প্রকৃত অর্থে পুরোনো চাল ভাতে সত্যি বাড়ে। চিকিৎসা ব্যয় কমে। তাছাড়া বিভিন্ন লাল ও কালো চাল অধিক পুষ্টিকর। আবার অনেক চাল আছে যেমন দোরাঙী, কালোমোটা, কেলাশ, ষাটিয়া, অগ্নিবান ইত্যাদি চালের ভাত খেলে পেটে অনেকক্ষন থাকে। অনেক চাল একাহারী মানুষদের জন্য উপযোগী। রাজ্য কৃষি বিভাগের অধীন ফুলিয়ার কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৭ বছর ধরে জৈব কৃষির কাজ চলছে। সেখানে প্রায় ৪০০ রকমের দেশী ধান সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ করা হচ্ছে। ১৫টি জেলায় কৃষকদের নিয়ে দেশী ধানের প্রচার ঘটানোর কাজ চলছে। চাষীরা সেই পুরোনো চালে ফিরেছেন বহু জেলাতেই।