বর্ধমানের মহারাজা তিলকচন্দ্র কালনার সমাজ বাড়ির সমানে একটি দীঘি প্রতিষ্ঠার জন্য সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন৷ তার মধ্যে বাংলাদেশের বরিশাল থেকে এসেছিলেন রামরাম (ভট্টাচার্য) তর্কসিদ্ধান্ত৷ উপস্থিত পণ্ডিতদের পরাস্ত করার পর তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তিলকচাঁদ তাঁকে কালনার শ্যামরাইপাড়ার বিঘা তিনেক জমি ও বার্ষিক বৃত্তি মঞ্জুর করেছিলেন৷ রামরাম তর্কসিদ্ধান্তের পুত্র কালিদাস সার্বভৌম৷ তাঁর পুত্র তারানাথ, পরিবারের ভট্টাচার্য উপাধির জন্য তারানাথদের বাসস্থান কালনার শ্যামরাইপাড়া ভট্টাচার্য পাড়া বলেও পরিচিত৷
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ইবি কাউয়েল সাহেব তাঁকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘Living Encyclopedia of Sanskrit Literature’ বলে৷ তাঁর রচিত সংস্কৃত ভাষার অভিধান ‘বাচস্পত্য ’ আজও পৃথিবীর সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় অপরিহার্য বলে পরিগণিত৷ তাঁর তৈরি বাজার নিয়ে লং সাহেব লিখেছিলেন—‘Culna (Kalna) is noted for the great trade, being the port of the burdwan district, the bazar has 1000 shops, the houses are chiefly of-bricks. Great quantities of rice brought from merchants of Rangpur, Dewanganj, Jaffirganj are here stored up, grain, silk and cotton also from a large staple.’একাধারে অগাধ পাণ্ডিত্য , সমাজ সংস্কারক, অন্য দিকে, সফল ব্যবসায়ীর সমাহার হলেন তারানাথ তর্কবাচস্পতি৷
কালনায় যখন তাঁর একাধারে পণ্ডিত এবং ব্যবসায়ী হিসেবে খ্যাতি মধ্যগগনে, ঠিক সেই সময়েই তারানাথের জীবনে এসেছিল চরম মোড় যা তাঁকে ভারতের পণ্ডিত সমাজের কাছে বিশেষ ভাবে পরিচিতি এনে দিয়েছিল৷ ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের ব্যাকরণ শিক্ষকের পদ খালি হলে ওই পদের জন্য উপযুক্ত পণ্ডিত নির্বাচনের দায়িত্ব বর্তেছিল পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উপর৷ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ওই পদে তারানাথ কে সম্মত করতে পায়ে হেঁটে কালনায় এসেছিলেন৷ তার পর তাঁকে রাজি করিয়ে ফিরেছিলেন৷ ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে তারানাথ ৯০টাকা মাসিক বেতনে সম্মত হয়েছিলেন সফল ব্যবসাপত্তর ছেড়ে দিয়ে৷ সমাজ সংস্কারক হিসাবেও তারানাথের ভূমিকা ছিল অসাধারণ৷ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ , বিধবা বিবাহ প্রচলন , এবং নারী শিক্ষা প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল অন্যতম৷ বিদ্যাসাগর-পুত্র নারায়ণচন্দ্রের বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠানে সস্ত্রীক গিয়েছিলেন তারানাথ৷ ওই বিবাহে বিদ্যাসাগরের আত্মীয়রা নববধূকে বরণ করতে রাজি না হওয়ায় তারানাথ সহধর্মিনীকে দিয়ে নববধূকে বরণ করিয়েছিলেন৷

বিদ্যাসাগর মেলা
এরপর নারী শিক্ষার প্রসারে তিনি দ্বিতীয়বার কালনায় আসেন ১৮৫৫ সালে। তাঁর ডায়েরির বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি ২৫ ডিসেম্বর ১৮৫৫ সালে বর্ধমানে এসেছিলেন, সেখানে তাঁর এক পূর্ব পরিচিতের বাড়িতে ছিলেন। সেখানে তিনি নারী শিক্ষা বিস্তারে একটি কাঁচা পাঠশালা তৈরি করেন। ২৬ তারিখ বিকেলের ট্রেনে বর্ধমান থেকে বৈঁচিতে আসেন। সেখান থেকে হেঁটে হাটনি গ্রামে আসেন। সেখানে তিনি সম্পন্ন চাষী ও কুমোরদের আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেখানে গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি কলুপুকুরে একটি কাঁচা পাঠশালা তৈরি করেন মুসলমানরাও তাঁকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এরপর ২৭ তারিখ তিনি আসেন বৈদ্যপুরে। এখানে তিনি নন্দীদের বাড়িতে থাকলেন। গ্রামবাসীদের সহায়তায় এখানে পাঠশালা গড়ে তুললেন। ২৮ ডিসেম্বর তিনি এলেন দোলতলায় কিন্তু এখানকার মানুষেরা নারীশিক্ষা প্রসারে তাঁকে সাহায্য করলেন না। ব্যার্থ হয়ে তিনি এলেন বাদলা গ্রামে এই অঞ্চলের মানুষেরা কিন্তু তাঁকে ভীষণভাবে সাহায্য করলেন। গড়ে উঠলো বিদ্যালয়। ৩০ ডিসেম্বর তিনি এলেন কালনায় তাঁর বন্ধু তারানাথ বাচস্পতির বাড়িতে। ওখানে তারানাথ সংস্কৃত টোল করেছিলেন ঠিক কিন্তু বিদ্যালয় নেই চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হলেন। শেষে সিঙ্গারকোনে। সেখানেও কিন্তু তিনি সেই রকম আশার আলো দেখতে পেলেন না। ব্যার্থ হয়ে কলকাতা ফিরে এলেন।
কালনায় বিদ্যাসাগরের এই পদার্পণকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আজ সিঙ্গারকোণ ঐকতান সভাগৃহে বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হলো। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে আগামী ২৭, ২৮, ২৯ ডিসেম্বর এখানে বিদ্যাসাগর মেলা করা হবে। সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. বাণীব্রত গোস্বামী ও ড. প্রিতম দাস সভায় পৌরোহিত্য করেন প্রণব রায়।