এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের থিম হল বিট এয়ার পলিউশন অর্থ্যাৎ বায়ু দূষণ প্রতিরোধ করুন। লক্ষ করেছেন আগের মত কলকাতা শহর আর নেই। গ্রাম থেকে শহর আসা মানুষ বোঝেন গ্রামের বাতাসের সঙ্গে শহরের বাতাসের পার্থক্যটা। ইদানিং বেড়েছে মানুষের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা। আমার সবাই বায়ু দূষণের কম বেশী স্বীকার। শীতকালে আরো বেশী সমস্যা হয়। ১২২ বছর আগে বিজ্ঞানী আরেনিয়াস দাবী করেন মানুষের দ্বারা উৎপাদিত কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে এবং ২.৫ থেকে ৩ গুন বৃদ্ধি পেলে মেরু প্রদেশে ৮-৯ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। এই ভাবে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান বাড়লে তুষার যুগ আসার আর সম্ভবনা নেই। পৃথিবী কোনদিনই একটানা ১০০-২০০ বছর বরফের তলায় থাকবে না। ইউরোপে অনেকেই আনন্দ পেয়েছিলেন। বরফ গলে যাওয়ার কারনে চাষের এলাকাও বাড়বে। এখন বিভিন্ন কারনে বায়ু দূষণ বেড়েছে। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড পরিমান ০.০৩% থেকে প্রায় ০.০৪% হয়েছে। এই গ্যাস অন্য গ্রীন হাউস গ্যাসের থেকে বেশী তাপ শোষণ করে এবং তাপ বেশী সময় ধরে রাখে। কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়া মূলত রয়েছে মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ও ওজোন। আবার তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভূপৃষ্ঠে ওজোনের পরিমাণ বাড়ে। মানুষের জন্যই ব্যাপক আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়েছে। বায়ু দূষণের জন্য পৃথিবীতে বছরে ৪০,০০০ হাজার মানুষ মারা যায়। প্রায় ৯১% মানুষ বায়ু দূষণের স্বীকার, অন্য কথায় প্রতি ১০ জনে ৯ জনই দূষণের দ্বারা আক্রান্ত।

উদ্ভিদ জগৎ ও কৃষিতে এই দূষণের প্রভাব পড়তে বাধ্য। পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে, কম খরচে ও কম সময়ে দ্রত ফসল কাটার দরকার। এর জন্য ইদানিং বৃহৎ কম্বাইন হারভেস্টর মাঠে নামানো হচ্ছে। এর ফলে খড় আটি বাঁধা যায় না। পরবর্তী ফসলের জন্য জমি তৈরী করার তাগিদে জমিতেই পড়ে থাকা খড়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ভারতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা বলছে ভারতে ৬২০ মিলিয়ন টনের বেশী ফসল কাটার অবশিষ্ট তৈরী হয় এবং এর মধ্যে পাঞ্জাবের ২০ মিলিয়ন টনের ৮৫% মাঠেই পোড়ানো হয়। ফলে কার্বন ডাই অক্সাইডের সঙ্গে প্রচুর নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড ও আমোনিয়া বাতাসে মিশে যায়। খড় পোড়ানোর ফলে উদ্ভিদ খাদ্য নাইট্রোজেন, ফসফোরাস, পটাশ ও সালফার নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয় এর ফলে মাটির অনুজীব ও কেঁচো মারা যায়, মাটির রস ও জৈব পদার্থের পরিমানও কমে যায়। অগ্রহায়ন মাসে দিল্লীর আকাশটা ধোঁয়ায় ভরে থাকে।
২০১৪ সালের এক পরিসংখ্যানগত গবেষনায় দেখা যাচ্ছে ১৯৮০-২০১০ সালের মধ্যে ভারতে গমের ৩৬% ও ধানের ২০% বেশী উৎপাদন হতে পারত। বায়ু দূষণ ও ভূপৃষ্ঠে ওজোনের পরিমান বৃদ্ধি এর জন্য দায়ী। গম, ধান, ভুট্টা ও সয়াবীনের ৫-১২% ফলনও কমে যায়। এখন রোগ পোকার আক্রমনের থেকেও বায়ু দূষনের জন্য উৎপাদন ও পুষ্টি হ্রাস অনেক বেশী উদ্বেগের। কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য চাল, গম, ভুট্টা ও সয়াবীনের লোহা, জিঙ্ক ও প্রোটিনের পরিমাণ কমে যায় গড়ে ৩-১৭ %। বায়ু দূষণের কবলে মানুষ সহ সমস্ত জীবকূল। আমাদের করনীয় কী? খাদ্য উৎপাদন কমে গেল মানব সভ্যতাই বিপন্ন। ভবিষৎ প্রজন্ম ও পরিবেশকে রক্ষার জন্য চাই স্বদর্থক নীতি। সামান্য হলেও সবাইকে কিছু না কিছু স্বার্থত্যাগ করতে হবে। দ্রুত বড়লোক হওয়ার বাসনা ও ভোগবাদী মনোভাব যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। জলাভূমি বুজিয়ে বহুতল বাড়ি নির্মান, জীবাশ্ম জ্বালানীর গাড়ির ব্যবহার কমানো, কারখানার দূষণ কমানোর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন, প্লাস্টিক পোড়ানো ও ব্যবহার বন্ধ করা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমিয়ে জৈব চাষ, বৃক্ষ রোপন করা, ফসলের অবশেষ পোড়ানো বন্ধের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করা। ফসলের অবশিষ্ট পচিয়ে ভালো সার করা যেতে পারে। অনান্য প্যাকেজিং শিল্পেও ব্যবহার করা যাবে। সর্ব্বপরি উপযুক্ত কঠোর শাস্তি বিধি প্রবর্তন করতে হবে।