পাঠকের করনীয়: উপরের তালিকাটি পড়ে পাঠক নিশ্চয় ঘাবড়ে যাবেন। শহরে খাবারটাই আমাদের বড় শত্রু, খাবার থেকেই যত রোগ ভোগ। শহরের মানুষকে দ্রুত ও বেশী পরিমানে খাবার সরবরাহ করাই হল আধুনিক রাসায়নিক কৃষির একটা বড় উদ্দেশ্য। তবে এটা বাস্তব, প্রাথমিক ভাবে ধাক্কা লাগলেও এর থেকে পরিত্রান পাওয়ার উপায় আছে। সবাই তো আর নিজের ফসল ফলাতে পারবেন না। প্রবন্ধ থেকে পাঠক একটা ধারনা পাবেন তবু সংক্ষেপে বলা যেতে পারে।
সেগুলি হল—
১) খাদ্যাভাসের সামান্য পরিবর্তন করতে হবে। দেশজ ফসলের উপর জোর দেওয়া। সারা বছর নানা ধরনের সবজি পাওয়া যায়। অসময়ের ফসল না খাওয়াই ভালো। সবজি হিসাবে ফুল অনেক রয়েছে। মোচা ছাড়া বক ফুল, কুমড়ো ফুল, সজিনা, বাঁদরলাঠি, গাঁদা, যুক্তি ফল (বসন্তকালে হয়) ও পরিষ্কার জলে জন্মানো কচুড়ি পানা ইত্যাদি। কার্বাইডে পাকানো ফল, পোল্ট্রির ডিম, কয়েকদিনের বরফের মাছ, প্রসেসড মাংস যথা সম্ভব পরিহার করা।
২) টমাটো, বেগুন, ঢ্যাড়শ ও পটলে প্রচুর কীটনাশক ব্যবহার হয়। এই ফসল গুলি কম খাওয়া যেতে পারে। সবজি কেটে সামান্য বেকিং পাউডার পটাসিয়াম পারমাঙ্গানেট জলে দিয়ে কাটা সবজি ২০-২৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। বেশীর ভাগ কৃষি বিষ ক্ষারীয় দ্রবনে দ্রবীভূত হয়। ফলে অনেকটা বিষ বেরিয়ে যায়। এতে জলে দ্রাব্য ভিটামিন বেরিয়ে গেলেও কিছুটা বিষ মুক্ত হয়। কেউ কেউ পোকা বেগুন কিনে থাকেন কারন ওতে হয়ত কৃষক বিষ দেয়নি বা অল্প দিয়েছেন তাই পোকা লেগেছে। বাস্তবে এটাও হতে পারে আবার বিষ দেওয়ার ফলে পোকা প্রতিরোধ শক্তি এতটাই জন্মেছে বারংবার বিষ দেওয়ার পরও পোকা লাগেছে। বেগুন নিয়ে কৃষি বিষের উপস্থিতির পরীক্ষা করলেই জানা যাবে, তবে সেটা অনেক ব্যায় সাপেক্ষ। জৈব খাদ্যের উপর জোর দেওয়া। জিন শস্যের ভয়াবহতা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

৩) ঢেঁকি ছাটা বা হাস্কিং মিলের পালিশ না করা লাল দেশী চাল খাওয়া অভ্যাস করা। সেই সঙ্গে প্রাতরাশে মুড়ি, টক দই ও চিড়ে, মুড়কি, রুটি , ইডলি খাওয়ায় কথা ভাবতে পারেন। মাঝে মধ্যে পৃথিবীর সবথেকে পুষ্টিকর চাল কালাভাতের চালগুড়োর তৈরী রুটি, খিচুড়ি, পোলাও, পায়েস, ঘি ভাত খাওয়া যেতে পারে। অসুস্থ মানুষের রোজই খাওয়া দরকার। শিশুরাও ছাতুর মত করে খেতে পারে।
৪) রঙ ও তবক দেওয়া খাবার, মিষ্টি, আইসক্রিম, অতিরিক্ত মাংস ও ডিম, ঠান্ডা পানীয় বর্জন করা।
৫) থার্মোকল ও প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার না করা , প্লাস্টিকের কাপে চা বা গরম কিছু না খাওয়া।
৬) বির্তকিত নন স্টীক প্যান, মাইক্রোআভেন ব্যবহার না করা।
৭) বিদেশের প্রসেসড ফুড না খাওয়া, খাবারে সন্দেহজনক কিছু থাকলে তা পরিহার করা।
৮) স্টীলের রান্নার পাত্র ছেড়ে লোহার ও মাটির পাত্রের ব্যবহার।
৯) বাড়ির ছাদে ও বারান্দায় টবে কিছু সবজি চাষ করা — বিশেষত লংঙ্কা, উচ্ছে, লাউ, কুমড়ো, টমাটো, বেগুন, মূলো, বরবটি,পুঁই, পালং,ধনে পাতা। এর থেকে সারা বছরই কিছু না কিছু বিশুদ্ধ সবজি পাবেন। কিউবাতে বাড়ির ছাদে চাষ করা বাধ্যতা মূলক। কিউবাতে পুরো দেশেই জৈব উপায়ে চাষ হয়। স্কুল কলেজ, মিউনিসিপালিটি সব জায়গায় জৈব চাষ হচ্ছে। ইদানিং বহু দেশেই ছাদে চাষ ( রুফ টপ গার্ডেনিং) বাড়ছে। মাটি ছাড়া শুধু মাত্র জল দিয়েই সবজি চাষ করা যায় তার সংগে মাছ চাষ ( আকোয়াপনিক্স /হাইড্রোপোনিক্স)। ছাদে যাতে চাপ না পড়ে সেই জন্য ছোবড়ার ( কয়ার পিথ) হালকা মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে। এটার একটা নান্দনিক দিকও আছে, প্রত্যক্ষ করা যায় কি ভাবে কি কি পরিচর্যার মাধ্যমে সবজি নিজের চোখের সামনে বড় হচ্ছে। শিশু সহ শহরের সকলের কাছে এটা যথেষ্ট আনন্দের।
১০) সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, এটা গতানুগতিক পথ ছেড়ে অন্য ভাবনায় দিকে যাওয়া বলেই প্রথম প্রথম কিছু মানুষ অবজ্ঞার চোখে দেখবেন। পরিতাপের বিষয় এই নিয়ে এখনো কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা তৈরী হয় নি। চিকিৎসক সমাজ যদি এগিয়ে এসে বলেন বিশুদ্ধ জৈব খাদ্যই সুস্থ থাকার চাবি কাঠি, গন মাধ্যমে ভূল বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান, সবুজ বিল্পবের লীলাক্ষেত্র পাজ্ঞাবের ভাতিন্ডার গ্রামে ঘরে ঘরে ক্যানসারের কথা তুলে ধরেন, রাসায়নিক কৃষির থেকে মানুষের অসুস্থতা বাড়ছে তাহলে অনেকটাই সমাজের সুস্থ পরিবর্তন হতে পারে। সেই সঙ্গে সাধারন স্বাস্থ্য বিধি মানা অযথা অবৈজ্ঞানিক ঔষধ না খাওযা ও অবৈজ্ঞানিক টীকা না নেওয়ার কথাও বলা প্রয়োজন। হাসপাতাল,সরকারী কার্যালয়ের স্কুল কলেজের পড়ে থাকা জমিতে সামান্য হলেও কিছু চাষ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। চাষ করাটা যে নিকৃষ্ট পেশা নয় তা চাষ করেই সচেতন করতে হবে। সুস্থ থাকাটা শুধু চিকিৎসকের উপর নির্ভর করে না। পরিবেশ, সুখাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, পরিমিত ব্যায়াম ও জীবনযাত্রার উপর নির্ভরশীল। এর জন্য সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন যদি এই পৃথিবীটাকে নবজাতকের জন্য বাসযোগ্য রাখতে হয়।