ভারতীয় ক্রিকেটে সচিন বানিয়েছেন রমাকান্ত আচরেকর। এখনও স্যারের নাম নিলেই মাথা নিচু করেন সচিন। তাঁর পরিবর্ত নাকি বিরাট কোহলি। মাহিকে এমএসডি বানিয়েছিলেন স্কুলের গেম টিচার কেশব ব্যানার্জি। ধোনির পরিবর্ত আবার ঋষভ পন্থ। সেও কোচ তারক সিনহার অবদান কতটা তা জানিয়েছে। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলে একটা শৈলেন মান্না আর তৈরি হবে না। কিন্তু শৈলেনকে মান্না বানিয়েছিলেন যিনি সেই সনাতন স্যার থেকেছেন লোক চক্ষুর অগোচরে। ১৩০ বছরের পুরনো স্কুল ব্যাটরা মধুসুদন পালচৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের সনাতন চাটুজ্জ্যেকে কোনওদিন ভুলে যাননি মান্না ‘দা’। কিভাবে স্যারের স্তুতি করবে ভেবে পেতেন না। মোহনবাগানের মতো বড় ক্লাবে খেললেও আজীবন স্যারের নাম নিয়েছেন।

১৯৪৮ লন্ডন অলম্পিকে খালি পায়ে সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে নামছেন শৈলেন মান্না।
দৃশ্য এক
১৯৮৮ সাল দুপুর বেলা। একটি অফিস টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে কলকাতা বিমানবন্দরে নেমেছি। কিন্তু টার্মিনাল বিল্ডিং থেকে বেরতেই রীতিমতো অপহরণ করা হল আমাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি গাড়িতে বসিয়ে সোজা নিয়ে যাওয়া হল শিয়ালদহের একটি হোটেলে। পরে বুঝলাম ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তারা কাণ্ডটা ঘটিয়েছেন। এই অপহরণের মজাটা হল, আমাকে কোনও মুক্তিপণ দিতে হবে না। উল্টে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময় ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলে আমি মুক্তি পাব। ঠিক হল, পরেরদিন সই-সাবুদ হবে।
তখনকার দিনের অধিকাংশ ফুটবলারই বাবা-মা, দীক্ষাগুরু, ছেলেবেলার প্রশিক্ষক বা পরিবারের বয়ঃজ্যেষ্ঠদের প্রণাম না করে তাঁদের আশীর্বাদ না নিয়ে সই করতে যেতেন না। আমিও বেঁকে বসলাম। সাফ জানিয়ে দিলাম যে বড়দের প্রণাম না করে আমি কোনওমতেই সই করতে যাব না। দীর্ঘ টালবাহানার পরে অনুমতি এল। ঠিক হল, আমি হোটেল থেকে সরাসরি বাড়িতে যাব তারপর একটি নির্দিষ্ট সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সই করতে যাব।
কিন্তু ইস্টবেঙ্গল কর্তারা বুঝতেই পারেননি যে পাখি উড়ে যাবে। সে বছর মোহনবাগানই খেলতে চেয়েছিলাম আমি। বাড়ির লোকেরাও তাই চেয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে দেখি মান্নাদা (শৈলেন মান্না) বসে আছেন। আর কালবিলম্ব না করে সোজা ছুটলাম সই করতে। অন্য দলের কর্তারা আমার নাগাল পাওয়ার আগেই আমি মোহন বাগানের অনুকূলে সই করলাম।

১৯৪৮ লন্ডন অলিম্পিকে টিমের সদস্যদের সঙ্গে চেয়ারে বসে ডানদিকে প্রথম শৈলেন মান্না।
দৃশ্য দুই
বাড়িতে সবাই আপাদমস্তক মোহনবাগানি। ছোট থেকেই তাই হাড়ে মজ্জায় মোহনবাগান শব্দটা ঢুকে গেছিল। দাদু ও কাকা (প্রদীপ চ্যাটার্জি) দুজনেই ফার্স্ট ডিভিশন খেলেছেন। ফলে বাড়িতে ফুটবল চর্চার একটা আবহ ছিলই। ছিল মোহনবাগান বলতে পাগল কিছু মানুষের সান্নিধ্য। ফলে শৈশবের সেই দিনগুলো থেকেই মোহনবাগানে খেলার একটা স্বপ্ন সযত্নে লালিত হতে থাকে সত্যজিতের মনে। সালটা ১৯৮৬, সকালবেলা। হঠাৎই বাড়িতে এসে হাজির শৈলেন মান্না। এসেই দাদুর ওপর চোটপাট। একি শুনছি কার্তিকদা, তোমার নাতি নাকি ইস্টবেঙ্গলে সই করছে? দাদুও সরাসরি বলে দিলেন, কি করবে, তোমরা কি ওকে অফার করেছ? ইস্টবেঙ্গল ডাকছে। সেখানে না করতে যাবে কেন? এরপর যদিও ইস্টবেঙ্গলে খেলা আর হয়নি। ওই বছরই প্রথম মোহনবাগানে সই করি।’ কাহিনি যিনি শোনালেন তিনি আর কেউ নন, মোহনবাগানের ঘরের ছেলে সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায়। খেলা ছেড়েছেন সেই ২০০০ সালে। তবে মাঠের সঙ্গে যোগাযোগটা থেকেই গেছে।

মোহনবাগান, ইষ্টবেঙ্গল দুই দলের দুই স্তম্ভ শৈলেন মান্না, আহমেদ খান।
দৃশ্য তিন
লন্ডন অলিম্পিকে খেলার জন্য আরও ২২টি দেশের মতো আবেদন করেছিল অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। এর মধ্যে নতুন ও খাটো শক্তির দলগুলোকে নিয়ে গঠন করা হয় প্রিলিমিনারি রাউন্ড। এই রাউন্ডে ভারতের খেলা পরেছিল সাবেক বার্মার (মিয়ানমার) বিপক্ষে। আরও চারটি দলের সঙ্গে তখনকার বার্মা নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সরাসরি মূল পর্বে খেলার সুযোগ পায় শৈলেন মান্না-তাজ মোহাম্মদদের ভারত। কোচ ছিলেন মোহনবাগানের সাবেক ডিফেন্ডার বলাইদাস চট্টোপাধ্যায়।
অলিম্পিকে অংশ নিতে ১৮ জন ফুটবলার নিয়ে লন্ডনগামী জাহাজে উঠেছিল ভারতীয় দল। মূল পর্বে মাঠে নামার আগে লন্ডনে পাঁচটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল ভারতীয় দল। এই পাঁচ ম্যাচে ৫ গোল হজমের বিপরীতে তাঁরা ৩৯ গোল করেছিল! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ভারতের বেশির ভাগ ফুটবলারই খেলেছেন বুট ছাড়াই। বড়জোর অ্যাঙ্কলেট পরে, ফুটবলে সেটি আসলে খালি পা-ই বোঝায়।
এরপর চলে এল মূল পর্বের লড়াই। ইস্ট লন্ডনের ইলফোর্ড শহরে সেদিন রচিত হলো ইতিহাস। ফুটবলের ময়দানে ফ্রান্সের মুখোমুখি হলো সদ্য স্বাধীন দেশ ভারত। তালিমেরান আওয়ের নেতৃত্বে সেদিন মাঠে নামা ভারতীয় একাদশের আটজনই ছিলেন খালি পায়ের ফুটবলার। ক্রিকেটফিল্ড স্টেডিয়ামে সেদিন এক অভিনব লড়াই দেখার প্রহর গুনছিলেন দর্শকেরা। বুট পরা বনাম বুটহীন ফুটবলারদের লড়াই। অথচ দুই দলের ফরমেশন একই ছিল ২-৩-৫। প্রথমার্ধে রেঁনে কুরবিনের গোলে প্রত্যাশামতোই এগিয়ে গেল ফ্রান্স। কারণ, প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা ভারত এই লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবেই ‘আন্ডারডগ’।
কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে ৭০ মিনিটে সমতায় ফিরল ভারত। আহমেদ খান ও ভজরাভেলুর দুর্দান্ত ওয়ান-টু থেকে পাওয়া পাসে গোল করেন সরঙ্গপানি রমন। ভারত ম্যাচটা জিতেই যেত যদি দু-দুটি পেনাল্টি মিস না করত! প্রথমটি মিস করেন ভারতের কিংবদন্তি ফুটবলার শৈলেন মান্না। পরেরটি তিনি নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েও মিস করেছিলেন। এর খেসারত দিতে হয় নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার এক মিনিট আগে। ৮৯ মিনিটে রেঁনে পেরসিলনের গোলে ম্যাচটা জিতে নেয় ফ্রান্স।
কিন্তু পুরো ৯০ মিনিট সমানতালে লড়াই করা ভারতীয় ফুটবলাররা জিতে নিয়েছিল অজস্র ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়। নাম না জানা একদল অখ্যাত ফুটবলারের ‘লড়াকু’ পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে তাদের সকলকে লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজকুমারী মার্গারেট। সে অনুষ্ঠানে প্রিন্সেস ভারতীয় দলের কাছে তাদের খালি পায়ে খেলার ব্যাপারটা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এবং দলের সেরা খেলোয়াড় মান্নার কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তবে ফেডারেশনের আর্থিক দৈন্যতার বিষয়টি আড়াল করে বিনয়ের সাথে মান্না জবাব দিয়েছিলেন, খালি পায়ে খেললে নাকি আরও নিখুঁতভাবে বল নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়! ফ্রান্সের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলা ডিফেন্ডার শৈলেন মান্নার পা-কে ‘মেড অব স্টিল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম। ১৯৫২ সালের হেলসিঙ্কি অলিম্পিক এবং ১৯৫১ আর ১৯৫৪ সালের এশিয়ান গেমসে ভারতের অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন শৈলেন মান্না।
১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে আগের সব সাফল্যকে ছাড়িয়ে যায় ভারতীয় ফুটবল দল। সেবারই প্রথমবারের মত অলিম্পিক ফুটবলের সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ভারত; কোয়ার্টার ফাইনালে ৪-২ গোলে তারা হারায় ইউরোপীয় দল অস্ট্রিয়াকে। তবে সেমিফাইনালে যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৪-১ গোলে পরাজিত হয় তারা। ফলে অল্পের জন্য ‘ব্রোঞ্জ পদক’ লাভের সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে দলটি। উল্লেখ্য, অলিম্পিকে ‘চতুর্থ স্থান’ অর্জন ভারতীয় ফুটবলে এখনও পর্যন্ত একটি মাইলফলক হয়ে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ম্যাচে দুই অধিনায়ক। ভারতের অধিনায়ক শৈলেন মান্না।
ময়দানে তাঁকে সবাই চিনতেন মান্নাদা বলে। শৈলেন মান্না, ফ্রি কিক স্পেশালিস্ট। ফুটবলে পা লাগালেই ম্যাজিক। ব্যাঁটরা কদমতলায় ১৯২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বরে জন্ম শৈলেন মান্নার। হাওড়ায় মামার বাড়িতে থাকার সময়, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ক্লাব ফুটবলে প্রবেশ করেন তিনি। তখন কলকাতা ফুটবলে হাওড়া ইউনিয়ন সেকেন্ড ডিভিশন ক্লাব। শৈশবে স্থানীয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে স্নাতক হন এবং জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায় কর্মজীবন শুরু করেন। বিবাহ করেন কুমিল্লা নিবাসী সহকর্মী আভাকে।
পরপর দুটি মরসুম হাওড়া ইউনিয়নে তাঁর দুরন্ত পারফরম্যান্স নজর এড়ায়নি তত্কালীন নির্বাচকদের। ১৯৪২ সালে তাঁর জায়গা হয় মোহনবাগান দলে। তারপর থেকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি ভারতীয় ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ডিফেন্ডারকে। পায়ের শটে এতোটাই জোর ছিল যে বিপক্ষের গোলরক্ষক রীতিমতো শঙ্কিত থাকতেন। তাঁর শটের জোর এতোটাই ছিল যে শোনা যায়, একবার তাঁর শটের বল ধরতে গিয়ে বিপক্ষের গোলরক্ষকের হাত ভেঙে গিয়েছিল। এরপর টানা ১৯ বছর মাঠ কাঁপিয়েছেন মান্নাদা।
শৈলেন মান্নার ফুটবল জীবন ১৯৬০-এ শেষ হলেও ফুটবল মাঠের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল চিরকালের। ময়দানে তিনি সকলেরই মান্নাদা। অতি মিশুকে এবং নম্র স্বভাবের মানুষটি মোহনবাগান ক্লাবের প্রশাসনের দায়িত্বেও ছিলেন। ১৯৭১-এ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান দেয়। গোষ্ট পালের পর তিনিই প্রথম ফুটবলার যাঁকে, পদ্মশ্রী সম্মান দেওয়া হয়। ২০০০ সালে তাঁকে সহস্রাব্দের সেরা ফুটবলারের সম্মান দেয় অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন। ২০০১-এ মোহনবাগান রত্ন সম্মান দেওয়া হয় মোহনবাগান ক্লাবের পক্ষ থেকে। আজীবন ফুটবলকেই ভালসবেসে গেছেন অমায়িক স্বভাবের মানুষটি। ভারতীয় ফুটবলের এই কিংবদন্তীর চিরবিদায় ঘটে ২৭ শে ফেব্রুয়ারি ২০১২ রবিবার রাত দুটোর সময় বিধাননগরের এক বেসরকারী হাসপাতালে। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৮। মৃত্যুর সময় তাঁর কাছে ছিলেন স্ত্রী আভা মান্না ও মেয়ে নীলাঞ্জনা মান্না।
স্যার কেমন আছেন। আশা করি পরিবার পরিজন নিয়ে অনেক ভালো আছেন এবং সুস্থ আছেন। জানি এখানে এই কথাগুলো বলা ঠিক হচ্ছে না। তারপরও বলছি। আমি আপনার লেখার অনেক বড় ফ্যান। কাজলদিঘী উপন্যাসটা আমি এখনও সময় পেলেই পরি। কিন্তু আপনি আর নতুন করে লিখছেন না। ওখানে কমেন্ট তো বন্ধ হয়ে আছে তাই এখানে লিখছি। স্যার আপনার কাছে বিনিত নিবেদন কাজলদিঘী উপন্যাস টা কি আবার কন্টিনিউ করবেন। এমন একটা জায়গাতে আটকে আছে পরের অংশ পড়ার জন্যে মন উতলা হয়ে আছে। প্রতিদিন একবার হলেও সাইটে ঘুরে আসি যদি নতুন পর্ব এসে থাকে এবং প্রতিদিন নিরাশ হয়ে ফিরে আসি। তাই স্যার আপনারা কাছে অনুরোধ করছি যদি আবার শুরু করেন তাহলে আমার মতে অনেকে একটু বিনোদন পাবে। আশা করি নিরাশ করবেন না।
মনির