সেই যে সুকান্ত লিখেছিলেন, ‘জালালাবাদের পথ ধরে ভাই/ ধর্মতলার পরে/ দেখবে ঠিকানা লেখা প্রতেকে ঘরে/ ক্ষুব্ধ এদেশে রক্তের অক্ষরে।’ জীবনের প্রতিটি দিন এই তরুণ কবি কাটিয়েছেন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে লালন করে। তাই দেশের সব প্রান্তে ক্ষোভের রক্তাক্ষর তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে লেখার যুক্তাক্ষরের মতো। এই ধর্মতলায় একদিন ওয়েলিংটনে পার্টির মিটিংয়ে যাবেন বলে একত্র হয়েছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত প্রমুখ। অগ্রজ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে সুকান্ত বলছেন, আমার কবিতা পড়ে আমার পার্টি কর্মীরা যদি আনন্দ পান তাহলেই আমি খুশি। কেননা একদিন এঁরাই তো বাড়তে বাড়তে দেশের অধিকাংশ হবে। এই দলবলই গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। হায়! সুকান্ত ভট্টাচার্য যদি আজকে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থা দেখতেন!
পূরণচাঁদ যোশী বলেছিলেন, শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা করা চলবে না। পার্টি কর্মীদের নাচ, গান, নাটক, ফিল্ম, সাহিত্য এসব ভালো করে জানতে হবে। সেই সময়ের সুকান্তও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পার্টি সংগঠনে। এর পাশাপাশি নানারকম লেখা প্রকাশে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, সুকান্ত যদি অকালে চির বিদায় না নিতেন সে ক্ষেত্রে যে কবিতাগুলি নিয়ে তাঁর কবিতাসমগ্র প্রকাশ হয়েছে তার অনেকগুলোই হয়তো বাদ যেতো। তবুও সুভাষের স্বীকারোক্তি সব কিছু নিয়েই সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বইগুলি বাংলাদেশের প্রায় ঘরে ঘরে স্থান পেয়েছে। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে দেওয়াল লিখন, রাজনৈতিক ইস্তেহার, সভাসমিতিতে বক্তব্য পেশ, পাড়ায় পাড়ায় সান্ধ্য জলসা— সর্বত্র আজও তাঁর প্রবল উপস্থিতি। বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন কিংবা ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/ পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি— এই সব পংক্তি আজও সব জায়গায় বাংলাভাষী মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ কবি। পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট মাতামহের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রিটের বাড়িতে তাঁর জন্ম।। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার (বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়া থানার উনশিয়া গ্রামে)।খুব অল্পবয়স থেকেই ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। তাঁর রচনাকর্মে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা গেছে। সেই সঙ্গে শোষণহীন এক নতুন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার বইয়ে ‘ঐতিহাসিক’ রয়েছে, ‘আর মনে করো আকাশে আছে এক ধ্রুব নক্ষত্র/ নদীর ধারায় আছে গতির নির্দেশ/ অরণ্যের মর্মর ধ্বনিতে আছে আন্দোলনের ভাষা/ আর আছে পৃথিবীর চিরকালের আবর্তন’। যে আদর্শের লড়াইয়ে সুকান্ত সব সময়ই যুক্ত, তার চেয়েও বোধহয় অরণ্যের মর্মরধ্বনি প্রাচীন। কবিতায় এই সব কথা আরেকটু বিস্তৃতভাবে বলার আগেই তো তাঁকে বিদায় নিতে হলো। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।