একেবারে আচমকা কোনো ইচ্ছে হলো আর তা পূরণও হলো, তখন আনন্দ শীর্ষসীমা ছোঁয়। অপরিসীম আনন্দে মোহাচ্ছন্ন মনকে বশে আনা বেশ কঠিন হচ্ছে—
হাতের নাগালেই প্রায় জেলা পুরুলিয়া। সে যে এতো মোহময়ী, তা জানা ছিল না। কয়েকদিনের আলাপ-সালাপে তিন বন্ধু মিলে পরিবারের সাথে আটজন মিলে রাতে ট্রেনে উঠে পড়েছিলাম। সারারাত আড্ডা গল্প সেরে তন্দ্রা লেগেছে সবে, ওমনি ‘গরম চায়ে’-র উষ্ণ অভ্যর্থনায় উঠে বসলাম সবাই। চা সেবনের পর নামার তোড়জোড় পুরুলিয়া স্টেশনে। নেমেই দেখি বোলেরো নিয়ে রিয়াউল ভাই দাঁড়িয়ে। তবে হ্যাঁ, কলকাতা থেকে ট্রেনে ওঠার আগে ওর সঙ্গে ঘন ঘন কথা বলে নিয়েছিলাম। ওইই আমাদের আগামী আড়াই দিনের পথ-প্রদর্শক, সারথিও বটে। হোটেলের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রিয়াউল বললো, আপনারা রেডি হোন, আমি একঘন্টার মধ্যে আসছি। হোটেলে স্নান সেরে বেরোলাম প্রথমদিনের পুরুলিয়া সফরে।

কাশীপুর রাজবাটী
কাশীপুর রাজবাটী তার বিশালত্ব নিয়ে জনমানব শূন্য নির্জনতায় ইতিহাসেরর স্বাক্ষরতা বহন করছে। ইতিহাস বলে মধ্যপ্রদেশের ‘ধার’ স্টেট (ধাবানগর) থেকে পঞ্চকোট রাজবংশের উত্তরাধিকারীরা এসেছিলেন পুরুলিয়ায়। সেই আগমন স্থায়িত্ব পেল মানভূমে। এই রাজবংশকে ‘শিখরভূম রাজবংশ’ও বলা হয়ে থাকে। ধর্ম আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, জেলার ২২টি জনপদ নির্মাণ, বিভিন্ন জাতির বসতি বিস্তারে আনুকূল্য দান, মন্দির-স্থাপত্য শিল্পের প্রসার, দেশপ্রেমিক প্রজাদের নিষ্কর মৌজা বিতরণ এবং জনজাতিগুলির সঙ্গে রাজ পরিবারের আত্মিক সম্পর্ক রাজ পরিবারটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। ১৮৩২ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে এ রাজবাড়ির বিরাট পরিবর্তন হয়। রাজা নীলমণি সিংহ দেও এবং তার সুযোগ্য পুত্র জ্যোতি প্রসাদ সিং দেও এর হাত ধরে কাশিপুর রাজবাড়ি এক অনন্ত কৃতিত্বের নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায়। সে সময় রাজবাড়ীর দরবার থেকে ভেসে আসত ঝুমুর, ভাদু-সহ বিষ্ণুপুরের উচ্চ ঘরানার বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংগীত। মৃদঙ্গের বোল আর বাঁশির মিঠে সুরে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে থাকতো। রাজবাড়ীর এই ইতিহাস জানার জন্য অবশ্যই পড়তে হবে রাখাল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চকোট ইতিহাস’।

জয় চন্ডী পাহাড়
ইতিহাস ছুঁয়ে চলে এলাম জয়চন্ডী পাহাড়ে। এখানেই ১৯৭৮ সালে সত্যজিত রায় তাঁর হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্রটির একটা বড় অংশের শ্যুটিং করেন। তারপর কেটে যেতে চলেছে চার দশক কিন্তু জয়চন্ডী পাহাড়ের পরিবেশ এবং সৌন্দর্য এখনও একই রকম। পাহাড়ের সামনে গেলেই চোখের সামনে আজও ভেসে উঠবে গুপি বাঘার ভোজন দৃশ্য অথবা উদয়ন পন্ডিতের সঙ্গে গুপি বাঘার প্রথম দেখা হওয়ার দৃশ্যটি। স্থানীয় অনেকের স্মৃতিতে আজও অমলিন বিশ্ববরেণ্য পরিচালকের সঙ্গে সেই শ্যুটিং এর দিনগুলি। সত্যজিতের স্মৃতিতে পাহাড়ের পাদদেশে তৈরী হয়েছে একটি স্থীয়া মঞ্চ। ৮০০ ফুট পাহাড়ের মাথায় মা চন্ডীর মন্দির। মা চন্ডীর থেকেই পাহাড়ের নামকরণ হয়েছে জয় চন্ডী পাহাড়। মা চন্ডীর দর্শনের জন্য আপনাকে উঠতে হবে প্রায় ৫০০টি সিঁড়ি। খুব শ্রমশ্রাদ্ধ নয় ধীরে ধীরে উঠুন। ওঠার সময় খানিক বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আছে বসার জায়গা। সিঁড়ি বেয়ে পাহারচূড়োয় উঠে আসার পর এক অদ্ভুত প্রশান্তি। নৈসর্গিক স্থাপত্যের চিহ্ন খোদাই হয়ে আছে মানভূমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

বড়ন্তী পাহাড়কোলে মুরারডী লেক
নেমে এলাম কিছুসময় পর। গাড়ি চলল বড়ন্তী পাহাড়কোলে মুরারডী লেকের দিকে। এ লেকের জল এমন স্বচ্ছ শুধু নিজের মুখ নয়, নিজ আত্মাকেও যেন দেখা যায়। আর পাহাড় পরে বিস্তৃত সবুজে মহুয়া আর পলাশের মাতালিয়া মন। বসন্তকালে এখানে বনে আর মনে নাকি আগুন লাগে। আসবো ফাগুনে আবার এখানে।
বড়ন্তী থেকে গড় পঞ্চকোটের দিকে চললাম এবার। অপরূপ প্রকৃতির সাথে অবহেলিত ইতিহাসের অপূর্ব মেলবন্ধনের নিদর্শন পঞ্চকোট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত রহস্যাবৃত্ত নিশ্চুপ এই গড় বা দুর্গ যা গড়পঞ্চকোট নামেই বিখ্যাত। এই পঞ্চকোটের ‘পঞ্চ’ মানে পাঁচ এবং ‘কোট’ বা ‘খুঁট’ যার অর্থ গোষ্ঠী, অর্থাৎ পাঁচটি আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে এই পঞ্চকোট নামের উৎপত্তি। জানা যায়, পুরুলিয়ার ঝালদা অঞ্চলের পাঁচ আদিবাসী সর্দারের সাহায্যে এখানে রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন দামোদর শেখর।
প্রায় ২৬৬ বছর আগে মারাঠা বর্গি ভাস্কর পণ্ডিত বাংলায় প্রবেশ করেছিলেন এই পথ দিয়ে। পথে তিনি যা কিছু দেখতে পেয়েছিলেন, সবই লুঠ করেন। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল আতঙ্ক। তাঁর হাতেই এই গড়পঞ্চকোটের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।
মাইকেল মধুসূধন দত্ত ব্যারিষ্ট্যারী পাশ করে দেশে ফেরার পর কিছুদিন এখানকার ম্যানেজারের পদে চাকরিতে ছিলেন। এখন রাজাও নেই, রাজ্যপাটও নেই। আছে শুধু সবুজ সমারোহে নির্জন নিস্তব্ধতা, তবে ‘ওই সময়’ যেন থমকে আছে ওই মন্দির চূড়োয়..!
এখানেই শালপাতার ছাউনি দেওয়া চার দিক খোলা রান্নাঘরে (ঝুপড়ি) প্রায় নিজেরাই ভাত রান্না করে ডাল, আলুপোস্ত, আমতেলে ডোবানো আমচুর (আমার বনানো) দিয়ে চারদিক পাহাড়ঘেরা খোলা আকাশের নীচে দুপুরের খাবার খেলাম শীতের বনভোজনের আমেজ নিয়ে।

পাঞ্চেৎ ড্যামে সূর্যাস্ত
এবার আমাদের গাড়ী চললো দামোদর নদের ওপর পাঞ্চেৎ ড্যামের দিকে। পথটি পুরোটাই নির্জন ঘন ও সবুজ অরন্যের ভেতর দিয়ে। সিনিক্ বিউটিতে মোহময়ী পুরুলিয়ায় সবাই মোহাচ্ছন্ন তখন। এর মধ্যে গাড়ী পৌঁছোলো পাঞ্চেৎ বাঁধের একেবারে মাঝখানটিতে। নদীর আর এক পাড়ে ধানবাদ সহজপাঠের দৃশ্য নিয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে। বাঁধের অর্ধেক অংশ প্রায় ঝাড়খন্ডের সীমায়। ফোনের টাওয়ারে ঝাড়খণ্ড লোকেশনই দেখাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর দামোদর নদে নৌকোয় ভেসে অভাবনীয়, অকল্পনীয় ‘অস্তরাগ’-এ মোহিত হলাম। নির্বাক হলাম। এ দৃশ্য অবলোকন করে তা বর্ননা করি সে ভাষা আমার নেই, শুধু কয়েকটি ছবি তুলতে পেরেছি। দেখুন …..
প্রতিদিন দামোদরের কালো জলে
কেমন করে সোনা গলে…!
তাই বোধয় মাঠ ভরে ওঠে সোনার ফসলে!
সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে দেখলাম মুগ্ধ চোখে।
সার্থক এ জীবন।
আড়াইদিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে স্নান সেরে সকাল সোয়া ৮টায় রিয়াউল ভাইয়ের সাথে আমরা ৮জন গাড়ীতে উঠলাম অযোধ্যা পাহাড়ের পথে—দু-দিকের রাস্তার সে কি মনোরম দৃশ্য! পাকাধানের সোনালী ক্ষেত—সাদা, গোলাপী, নীল শাপলা-শালুকে ভরা সরোবর দেখতে দেখতে কংসাবতীর প্রায় উৎসের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। গাড়ী থেকে নেমেই পা ডুবিয়ে স্রোতোধারা ছুঁয়ে বসে রইলাম একটি পাথরের ওপর। মনে হচ্ছিল নদী হয়ে বয়ে যাচ্ছি যেন। নদীর ‘কুল কুল’ শব্দে কত জন্মের কত কথা শুনতে শুনতে..!

কংসাবতীর উৎস সন্ধানে
চুপচাপ বসে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ, টনক নড়লো বাকি সহযাত্রীদের ডাকে, উঠে এলাম কংসাবতীর দক্ষিণপাড়ে পলাশ, সেগুন, মহুয়া ও শাল ঘেরা প্রায় হাজার বছরের পুরোনো এক প্রত্নস্থল—দেউলঘাটা। দুটি বিশাল আকারের দেউল দাঁড়িয়ে শুধু। এককালে এখনে প্রচুর মন্দির ছিল, কেউ কেউ বলেন এখানে বহু বছর আগে নাকি জৈনদের মন্দির ছিল, পরে হিন্দুদের দেবতাদের বসবাস অষ্টধাতুর দূর্গা ও শিব, বর্তমানে ‘মিঠুদি’ নামে এক আশ্রমিকা বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আগলে রেখেছেন নিজ দ্বায়িত্বে। তাঁর কাছেই শোনা পৃথিবীর একমাত্র এখানেই নাকি দূর্গার ডান পা মহিষাসুরের ওপর রয়েছে। আর পদ্মাসনে শিবমূর্তি (দেখে মনে হয় মস্তকহীণ কোনো জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি)।
এখান থেকে চললাম মুরুগুমা লেকে। চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না এর অপরূপ সৌন্দর্য। মুগ্ধ হয়ে দেখলাম শুধু। কতো দূর দূর গেছি কিন্তু নাগালের মধ্যে এতো সুন্দর প্রকৃতির কাছে কেন আগে আসি নি…!
চলে এলাম এখান থেকেও কিছু পরে মার্বেল লেকে। এখানে, বিশাল একটি মার্বেল পাহাড়ের পাদদেশে, ভারী সুন্দর জলপাই রঙের জল ভরতি হৃদয়ের মতো একটি লেক। হৃদয়ে অবগাহন করবো বলে আবেগে আপ্লুত হয়ে লেকের জলে নেমে পড়লাম আমরা সবাই। কি করি! ফিরতে ইচ্ছে না করলেও ফিরতে হলো এখান থেকেও। এবার সেই ‘তরলিত চন্দ্রিকা’ সুন্দরী ঝর্ণা ‘বামনী ফল্স’-এ প্রায় ৫০০ খানা (বেশিও হতে পারে) অপ্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে নেমে কোনোরকমে পাথর পেরিয়ে পেরিয়ে ঝর্ণাটির একেবারে কাছে গিয়ে পৌঁছোলাম। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের বয়েস ভুলে ঝর্ণার মতো উত্তাল, উদ্দাম হয়ে প্রায় ভেসে যেতে লাগলাম, এ বর্ণনা করা আমার সাধ্য নয়, ঝর্ণার জল তো জল নয় যেন জোছোনা গলে গলে পড়ছে পাথরের বুকে। ফিরতে হলো এখান থেকেও।

বাম্নী ফল্স
বাম্নী ফল্স-এ বিমোহিত হওয়ার পর এগোলাম আরো একটি সুন্দরী ঝর্নার দিকে…. এটিতে পৌঁছোতে আগেরটির মতো এতোগুলো (৫০০) সিঁড়ি নামতে হয় না। তুর্গা ফল্স, সৌন্দর্যে এটিও অকল্পনীয়, অবর্ণনীয়। সৌন্দর্য অবগাহনে বুঁদ হলাম নির্বাক একেবারে তরল হীরের স্রোত আছড়ে পড়ছে যেন প্রতি মুহূর্তে…! ফিরতে হলো এই সুন্দরতম দৃশ্যকে পিছনে ফেলেও। পৌঁছোলাম অযোধ্যা পাহাড়ের প্রায় মাঝ বরাবর আপার ড্যামে।

আপার ড্যাম
এখানে নদীর ওপর বাঁধটি ভারী সুন্দর। বাঁধটি সোজা গিয়ে পাহাড়ে মিশেছে। সুন্দর আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে নামতে থাকলাম লোয়ার ড্যামে।এরই কাছাকাছি আরো একটি ছোটো লেক। লহরিয়া নাম……
এ লেকের জলে
রোজ বিকেলে
সূর্য রশ্মি লহর তোলে!
অদ্ভুত সুন্দর এ দৃশ্য।

সূর্য রশ্মি লহর তোলে লহরিয়া লেকে
তারপর এই সূর্যকে সাথে নিয়ে বাঘমুণ্ডী পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেতে যেতে পৌঁছোলাম খয়রাবেড়া লেকে, এখানকার সৌন্দর্য্য বর্ণনা করার একটিও শব্দ নেই আমার কাছে।
আকাশে আশমানী রঙ, পাহাড়ে ঘন সবুজ আর পান্না রঙের লেকের জল—এ তিন মিশেলে এক মায়াময় দৃশ্যপট, চোখ ফেরানো দায়! থাকার জন্য ৫/৬টি কটেজ ও ৪/৫টি টেন্ট আছে, ইচ্ছে হলো আবার আসবো এখানে প্রকৃতির অপরূপ প্রানবন্ত রূপ দেখতে।

খয়রাবেড়া
পাহাড়ের ওপারে সূর্য তখন অস্তাচলে, সন্ধ্যে এসে স্বাগত জানালো আমাদের এই ইচ্ছেকে, যাবো এবার পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামে যেখানে অন্যান্য কাজের সাথে এখানের মানুষ যুক্ত থাকলেও বংশ পরাম্পরায় এঁরা জীবিকা হিসেবে পুরুলিয়ার বিখ্যাত ঐতিহ্যমণ্ডিত ‘ছৌ নৃত্য’-র মুখোশ তৈরী করে থাকেন। ঘুরে দেখতে ভারী ভালো লাগছিল। বড্ড আন্তরিক মানুষজন এখানে। মুগ্ধ আন্তরিকতায় আবার আসার ইচ্ছে নিয়ে পাহাড়ের নীচে পুরুলিয়া শহরে, হোটেলে ফিরলাম।
পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন না দেখলে পুরুলিয়া ভ্রমণ পূর্ণ হয় না, সে যতই প্রকৃতিতে মুগ্ধ হই না কেন। আসবো এখানে ‘বাউল উৎসবে’। দেখি পরের ‘অদূরভ্রমণ’-এ আমাদের কোথায় যাওয়া যায়, পাহাড় নাকি সমুদ্র, কে ডাকে আমায়..!
খুব সুন্দর লেখা ; শুভেচ্ছা জানাই