আজ ১২ জুলাই ২০২১। মনে পড়ছে ১৯৬৬ সালের ১২ জুলাই-এর কথা। ৫৫ বছর হয়ে গেল। ১৯৬৬ সালের জুলাই মাসটা ছিল অগ্নিগর্ভ। ১৯৬৫ সালে খরার জন্য সারা দেশে ফসলের উৎপাদন খুব কম হয়। এখন যেমন চালের উৎপাদন খুব বেশি তাই সরকারের গুদাম উপচে পড়ছে, সরকার তাই রেশনে বিনা পয়সায় চাল দিচ্ছে। ১৯৬৬ সালে পরিস্থিতিটা ছিল উল্ট। প্রতি সপ্তাহে রেশনের চাল ছাঁটাই হতো। তখন ২৫ শতাংশ গ্রামে এবং ৫০ শতাংশ শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ ছিল। গরিব তো বটেই মধ্যবিত্ত বাড়িতেও বিকেল থেকে হ্যারিকেনের চিমনি পরিষ্কার করে সলতে ঠিক করা হতো। অনেক বাড়িতে লম্ফ বা কুপি জেলে ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা করতো। চাল ছাঁটাই-এর সঙ্গে কেরোসিনও তখন পাওয়া যাচ্ছিল না। খাদ্য ও কেরোসিনের দাবিতে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। ছাত্র-ছাত্রীরা মিছিল করে শ্লোগান দেয়। চাল দাও, একপোয়া কেরোসিন দাও। সেই মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। স্বরূপনগরে মারা যায় কিশোর ছাত্র নুরুল ইসলাম, কৃষ্ণনগরে আনন্দ হাইত।
মধ্যবিত্তদেরও তখন রোজগার খুব কম ছিল। সরকারি, আধা-সরকারি কর্মী, কলেজ স্কুল শিক্ষক, ব্যাঙ্ক কর্মচারীদেরও মাইনে ছিল খুব কম। একজন স্কুল শিক্ষক ঢুকে মাইনে পেতেন ২২৫ টাকা। এখন হয়তো পান ২৫ হাজার টাকা। তাই আজকের মধ্যবিত্তরা সেই দিনটা ভুলে গেছেন।
সরকারে ছিল কংগ্রেস, মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন, আন্দোলন চালাচ্ছিল বামপন্থীরা। বামপন্থীরা ঠিক করেন, কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাঙ্ক (তখনও জাতীয়করণ হয়নি), স্কুল-কলেজ শিক্ষক, সওদাগরী কর্মচারীরা যৌথভাবে খাদ্য আন্দোলনের সমর্থনে সভা ডেকেছিল। তারিখ ১২ জুলাই ১৯৬৬। মনুমেন্ট ময়দানে। তখনও শহিদ মিনার ময়দান নাম হয়নি। তখনকার মনুমেন্ট ময়দানের ক্ষেত্রফল অনেক বড়ো ছিল। সেই বিরাট মাঠ উপচে ভিড় চলে যায় মেট্রো সিনেমা পর্যন্ত। অফিস কর্মচারীদের মিছিল রাত ৭টাতেও এসে ঢোকে। অসম্ভব উদ্দীপনা। সেদিনের সভার সভাপতি ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের নেতা কে.জি. বসু। এখন তাঁর জন্ম শতবর্ষ চলছে। বক্তা ছিলেন শিক্ষক আন্দোলনের নেতা সত্যপ্রিয় রায়, ব্যাঙ্ক কর্মচারী আন্দোলনের নেতা আশিস সেন, সিনেমা কর্মচারী আন্দোলনের নেতা মীর আবু সৈয়দ, মার্কেন্টাইল ফেডারেশনের নেতা সমীর মুস্তাফি প্রমুখ। সেদিন মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের উৎসাহ দেখে বোঝা গিয়েছিল, আট মাস পরের বিধানসভা ভোটে পালাবদল আসছে। হলও তাই। ১৯৬৭ সালের ২ মার্চ রাজ্যে প্রথম অকংগ্রেসী যুক্তফ্রন্ট সরকার তৈরি হলো। সেই সরকারকে সমর্থন করে সভা করলো ১২ জুলাই কমিটি যা একবছর আগে তৈরি হয়েছিল।
এখনও ১২ জুলাই কমিটি আছে। কিন্তু সব কর্মীদের মাস মাইনে ভালো হয়েছে। ভোগবাদ ও অবসাদ তাদের গ্রাস করেছে। তাই তাদের আর রাস্তায় দেখা যায় না।