রাত পোহালেই ১৫ সেপ্টেম্বর অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎ চন্দ্রের জন্ম সার্ধশতবর্ষ। শরৎচন্দ্রের স্মৃতি আঁকড়েই জন্ম শতবার্ষিকীতে শরৎচন্দ্রের স্মৃতি বিজরিত হাওড়া জেলার সামতাবেড় গ্রামে বসতবাড়িতে কোন রকম আয়োজন ছাড়াই দিনটি অতিবাহিত হবে অন্যান্য আর পাঁচটা বছরের মতই।

১৯২৩ সালে হাওড়া জেলার বাগনান-২ ব্লকের রূপনারায়ণ নদীর পাড়ে সামতাবেড় গ্রামটি কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের মনে ধরে। রূপনারায়ণনদীর এক পাড়ে হাওড়া জেলার বাগনান ব্লক আর অন্যপাড়ে পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাট ব্লক। মাঝখান দিয়ে কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে রূপনারায়ণ নদী।জায়গাটি শরৎচন্দ্রের মনে ধরতেই ১৯২৫ সালে বাড়ি তৈরি করে এই বাড়িতেই ১৯২৬ সাল থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ১৩টা বছর বসবাস করেছেন শরৎচন্দ্র। শরৎচন্দ্রের সামতাবেড়ের বসতবাড়িতে আজও সংরক্ষিত শরৎচন্দ্রের শয়নকক্ষ, পাঠকক্ষ, তাঁর ব্যবহৃত লাঠি, চটিজুতো, তামাক খাওয়ার গড়গড়া ও আরও অনেক কিছু। সামতাবেড়ের এই বাড়িতে বসেই শরৎচন্দ্র ‘রামের সুমতি’সহ একাধিক গল্প উপন্যাস লেখা ছাড়াও তাঁর শেষতম উপন্যাস ‘বিপ্রদাস’ লিখেছিলেন। মাঝে ১৯৭৮ সালে মাটির বাড়িটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৯ সালে হেরিটেজ কমিটি সামতাবেড়ে শরৎচন্দ্রের বসত বাড়িটিকে হেরিটেজ বাড়ি বলে ঘোষনা করার পর হাওড়া জেলা পরিষদ নতুন করে বাড়িটির আমুল সংস্কার করে।

এই বাড়িতে বসেই শরৎচন্দ্র পথের দাবী (১৯২৬) শেষপ্রশ্ন (১৯৩১) শ্রীকান্ত চতুর্থ পর্ব (১৯৩৩) বিপ্রদাস (১৯৩৫) উপন্যাস রচনা করেছিলেন। রূপনারায়ণ নদীর ধারে সামতাবেড় গ্রামের এই বাড়িতে রচিত উপন্যাসগুলিতে বিপ্লববাদ, পরাধীনতার জ্বালা ও জীবন তত্ত্বের প্রকাশ আর ভাবাদর্শের সংঘাত নিয়ে তিনি রচনা করে ছিলেন তার অমর উপন্যাস গুলি। এমনকী শরৎচন্দ্রের উৎসাহে সামতাবেড় গ্রামে শরৎচন্দ্রের বসতবাড়িটি বিপ্লবীদের আস্তানা হয়ে উঠে ছিল। বিপ্লবী রাসবিহারী দত্ত, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস সহ বহু বিপ্লবী নিয়মিত আসতেন এখানে। কলকাতার টাউন হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অভিনন্দন সভার বিখ্যাত মানপত্রটি রচনা করেছিলেন শরৎচন্দ্র। কবিও নিজে একবার শরৎচন্দ্রকে অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন। শরৎচন্দ্র হাওড়া শহর ছেড়ে সামতাবেড়ে যখন থেকে বাস করতে থাকেন, তখন থেকে ঐ অঞ্চলের দরিদ্র লোকদের অসুখে চিকিৎসা করা তাঁর একটা কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রোগী দেখে তিনি শুধু ওষুধই দাতব্য করতেন না, অনেকের পথ্যও কিনে দিতেন। হাওড়া শহরে থাকার সময় সেখানেও তিনি এই-রকম করতেন। শরৎচন্দ্র সামতাবেড় অঞ্চলের বহু দুঃস্থ পরিবারকে বিশেষ করে অনাথ বিধবাদের মাসিক অর্থ সাহায্যও করতেন।

শরৎচন্দ্র সামতাবেড়ে থাকার সময় অল্প তিন-চারটি মাত্র গ্রন্থ রচনা করতে পেরেছিলেন। শরৎচন্দ্র সামতাবেড়ে থাকার সময় শেষ দিকে কলকাতার বালীগঞ্জের ২৪ অশ্বিনী দত্ত রোডে ১৯৩৪ সালে একটি দোতলা বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। কলকাতায় বাড়ি হলে তিনি কখন কলকাতায় আবার কখনও সামতাবেড়ে এইভাবে কাটাতেন। কলকাতায় থাকাকালে কলকাতার তখনকার সাহিত্যিক ও শিল্পীদের দুটি নাম-করা প্রতিষ্ঠান রবিবাসর ও রসচক্রের সদস্যরা তাঁকে আমন্ত্রণ করে তাঁদের অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন। এঁরা শরৎচন্দ্রকে সম্বর্ধনাও জানিয়েছিলেন। রসচক্রের সদস্যরা শরৎচন্দ্রকে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সভাপতি করেছিলেন।

১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শরৎচন্দ্রকে ডি.লিট. উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। তার আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী পদক উপহার দিয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে একবার বি.এ. পরীক্ষায় বাংলার পেপারসেটার বা প্রশ্নকর্তাও নিযুক্ত করেছিলেন। এসব ছাড়া, দেশবাসীও তাঁকে তখন ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী এই আখ্যায় বিভূষিত করেছিলেন।