গিরিশচন্দ্র ঘোষের বাড়িটি যেখানে গিরিশ অ্যাভিনিউকে দু’ভাগে বিভক্ত করেছে, ঠিক সেখান থেকে দু’পা এগোলেই বাম দিকের গলিতে দুটি বাড়ির পরেই পড়বে দ্রষ্টব্য স্থানটি। উত্তর কলকাতার এই জায়গাটি নতুন ও পুরাতনের মধ্যে এক যোগসূত্র নির্মাণ করেছে। আমরা বলছি বাগবাজার ১৬ নম্বর বোস পাড়া লেনের কথা। হ্যাঁ সেই বাড়ি, যেখানে সিস্টার নিবেদিতা ভাড়ায় ছিলেন বেশ কিছু কাল। কলকাতা যখন ‘কলিকাতা’ — এই বাড়ি গল্প বলে সেই কালের। প্রকৃতপক্ষে নিবেদিতার বাড়িটি সেই সময় সারা ভারতে সবরকম উন্নয়নমূলক কাজের একটি প্রধান কেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হয় না। সময় ক্রমশ বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে। এখনও বাড়িটির দিকে তাকালে শিহরন জাগে, এর প্রতিটি ইট যেন কানে কানে কথা বলছে।
১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনের নিবেদিতার বাসভবনটি রামকৃষ্ণ সারদা মিশনকে হস্তান্তর করার ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী হয়েই উদ্যোগ নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পরে বাড়িটির সংস্কার ও সেখানে নিবেদিতা বিষয়ক প্রদর্শশালা গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন করেছে রামকৃষ্ণ সারদা মিশন। ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর এই বাড়ি এবং প্রদর্শশালার উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। বর্তমানে এই বাড়িটিকে গ্রেড ওয়ান হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে ঘোষণা করেছে কলকাতা পৌরসংস্থা।

স্মৃতি কী? সভ্যতার স্থিতি ও গতিতে এই মানসিক চর্চার যথাযথ স্থানই বা কোথায়? কেন, প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, অতীতের অনুষঙ্গ বর্তমানের জরুরি প্রয়োজন? ব্যক্তির বাঁচন-প্রণালীতে অভিজ্ঞতা যেমন অসংখ্য ঘটে যাওয়া ঘটমান বর্তমানের সারসংক্ষেপ রূপে তার অবশিষ্ট জীবনপথে অন্ধকারে গমন-দিশা জোগাতে পারে, জাতির জীবনেও কি তেমন কোনো ভূমিকা থাকে? থাকে বইকি। তার জন্যই তো প্রয়াস নিবেদিতাকে পুনরায় বাঙালির কাছে তুলে ধরা। এর জন্য যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার ও কলকাতা পৌরসংস্থা। পুরোনো জিনিসকে সংরক্ষণ করে নতুন আঙ্গিকে গড়ে তোলা হয়েছে বাগবাজারে নিবেদিতার বসতবাড়িটি। বর্তমানে এখানে আলোর পথযাত্রীর ঠিকানা স্বরূপ মিউজিয়াম গড়ে উঠছে। এখানে আছে চারটি গ্যালারি, ঠাকুর দালান, অডিও-ভিজুয়াল রুম, টিকিট কাউন্টার ইত্যাদি। এক নম্বর গ্যালারিতে তুলে ধরা হচ্ছে নিবেদিতার পড়ার ঘরকে। সেখানে আছে নিবেদাতার ব্যবহৃত চেয়ার টেবিল সহ একাধিক অমূল্য জিনিস।
ভারতে আসার পর ১৬ নম্বর বোস পাড়া লেন বাড়িটিতে ও ১৭ নম্বর বোস পাড়া লেনের আর একটি বাড়িতে ভাড়া ছিলেন সিস্টার নিবেদিতা। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ১৬ নম্বর বোস পাড়া লেনের বাড়িটি। এই বাড়িতেই সিস্টার আয়োজন করেছিলেন বিখ্যাত এক চা-চক্রের। দিনটি ছিল, ১৮৯৯ সালের ২৮ জানুয়ারি, শিনবার। আমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার, অবলা বসু প্রমুখ। অনুষ্ঠানটিতে সাক্ষাৎ হয়েছিল কবি ও সন্ন্যাসীর। জানা যায় অনাড়ম্বর, বাহুল্যবর্জিত, সাদামাটা এই চায়ের আসর বসেছিল মোমবাতির আলোয়। রাস্তা থেকে বাড়ির ভিতরে ঢুকে বাঁদিকে দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে পৌঁছে যাওয়া যাবে পরপর দুটি ঘরে। তারপর ছোটো একটি পথ পেরিয়ে সুন্দর একটি দালান। সামনেই উন্মুক্ত উঠোন। দালানটির সামনে কারুকার্য খচিত ইটের তিনটি থাম। দালানটি সাদা পাথরে বাঁধানো। এর উপরে উঠতে গেলে কয়েকটি সিঁড়ি পার হতে হয়। একটি পুরনো ছবিতে দেখা যায় এই সিঁড়িগুলির মধ্যে ছাত্রীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন সিস্টার নিবেদিতা। তার উল্টোদিকেই একটি ঘর। এই ঘরেই রাখা থাকছে নিবেদিতার ব্যবহৃত চেয়ার টেবিল সই তৎকালীন সময়ের নানা সামগ্রী। উন্মুক্ত উঠোনটির গুরুত্ব অপরিসীম। নিবেদিতার বহু লেখাতে দেখা গেছে কাজের চাপ কাটাতে যখন তিনি ফাঁকা আকাশের নিচে এসে তারাদের দেখে সাময়িক স্বস্তি পেতে চেয়েছেন, তখন তাঁর প্রিয় স্থান হয়ে উঠেছে উঠোনটি। এছাড়া স্বামী বিবেকানন্দ ও অন্যান্য গুরু ভাইদের একটি ছবি পাওয়া যায় এই উঠোনটিতে। যার পেছনে দেখা যায় দুটি লোহার পাইপ। বর্তমান বাড়িটিতে ওই লোহার পাইপ দুটি অবিকৃত ভাবে রাখা হয়েছে। আছে দোতলায় যাওয়ার বাঁধানো সিঁড়ি। ছোট ছোট ২০টি সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় যাওয়ার পথ। দোতলায় ছিল সিস্টারের শয়ন কক্ষ। রাতের পর রাত জেগে কালজয়ী নানা লেখা তাঁর কলম থেকে সৃষ্টি হয়েছে দো-তলার এই ঘর থেকেই। বাগবাজারের এই এঁদো গলি জানে কী ভাবে আয়ারল্যান্ডের ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন আবহাওয়া থেকে আগত মার্গারেট নোব্ল ‘সিস্টার নিবেদিতা’ হয়ে উঠলেন। গ্রীষ্ণকালে অসহ্য গরমে তাঁর চোখ মুখ লাল হয়ে যেত। মাথা যন্ত্রণায় কষ্ট পেতেন। দারিদ্র ছিল নিত্য সঙ্গী। অথচ এরি মধ্যে চলত অবৈতনিক স্কুল পরিচালনা। পরাধীন ভারতকে ইউরোপীয়দের শ্রেষ্ঠ উপহার ‘নিবাদেতা’র বসবাস করা ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনের বাড়ি এক ঐতিহাসিক দলিল। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাব আন্দোলনকে বুঝতে হলে বারবার আসতেই হবে এই জায়গায়। বর্তমানে গড়ে ওঠা সংগ্রহ শালায় স্থান পেয়েছে নিবেদিতার ব্যবহৃত পড়ার চেয়ার-টেবিল, নিবেদিতার হাতে লেখা অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টার, ছাত্রীদের পড়াশোনা তথা প্রতিভার রির্পোট, জপের মালা, বজ্র চিহ্ন আঁকা লকেট, জগদীশচন্দ্র বসু কর্তৃক নিবেদিতাকে দেওয়া উপহার পেপার ওয়েট, সারদাদেবীর ব্যবহৃত শাড়ি, সিস্টার ক্রিস্টিনের ব্যবহৃত পেন, ডায়রি সহ একাধিক জিনিস। স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে নিবেদাতার সাক্ষাতের শেষ দিন ব্যবহৃত টেবিল-ক্লথটিও আছে এখানে।

তীব্র আলোর ঝলকানি আলোকিত করার বদলে কখনো কখনো আনতে পারে সাময়িক দৃষ্টিহীনতাও। বাঙালির সাময়িক বিবেকানন্দ-নিবেদিতা বিস্মরণ কী সে জাতীয়? তবু সে তো তীব্র আলো। তাই শতাধিক বছরের তফাতে দাঁড়িয়ে শিহরন জাগে, মনে হয় স্বল্পায়ু দুটি মানুষ কী অসাধ্যটাই না করেছিলেন। সাধক রামকৃষ্ণদেবের প্রেরণায় তাঁরা জাগিয়ে দিয়ে গেলেন জাতিকে। আধুনিক ভারত গঠনের স্বপ্ন দেখালেন কারা? রামকৃষ্ণদেব, বিবেকানন্দ, নিবেদিতার জ্বালানো সে আলো তীব্র আঁধার রাতে বহুদূরের পথকে আলোকিত করেছে। কিন্তু শুরুটা হয়েছিল কন্টকাকীর্ণ পথের মধ্যে। ১৮৯৮ সালে নভেম্বরের এক সকালে নিবেদিতা প্রথম প্রবেশ করেন বোসপাড়া লেনের বাড়িতে। ভারতে থাকাকালীন বেশির ভাগ সময়টি তাঁর কেটেছে ১৬ নম্বর বোস পাড়া লেনে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। চারপাশে মাছি ভনভন করছে, নর্দমা, তারই মধ্যে আছেন। আবাল্য শীতপ্রধান দেশে মানুষ হওয়ায় গরমে নিবেদিতার প্রচণ্ড কষ্ট হতো। হাতপাখা ছাড়া কোনো বৈদ্যুতিক পাখা ছিল না। মাঝে মাঝে নিজের কপাল হাত দিয়ে চেপে ধরতেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘মাথায় বড় কষ্ট’। তবুও কখনো এই বাড়ি ছেড়ে যাননি। বলতেন, এই স্থানটি আমাকে দত্তক নিয়েছে, আমি একে ছেড়ে কোথাও যাব না। ‘জগতের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ, আর সবচেয়ে সাহসী, যাতনাই তাদের বিধিলিপি’—তাই এই শারীরিক যাতনা যে নিবেদিতাকে পরাজিত করতে পারবে না— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন ২০২২ সালের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে সব থেকে বড় প্রশ্ন— এই যুগে নিবেদিতা কতটা প্রাসঙ্গিক। কিংবা ছাত্রছাত্রীরা কী ভাবে তাঁর জীবনদর্শন থেকে অনুপ্রেরণা পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশেই পাওয়া যাবে ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনে নিবেদিতার বসতবাটি নির্মিত সংগ্রহশালায় প্রবেশ করলে। দর্শনার্থীদের জন্য, বিশেষত পড়ুয়াদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছে নিবেদিতার কলকাতা—যাপনের নানা নিদর্শন। থাকছে, নিবেদিতার বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য চিঠি, ছবি, ব্যবহায্য সামগ্রী। তৎকালীন সময়ে কে না এসেছেন এই বাড়িটিতে! ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে মর্ডান রিভিউ পত্রিকায় নিবেদিতার এই গৃহ সম্বন্ধে লেখা হয়েছে, ‘তাঁর বাড়ি চমৎকার এক মিলনক্ষেত্র।… আমাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আর কোথাও এত সংখ্যক বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় চরিত্রের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ ছিল না। এখানে (গভর্নর জেনারেল) কাউন্সিলের সদস্যগণের, সেইসঙ্গে কলকাতা ও বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের নেতৃগণের সাক্ষাৎ মেলে, যাঁদের নাম ও কার্যের সংবাদ প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রচারিত; ভারতীয় শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, বক্তা, সাংবাদিক, ছাত্র, প্রায়শ রামকৃষ্ণসংঘের কোনো পরিব্রাজক সন্ন্যাসী, মাঝে-মধ্যে ভ্রাম্যমাণ পণ্ডিত এবং অবিরত দূরপ্রদেশসমূহের ধর্মনেতা বা জননেতা হাজির।’ আর যাঁকে কেন্দ্র করে এই সমাবেশ সেই নিবেদিতার দিন কেমন কাটত বাড়িটিতে? ১৯১১ সালে নভেম্বর মাসে প্রবুদ্ধ ভারত পত্রিকাতে লেখা হয়েছে, ‘একেবারে প্রভাতকাল থেকে উত্তীর্ণ-সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ে দেখা যেত তিনি কঠোর পরিশ্রমে নিমগ্ন, হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন ভারতের ইতিহাস, পুরাণ, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম, শিল্প, দর্শনের উপরে… যদি তা জাতীয় চৈতন্যসৃষ্টির প্রয়োজনে লাগে।’

কবি বলেছেন — ‘কালের গর্ভে বিলুপ্ত যারা মানুষের মনে রহে, মানুষের ডাকে মৃত্যুশয়ন হতে তারা কথা কহে।’ — এই কথা শুনতে পাবেন আপনিও। একবার ঘুরে যান এই সংগ্রহশালায়। প্রতি শনি ও রবিবার খোলা থাকছে সংগ্রহশালাটি। টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা। পড়ুয়াদের জন্য বিশেষ ছাড় আছে।