আরও একটি ইংরেজি বছরের ক্যালেন্ডারের পাতা শেষ হয়ে এলো। বছর ফুরতে না ফুরতেই চিন-সহ কয়েকটি দেশের কোভিড সংক্রমণ ফের ভাবনা ধরিয়ে দিয়েছে আমাদের মনে। বিদায়ী বছরের বেশির ভাগ সময়টাই কেটেছিল স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু বছরের শেষে গিয়ে ফের সেই কোভিড নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। জানা নেই নতুন বছরে আবার সেই অভিশপ্ত সময়ে ফিরতে হবে কিনা। কোভিড সংক্রমণের বিদায়ী বছরেও দেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন, পঞ্জাবে আপের ক্ষমতা দখল, যদিও গুজরাত-সহ অধিকাংশ রাজ্যে বিজেপি জিতেছে পাশাপাশি হিমাচল প্রদেশে কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী একটা বড় সময় পর্যন্ত দেশে প্রকৃত সর্বভারতীয় দল হিসাবে কেবলমাত্র কংগ্রেসকেই ধরা হত। এমনকী দীর্ঘসময় ধরে বিজেপিকে কেবলমাত্র উত্তর ভারতের দল বলেই মনে করা হত। কারণ ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত বিজেপি উত্তর ভারতের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনও নয়। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর হিসাব বদলে যায়। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় স্থানটি দখল করে নেয় বিজেপি। ২০২২-এ বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। কয়েকটি রাজ্যে যেমন নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় ফিরেছে বিজেপি, তেমনই কয়েকটি রাজ্য হাতছাড়া হয়েছে তাদের। কোথাও আবার গেরুয়া ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে আঞ্চলিক দলগুলি। আর কংগ্রেস হয়ে পড়েছে প্রান্তিক শক্তি।
বিদায়ী বছরে বিজেপি প্রথম ধাক্কা খায় বিহারে। নীতিশ কুমারের নেতৃত্বাধীন জেডিইউ বিজেপি-র এনডিএ জোট থেকে বেরিয়ে লালু প্রসাদ যাদবের নেতৃত্বাধীন জনতা দলের সঙ্গে জোট করে সরকার গড়ে বিহারে। চলতি বছরে মহারাষ্ট্রে শিব সেনার ভিতরের ভাঙনের লাভ পায় বিজেপি। মহারাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল নিয়ে ২০২২-এ শিবসেনায় ভাগাভাগি হয়ে যায়। শিবসেনা নেতা একনাথ শিন্ডে দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বেশ কিছু বিধায়কদের নিয়ে গুয়াহাটি চলে যান। দু’সপ্তাহ ধরে চলা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর উদ্ধব ঠাকরেকে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়। বিজেপির সমর্থন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন একনাথ শিন্ডে। উদ্ধব ঠাকরে না একনাথ শিন্ডে কার শিবসেনা আসল তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। একনাথ শিন্ডে শিবিরকে সমর্থন করে মহারাষ্ট্রের সরকারে থাকার সুযোগ পায় ভারতীয় জনতা পার্টি। দু’সপ্তাহ ধরে চলা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর উদ্ধব ঠাকরে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। একইসঙ্গে ভেঙে যায় মহা বিকাশ আঘাড়ি চালিত সরকার। বিজেপির সমর্থন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন একনাথ শিন্ডে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, গোয়া, মনিপুরে বিজেপি ফের ক্ষমতা দখল করেছে। মণিপুরে ফেব্রুয়ারি-মার্চে বিধানসভা নির্বাচন হয়। সেখানে ৬০টি আসনের মধ্যে ৩২টি আসনে জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিজেপি। উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় আসে তারা। যদিও বাইশের নির্বাচনে দুই রাজ্যেই তাদের আসন সংখ্যা খানিকটা কমেছে। কিন্তু তাতে ক্ষমতায় আসতে কোনও সমস্যা হয়নি বিজেপি-র। কিন্তু পঞ্জাব জয় করেছে আম আদমি পার্টি। আপ দিল্লি পুরসভা নির্বাচনেও বিজেপির গত ১৫ বছরের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছে। ২০২২ সালে যে কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে বছরের শেষ মাসে ফল বেরিয়েছে হিমাচলপ্রদেশ ও গুজরাতের। হিমাচলে কংগ্রেস জিতলেও গুজরাতে ফের ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি।
কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন এই বছর দেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেই সঙ্গে উল্লেখ করতে হয় সেই নির্বাচনে নেহরু-গান্ধী পরিবারের কারও অংশ না নেওয়া। অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হয়েছিল অশোক গেহলট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। কিন্তু পরে মুখ্যমন্ত্রীর পদ নিয়ে টানাপোড়েনের জেরে তিনি আর সভাপতি নির্বাচনে লড়াই করেননি। সভাপতির নির্বাচনে মল্লিকার্জুন খাড়গে শশী থারুরকে হারিয়ে কংগ্রেসের সভাপতি হন।
ভারতের রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা ফিরে পেতে কংগ্রেস রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কন্যাকুমারী থেকে ভারত জোড়ো যাত্রা শুরু করেছে। ইতিমধ্যে সেই যাত্রা ১০০ দিন পূরণ করেছে। ভারত জোড়ো যাত্রার লক্ষ্যমাত্রা হল ১৫০ দিনে ৩৫৭০ কিমি পথ অতিক্রম করা। উল্লেখ্য, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন, সুধীন্দ্র কুলকার্নির মতো ব্যক্তিদের এই যাত্রায় রাহুল গান্ধীর পাশে হাঁটতে দেখা গিয়েছে।
এ বছর ভারতীয় রাজনীতির আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ন্যাশনাল হেরল্ড মামলায় সোনিয়া গান্ধীকে তিনবার এবং রাহুল গান্ধীকে পাঁচবার ইডির সামনে হাজিরা দিতে হয়েছে। বিরোধীরা বছর জুড়েই দুই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি-সিবিআই-এর বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ তুলে আসছেন। বিরোধীদের অভিযোগ তাদের ভয় দেখাতে বিজেপি এই দুই কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করছে। রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী ছাড়াও দলের নেতা ডিকে শিবকুমার, আপ নেতা মণীশ সিসোদিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে বারে বারে সামনে এসেছে দুই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নাম। এছাড়াও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সক্রিয়তায় জেলবন্দি হয়েছেন শিবসেনার সঞ্জয় রাউত, আপের সত্যেন্দ্র জৈন, মহারাষ্ট্রের দুই প্রাক্তন মন্ত্রী নবাব মালিক এবং অনিল দেশমুখ।
২০২২-এ ভারতের রাজনীতির অন্যতম ঘটনা হল মুলায়ম সিং যাদবের মৃত্যু। মুলায়ম সিং যাদব সমাজবাদী পার্টি প্রতিষ্ঠাতাই শুধু নন, তিনি তিনবার উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর হয়েছিলেন।