আজ ২০ জুলাই। ১৯৫৪ সালের এই দিনে জেনেভা সম্মেলন ঠিক করে ভিয়েতনাম থেকে ফরাসি সৈন্যরা সরে যাবে। আগে ভিয়েতনাম ছিল ফরাসি উপনিবেশ। জেনেভা সম্মেলনের পর ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ সরে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ইতালির মত ফ্যাসিস্ট সরকার গুলোর সঙ্গে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেনের মত সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো দুর্বল হলো। আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যমণি হয়ে উঠলো।
১৯৪৫ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেভিড আইজেনহাওয়ার (David Eisenhower)। তিনি জেনেভা সম্মেলনে বলেন ১৭ অক্ষ রেখা ধরে ভিয়েতনাম ভাগ হবে। উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম। উত্তরের রাজধানী হলো হ্যানয়। দক্ষিণের সাইগণ। উত্তর ভিয়েতনাম চালাবে কমিউনিস্টরা। দক্ষিণে বসবে আমেরিকার তাবেদার সরকার বাও দাই, পরে থিউ। কিন্তু কমিউনিস্টরা বললেন দক্ষিণ থেকেও সাম্রাজ্যবাদীদের তারাব। তবে যতটুকু সুযোগ জেনেভা সম্মেলনে পাওয়া গেছে সেটা মানব। উত্তরের কমিউনিস্ট সরকারের প্রেসিডেন্ট হলেন হো চি মিন (Ho Chi Minh)। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফাম ভ্যান দং (Pham Van Dong)। ১৯৩০ সালে ভিয়েতনাম লাওস ও কম্বোডিয়া মিলে তৈরি হয়েছিল ইন্দচিনের কমিউনিস্ট পার্টি। সেই বড় পার্টির এক নম্বর নেতা ছিলেন চাচা হো (Chacha Ho)।
১৯৫৪ সাল থেকে শুরু হলো দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকা হটানোর যুদ্ধ। সে বছর হো চি মিন ভারতে এসেছিলেন। দিল্লি হয়ে কলকাতায় আসেন। তখন কলকাতার ডেকার্স লেনে ছিল সিপিআই এর দফতর। হো সেখানে যান। তখন সিপিআই এর রাজ্য সম্পাদক ছিলেন জ্যোতি বসু। এটাও মাথায় রাখতে হবে তখন ভারতের নেহেরু সরকারের বিদেশ নীতি ছিল প্রগতিশীল। চাচা নেহরু চাচা হো কে বলেন আমরা আপনাদের দাবি মানি। দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকা হটানোর লড়াই চলবে।
আমেরিকার টাকার প্রবাহে পুরো দক্ষিণ ভিয়েতনাম না হোক রাজধানী সায়গণ ছিল কিছুটা উন্নত। কমিউনিস্ট শাসিত উত্তর ছিল অন্নুনত। ততদিনে লাওস, কম্বোডিয়া আলাদা হয়ে গেছে। ইন্দচিন কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে তিনটি কমিউনিস্ট পার্টি হয়েছে। ভিয়েতনামে দুটো নয়, একটাই কমিউনিস্ট পার্টি। ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টি (vietnam workers party)। ১৯৫৪ সাল থেকে শুরু হলো দক্ষিণ ভিয়েতনাম মুক্ত করার লড়াই। চাচা হো বললেন, শুধু কমিউনিস্টরা নয় দেশের সবাই মুক্তি চাইছেন। তাই ডেমোক্রেটিক পার্টি, বুদ্ধিস্ট লিগ সবাইকে নিয়ে তৈরি হলো ন্যাশনাল লিবারেশন ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (National Liberation Democratic Front)। কিন্তু অন্য দলগুলি আমেরিকাকে হটাতে চাইলেও তারা সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাস করতো না। জীবন যাত্রায় পুরো গান্ধীবাদী কিন্তু চিন্তা ভাবনায় হঠকারিতা না করলেও প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন হো।
১৯৫৪ সাল থেকে শুরু হলো দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকা হটানোর লড়াই। তখন ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক ছিলেন ট্রু অং চিন (Truong chinh), মিলিটারি মন্ত্রী তথা গেরিলা যুদ্ধের নেতা ছিলেন ভো নগন গিয়াপ (Vo Nguyen Giap)। দশ বছর পর আমেরিকা আরও আগ্রাসী হলো। নাপাম (Napalm) নামে এমন বোমা ফেলতে লাগলো, যে মাটি পুড়তে লাগলো। একে ইংরিজিতে বলা হতো আমেরিকার ঝলসে যাওয়া-আর্থ নীতি (scorched-earth policy)। সেই মাটিতে আর ফলন হবে না। হো বললেন, ঘরের মেয়েরা অন্য কাজ করার ফাঁকে রাইফেল চালানো শিক্ষা নেবে। বিরাট লড়াই। চীনে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা করার জন্যে মাও সেতুং (Mao Zedong) সশস্ত্র বিপ্লব করতে বলেছিলেন। হো তাই বললেন। দুটো দেশেই মানুষের ভোটাধিকার-সহ কোনো অধিকার ছিল না। ভারতের সঙ্গে এখানেই পার্থক্য। ভিয়েতনামের যুদ্ধ নিয়ে ১৯৬৫ সালে সাংবাদিক উইলফ্রেড বার্চেট (Wilfred Barchet) লিখেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বই ভিয়েতনাম। ফরাসি সাংবাদিক জন ল্যাকাউচার (Jean Lacouture) লিখেছিলেন হো চি মিন। বাংলায় ১৯৬৬ সালে লিখেছিলেন সৌরিন সেন ভিয়েতনাম। এই তিনটি বই পড়ার জন্যে আমি ছটপট করতাম। তিনটি বই পড়তে পেরেছি বলে আমি গর্বিত না বললেও আনন্দিত।
আবার ১৯৭১ সালে সিপিআইএম(এল) ছাড়ার সময় বুঝেছি লেনিন মাও চাচা হো, ফিদেল সবাই বলেছেন দেশের অবস্থা না বুঝে অন্য দেশের লড়াইয়ের খবরে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই লড়াইয়ের নকল করতে যাওয়া আত্মহত্যার রাজনীতি করা। ওতে দেশের মানুষের কোনো লাভ হয়না। যেটা করতে গিয়ে ১৮৪৮ ও ১৯৬৯ সালে অনর্থক প্রচুর ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। দুবারই দু-বছরের মাথায় প্রচুর ক্ষতি স্বীকার করে হারতে হয়েছে। শত্রু ও নিজেদের শক্তির ভারসাম্য না বুঝে লড়াই করতে গেলে যা হয়।

যাই হোক ১৯৭১ সালে বিপর্যস্ত সিপিআইএম(এল) দলের কর্মীরা ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি শনিবার কার্জন পার্কে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে থাকে। গান, নাটক, কবির লড়াই হয়। ২০ জুলাই তারা ভিয়েতনাম দিবস পালন করে। ১০০ কর্মী জড়ো হতেন। সংখ্যা বাড়িয়ে বলা আমার স্বভাব নয়। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঘটলো অঘটন। সেদিনও সাংস্কৃতিক কর্মীরা জড়ো হয়েছিলেন। হটাৎ জমায়েত থেকে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করে। কর্মীরা ভ্যান ঘিরে বিক্ষোভ দেখায়। আরও পুলিশ আসে। বেপরোয়া লাঠি চালায়। লাঠির ঘায়ে ওখানেই মারা যায় ভবানীপুরের সাঁখারিটলার ১৭ বছরের নাটক অনুরাগী প্রবীর দত্ত। দীপা চ্যাটার্জি তাকে ট্যাক্সি করে মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যান। ততক্ষণে মৃত। তারপর হাসপাতালে পৌঁছান এপিডিআর-এর সঞ্জয় মিত্র। আসেন তখনকার সিপিআই যুব নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত। তিনি দু-ঘণ্টা হাসপাতালে ছিলেন। কিন্তু সঞ্জয়দা সারা রাত কাটিয়ে সকালে থেকে দুপুরে ময়না তদন্ত পর্যন্ত ছিলেন। সেই ঘটনার প্রতিবাদে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে বিরাট সভা হয়।
তারপর ১৯৭৭ সালে-র ২০ জুলাই উদ্যোগ নিয়ে সুজাতা সদনে একটি সভা করা হয়। সভাপতিত্ব করেন গণেশ ঘোষ। বক্তা ছিলেন অরুণ প্রকাশ চ্যাটার্জি, রাজ্য সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের নেতা সিপিআইএম-এর অরবিন্দ ঘোষ। সঞ্চালনার দায়িত্ব ছিল আমার। প্রবীর দত্তর মা রানু গুপ্ত পুলিশের বিরুদ্ধে কেস করেছিলেন। কিন্তু বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছিল। আজ সেই ২০ জুলাই। ৪৮ বছর আগের কথা কমরেডদের একটু মনে করিয়ে দিলাম। ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল দক্ষিণ ভিয়েতনাম মুক্ত হয়েছে। দুটো ভিয়েতনাম এক হয়েছে। দশ কোটি দেশের লোক। আজকের ভিয়েতনাম জানতে হবে। তার আগে নিজের দেশটা ভালো করে জানতে হবে।