পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুরে ২১ দিনব্যাপী জসিম পল্লীমেলা শুরু হয়েছে। ২১ জানুয়ারি ২০২৩ শনিবার জেলাশহর অম্বিকাপুরে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের নিজ বাড়ির পাশে কুমার নদের তীরে। জেলা প্রশাসন ও জসীম ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করে থাকে।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ১২০তম জন্মবার্ষিকী এবার। এই মেলা উদ্বোধন করেন কবির ছোট জামাতা ও প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী (বীরবিক্রম)। জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদারের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘আপনারা যদি কবি জসীমউদ্দিনকে জানতে চান তবে তাঁর বই পড়তে হবে। তাঁর কৃতকর্মগুলো সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করতে হবে।’
নতুন প্রজন্মকে উদ্দেশ্য করে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘প্রচারের অভাবে পল্লীকবি জসীমউদ্দিন সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে। নতুন প্রজন্ম আজকাল বই পড়া ভুলে যাচ্ছে। তাই, নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে। জসীমউদ্দিনের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে একসময় নতুন প্রজন্ম জসীমউদ্দিনকে ভুলে যাবে।’

এবারের মেলায় বিভিন্ন স্টলে লোকজ বিভিন্ন চারু ও কারুপণ্যের বিপণনের ব্যবস্থা রয়েছে। মেলায় ১৫০-২০০টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন বিকেলে মেলার মাঠ প্রাঙ্গণে জসীম মঞ্চে গান, নাচ, নাটক-সহ বিভিন্ন লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকছে। এতে ফরিদপুর-সহ জেলার বাইরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করছে। মেলায় রয়েছে হস্ত, মৃৎ, বাঁশ ও বেত শিল্প-সহ গ্রামীণ মানুষের ব্যবহৃত নিত্যদিনের জিনিসপত্তর। এছাড়াও শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য রয়েছে সার্কাস, নাগরদোলা-সহ বিভিন্ন রকমের রাইডস।
প্রসঙ্গত পল্লীকবি জসীমউদ্দিন গ্রাম বাংলার পল্লীর মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার চিত্র বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি ছাড়া আর কোন কবি পল্লীকে এমন ভাবে তুলে ধরেননি। তার লেখা থেকে দু-একটা উদাহরণ দিলে পাঠক বুঝতে পারবে তিনি কতটা ভালবাসতেন পল্লী বাংলাকে।

“ওইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে, / ত্রিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে” —
কবিতার লাইন দুটি জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতার প্রথম দু-চরণ। এ কবিতা এত সুপরিচিত যে নতুন করে এর পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। জসীমউদ্দীন পল্লী গাঁয়ের কবি হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিত। এর খুব সহজ ব্যাখ্যা হলো এই, জসীমউদ্দীনের অধিকাংশ কবিতাতেই উঠে এসেছে পল্লীর কথা। পল্লী মায়ের রূপ সুনিপুণ ও দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পল্লী কবির অন্তরে যেন সদা ধ্বনিত হতো পাড়া গাঁয়ের কথা। কবি হিসেবে সর্বাধিক পরিচয় থাকলেও জসীমউদ্দীন ছিলেন একজন গীতিকার, লেখক, রেডিও ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষক। তিনি নিজে পল্লীর রূপে যেমন মুগ্ধ ছিলেন তেমনি কবিতার ভাষায় অন্যকেও তার গ্রামের সৌন্দর্য দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তার বিখ্যাত “নিমন্ত্রণ” কবিতার এই কয়েকটি লাইন—
তুমি যাবে ভাই-যাবে মোর সাথে, আমাদের
ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের
স্নপহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই-যাবে মোর সাথে, আমাদের
ছোট গাঁয়।

নিমন্ত্রণ কবিতায় কবির যে আকুল আমন্ত্রণ সে আমন্ত্রণে প্রতিটি লাইনেই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে হাজার বছর ধরে চলে আসা গাঁয়ের ভালোবাসায় ভরা রূপের কথা। তাকে পল্লীকবি কেন বলা হয় তা তার কবিতাগুলো একটু পড়লেই স্পষ্ট হয়ে যায়। তার রাখাল ছেলে কবিতাটি পড়লেও গ্রাম বাংলার প্রকৃতির রূপের দেখা পাওয়া যায়।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অমর কীর্তিকে ধরে রাখার জন্য ফরিদপুরে ২১ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী জসীম পল্লীমেলা অবশ্যই অপরিহার্য।
এই মেলার যাওয়ার ব্যবস্থা : বেনাপোল টু ঢাকা বাসে ফরিদপুর শহরে নেমে রিক্সা বা ইজিবাইকে মেলায় পৌচ্ছান যায়। অন্যদিকে, ঢাকা টু ফরিদপুর সরাসরি বাস পাওয়া যায়। রাত্রিযাপনের জন্য ফরিদপুর শহরে মানসম্মত হোটেল পাবেন।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।