ঠিক বেলা ১২ টা বেজে ৫০ মিনিট। বৃষ্টির তেজ বেশ কিছুটা কমে গেছে। মঞ্চে উঠলেন জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ডায়াসে তখন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এবং মঞ্চে অধিষ্টিত সাংসদ, বিধায়ক, শহিদ পরিবারের সদস্যগণ-সহ বিশিষ্ট জনেরা। জয়ধ্বনি দিয়ে স্বাগতম জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মাইক হাতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সিঁড়ি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তথা জননেন্ত্রীকে স্টেজে নিয়ে আসলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। সূর্য দেখা দিয়েছে।
সকাল ৭ টা থেকেই হাওড়া ব্রিজ, সেকেন্ড হুগলী ব্রিজ, দক্ষিনেশ্বরের নিবেদিতা সেতু, শিয়ালদহ ব্রিজ মানুষের পায়ে পায়ে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু জোড়াফুলের পতাকা। মিটিং শুরুর সময় ছিল ১২টা থেকে। কিন্তু সকাল ৯টা তেই ধর্মতলা চত্বর লোকেলোকারণ্য। সাড়ে ১১টার সময় রাজ্যের মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় সভাপতির আসনে আহ্বান জানান সুব্রত বক্সীকে। তিনি সেই পদ গ্রহণ করে প্রথম বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল কেন আজও ২১ জুলাই তৃণমূল কংগ্রেস শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে। তিনি মনে করিয়ে দেন সাড়ে ৭ কোটি মানুষের সচিত্রপরিচয় পত্রের দাবিতে ১৯৯১ সালে তৎকালীন যুব কংগ্রেসের সভাপতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলন শুরু করেছিলেন। প্রথমে ঠিক হয়েছিল এই কর্মসূচি পালন করা হবে ১৪ জুলাই। কিন্তু সেই সময় তৎকালীন রাজ্যপাল মারা যাবার কারণে কর্মসূচি পরিবর্তন করে ২১ জুলাই করা হয়েছিল।

এর পরের বক্তা ছিলেন সৌগত রায়। তিনি জানান, ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে এই জায়গাটি খুবই পবিত্র জায়গা। প্রতি বছর তৃণমূল কংগ্রেস এখানে ২১ জুলাই শহিদ তর্পণ করেন। ২০১১ সালের আগে বিরোধী থাকার সময় অনেকবারই তখনকার বাম সরকার এই জায়গায় শহিদ তর্পণ করতে আপত্তি জানায়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতি বছর এখানেই শহিদ দিবস পালন করে আসছেন। করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে ভার্চুয়ালি শহিদ দিবস পালন করা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা শোনার জন্য সারা রাজ্য থেকে মানুষ এই স্থানে কোভিড বিধি মেনে, উপস্থিত হননি ঠিকই কিন্তু শহিদ স্মারকে আমরা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।

এর পর ঠিক ১১.৪৫ মিনিটে শহিদ বেদীতে মাল্যদান করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঞ্চে তখন বক্তব্য রাখছেন সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমেই তিনি শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। প্রায় ১৫ মিনিটের ভাষণে সুদীপবাবু কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে বিশেষ তোপ দাগেন। কেন্দ্রীয় সরকার কোন কোন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে বিপন্ন করছে তার বিস্তারিত ৮টি পয়েন্ট উল্লেখ করেন তিনি। যেমন নোট বন্দি, অপরিকল্পিত ভাবে লকডাউন ঘোষণা, ত্রুটিপূর্ণ জিএসটি, চীন সম্পর্কে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া, সিবিআই ও ইডিকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভাঙার চেষ্টা ইত্যাদি। এর পরের বক্তা ছিলেন জি.টি.এ-র চেয়ারম্যান অনিক থাপা। তিনি জানান সকল মানুষের ভালোর কথা ভেবে, উন্নয়নের কথা ভেবে তাঁরা তৃণমূলের পাশে থাকবেন। কারণ তাঁরা মনে করেন একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই পারেন সকল রাজ্যবাসীর মুখে হাসি ফোটাতে, সকলের কর্মসংস্থান করতে। এর পরের বক্তা ছিলেন শত্রুগ্ন সিনহা। তিনি হিন্দি ভাষায় বক্তব্য রাখেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি ‘আয়রন লেডি’ ও ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে জানান, ‘বহত জান হ্যায় ইস সভামে’। ২১ জুলাইকে কেন্দ্র করে সারা রাজ্যবাসীর প্রতিক্রিয়া দেখে তাঁর এই ধারনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

১২.১৫ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন রাজ্যের মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তখন সকালের গুমোট ভাব কেটে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। বৃষ্টিও নামে প্রচন্ড ধারায়। পার্থবাবু বলেন কেন্দ্রীয় সকরারের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দিক নির্দেশ করে পথ দেখাবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দেখানো পথে আমরা চলব। তৃণমূল কংগ্রেস সুসংগঠিত দল। এই দলে নবীন-প্রবীণ মিলেমিশে থাকে। নবীন-প্রবীণের এই মেলবন্ধন ও দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূরদর্শিতা তৃণমূলের এগিয়ে যাওয়ার পাথেয়। শেষে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। এর পরের বক্তা ছিলেন শিউলি সাহা। ১২.২০ মিনিটে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। এর পরের দুজন বক্তা ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম ও বিরবাহা হাঁসদা।
প্রচন্ড বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মাইক হাতে স্টেজে ওঠেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানান, সিন্ডিকেট করলে তৃণমূল করা যাবে না এবং মনে করিয়ে দেন দলের এক নম্বরে অবস্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবং তার পর দলের কর্মীরাই সব। তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য সৎ ও মানুষের পাশে থাকা ব্যক্তিই দলের মনোনয়ন বা টিকিট পাবে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এই সভার প্রধান বক্তা। তাঁর দিকনির্দেশর দিকেই তাকিয়ে এত ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে লক্ষ লক্ষ জনতা সভাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। যত জন সভাস্থলে আসতে পেরেছেন তার থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশি মানুষ রাস্তায় আটকে ছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তৃতা দিতে উঠেই জানান যাঁরা যেখান পর্যন্ত এসেছেন তাঁরা সেখানেই যেন থেমে যান, সভাস্থলের দিকে এগিয়ে আসার আর দরকার নেই। শহরের নানা জায়গায় জায়েন্ট স্কিন লাগানো ছিল, যাতে দলনেত্রীর বক্তব্য সবাই শুনতে পান। মুড়ি, চিড়ের ওপর কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে জিএসটি চাপাচ্ছে তার প্রতিবাদ করেন মুখ্যমন্ত্রী। রান্নার গ্যাস, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়েও কেন্দ্রের ওপর তোপ দাগেন মমতা। একই সঙ্গে জানান, দেউচাতে কাজ শুরু হয়ে গেছে। ওখানে অনেক কর্মসংস্থান হবে এবং ভবিষ্যতে ভালো কয়লা পাবার দরুন রাজ্যবাসীর ওপর থেকে বিদ্যুতের দামের বোঝা অনেকটা লাঘব হবে। রাজ্যে ১৭ হাজার শিক্ষকের পদও ফাঁকা আছে জানান তিনি। কোর্ট অর্ডার দিলেই সেই শূণ্যপদ পূরণ হবে। এছাড়া তিনি জানান রাজ্যের এক জন মানুষও যাতে অভুক্ত না থাকে সেই বিষয়ে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে জানাবার ব্যবস্থা করবেন তিনি কয়েক মাসের মধ্যেই। এর পর দুর্গাপুজো পর্যন্ত কর্মীদের কী কী কর্মসূচি পালন করতে হবে তার তালিকা দেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমাবেশ শেষ হয় দুপুর ২টোর সময়।