পুলিশের গুলিতে এখানে কোনও নিরীহ আন্দোলনকারীর রক্তাক্ত নিষ্প্রাণ দেহ রাজপথে লুটিয়ে পড়েনি ঠিকই, কিন্তু পুলিশি নৃশংসতার দিক দিয়ে সেদিন কোনও অংশেই পিছিয়ে ছিল না বড়বাজার লাগোয়া ব্র্যাবোর্ন রোড এলাকা। মতান্তর থাকলেও অনেকেরই বিশ্বাস, সেদিনের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভাঙতে পুলিশের দিক থেকে সুপরিকল্পিত প্ররোচনার শুরু মহাকরণের নিকটতম এই জায়গাটাতেই। হ্যাঁ, ১৯৯৩-এর ২১ জুলাইয়ের কথাই বলছি। যেদিন জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যুব কংগ্রেসের যুক্তিপূর্ণ এবং অবশ্যই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনের নামে মানবিকতার চরম অবমাননা করেছিল সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন সরকারের পুলিশ। মেয়ো রোড ধর্মতলা এলাকায় পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল ১৩ জন আন্দোলনকারীর। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হয়েছিল আহতের তালিকা। ব্যাপক গণ্ডগোল শুরু হয়ে যাওয়ায় জমায়েতের সব কটা পয়েন্টে পৌঁছোনো সম্ভব ছিল না ঠিকই, কিন্তু মহাকরণের একেবারে নাকের ডগায় টি বোর্ড-ব্র্যাবোর্ন রোডের ঘটনা দেখে মনে হয়েছিল যে পুলিশ শুধু সভ্যতার সীমা ছাড়ায়নি সেদিন, ছাড়িয়েছিল শালীনতার সীমাও।
জনতার স্রোতে পুলিশি প্ররোচনা
আন্দোলনের উত্তরমুখী মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল টি বোর্ডের কয়েক পা দূরে এক ছোট্ট মন্দিরের পাশে। তখন তো আর দ্বিতীয় হুগলি সেতু বা বিদ্যাসাগর সেতুর ওপর দিয়ে সদলবলে আসার উপায় ছিল না, তাই রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে হাওড়া ব্রিজই ছিল মূল কলকাতার গেটওয়ে। হাওড়া জেলার তো বটেই, দুই মেদিনীপুর, হুগলি, বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এমনকী উত্তরবঙ্গের অনেক জেলার মানুষকেও কলকাতার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আসতে হতো এই হাওড়া ব্রিজ দিয়েই। সেদিনও মমতার ডাকে হাওড়া ব্রিজ হয়ে একের পর এক মিছিল আসছিল মহাকরণ অভিযানে যোগ দিতে। শুধু মানুষের ঢল। কোনও কোনও মিছিল মহাকরণ অভিমুখে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে এগোলেও হাওড়া শহর এবং গ্রাম থেকে আসা বড়ো মাপের মিছিলগুলো কিন্তু একের পর এক টি বোর্ডের দিকে এগোচ্ছিল ব্র্যাবোর্ন রোড ধরেই। সেই সময়ের প্রদেশ কংগ্রেসের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর নিষেধকে পাত্তা না দিয়েই নবীন-প্রবীণ কংগ্রেসিদের ঢল নেমেছিল ওই এলাকায়। যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনুগামীদের নিয়ে টহল দিচ্ছিলেন প্রতিটা পয়েন্টে। বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন অন্দোলনের রূপরেখা। কখনও ট্রাফিক স্ট্যান্ডে বসেই নির্দেশ দিচ্ছিলেন শত প্ররোচনার মুখেও সংযত থাকার। কিন্তু আচমকাই ছন্দপতন। যতটুকু মনে পড়ছে, ব্র্যাবোর্ন রোডের মঞ্চে নেতাদের ভাষণ শুরু হতে না হতেই ডানদিকে মন্দিরের সামনে কিছু সশস্ত্র পুলিশকর্মী তর্কাতর্কি শুরু করে দিলেন শ্রোতাদের সঙ্গে। প্রথমে ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি। তারপরেই লাঠিচার্জ। সৌগত রায়ের মতো নেতা তখনও দলীয় কর্মীদের সংযত থাকার আবেদন জানাচ্ছিলেন। কিছু বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন পুলিশ অফিসারদের। তবুও অসংযত পুলিশ মঞ্চের ওপরে উঠেও শুরু করলো ব্যাপক মারধর। কারণ সত্যিই অজানা। আপাতদৃষ্টিতে কিন্তু আন্দোলনকারীদের দিক থেকে চোখে পড়েনি কোনও প্ররোচনা। তা সত্ত্বেও আচমকাই পুলিশের এমন রুদ্রমূর্তি দেখে হতবাক জনতা। হুড়োহুড়িতে ভেঙে পড়ার জোগাড় আন্দোলনের মঞ্চ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাঁদানে গ্যাস নিরীহ জনতাকে লক্ষ্য করে। পালাতে গিয়ে যাঁরা মুখ থুবড়ে পড়লেন রাস্তায়, তাঁদের পিঠেও পড়তে লাগলো লাঠির ঘা। সবটাই কিন্তু একতরফা। অসুস্থ হয়ে পড়লেন অনেকেই। এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ মাদল-ধামসা নিয়ে উঠে পড়লেন মঞ্চে। ধামসা বাজিয়ে ভয়ার্ত সহকর্মীদের ফিরে আসতে আহ্বান জানালেন তাঁরা। ১৯৯০-তে বাসভাড়া আন্দোলনে হাওড়া ব্রিজের মুখে পুলিশের গুলিতে নিহত শিক্ষিকা বিমলা দে-র স্বামী প্রাণকৃষ্ণ দে-ও চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন যুবকর্মীদের। কাজও হলো। ঠিক এই সময়েই এসে পড়লেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী। দলবল নিয়ে। পুলিশি হামলায় বিধ্বস্ত কর্মীদের মনোবল জোগালেন। একজনকে স্নেহের ধমকও দিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকেই ঘিরে ফেলল সশস্ত্র পুলিশের দল। তিনি চলে যেতেই আবার গণ্ডগোল এবং পুলিশের একতরফা হামলা। দফায় দফায় লাঠিচার্জও। এবারে শুরু হয়ে গেল কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টাও। শোনা যায়, স্থানীয় কিছু হকারও নাকি সেদিন ভিড়ে মিশে গিয়ে গোলমাল পাকিয়ে তার দায় আন্দোলনকারীদের ওপরে চাপাতে চেয়েছিল। ততক্ষণে অবশ্য ব্যাপক গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়েছে মেয়ো রোড, ধর্মতলা এলাকায়। আক্রান্ত, রক্তাক্ত নেত্রী মমতা। পুলিশের গুলিতে একের পর এক মৃত্যুর খবর আসছে।
সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা এবারে শুনে নিন তখনকার যুবনেতা এবং আজকের সমবায় মন্ত্রী অরূপ রায়ের কাছে। তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন সেদিনের আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা আরও কয়েক জন বিশিষ্ট মানুষও।
অরূপ রায়ের স্মৃতিতে
নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে আগের দিন থেকেই হাওড়া স্টেশনে ক্যাম্প করে বসেছিলাম আমরা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেনে-বাসে আসা দলীয় কর্মী-সমর্থকদের স্বাগত জানানোর জন্যই খোলা হয়েছিল এই ক্যাম্প। দায়িত্বে বাণী সিংহ আর আমি। সব্বাই মোটামুটি পৌঁছে গিয়েছিলেন বেশ সকাল সকালই। তারপরে বেলা এগারটার পরে মিছিল নিয়ে ব্র্যাবোর্ন রোডের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পালা। শান্তিপূর্ণ মিছিল এগোচ্ছিল খুব ধীরে। কিন্তু টি বোর্ডের সামনে পৌঁছোনোর আগেই আচমকা পুলিশের আক্রমণের মুখে পড়ে গেলাম আমরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই উর্দিধারীদের লাঠি পড়তে শুরু করলো যুব কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের পিঠে, মাথায়। বাদ গেলেন না প্রবীণরাও। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কথা নেই বার্তা নেই কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়তে শুরু করলো পুলিশ। হাজার হাজার লোককে তাড়া করে নিয়ে যাওয়া হলো হাওড়া স্টেশনের দিকে। পুলিশি আক্রমণের মুখে দিশাহারা হয়ে বাইরে থেকে আসা অনেক কর্মী-সমর্থকই প্রাণ বাঁচাতে ঢুকে পড়লেন স্টেশন চত্বরে। কিন্তু এখানেও রক্ষা নেই। সাবওয়ে এবং স্টেশন চত্বরে ঢুকে এবারে হাওড়া পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ শুরু করলো। মার থেকে রেহাই পেলেন না নিরীহ ট্রেনযাত্রীরাও। সহ্যের সীমা ছাড়ালো এবারে। প্রতিবাদ করলাম, রুখে দাঁড়ালাম। ব্যাপক তর্কাতর্কি শুরু হলো পুলিশের পদস্থ অফিসারদের সঙ্গে। আমাদের সমস্ত কর্মী রওনা না হওয়া পর্যন্ত গভীর রাত অবধি স্টেশনের মাটি কামড়ে পড়ে থাকলাম আমরা।
সাঁড়াশি আক্রমণ
মিছিলে সেদিন অরূপ রায়ের সঙ্গেই ছিলেন হাওড়া পুরসভার আজকের মেয়র পারিষদ বিভাস হাজরা। তাঁর কথায়, ব্র্যাবোর্ন রোডে পেট্রোল পাম্পের সামনে হঠাৎ একটা টিয়ার গ্যাসের শেল এসে ফাটে ঠিক তাঁর পায়ের কাছে। চোখে অন্ধকার দেখে বিভাস ভাইকে জড়িয়ে ধরে পড়ে যান রাস্তায়। সেই অবস্থাতেই পিঠে এসে পড়ে লাঠির ঘা। পুলিশের তাড়া খেয়ে হাওড়া ব্রিজের দিকে ছুটতে গিয়ে দেখলেন সেখানেও নিস্তার নেই। হাওড়ার দিক থেকেও লাঠি হাতে তেড়ে আসছে বিশাল পুলিশবাহিনী। অনেকের মুখেই অশ্লীল ভাষা। সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়ে হাওড়া ব্রিজ থেকে গঙ্গার জলে ঝাঁপ দেওয়ার উপক্রম ভয়ার্ত মানুষের। কিন্তু শান্তিপূর্ণ মিছিলকারীদের ওপরে এমন পুলিশি হামলা কেন, তার কোনও উত্তর নেই।
আইনজীবী নেতাদের চোখে
সেদিন প্রথম দফার মিছিলে ছিলেন হাওড়া কোর্টের তিন দুঁদে আইনজীবী তপন রায়চৌধুরী, সমীর বসু রায়চৌধুরী এবং দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। এর মধ্যে তপনবাবু এবং দেবাশিসবাবু প্রাক্তন কাউন্সিলর। সমীরবাবু আজও তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যন্ত সক্রিয় নেতা। সেদিনের সেই মুহূর্তটার কথা ভাবলে এখনও কেমন যেন আনমনা হয়ে যান তপন রায়চৌধুরী। তাঁর কথায়, ‘প্রিয়দার সঙ্গে হাঁটছিলাম আমরা। সঙ্গে প্রায় ৫০ জন। আচমকাই দেখি সশস্ত্র পুলিশের দল ঘিরে ফেলেছে আমাদের। প্রায় প্রত্যেকের কোমর থেকেই উঁকি দিচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। তারপরে সবাইকেই তুলে দেওয়া হলো পুলিশ ভ্যানে।’ প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর মতো নেতাকে গ্রেফতার করতে এত আগ্নেয়াস্ত্রের কী প্রয়োজন ছিল তা আজও মাথায় ঢোকে না প্রবীণ আইনজীবী তপনবাবুর। আর সমীরবাবুর ভাষায়, পুলিশি স্বেচ্ছাচারিতার এমন ভয়াবহ রূপ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনও দেখেননি। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা, বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েই বিনা প্ররোচনায় সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকারীদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পুলিশ।
ছাত্রনেতার তিক্ত অভিজ্ঞতা
দক্ষিণ উলুবেড়িয়ার তৃণমূল বিধায়ক পুলক রায় তখন ছিলেন হাওড়ার অবিভক্ত ছাত্র পরিষদের শীর্ষনেতৃত্বে। দক্ষ সংগঠক পুলক ২১ জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহাকরণ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন কয়েকশো ছাত্র-ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে। ব্র্যাবোর্ন রোডে পুলিশের ভয়াবহ আচরণ দেখে তাঁর স্থির বিশ্বাস, শুধু পুলিশ নয়, সিপিআইএমের ক্যাডারবাহিনীকেও সেদিন পুলিশের ছদ্মবেশে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল নিরীহ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপরে।
কেন এমন অভব্যতা?
অবিরত লাঠি আর কাঁদানে গ্যাসের আস্ফালনে তখন সত্যিই ছত্রভঙ্গ আন্দোলনকারীরা। রাস্তাঘাট শুনশান। বেবোর্ন রোড জুড়ে ছড়িয়ে আছে চটি, জুতো। ঘণ্টাখানেক পরে আশপাশে আশ্রয় নেওয়া নিরীহ পথচারীরা, যাঁদের সঙ্গে আদৌ কোনও যোগ ছিল না আন্দোলনের, ধীরে ধীরে রওনা দিতে চেষ্টা করছিলেন নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে। কিন্তু আশ্চর্য, মঞ্চের কাছে তাঁদের প্রত্যেককে পড়তে হচ্ছিল রীতিমতো পুলিশি জেরার মুখে। তারপরে যাঁদের যাওয়ার অনুমতি মিলছিল তাঁদের শরীরের পশ্চাতদেশে লাঠির ঘা মেরে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন এক বয়স্ক পুলিশ অফিসার। সামান্য দূর থেকে ভেসে আসছিল কয়েক জন পুলিশকর্মীর অশ্লীল মন্তব্য। না, নবীন-প্রবীণ কেউই রেহাই পাচ্ছিলেন না পুলিশের এই অপমানজনক আচরণ থেকে। শেষ পর্যন্ত এক মহিলা রুখে দাঁড়ানোয় গুটিয়ে যায় পুলিশি ঔদ্ধত্য।
প্রথমে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি এবং পরে সাংবাদিকতার সূত্রে অনেক আন্দোলন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। কিন্তু সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখে আমার মনে হয়েছিল, শুধুমাত্র সভ্যতা নয়, শালীনতারও মাত্রা ছাড়িয়েছিল পুলিশ।
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২১ জুলাই ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত