গত বছর নভেম্বর মাস থেকে ৩ কৃষি আইন বাতিল ও ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি গ্যারেন্টির দাবিতে রাজধানীর বুকে আন্দোলন করছেন কৃষকরা। আগামী ২৬ নভেম্বর এই আন্দোলনের এক বছর পূরণ হবে। তার আগে আগামীকাল ২৭ সেপ্টেম্বর ১০ মাস পূর্তির দিনই আন্দোলনকারী কৃষকরা ভারত বনধের ডাক দেন উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরে আয়োজিত কিষাণ মহাপঞ্চায়েত থেকে। এই নিয়ে চলতি বছর তিনবার কৃষকদের পক্ষ থেকে বনধের ডাক দেওয়া হল। সংযুক্ত কিসান মোর্চার তরফে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠন, শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠন সহ প্রায় ১০০ টি সংগঠন ভারত বনধের সমর্থন জানাচ্ছে।
উল্লেখ্য, কৃষকরা নিজেদের দাবিকে আরও দৃঢ় করতে ও জনগণের মধ্যে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ভারত বনধের ডাক দিয়েছে মোর্চা। প্রথমে ২৫ সেপ্টেম্বর এই বনধের ঘোষণা করা হয়, পরে মুজফ্ফরনগর মহাপঞ্চায়েত থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর বনধের ঘোষণা করা হয়েছে। বলা দরকার, কৃষিপণ্যের জন্য সরকারের ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ বা এমএসপি বহাল থাকবে, স্বামীনাথন কমিটির রিপোর্ট বাস্তবায়ন করে এবং কৃষিখাতের দালাল বা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের ভূমিকাকে খর্ব করে এই বিল কৃষকদের জন্য নানা সুবিধা নিয়ে আসবে। সরকার এই আশ্বাস দিলেও কৃষক বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনরত কৃষকদের আশঙ্কা, বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য তারা যে এতদিন সরকারের বেঁধে দেওয়া ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ পেতেন, এই বিল পাস হওয়ার পর সেই নিশ্চয়তা আর থাকবে না। কারণ, নতুন বিলে সরকার নিয়ন্ত্রিত এই কৃষি মান্ডিগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। তাঁরা মনে করছেন নতুন কৃষি আইনে, বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য সরকারের নির্ধারিত সহায়ক মূল্যের নিশ্চয়তার বদলে বৃহৎ পুঁজিপতি বা কর্পোরেটদের মর্জির ভরসায় থাকতে হবে, যেটা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এক সময় নীলকর সাহেবরা দাদন দিয়ে কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করতেন, নতুন কৃষি আইনে ছোট জমির মালিক বা একেবারে ছোট চাষিরা অনেকটা সেই অবস্থায় পরবে বলে তাদের আশঙ্কা।
কৃষকদের বক্তব্য, ছোট বা মাঝারি আড়তদাররা এখনও তাদের পণ্য কিনছেন, কিন্তু কেন্দ্র সরকারের নতুন কৃষি আইন মেনে নিলে তাদের হঠিয়ে চলে আসবে বড় কর্পোরেট। আর তাদের নিয়ে আসতেই এই বিল।ঠিক যেভাবে মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে জিও আর এয়ারটেল ছাড়া আর সব প্লেয়ার বাজার থেকে আজ উধাও, ঠিক সেভাবেই শুধুমাত্র বড় পুঁজিপতিদের কাছে ফসল বেচতে তাদের বাধ্য করা হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চাপেই কেন্দ্র সরকারের এই পদক্ষেপ বলে মনে করেন কৃষকরা। যে কারণে রাজনীতিবিদ ও অ্যক্টিভিস্ট যোগেন্দ্র যাদব বলছিলেন, পাস হওয়ার মাত্র পাঁচদিনের বিরুদ্ধে সারা দেশের সব রাজ্যে ও সব কৃষক সংগঠন মিলে যেভাবে এই বিলের প্রতিবাদে নেমেছে তা ভারতে আগে কখনও হয়নি। যে কারণে পাঞ্জাবের পাটিয়ালা থেকে তামিলনাডুর সালেম সর্বত্র কৃষকরা একটাই দাবি জানাচ্ছেন- তাদের মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের গ্যারান্টি চাই।
তাহলে কি নতুন কৃষি আইন কৃষকদের সব দিক থেকেই মারবে? পার্লামেন্টে পাস হওয়া যে তিনটি বিল নিয়ে ১০ মাস ধরে কৃষকেরা লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং কোনওভাবেই সরকারের চাপের কাছে মাথা নোয়াতে রাজি নন, তার প্রথমটিতে সরকার নিয়ন্ত্রিত পাইকারি কৃষিবাজার বা মান্ডিগুলো কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিলটি ফসলের আগে থেকে ঠিক করে রাখা দামে চুক্তিভিত্তিক চাষ বা কনট্রাক্ট ফার্মিংয়ের পথ প্রশস্ত করবে। আর ব্যবসায়ী বা উৎপাদকরা চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজ ইত্যাদি কতটা মজুত করতে পারবেন, এই মুহুর্তে তার ওপর যে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আছে তৃতীয় বিলটি সেটাই বিলোপ করবে।
কেন্দ্রের তরফে যদিও বলা হচ্ছে যে এসএসপি থাকবে – চিন্তার কিছু নেই। কৃষিবিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথনের রিপোর্টে চাষীদের যে উপযুক্ত এমএসপি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল, নতুন বিলগুলো সেটাই নিশ্চিত করবে এবং ভারতে কৃষির জন্য এক দেশ, এক বাজার’ প্রতিষ্ঠা করবে। তা কিন্তু মানতে নারাজ আন্দোলনকারী কৃষকেরা। আর কেন্দ্রের কথা অনুযায়ী যদি তাই হবে তাহলে নতুন কৃষি বিল কেন অত তাড়াহুড়ো করে আনা হল, কেন তা নিয়ে কোনরকম আলোচনা হল না? বিজেপি জোটের কাছে পার্লামেন্টে সংখ্যা থাকলেও এই বিল নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্ তারা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ বিলে সই করে তা আইনে পরিণত করে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ট্রাক্টর জ্বালিয়ে কৃষকরাও বুঝিয়ে দিয়েছেন তাদের বিক্ষোভ সহজে থামবে না। ধর্মঘটের কারণে পরিবহন এবং বাজার বন্ধ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ সোমবার এলপিজি এবং পেট্রোল-ডিজেলের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ হবে।
জানা গেছে ধর্মঘটের আওতায় থাকবে সব সরকারি ও বেসরকারি অফিস, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, দোকান, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সব পাবলিক ইভেন্ট। বনধের সময়ে সরকারি এবং বেসরকারি পরিবহনও বন্ধ করা হবে।