| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

চুয়াল্লিশে এসে স্বপ্ন ঘোড়া, কল্পনা তার সওয়ারি : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ১৩৮৯ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৪ অক্টোবর, ২০২১

সব ফুল যেমন ফল হয়ে ওঠে না, সব ফল তেমনই নৈবেদ্যে লাগে না। সবকিছুর অস্তিত্বেই শ্রেষ্ঠত্বের সোপানে যাচাইয়ের পরিসর আপনাতেই বিস্তার লাভ করে। আমাদের জীবনও সেই ঝাড়াই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। পৃথিবীর তিন ভাগ জল থাকা সত্বেও মানুষের জলের কষ্ট বর্তমান। সব জল পানীয় নয়, আবার স্বাস্থ্যকরও নয়। এভাবে জীবনের সীমিত পরিসরের মধ্যেই রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দময় পৃথিবীকে যেমন আমরা যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে আস্বাদন করতে বাধ্য হই , তেমনই তার মাধ্যমে অস্তিত্বের সোপানে উৎকর্ষমুখর বনেদিয়ানায় আবদ্ধ হয়ে পড়ি। অন্যদিকে মানুষের জীবন দেহে বাঁচে, মনে বাস করে। সেখানে প্রাণে বাঁচার চেয়ে মনে বাস করা আবেদনমুখর হয়ে ওঠে। মনের উৎকর্ষেই জীবনের পরম পরশ। সেদিক থেকে দেহের বয়সের চেয়ে মনের পরিণতিবোধ আপনাতেই প্রকাশমুখর। সেই বোধে জীবনের অভিজ্ঞতার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আসলে অভিজ্ঞতার ভিতে জীবনের সৌধ গড়ে ওঠে। সেখানে প্রথাগত কেতাবি শিক্ষার চেয়ে সাময়িক অভিজ্ঞতার মূল্য অপরিসীম। কেতাবি শিক্ষার সোপানে যেখানে জ্ঞানের বিস্তার ঘটে, অভিজ্ঞতার আধারে সেখানে প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে পড়ে। সেই আলো জীবনবোধকে স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরিণতমনস্ক করে তোলে।

জীবনের প্রতিকূলতাই সেখানে আনুকূল্য লাভ করে। ব্যর্থতার সোপান বেয়ে সাফল্যপ্রাপ্তিই তার লক্ষ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে না, ব্যর্থতার আলোয় জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করাতেই তার সার্থকতা নিবিড় হয়ে ওঠে। এজন্য সাফল্যের সঙ্কীর্ণতায় তার শিক্ষা শেষ হয়ে যায় না, ব্যর্থতার বিস্তারই তার বনেদিয়ানা। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সেই পাঠশালাতেই আমাদের বেড়ে ওঠা, পথচলা। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘শ্রীকান্ত’-এর প্রথম পর্বের (১৯১৭) সূচনাবাক্যেই বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ জীবনের কথায় প্রৌঢ়ের আভিজাত্যে ভর করেছেন, ‘আমার এই ‘ভব-ঘুরে’ জীবনের অপরাহ্ন-বেলায় দাঁড়াইয়া ইহারই একটা অধ্যায় বলিতে বসিয়া আজ কত কথাই না মনে পড়িতেছে !’ শুধু তাই নয়, তার অব্যবহিত বাক্যেই তাঁর বৃদ্ধত্বকেও স্পষ্ট করে তুলেছেন, ‘ছেলে-বেলা হইতে এমনি করিয়াই ত বুড়া হইলাম।’ অথচ তখন শরৎচন্দ্রের বয়স সদ্য চল্লিশের ঘর অতিক্রম করেছে। আসলে বিচিত্র অভিজ্ঞতার প্রাচুর্যে শারীরিক বয়স মানসিক বৃদ্ধির থেকে পিছিয়ে পড়ে। এজন্য মনের বয়স শরীরকে ছাড়িয়ে যায় এবং সেই বৃদ্ধিই সেখানে বৃদ্ধত্ব লাভ করে। তার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন নেই, স্বল্প পরিসরেই তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। শরৎচন্দ্রই তার পরিচয় দিয়েছেন। ‘অভাগীর স্বর্গ’ (‘বঙ্গবাণী’, ১৩২৯ মাঘ)-এর চোদ্দ পেরানো পনেরোর কিশোর কাঙালী তার মায়ের মৃত্যুদেহ দাহ করার উদ্যোগী হয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিক্ত অভিজ্ঞতাতেই তা লাভ করেছিল। লেখকের ভাষায়, ‘এই ঘণ্টা-দুয়েকের অভিজ্ঞতায় সংসারে সে যেন একেবারে বুড়া হইয়া গিয়াছিল।’ সেদিক থেকে জীবনের বিরূপ অভিজ্ঞতার আভিজাত্যবোধে শরৎচন্দ্রের একচল্লিশ বছর বয়সে ‘জীবনের অপরাহ্ন-বেলা’ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি।

জীবনের গতি সূর্যের মতো নিয়মিত নয়, নদীর মতো নিম্নগামী সচলতাও তার নেই। তার ছকবন্দি প্রকৃতির অনিশ্চয়তায় উত্থান-পতনের নাগরদোলা যেমন সত্য, তেমনই সত্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জীবনবোধে সময়কে অতিক্রম করার প্রবণতাও। এজন্য প্রাপ্তবয়স্ক আর প্রাপ্তমনস্কতায় শরীর ও মনের বয়সের ব্যবধান অস্বাভাবিক মনে হয় না। জীবনবোধে মনের চলন আপনাতেই সুদূরপ্রসারী হয়ে থাকে। সেখানে জীবনের বিপর্যয়ই জীবনকে আরও বনেদি ভিতে দাঁড় করায়। বিচিত্র বিরূপ অভিজ্ঞতাই জীবনকে গতি দান করে। দুর্গতিই তার মূলধন হয়ে ওঠে। ‘শ্রীকান্ত’রূপী শরৎচন্দ্র ‘ছেলে-বেলা’ থেকে একবারে ‘বুড়া’য় পৌঁছেছেন। সেখানে যৌবনের ‘হয়ে ওঠা’র সময়টি উহ্য থেকে গেছে যা উপন্যাসের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাই তার মূলধন। অন্যদিকে কাঙালীর সংসারের বিরূপ অভিজ্ঞতার ঝোড়ো হাওয়ায় শৈশব হারিয়ে যাওয়ায় তার বাস্তবের নিষ্ঠুর ও নির্মম পরিণতবোধ পাঠকমানসে নিবিড় হয়ে উঠেছে। কাঙালীর মতো আমার শৈশবও হারিয়ে গিয়েছিল। আমার নয় বছর বয়সে বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর চৌত্রিশ বছরের অকালমৃত্যুর ছায়াতেই আমার শৈশব আত্মগোপন করে, শূন্যতাবোধে নতুন জীবনের কায়া জেগে ওঠে। শুরু হয় চেনা জগতের অচেনা পরিসর, জানার মধ্যে অজানা অনেকান্ত। আসলে মায়ের আঁচলে সব শিশুই নন্দনকাননে বাস করে। তখন তার কিবা দিন, কিবা রাত। সব সময়েই মনে কল্পনার‍ রঙিন আলো হাতছানি দিয়ে ডাকে। সেখানে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মনের বসন্তে ফুল ফোটার অবকাশ না-থাকার মতো শৈশবের নন্দনকাননে ধনের প্রাচুর্যের চেয়ে মনের আভিজাত্য তীব্রতা লাভ করে। সেখানে মনধনই মূলধন। এজন্য মায়ের অপত্যস্নেহের প্রকৃতিতে ধনী-দরিদ্রের যেমন কোনো পার্থক্য থাকে না, তেমনই তার স্নেহসুধায় অভাববোধের বালাই নেই। শৈশবের ‘সব পেয়েছির দেশে’র আনন্দমুখর জীবনের কল্পনাসুন্দর পৃথিবীতে স্বপ্নরঙিন হাতছানি আপনাতেই চোখের জল মিলিয়ে দেয়, ঠোঁটের হাসি ফিরিয়ে আনে। সেদিক থেকে দরিদ্র মায়ের শিশুর কোনো দারিদ্র স্পর্শ করতে পারে না। শুধু তাই নয়, দারিদ্রের কায়া যাতে তার শিশুর উপর ছায়া ফেলতে না পারে সেজন্য দারিদ্রপীড়িত মায়ের আপনার সর্বস্ব দিয়ে আড়াল করার সদিচ্ছাই আপনাতেই স্নেহকে সুধায় পরিণত করে।

এজন্য শৈশবের খেলাঘরে কেউ রাজপুত্র, কেউ রাজকন্যা। সেখানে দারিদ্রের প্রতাপ নেই, আছে তার নির্মল আলো। সেই আলোতে অভাবকে জয় করার সৎসাহস শিশুমনে সহজ হয়ে ওঠে। ছোট্ট শিশুই তার অভাগিনী মায়ের চোখের জল শুধু মুছিয়ে দেয় না, ভবিষ্যতে সে নিজেই তার সুরাহা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। শুধু তাই নয়, জীবনকে সহজ করে নেওয়ার শক্তি তার সহজাত। অভাবের বেড়ি তার কল্পনাকে লাগাম দিতে পারে না, স্বপ্নকেও পারে না বাঁধতে। অল্পতেই তার আশুতোষ প্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে। তার নিত্যানন্দ প্রকৃতি চির সবুজ। এজন্য জীবনযন্ত্রণায় শৈশবের সহজতায় ফিরে যাওয়ার কল্পনা আপনাতেই হাতছানি দিয়ে ডাকে। শান্তিনিকেতনের পরশ তো সেখানেই। রাজা-ভিক্ষুকের শৈশবের বসন্তযাপনের প্রকৃতি প্রায় একই । বড় করার নামে সেই মধুময় সেই শৈশবকেই হারানোর খেলায় মেতে উঠি বা হারাতে বাধ্য হই। শুধু তাই নয়, ভেতরের শিশুটিকেই প্রয়োজনে হত্যা করতেও আমাদের দ্বিধাহীন চিত্ত। শৈশবের খেলাঘর মাটিতে লুকায়, চোখে স্বপ্নের কাজল মুছে যায়, কল্পনার ঘুড়ি মুখ থুবড়ে পড়ে, মনের বিস্ময়বোধ বাস্তবের মাটিতে নেমে আসে। সেগুলি যে বড় হওয়ার পথের কাঁটা ! সেই কাঁটা খুঁটে খুঁটে উপড়ে ফেলার নামই সাবালক হয়ে ওঠা। জীবন যত এগোয়, যন্ত্রণা ততই বাড়ে। কেননা জ্ঞানাঞ্জন শলাকায় কল্পনা ও স্বপ্নের জগৎ ক্ষতবিক্ষত হয়ে হতে থাকে।

জ্ঞানবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেমন উপলব্ধির পরিসর বেড়ে যায়, তেমনই যন্ত্রণারও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। অন্যদিকে শৈশবের সারল্য জীবন ক্রমে সরে যাওয়ায় তার অভিমুখে জটিলতার ক্যানভাস উঠে আসে। সেক্ষেত্রে উপলব্ধির গভীরতাই যন্ত্রণার আধার হয়ে ওঠে। সেখানে অস্তিত্বসংকটের সোপানে জীবনবোধ ও যন্ত্রণা সমানতালে চলতে থাকে। এজন্য শৈশবের খেলাঘর ভেঙে ইমারত বানালেও মনে শান্তি আসে না, হৃদয়ে আনন্দের শিহরণ জেগে ওঠে না। যাও সাময়িক তৃপ্তির অবকাশ তৈরি হয়, তাও অচিরেই মিলিয়ে যায়। একদিকে সব না-পাওয়ার অপরিতৃপ্তিবোধ স্থির হতে দেয় না, অন্যদিকে যা পাওয়া গেছে, তাও হারানোর ভয় চেপে বসে। বাস্তবের সঙ্গে সাযুজ্য রাখতে গিয়ে অভ্যাসের জীবন একসময় ভারী হয়ে ওঠে। সেই ভারবহনে অক্ষম জীবনে মনে আর মানে বাঁচার মানসিকতাও উবে যায়। জীবনের উপান্তে ফিরে শৈশবের শান্তিনিকেতনে নিজেকে খুঁজেফেরার বাতিক তখন স্বাভাবিক মনে হয়। অথচ শৈশবের শিশুটিকে মনের সংগোপনে রেখে চললে অভ্যাসের জীবনও মধুময় হতে পারে। আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে আমারই মনের সংগুপ্ত ছোট্ট স্বপন।

বাবাকে আমি ‘বাবু’ বলতাম। মায়ের আদূরে কণ্ঠে ‘বাবু’ই আমার মনে বাসা বাঁধে। যখন সেবিষয়ে সচেতন হয়ে বাবা ডাকতে গিয়েছি, সেও লাজুক মুখের আড়ষ্ঠতায় ‘বাবু’ই উড়ে যায়, বাবা এসে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয়, আমার প্রয়াস লাঘব করে বাবাও শেষে চলে যান। আমার আর ডাকার অবকাশ মেলেনি। করতেন এলোপ্যাথিক চিকিৎসা। লোকজন নিয়ে সদা ব্যস্ত জীবনে পরিবারের দিকে তাকানোর ফুরসৎ ছিল না। তাছাড়া ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন হয়তো তাঁর ছিল, আদিখ্যেতা ছিল না। অন্যদিকে মেয়েদের মাতৃত্ব সহজাত, ছেলেদের পিতৃত্ব অর্জিত। ‘সুপ্ত পিতা’ জেগে ওঠার অবকাশ প্রয়োজন। সেদিক থেকে শৈশবে মায়ের হৃদয়ের উষ্ণতার আত্মিক সহজতা বাবার মনে স্বাভাবিক হতে কিছু সময় অতিবাহিত হয়। আমার বাবার মনে আমি কতটা জায়গা জুড়ে ছিলাম, তা উপলব্ধি করার বোধ তখনও ছিল। একটা প্রখর ব্যক্তিত্বশালী সম্ব্রমজনিত ভয় জাগানিয়া দূরত্বে আমি চলে বেড়াতাম। কখনই কাছে ঘেঁষতাম না। ধামোরে মামার বাড়ির পাশেই আমাদের বাড়ি ছিল।

মামারবাড়িই ছিল আমার শৈশবের আনন্দনিকেতন। মাসিদের কোলেই নাগরদোলা। মায়ের চেয়ে দিদিমাই আপনজন, ননীর ভাণ্ড। সেক্ষেত্রে আমার চার বছর বয়সে তিন-চার কিমি উজিয়ে বাবা যখন ধামোর গ্রাম ছেড়ে উত্তর-পূর্বদিকে রোড সংলগ্ন চড়কডাঙ্গা কলোনিতে নতুন বসত গড়ে তোলেন, তারপরেও আমি সেই আনন্দধামে বারবার ফিরে গেছি। আমার শৈশবে বাবা-মায়ের ঘেরাটোপ ছিল না। সেখানে আমার একাকী অবাধ বিচরণ, অফুরাণ বিস্তার। বাবার কর্মব্যস্ততার মধ্যে আমার নিরুত্তাপ জীবন আপন বেগে পাগলপারা। তাছাড়া বাবার মধ্যে ছেলেকে চড়ানোর বাতিক ছিল না। তার মতো সে বেড়ে উঠুক, এই তাঁর প্রত্যাশা ছিল। ছেলের মধ্যে নিজের ছায়া বিস্তার বা কায়াধারণ কোনোটাই তাঁকে ভাবিয়ে তোলেনি। কোনোভাবেই আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস তাঁর মধ্যে লক্ষ করিনি। ছেলের নামকরণের ক্ষেত্রেও তাই। অযাচিতভাবে আদুরেপনায় বেশকিছু নাম জুটেছিল। রাশিতে মেলে ‘বীরধনঞ্জয়’, ঠাকুরমা দেন ‘মণ্টু’, ঠাকুরমশাই ‘জগদীশ’। বাবা নাম রাখেন ‘দীপঙ্কর’। মামা স্বপ্ন দেখে বলেন ‘স্বপন’। সেই স্বপনের জয়ে বাবা পরাজয় মেনে নেন। বইয়ের মলাটে তাঁর আত্মজের নাম লেখেন ‘শ্রী স্বপন কুমার মণ্ডল’। ছেলেকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ তাঁর ছিল না। সময়ে পড়াতে বসিয়েছেন, স্কুলে পাঠানোর জন্য নিমের ডালও হাতে নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর কর্মব্যস্ততায় সেসব গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, একজনকে জুটিয়ে নিয়ে একদিন বাবার কথা বলে দোকান থেকে একমুঠো বিড়ি আর দেশলাই নিয়ে হাটখোলায় বিড়ি ধরানোয় সচেষ্ট হওয়ার সংবাদেও সাংঘাতিক কিছু ঘটেনি। বাবা শুধু বলেছিলেন, ‘ছেলে আমার বড় হয়ে গেছে।’ বাবা মাত্রাতিরিক্ত বিড়ি খেতেন। হয়তো সেই অপরাধবোধেই তিনি সেদিন শাসনে প্রশাসক হতে পারেননি, আত্মসমীক্ষায় আমার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন।

মৃত্যুর পূর্বে তিনি দু-বছর অসুখে ভুগেছিলেন। সেই অসুস্থ অবস্থাতেই একদিন রোডে গরুর গাড়ির পেছনে বাঁদুরঝোলা অবস্থায় অজান্তেই এসিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করে আর সেভাবে না-ধরার চেতাবনি দিয়েছিলেন। বাড়ির কাছে বাসস্ট্যান্ডের দোকানে আমি কোনোকিছু চাওয়ামাত্র যাতে পেয়ে যাই, সেই ব্যবস্থাও করেছিলেন বাবা। অথচ কোনো সময়েই বাবার সঙ্গে আমার সখ্যতা ছিল না, মায়ের স্নেহও আমাকে আগলে রাখতে পারেনি। আবার তাঁদের একমাত্র সন্তান আমি। অন্যদিকে ভাই-বোনের অভাববোধও ছিল না আমার। সেখানে আমার শৈশব আমাতেই ছিল পূর্ণ। আমার শূন্যতাবোধই আমার কল্পনাকে পক্ষীরাজ ঘোড়া বানিয়েছে, স্বপ্নকে করেছে তার সওয়ারি। অথচ চলতে না চলতে বাবার অকালমৃত্যুতে সেই ঘোড়া মুখ থুবড়ে পড়ে, সওয়ারিও নীচে নামে। সময়ের ফেরে আমার শৈশব আমায় ছেড়ে গেলেও আমি সেই শিশুটিকে আগলে চলি। যে-শিশুটি বারান্দায় বাবার মৃতদেহে ছেড়ে ঘরে ঝোলানো বেঁচে যাওয়া আঙুরের দিকে মন দেয়, তার চোখে জল না-থাকাই দস্তুর। তার জগতে যে বাবার অভাব তখনও জেগে ওঠেনি। জন্মানোর পর শিশুর কান্নার স্বাভাবিকতায় আমার কান্নাহীন মুখের দিকে তখন সকলের সতৃষ্ণ দৃষ্টি। মানুষও মাঝে মাঝে দর্শনীয় প্রাণী হয়ে ওঠে। বাবা অসময়ে চলে গিয়ে আমায় স্বেচ্ছাচারী স্বাধীনতা প্রদান করে আমার চলার পথকেই শুধু বেঁধে দেননি, জলে ফেলে সাঁতার শেখানোর মতো জীবনকে জানার অবকাশ উপহার দিয়ে যান। ততদিনে তাঁর দীর্ঘদিন অসুখে ভোগার কারণে সংসারে আর্থিক শূন্যতা প্রকট হয়ে পড়ে। বাবা আমায় ধনে দরিদ্র করলেও মনে আত্মসম্মানের অনির্বাণ দীপশিখা জ্বালিয়ে যান। সেই সম্মানবোধই ছিল আমার রক্ষাকবচ, আমার পাথেয়।

রাজা ভিখারী হলে শুধু রাজসম্মানই হারান না, অপরের করুণার পাত্রও হয়ে ওঠেন। সেখানে বাবা আমাকে অপরের করুণ দৃষ্টির শিকার করে তোলেন। বাবার সম্মানই আমার অসম্মানের আধার হয়ে ওঠে। নেমে আসে উপেক্ষা আর অবজ্ঞার নির্মম উদাসীনতা। বোধের বিস্তারে অস্তিত্বের শিকড়ে টান পড়ে, মাটি আলগা হয়। আমি নির্বাক বিস্ময়ে সোনালি সকালের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনি। দৃষ্টি তখন শুধুই সামনের দিকে। উপেক্ষার শীতলতা যত নেমে আসে, ততই আমি বসন্তের আবাহনীতে নিজেকে রাঙিয়ে নিই। মনের চলন সময়কে অতিক্রম করে চলে। তখন লক্ষ্য শুধু গন্তব্য পৌঁছানো নয়, কত দ্রুততার সঙ্গে সেখানে উপস্থিত হওয়া যায়, সেদিকেই তার অন্তর্দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে পড়ে। পথের দুধারে দেখা বা জিরিয়ে নেওয়ার অবকাশ তার নেই। শুধুই চলা। তখন পথ চলাতেই আনন্দ। শুধু তাই নয়, এই চলার মধ্যেই জীবনের পরশ সুরভিত হয়ে ওঠে। আসলে বোধের বিস্তারে যেমন যন্ত্রণার পরিসব বৃদ্ধি পায়, তেমনই তাতে অন্তর্দৃষ্টিও প্রসারিত হয়। শৈশবোত্তর পরিসরে প্রসারিত অন্তর্দৃষ্টিই জীবনকে উপভোগ্য করে তোলে। সেখানে দারিদ্রের ভূমিকা অবিসংবাদিত। তার ছোবলে মানুষ যেমন মৃত্যুতে সামিল হয়ে পড়ে, তেমনই জীবনে সঞ্জীবনীসুধার পরশ লাভ করে।

ক্ষুধা যেমন খাদ্যকে সুখাদ্য করে তোলে, দারিদ্রও তেমনই জীবনকে মননের মধু প্রদান করে। জীবনের তিক্ততাও সেই মধুতে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, জীবনসংগ্রামে মেলে অপূর্ব জীবনদর্শন। নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার সোপানে তার পরিচয় মেলে। জীবন যত এগোয়, ততই তার বৈচিত্র্যমুখর পরিসর উৎকর্ষমুখর হয়ে ওঠে। অর্থের অভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েই টিউশনি করা শুরু করি এবং বাকি ছাত্রজীবনে তার দাসত্ব করলেও মনে ছিল রাজত্বের তৃপ্তিবোধ। তখন মিল্টনীয় প্রজ্ঞার আলো আমাকে প্রাণিত করে চলেছে, ‘স্বর্গের দাসত্বের চেয়ে নরকের রাজত্ব শ্রেয়।‘ তখন মালদা কলেজে পড়ি আর টিউশন পড়াই। থাকি শহরের ফুলবাড়িতে। সস্তায় হোটেল খুঁজতে গিয়ে বিচিত্রা মার্কেটে ৪টাকা প্লেট ভাতের হোটেলের সন্ধান পেয়ে সানন্দে সেখানে গিয়েছি। সত্যিই ৪টাকা প্লেট। অনতিদূরে ওভারব্রিজের নীচে আমি সেই সময়ে ফুটপাথের হোটেলে ৬টাকা করে খেতাম। তারও কমে ভাত মেলার খবরে স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহ্লী উৎফুল্লে সেখানে হাজির হয়েছিলাম। লক্ষ্মীকালাইয়ের ডালভাত খেয়ে অরুচিবোধে সেখানে আর যাইনি। ভাতের ফ্যান দিয়ে তৈরি ডালকে লক্ষ্মীকলাইয়ের নামে চালানোর বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। নতুন শেখার আনন্দে পেটের ক্ষুধাই সেদিন উবে গিয়েছিল।

অভাবের তাড়নায় চাল না থাকা যদি বাড়ন্ত হয়, তবে ফ্যান কেন লক্ষ্মীকলাই হবে না। অন্যদিকে সেই ডালভাতই নিরন্ন মানুষের মুখে উপাদেয় হয়ে থাকে, সেখানে আমার দারিদ্রবোধই আমাকে সহনীয়তার আভিজাত্যে সক্রিয় করে তোলে। দারিদ্রজাত অন্তর্দৃষ্টিই সেক্ষেত্রে বিরূপ অভিজ্ঞতার মধ্যে জীবনবোধকে শুধু প্রাণিত করে না, আপনাকে সবাকার সঙ্গে মিলিয়ে দেয় যা ‘আপন হতে বাহির’ হওয়ার পথকে প্রশস্ত করে। অন্যদিকে শৈশবোত্তর জীবন তো আসলে ‘হয়ে ওঠা’র সচল প্রবাহ। আত্মপ্রতিষ্ঠার তীব্রতায় তার গতিমুখে দেখনদারির ফুলই উৎকর্ষবোধে আত্মপ্রকাশের ফলে পরিণতি লাভ করে। সেখানে ‘হয়ে ওঠা’র নীরব সাধনার অভিমুখ লক্ষ্যভেদী একমুখী চলনে আমার বাল্য-কৈশোর ঝরে পড়ে, যৌবনও সংগুপ্ত থেকে যায়। অবশ্য সাধনার ধর্মই তো তাই। দস্যু রত্নাকর থেকে ঋষি বাল্মীকির মাঝের সাধনা আমাদের অজানা। অন্যদিকে ‘হয়ে ওঠা’র সচল প্রবাহ থেমে যায় না, নানা শাখা-প্রশাখাতেও তার বিস্তার ঘটে। এজন্য আমৃত্যু তার প্রবাহ সক্রিয় থাকে। নয় বছরের ছোট্ট স্বপন এখন চুয়াল্লিশের স্বপনকুমার মণ্ডল। তাপমাত্রায় তা অসহনীয় হয়ে উঠলেও বয়সের আলোতে তা শুধু উপভোগ্যই নয়, উপলব্ধিতেও বর্ণরঙিন। সামনে তার চরৈবেতির আমন্ত্রণ, পেছনে স্মৃতিসুধার পরশ। সময়ান্তরে ছোট্ট স্বপনও যে তাঁর জীবনের নিত্যানন্দের দোসর হয়ে উঠেছে। পার্থক্য বলতে শৈশবের ঘোড়া ও তার সওয়ারীর চরিত্র বদলে গেছে। এখন স্বপ্নের ঘোড়া, কল্পনা তার সওয়ারি।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : কার্তিককুমার মণ্ডল, সভাপতি, পরম পরশ কমিটি, পুরুলিয়া।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

3 responses to “চুয়াল্লিশে এসে স্বপ্ন ঘোড়া, কল্পনা তার সওয়ারি : স্বপনকুমার মণ্ডল”

  1. সুখেন দাস says:

    মামার ‘স্বপ্ন’ আজ আমাদের জেগে ‘স্বপ্ন’ দেখানোর সাহস জুগিয়েছে চলেছেন…

  2. Gouranga Biswas says:

    ঋদ্ধ হোলাম,অনেক অজানা কে জানতে পারলাম।
    প্রনাম নেবেন।

  3. Ramu Barman says:

    দারিদ্রকে জয় করে স্যার আপনি এগিয়ে চলেছেন। অন্যকে দিশাও দেখিয়েছেন, এখনো দেখাচ্ছেন। হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছো মহান। প্রণাম নেবেন স্যার।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev