এই পর্বে সতী পীঠের যে অঞ্চলগুলি নিয়ে আলোচনা করবো সেগুলি হলো— বহুলা, বক্রেশ্বর, ভবানীপুর, ছিন্নমস্তিকা (চিৎপূর্ণী), গন্ধকী, নাসিক, জয়ন্তী, যশোরেশ্বরী, জ্বালামুখী।

বহুলা : বর্ধমানের কেতুগ্রামের কাছে বহুলায় দেবীরবাঁ-হাত পড়েছিল বলে বিশ্বাস। দুর্গার নাম এখানে বহুলা। শিবের পরিচয় ভীরুক নামে। এই শক্তিপীঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের কাটোয়ার কাছে কেতুগ্রামে অবস্থিত। প্রাচীনকালে কেতুগ্রামকে বহুলা বা বাহুলা নামে ডাকা হতো। রাজা চন্দ্রকেতুর নামানুসারে এই গ্রামের নাম হয় কেতুগ্রাম। এই গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন বহুলা। পীঠনির্ণয়তন্ত্র তন্ত্র মতে এখানে দেবী সতীর বাম বাহু পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম বহুলা আর ভৈরবের নাম ভীরুক। ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে এই পীঠ সম্বন্ধে বলেছেন—বাহুলায় বামবাহু ফেলিলা কেশব।/বাহুলা চণ্ডীকা তাহে ভীরুক ভৈরব।। কেশব অর্থাৎ ভগবান নারায়নের চক্রে খণ্ডিত হয়ে মা সতীর বাম বাহু এখানে পড়ে।

বক্রেশ্বর : বাংলার আর এক বিখ্যাত শক্তিপীঠ। বীরভূম জেলার এই তীর্থক্ষেত্রে পড়েছিল সতীর দুই ভ্রূর মধ্যবর্তী অংশ। সতী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী রূপে পূজিত হন। শিব হলেন বক্রনাথ। বলা হয়, ঋষি অষ্টাবক্র এখানে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। ‘পীঠমালামহাতন্ত্র’ শাস্ত্রে লেখা আছে—বক্রেশ্বর মনঃ পাতু দেবী মহিষমর্দিনী/ভৈরব বক্রনাথস্তু নদী তত্র পাপহরা। পাপহরা বক্রেশ্বর নদীর পাশে এই পীঠ অবস্থিত।

ভবানীপুর : এই সতীপীঠ এখন বাংলাদেশে। রাজশাহীর করতোয়া নদীর তীরে এই স্থানে দেবীর বাঁ-নিতম্ব এবং পোশাক পড়েছিল। দুর্গা এখানে পূজ্য অপর্ণা নামে। শিবের পরিচয় ভৈরব। কথিত, নাটোরের রাজা এই মন্দিরে ধ্যান করতেন। প্রতিবছর রামনবমী উপলক্ষে এখানে বড়ো মেলা বসে।

ছিন্নমস্তিকা (চিন্তাপূর্ণী) : হিমাচলপ্রদেশের উর্ণা অঞ্চলে চিন্তাপূর্ণী ছিন্নমস্তা মন্দির একটি শক্তিপীঠ। কথিত আছে এই মন্দিরে সতীর কপাল পড়েছিল। দেবী এখানে ছিন্নমস্তিকা এবং কপাল উভয় রূপেই পূজিতা হন। ভৈরবের নাম রুদ্র মহাদেব।
এই দেবী এখানে কীভাবে প্রকট হলেন সে নিয়ে একটি প্রচলকথা আছে—বহুকাল আগে মাইদাস নামে দেবী চণ্ডিকার এক পরম ভক্ত এই স্থানটি আবিষ্কার করেন। মাইদাস তাঁর ব্যবসায়ী পিতার কাজে মন দিতেন না বলে একবার তিনি গৃহ হতে বিতাড়িত হন। মাইদাস তখন শাসনমুক্ত হয়ে পরম নিশ্চিন্তে এই পার্বত্য প্রদেশের গভীর বনাঞ্চলে গিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর আরাধনা করতে থাকেন। মাইদাস যেখানে বনমধ্যে বটবৃক্ষমূলে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই জায়গার নাম ছপরোহ। বিশ্রামকালে এখানেই তিনি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলেন এক দিব্যজ্যোতিসম্পন্না কন্যা তাঁকে বলছেন, ‘ভক্ত মাইদাস! তুমি এখানে থেকেই আমার সাধনা করো, এতেই তোমার ভালো হবে।’
স্বপ্নভঙ্গে কাউকেই তিনি দেখতে না পেয়ে বারে বারে দেবীর ধ্যান ও আরাধনা করতে লাগলেন।
দেবী তখন চতুর্ভুজা সিংহবাহিনী মূর্তিতে দর্শন দিলেন মাইদাসকে। বললেন, ‘পুরাকালে আমি এই স্থানেই দেবাদিদেবকে আমার ছিন্নমস্তা রূপ দেখিয়েছিলাম। এই বটবৃক্ষতলেই আমার স্থিতি। আমি ছিন্নমস্তা হলেও সকলের চিন্তা দূর করার জন্য চিন্তাপূর্ণী নামেই এখানে প্রসিদ্ধ হব।’ তারপর আরও বললেন, ‘এই স্থান থেকে একটু নীচে একটি বড় পাথর দেখতে পাবে। সেই পাথর সরালেই সুপেয় জল পাবে। ওই জলেই আমার পূজা ও তোমার তৃষ্ণা দূর হবে।’
মাইদাস সেই নির্দেশ মতোই দেবীর পীঠকে জাগ্রত করতে লাগলেন।

গন্ধকী : এটি নেপালে অবস্থিত জাগ্রত পীঠস্থান। পোখারার গন্ধকী নদীর তীরে মুক্তিনাথ মন্দিরের কাছে এই মন্দির। এখানে দেবীর ললাট পতিত হয়। দেবীর নাম গন্ধকী চণ্ডী। ভৈরব চক্রপাণি রূপে বিরাজমান।

নাসিক : মহারাষ্ট্রের গোদাবরী নদীর তীরে নাসিকে দেবীর চিবুক পতিত হয়। দেবী এখানে ভ্রামরী নামে পরিচিত। ভৈরবের নাম বিক্রিতাক্ষ। পুরাণে পাই যে অরুণাসুর নামে এক অসুর কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার থেকে বর নেয় যে কোন দুই বা চার পায়ের কেউ তাকে মারতে পারবে না। সে তখন দেবলোক আক্রমণ করে। পরবর্তীকালে কৈলাসও আক্রমণ করে ও মহাদেব শিবও তাকে প্রতিরোধ করতে পারেননি। তখন পার্বতী বিশাল দেহ ধারণ করেন ও চারিদিকে মশা, মাকড়শা, মাছি ইত্যাদিতে ভরে যায়। এরাই দেবীর হয়ে যুদ্ধ করে ও শেষে অরুণাসুর পরাজিত হয়। দেবীর নাম হয় ভ্রামরী।

জয়ন্তী : জয়ন্তী পীঠ ঠিক কোথায় তা নিয়ে পণ্ডিতদের বিতর্ক আছে। জয়ন্তী পীঠে দেবী সতীর বাম জঙ্ঘা পড়েছিল (মতান্তরে পৃষ্ঠদেশের অংশ)। দেবীর নাম জয়ন্তী আর ভৈরব হলেন ক্রমদীশ্বর। এই দেবী পীঠ সম্বন্ধে বলা হয়—জয়ন্ত্যাঁ বামজঙ্ঘা চ জয়ন্তী ক্রমদীশ্বরঃ। ভারতচন্দ্র তাঁর কাব্যে লেখেছেন—জয়ন্তায় বামজঙ্ঘা ফেলিল কেশব।/জয়ন্তী দেবতা ক্রমদীশ্বর ভৈরব।। এই পীঠ আবিস্কারের সাথে আশ্চর্যজনক এক কাহিনি জড়িয়ে আছে। সময়টা ১৫৪৮-১৬৬৪ সাল। তখন জয়ন্তীতে রাজত্ব করতেন রাজা বড়গোসাঞি। গ্রামের একদল কিশোরী একদল রাখাল বালক এর সাথে খেলছিল। তারা সেখানে একটি কালো পাথর দেখলো। তাঁদের মনে পূজা পূজা খেলার ইচ্ছা জাগল। যেমন শিশুরা মাটির মূর্তি বা মাটি দিয়ে মূর্তি বানিয়ে পূজো পুজো খেলে ঠিক তেমনি। বালক বালিকারা কালো পাথর টিকে মা কালী ধরে নিয়ে, বনের ফুল তুলে পুজো করে কলা পাতায় বনের ফল নিবেদন করলো। মাটির ভাড়ে ঝর্নার জল নিবেদন করলো। কিন্তু কালী পুজোয় তো বলির দরকার। একজন বালককে পাঁঠা সাজালো। সেই বালক পাঁঠার মতো ম্যাঁ ম্যাঁ করতে লাগলো। একজন শোলা দিয়ে খড়গ বানালো। সেই শোলার খড়্গের আঘাতে সেই পাঁঠা সেজেছিল যে বালক তার মুণ্ডচ্ছেদ হয়ে গেলো। শোলার খড়্গে মুণ্ডচ্ছেদ দেখে ভয়ে বালক বালিকারা পালালো। শেষে সেই বালকের মা এসে সেই পাথরের সামনে অনেক অনুনয় বিনয় প্রার্থনা করতেই দেখা গেলো সেই নিহত বালক হাসতে হাসতে বন থেকে বেরিয়ে আসছে। এই অলৌকিক খবর রাজার কানে গেলো। রাজা তার গুরুদেব কে নিয়ে সেই স্থানে গেলো। সেই গুরু ছিলেন একজন তান্ত্রিক আচার্য। গুরুদেব ধ্যানে বসলেন। ধ্যান সমাপ্তে জানালেন—“হে রাজন। এই স্থান মহা পবিত্র। ভগবান হরির চক্রে খন্ডিত হয়ে মা সতী দেবীর বাম জঙ্ঘা এই স্থানে পতিত হয়েছে। তুমি মায়ের নিত্য পূজোর ব্যবস্থা করো।” রাজা ভাবলেন পাথরটিকে রাজবাড়ি নিয়ে গিয়ে নিত্য পূজো দেবেন। কিন্তু তুলতে বিফল হলেন। অনেক গর্ত খুঁড়েও পাথরের তল পেলেন না। গুরুদেব নির্দেশ দিলেন- এখানেই মন্দির বানিয়ে পূজোর ব্যবস্থা করো। রাজা মন্দির বানিয়ে নিত্য পূজোর ব্যবস্থা করলেন।

যশোরেশ্বরী : সতী এখানে যশোরেশ্বরী। শিব এখানে চন্দ্রধর। এটি একটি প্রসিদ্ধ সতীপীঠ। বাংলাদেশের খুলনার ঈশ্বরীপুরে এই মন্দির অবস্থিত। এখানে দেবীর হাতের তালুদ্বয় ও দুই পদতল পড়েছিল। শোনা যায় যে রাজা প্রতাপাদিত্যের এক প্রধান কর্মচারী একদিন ঝোপের আড়াল থেকে আলোকছটা আসতে দেখেন ও সেখানে গিয়ে দেখেন এক প্রস্তর খন্ড যা অনেকটা হাতের তালুর মতো দেখতে। তখন রাজা প্রতাপাদিত্য এইখানে মন্দির নির্মাণ করেন। দেবীর নাম এখানে যশোরেশ্বরী। ভৈরব এখানে চন্দ্রধর নামে পরিচিত। এই মন্দির রাজা লক্ষ্মণ সেন দ্বারাও রক্ষিত হয়েছিল। তাই এই মন্দিরের প্রাচীনত্ব কতটা তা আমরা বুঝতেই পারি। দেবী এখানে কালী রূপে পূজিতা। কালী পূজার সময়ে প্রতি বছর মেলা হয়।

জ্বালামুখী : হিমাচলপ্রদেশের কাঙরা অঞ্চলে অবস্থিত এই সতীপীঠ একটি জাগ্রত পীঠ। এখানে দেবীর জিভ পড়েছিল। দেবী এখানে সিদ্ধিদা বা অম্বিকা নামে পূজিতা। ভৈরবের নাম উন্মত্ত ভৈরব। আশ্চর্যের কথা হল এখানে কোন দেবী মূর্তি নেই। এখানে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকে দেবী রূপে পুজো করা হয়। এই আগুন কবে থেকে জ্বলছে তা জানা যায় না। প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী কাঙরার রাজা ভূমি চাঁদ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই স্থানে মন্দির নির্মাণ করেন। সম্রাট আকবর এখানে এসে নাকি ওই অগ্নি নেভানোর চেষ্টা করেন জল দিয়ে। তাতে অকৃতকার্য হয়ে তাঁর দেবী শক্তি সম্বন্ধে শ্রদ্ধা হয় ও তিনি মন্দিরের চূড়ায় স্বর্ণছত্র প্রদান করেন। ১৮১৫ সালে এখানে মহারাজ রণজিৎ সিং আসেন ও মন্দিরের গম্বুজ সোনার পাতে মুড়িয়ে দেন। মন্দিরের ভিতরে একটি যন্ত্রকে বস্ত্র, অলঙ্কার সহযোগে পুজো করা হয়। কাংড়ার জ্বালামুখীতে সতীর জিভ পড়েছিল।