জয় স্পষ্ট হতেই অধীর চৌধুরী লালজামা গায়ে সাগরদিঘী পৌঁছে গিয়েছিলেন। লালজামা লাল পার্টির জন্য কিনা এ প্রশ্নের সম্মুখীনও তাঁকে হতে হয়েছিল। নির্বাচনী সভায় সব দলের নেতারা আত্মবিশ্বাস আর ভক্তিভরে জিতবো বলেছিলেন। অধীর চৌধুরীও বলেছিলেন। সবাই ভুল, একা তিনিই ঠিক— ফলাফল সেটা প্রমাণ করল। অনেকদিন পর তাঁর দল এবং তাঁর মনোনীত প্রার্থীর জয়ে তাঁকে বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেও দেখা গেল। দেখে ভালো লাগছিল উজ্জীবিত কর্মীদের মাঝে লালজামা গায়ে অধীর চৌধুরীকে। বলা যেতে পারে— নেতা হলে এরকমই হতে হয়!
সাগরদিঘী উপ-নির্বাচনে ভোটযুদ্ধ দেখলাম একের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অনেকের। অনেকের মধ্যে রয়েছে যেমন শাসক দলের দুর্নীতি, তেমনই রয়েছে জাত-পাতের দুর্গন্ধময় প্রচার। রয়েছে বিজেপি, কংগ্রেস-সিপিএম-আইএসএফের জোট, রয়েছে সমস্ত প্রচার মিডিয়া। এতোসবের বিরুদ্ধে একা লড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। লড়ে হেরেছে তেইশ হাজার ভোটে। তৃণমূল কংগ্রেসের ‘হিন্দু’ প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৬৫ হাজার। কংগ্রেস-সিপিএম-আইএসএফ-মিডিয়ার ‘মুসলমান’ প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৮৮ হাজার। ২৫ হাজার ভোট পেয়েছেন বিজেপি প্রার্থী।
যে জাত-পাতের বিষাক্ত বিষে জর্জরিত গোটা দেশ, দেখলাম নির্বাচনী প্রচারে কখনও প্রচ্ছন্ন কখনও প্রকাশ্যে হাজির করা হলো দুর্গন্ধময় জাত-পাতকে। সমস্ত মিডিয়া নগ্নভাবে ৬৮ শতাংশ মুসলমান ভোটার কেন্দ্রে ‘হিন্দু’ প্রার্থী ‘মুসলমান’ প্রার্থী বলে সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দিয়ে গেল। বিজয়ী প্রার্থীকে মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানোর নোংরা খেলা চলল প্রচারসময় জুড়ে। শাসকদলের দুর্নীতি যেখানে এই নির্বাচনে প্রধান ইস্যু-ই যথেষ্ট ছিল, সেখানে কেন হিন্দু-মুসলমান বলে যেতে হল— এই প্রশ্ন কি একেবারেই ফেলনা? প্রশ্ন তো আরো তোলা যেতে পারে— ৬৮ শতাংশ হল মুসলমান ভোটার, মানুষ ভোটার নন।! কবে মুসলমানরা মানুষ ভোটার হবেন?
অধীর চৌধুরী বলছিলেন— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করেছেন, মুসলমানদের ঠকিয়েছেন— এটা বুঝতে পেরেই তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়েছেন মুসলমানরা। এখন থেকে ৪৬ বছর (৩৪+১২) আগে অধীর চৌধুরী রাজনীতিতে ছিলেন না বা কংগ্রেস দলে ছিলেন না। কিন্তু তাঁর দল কংগ্রেস মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করেছিল। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের শাসনামলে এই বাংলায় চাকুরি ক্ষেত্রে মুসলমানদের নিয়োগ ছিল ১০ শতাংশের উপর। এখন অধীর চৌধুরীর বন্ধু দল সিপিএম, ৩৪ বছরে সেটাকে টেনে নামিয়ে দেয় ২ শতাংশে। দিশেহারা এই সিপিএম এখন বাঁচার রাস্তা খুঁজছে অধীর চৌধুরীর হাত ধরে। ওই আপ্ত বাক্যটাই আমাদের বলা ছাড়া আর কিইবা আছে— রাজনীতিতে সবই সম্ভব!
সাগরদিঘীর ভোট-ফলাফলের পর মিডিয়া থেকে বিরোধীরা জোর প্রচার শুরু করেছে— শেষের শুরু মমতার, সাগরদিঘী পথ দেখাবে বাংলাকে। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট কমেছে ১০ হাজার, ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের হিসেবে কমেছে ২৮ হাজার। ৬৫ হাজার ভোট পেয়ে হেরে গেলেও একক দল হিসেবে সর্বোচ্চ ভোট-প্রাপ্তি তৃণমূল কংগ্রেসের। শত্রু বন্ধু হলে, সেই বন্ধু শত্রু হতে কতক্ষণ! এখন সেই বন্ধু সিপিএমকে নিয়ে কংগ্রেসের কাছে সাগরদিঘী কি হয়ে উঠবে বিপ্লবের সিংহদুয়ার! সেটা দেখতে আমাদের এখনও অপেক্ষা করতে হবে ৩ বছর। আর এখনকার রাজনীতি, কখন যে কী হয়!