সবাই নিজের মতো করে ভাবে। সবার কাছে দেশও একভাবে ধরা দেয় না। তা নিয়ে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। কেউ স্বদেশে পরবাসী, কেউ পরবাসী থেকেও স্বদেশি। দেশের স্বাধীনতা লাভের পঁচাত্তর বছরে দাঁড়িয়ে তার প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার তুল্যমূল্যে ফিরে দেখার অবকাশে আপনাতেই নানা প্রশ্ন, পরিপ্রশ্ন উঠে আসে। সেখানে সাফল্য ব্যর্থতার নিরিখটি নিয়েই বিতর্কের বহুমুখী বিস্তার লক্ষ করা যায়। শুধু তাই নয়, সেখানে স্বাধীনতার স্বাদ ও তার আস্বাদ নিয়েই কত মতামত, কত অভিমত, কত ক্ষোভ, কত বিক্ষোভ। সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত সবেতেই দেশের স্বাধীনতা নানা প্রশ্নেই জর্জরিত। বামপন্থী আদর্শে ‘ঝুটা স্বাধীনতা’ প্রথমাবধি সচল। নাকের বদলে নরুণ পাওয়া স্বাধীনতা তাদের তৃপ্তি দেয়নি। সমাজের সর্বস্তরে শাসন ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্রের ছকবন্দি চেতনা থেকে তারা বেরুতে পারেনি। এজন্য বামপন্থীদের কাছে এ স্বাধীনতা শুধু শাসক-শোষকের পরিবর্তন মাত্র। অন্যদিকে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ধর্মভেদে দেশভাগের মধ্যে দিয়ে সাতচল্লিশে যে দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতা এল, সময়ান্তরে তার রক্তক্ষরণ শুকিয়ে এলেও দেহের যন্ত্রণা সক্রিয় থেকে গেল। যার ফলে দেশভাগ থেকে মানুষ ভাগে দেশের মানুষকে স্বদেশেই পরবাসী করে তোলে, তেমনই তাতে মানুষের মনভাগেও ধর্মীয় বিদ্বেষ তীব্র আকার ধারণ করে। এজন্য পূর্ব পাকিস্তান থেকে চব্বিশ বছর পর বাংলাদেশ হলেও সে দেশে সব বাঙালির ঠাঁই হল না। আবার সেই প্রেক্ষিতে ভারতেই বাংলাদেশী শরণার্থীদের স্বদেশ খুঁজে চলা শুরু হয়ে যায়। তারফলে ধর্মীয় বিভাজনে দেশভাগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ধর্মীয় শান্তিতে সহাবস্থান তো এল না, উল্টে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে উদ্বাস্তু হতে হল। সেই স্বদেশ হারানো স্বাধীনতা অনেকের কাছেই পরাধীনতায় ছিন্নমূল জীবন। সেখানে বুকের মধ্যে স্বদেশ, মুখে পরদেশই দেশ। নিজের জন্মভূমির নাম বলতেও জিভ শুকিয়ে আসে, গলায় দলা পাকিয়ে ওঠে, ভয় হয় পিছনে কেউ অনুপ্রবেশকারী বলে দেগে দেয়। সেক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক হানাহানি থেকে ভাগ বাটোয়ারা করে ভারতের স্বাধীনতা লাভের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতটিই বিশেষ ভাবে স্মরণীয় মনে হয়। অসুস্থ শরীরে পথচলা স্বাস্থ্যকর নয়। সেখানে সেই ক্ষতবিক্ষত দেহেই আমাদের দেশ এগিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ভারতকে ছেড়ে আধুনিক ইন্ডিয়া যত এগিয়ে চলে, ততই তার মানসিক ক্ষরণ ঘটে। তখন একদিকে যেমন তার পূর্ব-পশ্চিমে ডানা কাটা পাখির অস্তিত্ব নিবিড় মনে হয়, অন্যদিকে তেমনই যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েও ফিনিক্স পাখির মতো ভারতের মধ্যে ইন্ডিয়া জেগে ওঠে। সেদিক থেকে দেশের স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর ফিরে দেখার অবকাশে যেমন গৌরববোধ জেগে ওঠে, তেমনই পিছনে অবলোকন করে হতাশ হতে হয়।

দেশ খণ্ডিত হয়ে স্বাধীন হলেও অখণ্ড চেতনায় বিস্তৃতি লাভ করেছে, তার গণতান্ত্রিক কাঠামো অনেক পরিণত হয়েছে, সেবিষয়ে ‘মেরা ভারত মহান’। অন্যদিকে সেই দেশ পঁচাত্তর বছরে এসেও দেশের মধ্যেও স্বদেশের খোঁজে অসহায় মানুষের আতঙ্কপীড়িত মুখ ভেসে ওঠে, জেগে ওঠে পরাধীনতার দুঃস্বপ্ন। সেখানে ধর্ম ও জাতির বৈষম্যমূলক অস্তিত্ব শুধু ইন্ধনের অপেক্ষায় ওৎ পেতে থাকে। যে ধর্মীয় সহাবস্থানের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, তা তো হয়নি, উল্টে এতদিন পরেও সেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাজনিত সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবোধই দেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে, দেশের নাগরিকদের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ নিবিড় হয়ে উঠেছে, দ্বিধাদ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে। যেখানে দেশের ধারণাই দেশের জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠার অন্তরায় হয়ে রয়েছে, সেখানে তার অস্তিত্ব নানাজনে নানারকম হতে বাধ্য। দেশ তো শুধু সীমানা বেষ্টিত স্থানিক পরিচয়ে আবদ্ধ নয়, মানসিক অস্তিত্বেই তার বিস্তার ও সৌরভ। দেশবাসীর সেই মন ও মননের আলোতে দেশের চেতনায় যে ঐক্যের অভাব বর্তমান, তা তার ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই প্রকট হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর কার, দেশের না দশের ? কেননা দেশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ না থাকলেও দেশবাসীর মনে এ দেশ কতটা স্বদেশের আন্তরিকতায় আপন মনে হয়, তা নিয়ে সজীব বিতর্ক বর্তমান। রোগ বা নীরোগ থাকা নয়, দেহের শ্রীবৃদ্ধির আলোয় তার প্রাণের পরশ ছড়িয়ে পড়ে। সেদিক থেকে দেশের রক্তক্ষয়ী ধর্মীয় হিংসাশ্রয়ী অসুস্থ স্বাধীনতার রেশই যেখানে এখনও নানাভাবে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো আতঙ্কের হাতছানি দেয়, সেখানে তার উত্তরণের ধারণাই সক্রিয় না হওয়াই স্বাভাবিক। তার ফলে তার পঁচাত্তরের মাইলফলক উদযাপনে নানারকম প্রশ্ন মাথাচাড়া দেয়। তার উদযাপন আয়োজনে না প্রয়োজনে? কেননা আয়োজনের স্বতঃস্ফূর্ততা প্রয়োজনের প্রদর্শনী স্বার্থে আন্তরিক হয়ে ওঠে না। আবার কীসের উদযাপন, উন্নয়নের না উৎসবের? দেশের উন্নয়ন আসলে দেশ ও দেশবাসীর জীবনযাপনের মানোন্নয়ন। সেই মানোন্নয়নই উৎসব হয়ে ওঠে। সেখানে উৎসবের কৃত্রিম আয়োজনের প্রয়োজন পড়ে না। উন্নয়নের সোপানে যদি অবনতির প্রাথমিক চেতনাই আমাদের বিমুখ করে তোলে, তাহলে সেই উন্নয়ন নিয়েই সন্দেহ জেগে ওঠে। আলোর আয়োজনে অন্ধকার শুধু দূর হয় না, তা আরও গভীর হয়ে ওঠে। সেই আলোতে অন্ধকার আরও প্রকট মনে হয়। আলো যে অন্ধকারকেই চিনিয়ে দেয়। সরকারি ভাবে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার জন্য মিড ডে মিলের আয়োজন করা হয়েছে। তার প্রয়োজনীয়তা ছিল, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। ক্ষুধাতুর ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে তার আবেদন মূর্ত হয়ে ওঠে। অথচ তার মধ্যেও আরও গভীর সত্য উঠে আসে। যে ছেলে দৌড়ে ছুটে এসে লাইনের প্রথমে আসে, তাকে দেখে মনে হবে তার অত্যধিক ক্ষুধা পেয়েছে। অথচ তাকে জিজ্ঞাসা করে জানা যায় গভীর সত্যটি। একবারের খাবারে তার পেট ভরে না। সেই খাবার খাওয়ার পর যাতে আরেকবার তাড়াতাড়ি আবার লাইনে দাঁড়াতে পারে, এজন্যই সে লাইনের প্রথমে দাঁড়ানোর জন্য ছুটে ছুটে আসে প্রতিদিন। সেক্ষেত্রে আমাদের উন্নয়নের মাঙ্গলিক চেতনা বিস্তার লাভ করলেও আমরা এখনও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারিনি।

আসলে আধুনিকতার মোড়কী উন্নয়নের মধ্যে থাকে প্রতারণা। সানমাইকা দিয়ে ঘুণেধরা কাঠ ঢেকে দেওয়া যায়, তার ভেতরটা একই থাকে। বিজ্ঞাপনী আয়োজনে কৃত্রিম আভিজাত্য ঠিকরে পড়লেও তার স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিকতার অভাব প্রকট মনে হয়। স্বাধীনতার সার্থকতা তার বহুমুখী বিস্তারে, তার সমানাধিকারবোধ থেকে বাছাইয়ের আভিজাত্যে। সেই অধিকারের অভাববোধেই বৈষম্যপীড়িত দেশে সংরক্ষণের অস্তিত্ব প্রথমাবধি সচল। শুধু তাই নয়, যত দেশ এগিয়েছে, তত তার গুরুত্ব বেশি করে অনুভূত হয়েছে। সেখানে সংরক্ষণের দৌলতে উন্নয়নের সাফল্যই তার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে না, বরং তার মাধ্যমে যে সুফল মেলে, তাই প্রমাণ করে। অথচ সেই উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিও প্রত্যাশিত নয়। সেক্ষেত্রে রোগ সারানোর মধ্যে দেহের উন্নতিই যেখানে বাধাপ্রাপ্ত হয়, সেখানে তার অগ্রসরের ছবি অস্পষ্ট মনে হয়। অন্যদিকে প্রাপ্তি যেখানে অধরা মাধুরী, সেখানেও প্রত্যাশার হাতছানি বেদনা জাগিয়ে রাখে। স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন দেশের স্বপ্নে মনে যে মুক্ত পৃথিবীর সুখদ ছবি জেগে উঠেছিল, তা সময়ান্তরে বিষাদঘন স্মৃতি হয়ে ওঠে। নিরাশার কষ্ট সুসময় এলে মানুষ ভুলে যায় বা কাটিয়ে ওঠে। কিন্তু আশা জাগিয়ে আশাভঙ্গ হলে মানুষের মনে তা কুরে কুরে খায়। তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাঁশি’ কবিতার কিনু গোয়ালার ভাড়াটিয়া পঁচিশ টাকা মাইনের হরিপদ কেরানির মনের আশাহত মনের অবস্থা। হরিপদ টিউশনি করে কোনোরকমে বেঁচেবর্তে থাকায় ধলেশ্বরীনদীর তীরে পিসিদের গ্রামে গিয়ে বিয়ে ঠিক হলেও মেয়েটিকে কষ্টের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বিয়ে না করেই ফিরে আসে। ফিরে এলেও মনে তার ট্রাজিক পরিণতি জেগে থাকে : ‘ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসাযাওয়া—/ পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’ বিশেষ করে যাঁরা স্বাধীনতার নামে স্বদেশে পরবাসী হয়ে এ দেশে আশ্রয় নিয়ে এদেশকেই স্বদেশ ভেবে এসেছেন এবং যাঁরা স্বাধীন দেশে মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁদের মনে স্বপ্নভঙ্গের অমলিন ছবি নীরবে কথা বলে।

দেশের বয়স পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে গেলেও তার অস্তিত্ব অভ্যাসে বয়স্কে সক্রিয় হয়ে ওঠেনি। এখনও তার চেতনায় হতাশা কাটিয়ে উঠার প্রয়াস। সেখানে দেশবাসীর মনে সংখ্যাগুরুর সঙ্গে সংখ্যালঘুর দ্বন্দ্বমুখর অস্বস্তি নানাভাবে ঘুরে ফিরে আসে। শুধু তাই নয়, সেখানে একের স্বাধীনতার উগ্রতায় অন্যের পরাধীনতা জেগে ওঠে। বৃহৎ দেশের মধ্যে বিচিত্র ধর্ম-সমাজ, জাতপাত, গোষ্ঠী-সম্প্রদায় প্রভৃতির বৈচিত্র্যের আভিজাত্যের চেয়ে বৈষম্যবোধের অস্তিত্বসংকটে পীড়িত দেশের গৌরব বিজ্ঞাপিত হলেও বাস্তবে তার পারস্পরিক বৈরী মনোভাবই সামনে চলে আসে। আর তাই এক দেশের চেতনাতেই সন্দেহ জাগিয়ে তোলে। সেক্ষেত্রে দেশ তার বিদেশি আক্রমণকে প্রতিহত করায় এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে শক্তিধর রাষ্ট্র হিসাবে যতই এগিয়ে থাকুক না কেন, দেশের অভ্যন্তরে বিভেদকামী শক্তির সঙ্গে যে এখনও পেরে ওঠেনি, তা সহজেই অনুমেয়। যার জন্য এতদিন পরেও দেশে নাগরিক পরিচয় নিয়েই দেশবাসীর মনে অস্থিরতা নানাভাবে প্রকাশমুখর। যেখানে দেশের ধারণাই সীমানাবেষ্টিত হয়ে থাকে, সীমার মধ্যেই স্বাধীনতা বন্দি, সেখানে তার চেতনা অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করে দেয়, নিজের বাড়িকেও ভাড়াবাড়ি মনে হয়। সেখানে আমরা স্বাধীনতায় যে House পেয়েছিলাম, তা এখনও Home হয়ে ওঠেনি। আসলে হাউজ বা বাড়ি বাসযোগ্য হয়ে একান্ত আপন হোম বা গৃহ হয়ে ওঠে। যেখানে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়, মানুষ স্বপ্নে বিভোর হতে পারে, তাই গৃহ। সেখানে অভিনয় করে চলতে হয় না, মুখোশ খুলে নিশ্চিন্তে থাকা যায়, সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা মনে হয়। সেখানে দেশের স্বাধীনতা আমাদের হাউস দিয়েছে, হোম দিতে পারেনি। সেই হোমের স্বপ্ন দেশবাসীর চোখেমুখে। সেদিক থেকে অবশ্য আমাদের প্রত্যাশা জাগানোর মধ্যেও রয়েছে দেশের অগ্রগতি। দেশের বহুমুখী উন্নয়নের ধারাতে আমাদের প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে, আরও বহুমুখী হয়েছে, প্রত্যয়ী করে তুলেছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ যত পরিণতি লাভ করে, ততই তার চাহিদা উৎকর্ষমুখর হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে পঁচাত্তর বছর অতিক্রান্ত দেশটি নিশ্চয় আমাদের হাউসটিকে গণতান্ত্রিক ভাবে সুগঠিত করে একদিন হোম করে তুলবে, এ প্রত্যাশা করাই যায়।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
কী অপূর্ব সুন্দর বর্ণনা পেলাম স্যার, আপনার লেখায়,,,,,,, অসাধারণ ???????????????? নিরন্তর শ্রদ্ধা জানবেন।
মন ছুঁয়ে গেল স্যার। স্বাধীনতা সবার সুখের হোক এই কামনা করছি।
স্যার আপনার লেখা মন ছুয়ে গেল।