বাংলা তথা ভারতবর্ষে আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম জনক আর ভারতীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবনের অন্যতম প্রধান পুরধা নন্দলাল বসু। এনট্রান্স পরীক্ষার পর অবনীন্দ্রনাথের কাছে যখন চিত্রকলা শিক্ষার ইচ্ছা নিয়ে তাঁর সম্মুখীন হন তখনই অবনীন্দ্রনাথ তাঁর কাজ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি তৎকালীন সরকারি আর্ট স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল হ্যাভেল সাহেবর কাছে নিয়ে যান। আর তাঁদের পরামর্শে সেই সময়ে বিখ্যাত শিল্পী ঈশ্বরীপ্রসাদের ক্লাসে ডিজাইনের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। পরবর্তীকালে ১৯১৫ সালে ইন্ডিয়ান আর্ট সোসাইটির পত্তন হলে নন্দলাল বসু, ক্ষিতিন মজুমদার অসিত হালদার প্রমুখেরা একই সঙ্গে কাজ করে ছাত্রদের Indian Painting-এর তালিম দিতে শুরু করেন। কিন্তু রবীন্দ্রসান্নিধ্যে আসার পর রবীন্দ্রনাথের এই প্রতিভাকে খুঁজে নিতে অসুবিধে হয়নি। তাঁর আহ্বানে কলকাতা ছেড়ে স্থায়ী দায়িত্ব গ্রহণ করেন শান্তিনিকেতনে।

রবীন্দ্র-আশ্রমে কলাভবনের দায়িত্ব নিয়ে ১৯২০ সাল থেকে টানা প্রায় আমৃত্যু তিনি শান্তিনিকেতন আর রবীন্দ্রনাথের মানসলোকে একাকার হয়ে যান। অবনীন্দ্র, গগনেন্দ্র তাঁদের ছাত্র-ছাত্রী পরবর্তীকালে নন্দলাল বসুর ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে যে বেঙ্গল স্কুল অব আর্টের সূচনা হয়েছিল, তা থেকে বাংলার আধুনিক চিত্রকলার নিজস্ব পরিচয় তৈরি হলো। নন্দলাল বসুর মতো একজন অতি সরল মাটির মানুষ যিনি ভারত আত্মাকে হৃদয়ঙ্গম করেছেন, সিস্টার নিবেদিতার সংস্পর্শে এসে রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আধ্যাত্ম আর প্রকৃত নন্দনচেতনার এক বিষ্ময়কর ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমাদের কাছে জাজ্জ্বল্যমান হয়ে রয়েছেন। তারই সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে স্বদেশ চেতনার প্রকাশ তাঁর কাছে আমরা যে দেখেছি তা তুলনাহীন। শান্তিনিকেতন যেমন তাঁর কেন্দ্রভূমি শিল্পভূমি অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের মানস পটের প্রতিফলন যা তাঁর নন্দন বোধ আর রুচির সঙ্গে দৈনন্দিন সমাজ ছন্দে যে রঙিন হয়ে ওঠার স্বপ্ন গুরুদেব দেখিয়েছিলেন তাকে বাস্তবে বর্ণে, রেখায়, ছন্দে, রূপায়িত করেছিলেন নন্দলাল বসু।

একদিকে তিনি রবীন্দ্রনাথ অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধী এবং নিবেদিতার সংস্পর্শে ভারত আত্মার মর্ম উপলব্ধি করে যেমন শিল্পে প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন, তেমনি তিনি অসংখ্য কাজের মধ্যে যেমন নগরজীবনকে চিত্রিত করেছেন, অনুরূপভাবে সৃষ্টি করেছিলেন পুরানের নানা কাহিনীকেও। সেই প্রথম তাঁর বড়ো ছবি সতীদাহ বিষয়, তারপর রামায়ণী কথা, অহল্যা উদ্ধারের বিখ্যাত ছবি, শিবলীল, কুমারসম্ভব ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের নটীর পূজার মধ্যে দিয়ে বহু ছবি এঁকেছেন। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যেও বিশিষ্টতা লক্ষণীয়। ছাত্রদের তিনি শুধু কারুকাজ শেখাননি, পাশাপাশি ইতিহাস-প্রকৃতি যেমন মানুষকে জানা ঠিক তেমনিই সমাজকে জানানোর মধ্য দিয়ে অসংখ্য ছাত্রকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। একদিকে রামকিংকর বেইজ, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রমেন চক্রবর্তী, ধীরেন দেববর্মণ, মাসোজি, ইন্দ্র দুগার, দীনকর কৌশিক থেকে শুরু করে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী যাঁরা সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এবং পৃথিবীর কাছে ভারতীয় শিল্পের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন তিনি ছিলেন তাঁদের শিক্ষাগুরু এবং দীক্ষাগুরুও বটে। সেই মাস্টারমশাই নন্দলাল বসুর শিক্ষক হিসাবে অবদান চিরস্মরণীয় থাকবে।

অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে হরিপুরা কংগ্রেসের সজ্জায় তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমরা লক্ষ করেছি তেমনই রবীন্দ্রনাথের নানান নৃত্য নাটিকায় তাঁর মঞ্চসজ্জা পোশাক সবেতেই একটা বিশেষ ধরণের নান্দনিকতার ছাপ আমরা দেখতে পাই। শিল্পী শিক্ষক আর মানুষ নন্দলাল বসু আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আধুনিক সভ্যতা তাঁর কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে। ১৮৮২ সালের ৩ ডিসেম্বর তাঁর খড়গপুরে জন্ম আর ১৯৬৬ সালের ১৬ এপ্রিল তিনি শিল্পজগৎ শূন্য করে চলে যান। এক মাটি ছোঁয়া মানুষ আর আকাশ ছোঁয়া শিল্পী নন্দলাল বসুকে সশ্রদ্ধ প্রণাম।