[পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত ২৯তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের পসার অনেক বিস্তৃত। কেন লোচ, ন্যুরি বিলি চ্যেইলানের সাম্প্রতিকতম কাজের পাশাপাশি দেখানো হচ্ছে এবছর শতবর্ষে পা রাখা মৃণাল সেন ও দেব আনন্দের ক্লাসিক ছবিগুলি। ভারতের উত্তর পূর্ব থেকে আসা সিনেমার সঙ্গে একই স্ক্রিনে ফুটে উঠছে লাতিন আমেরিকার ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সিনেমা। এই পর্বে থাকছে উৎসবের বিপুল পসার থেকে তৃতীয় দিনের বাছাই তিনটি ছবি]
এক অন্য সোভিয়েত
গর্বাচেভ-জমানা, পেরেস্ত্রৈকার দিনগুলোর চিহ্ন বহনকারী ভাঙা সোভিয়েত ইউনিয়নের চলচ্চিত্রকার পাভেল লুঙ্গিনের একাধিক সিনেমা এবারের চলচ্চিত্র উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। ৭৪-বছরের পাভেল ২০০৮ সালে রুশ-সরকার কর্তৃক ‘পিপলস আর্টিস্ট অফ রাশিয়া’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

‘সর পে লাল-টোপি রুশী’
ছবির নাম: ব্রাদারহুড (২০১৯), পরিচালক: পাভেল লুঙ্গিন. দৈর্ঘ্য : ১ঘন্টা ৫৬ মিনিট, আফগানিস্তান, ১৯৮৯
একটি বোমারু বিমানকে গুলি করে নামিয়ে নিলো মুজাহিদরা। সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগানভূমি থেকে সরে যাওয়ার পথে। একটি বন্দুক পাইলটের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যিনি জেনারেল ভাসিলেভের ছেলে। তাকে মুজাহিদদের বন্দীদশা থেকে উদ্ধার করার জন্য একটি অভিযান চালানো হয়। যাবতীয় মিসফিট সৈনিকদের জড়ো করা হয়, এবং রুশ সেনাবাহিনীর অন্তর্বর্তী বিদ্রোহ, চোরাকারবার, বিশ্বাসঘাতকতা, এবং ক্রমবর্ধমান অভাবের ছবি ফুটে উঠতে থাকে।

বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত, ব্রাদারহুড সিনেমাটিকে রাশিয়ার প্রথম ‘ভিয়েতনাম’ চলচ্চিত্র অর্থাৎ যেভাবে মার্কিনিরা ভিয়েতনাম যুদ্ধকে দেখান, তেমন একটি প্রতিকল্প হিসাবে দেখা যেতে পারে।
এটি দেখায় যে, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের বিশৃঙ্খল শেষ মাসগুলিতে সোভিয়েত সৈন্যরা মাতাল হয়ে লুটপাট করছে।

মুজাহিদিনদের সাথে সংঘর্ষ ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এবং ১৪,০০০ এরও বেশি সোভিয়েত সৈন্যের মৃত্যু হয়েছিল।
ছবিটির মুক্তির তারিখ ৯ইমে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা একটি সরকারী ছুটির দিন যখন বর্তমান রাশিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের বিরুদ্ধে বিজয় উদযাপন করে, রেড স্কোয়ারে একটি বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ করে।
তবে যুদ্ধে নিহতদের প্রবীণ আত্মীয়রা প্রতিবাদ করার পরে ছবিটির মুক্তি অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, তাদের মতে চলচ্চিত্রটিতে যারা যুদ্ধ করেছিল তাদের অপমান করা হয়েছে।
সিনেমাটি হল ‘রুশ-বিদ্বেষী কাদাছোড়াছুড়ির ধ্রুপদী উদাহরণ’ আফগানিস্তানে প্রধান সোভিয়েত কন্টিনজেন্টের প্রাক্তন কমান্ডার বরিস গ্রোমভ, সিনেমার প্রদর্শন নিয়ন্ত্রণকারী রুশ-সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠিতে এই কথা লিখেছিলেন।

‘করসেসি যদি রুশ হতেন’
ছবির নাম: ট্যাক্সি ব্লুজ (১৯৯০), পরিচালক: পাভেল লুঙ্গিন দৈর্ঘ্য : ১ঘন্টা ৫০ মিনিট
পাভেল লুঙ্গিনের দুর্দান্ত ট্র্যাজিকমেডি ‘ট্যাক্সি ব্লুজ’ এমন একটি সোভিয়েত ইউনিয়নকে উপস্থাপন করে যা সিনেমার পর্দায় নতুন দৃশ্যগত কৌতুহলের উল্লেখ ঘটায়। ফিল্মের দুটি কেন্দ্রীয় চরিত্রকে সাময়িকভাবে একত্রিত করে তিনি সৃষ্টি করেন- একজন বদমায়েশ ইহুদি সঙ্গীতশিল্পী এবং একজন তিক্ত, যন্ত্রণাদায়ক, অস্পষ্টভাবে ইহুদি-বিরোধী ক্যাবি, ‘ট্যাক্সি ব্লুজ’ একটি অস্থির সমাজের কাঁচামাংসের নির্মম ঝলক দিয়ে ভরা এক ভূতুড়ে ভ্রমণকাহিনী।
লুঙ্গিন এই অন্তর্দৃষ্টিগুলিকে তাঁর চলচ্চিত্রের অসাধারণ চরিত্র অধ্যয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলেন। গল্পের স্বপ্নীল, মদ্যপ বুদ্ধিজীবী এবং নৃশংসতার সন্তান গর্ভে ধারণ করে অন্তঃসত্ত্বা এক শ্রমিককে, তাদের শ্রেণী দ্বন্দ্ব এবং আকাঙ্ক্ষাকে এমন একটি পটভূমিতে প্রকাশ করেন। যা স্পষ্টভাবে তাদের জৈবনিক অসুখের প্রতিফলন ঘটায় এবং এর পিছনের মতাদর্শিক শক্তিগুলির প্রতি ইঙ্গিত দেয়।

‘তবুও কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়’
ছবির নাম: পারফেক্ট ডেজ (২০২৩), পরিচালক: উইম ওয়েন্ডার্স, দৈর্ঘ্য : ২ঘন্টা ৩মিনিট
টোকিওর এক টয়লেট ক্লিনারের আপাতদৃষ্টিতে শান্ত, একাকী, ধীরলয়ের জীবনের কাব্যিক রোজনামচা নিয়েই ‘পারফেক্ট ডেজ’, ছবিটি ইন্টারন্যাশনাল ফিচার বিভাগে একাডেমি পুরস্কারে জাপানের অফিসিয়াল এন্ট্রি হিসাবে মনোনীত হয়েছে। মূল চরিত্রাভিনেতা কোজি ইয়াকুশো কান চলচ্চিত্র উৎসব, ২০২৩-এ সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন।