[পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত ২৯তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের পসার অনেক বিস্তৃত। কেন লোচ, ন্যুরি বিলি চ্যেইলানের সাম্প্রতিকতম কাজের পাশাপাশি দেখানো হচ্ছে এবছর শতবর্ষে পা রাখা মৃণাল সেন ও দেব আনন্দের ক্লাসিক ছবিগুলি। ভারতের উত্তর পূর্ব থেকে আসা সিনেমার সঙ্গে একই স্ক্রিনে ফুটে উঠছে লাতিন আমেরিকার ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সিনেমা। এই পর্বে থাকছে উৎসবের বিপুল পসার থেকে ষষ্ঠ দিনের বাছাই একটিই ছবি।]

দুনিয়ার বাস্তুচ্যুত এক হও
ছবির নাম: দ্য ওল্ড ওক (২০২৩), পরিচালক: কেন লোচ, দৈর্ঘ্য: ১ঘন্টা ৫৩ মিনিট
তাদের একত্রে ১৫তম ছবিতে পরিচালক কেন লোচ এবং লেখক পল ল্যাভার্টি এমন একটি বিষয়ের মুখোমুখি দর্শককে দাঁড় করিয়েছেন যা, এই মুহূর্তে সারা পৃথিবী জোড়া অতি-দক্ষিণপন্থী উত্থান ও ইসলামোফোবিক উদ্বাস্তু-বিদ্বেষের মুখোমুখি খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতেত পারে। তারা দর্শককে একটি প্রায় পরিত্যক্ত ব্রিটিশ-মফস্বল এবং সেখানে হঠাৎই আশ্রয় নেওয়া সিরিয়ার উদ্বাস্তু-মানুষ, উভয়ের মধ্যবর্তী নাটকীয় তিক্ততার দিকে সজোরে ঠেলে দিয়েছেন। উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডের পটভূমিতে, দর্শকরা একদল সিরিয়ানকে একটি পরিত্যক্ত খনি-এলাকায় আসতে দেখেন। লোচ এবং ল্যাভার্টি এই পরিস্থিতিতে ক্যামেরায় ধরেন, প্রত্যেকের কঠোর বাস্তবতাকে, সবকিছু সরলীকৃত করে দেননা। টোরি সরকারের কাউন্সিলগুলি, খনিতে কর্মরত বয়স্ক এবং তরুণ শ্রমিকদের কাছ থেকে চাকরি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং পেনশন কেড়ে নিয়েছে।

শরণার্থীরাও হারিয়েছে অনেককিছুই—পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণ থেকে নিজেদের মানসিক শান্তি, তাদেরও জীবনের ভাঁড়ার ফুরিয়েছে। উভয়েরই অর্থের অভাব, অথচ দুজনে দুজনের যুযুধান প্রতিপক্ষ।

‘দি ওল্ড ওক’ নামক বুড়ো গাছের মত পানশালায়, আমরা দেখি বাকি আছে সমাজতন্ত্রের, যৌথযাপনের স্বপ্নের শেষ অবশেষ। স্ক্রিন জুড়ে একের পর এক ১৯৮৪-৮৫ সালের খনিশ্রমিকদের ধর্মঘটের ছবিগুলো, মনে করায় একদা খনিশ্রমিকদের ইতিবৃত্ত থেকে বিদ্রোহের ইতিহাস লিখতে শিখিয়েছিলেন অশীতিপর ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ই.পি.থম্পসন। এই ইতিহাস-লিখনকে বর্তমানের লড়াইয়ের সঙ্গে এক সেতুবন্ধনের মতো বাঁধেন কেন লোচ। এক পাতে খাবার বেড়ে যখন, সিরিয়ার যুবতী এবং ব্রিটিশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ভাগাভাগি করে নেন, তখন এই ‘কমিউনিটি কিচেনে’র দেওয়ালে চোখের জল মুছতে মুছতে কোনো অদৃশ্য কেউ যেন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর, সেই অমোঘ শেকলভাঙ্গা ডাককে অন্যভাবে লিখে দিয়ে যায়। পতাকা পাল্টে গেলেও, স্লোগান পাল্টে গেলেও, এই ব্যপ্তচরাচর জুড়ে আজও মানুষ ও তার রান্নাঘর জেগে থাকে।