চতুর্থ অধ্যায়
শাহজাদা দারাশুকোর কান্দাহার অভিযান
এক
শাহ সফীর মৃত্যু ও পারস্য রাজ্যের অসতর্ক অবস্থার সুযোগ অবহেলা করিয়া দিল্লীশ্বর সুবিবেচনার কাজ করিয়াছিলেন কিনা সন্দেহ। কাবুল-কান্দাহার নিরাপদ করিতে হইলে সিস্তান না হউক, অন্তত পারস্য ও খোরাসানের দিক হইতে শত্রুর সুগম প্রবেশদ্বার স্বরূপ হিরাত নগর অধিকার করা সম্রাট শাহজাহানের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। পরধন কিংবা পররাজ্যে তাঁহার যে অরুচি ছিল তাহাও নয়। ১৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে গোলকুণ্ডা ও বিজাপুরের বিরুদ্ধে অভিযান ও পরবর্তী ব্যবহার ইহার প্রমাণ। জুঝার সিংহ বুন্দেলা চৌরাগড় লুটের ভাগ দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি তাঁহাকে সর্বস্বান্ত করিয়াছিলেন (১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ)। সমগ্র ভারতে সার্বভৌমত্ব স্থাপন করিয়া ধর্মাশোকের মতো শাহজাহান যে যুদ্ধ ও রক্তপাতে বীতস্পৃহ হইয়াছিলেন, ইতিহাস এ কথা বলে না। দারার দ্বিতীয় অভিযানের মাত্র চারি বৎসর পরে সম্রাট শাহজাহান বিজিগীষা-বৃত্তি এবং বাবর-তৈমুরের জন্মভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভাবাতিশয্যের প্রেরণায় শাহজাদা মুরাদ ও তৎপশ্চাৎ আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে বখ্-অভিযান প্রেরণ করিতে দ্বিধা বোধ করেন নাই। দশ সহস্র লোকের জীবন ও চারি কোটি টাকা নগদ—এই খরচে তিনি অনায়াসে হিরাত দখল করিয়া ভবিষ্যতের জন্য নিশ্চিত্ত হইতে পারিতেন। এ যুদ্ধে সেনাপতি পদের জন্য দারার যোগ্যতা না থাকিলেও তিনি আওরঙ্গজেবকে পাঠাইতে পারিতেন কিংবা নিজে নেতৃত্ব করিতে পারিতেন। আসল কথা, সম্রাট শাহজাহান আকবরের মতো সামরিক কিংবা রাজনৈতিক প্রতিভা লইয়া জন্মগ্রহণ করেন নাই; পুত্র আওরঙ্গজেবের মতো সামরিক দূরদৃষ্টি, মানসিক শক্তি কিংবা শ্রমসহিষ্ণুতা ও ধৈর্য শাহজাহানের ছিল না। প্রথম বয়সে তাঁহার এ সকল গুণ কিছু কিছু থাকিলেও মমতাজমহলের মৃত্যুর পর অতি দ্রুত শারীরিক বার্ধক্য ও বুদ্ধিবৃত্তির দুর্বলতা তাঁহাকে অভিভূত করিয়াছিল।
শাহজাহানের অবিবেচনার ফল হাতে হাতে ফলিল। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু বলিয়া যে শত্রুকে তিনি অবহেলা করিয়াছিলেন, সেই দ্বিতীয় শাহ আব্বাস কৈশোরে পদার্পণ করিয়াই কান্দাহার পুনরধিকারের জন্য হিরাত শহরে যুদ্ধসম্ভার ও সৈন্য সমাবেশ করিতে লাগিলেন। মোগল সম্রাট এ সময়ে দিল্লিতে ছিলেন। তিনি প্রথমে স্থির করিয়াছিলেন স্বয়ং কাবুলে গিয়া যুদ্ধের ভার লইবেন। সুবাদারেরা সসৈন্যে দিল্লিতে হাজির হইতে আদিষ্ট হইল। কিন্তু তাঁহার আরামপ্রিয় আমীরদের মধ্যে অনেকেই দারুণ শীতে কাবুল যাইবার কথা শুনিয়া হতাশ হইয়া পড়িলেন। তাঁহারা বাদশাহকে বুঝাইলেন, ইরানীরা শীতকালে কিছুতেই লড়াই করিতে আসিবে না, আলা হজরত অনর্থক কষ্ট স্বীকার করিবেন; হিন্দুস্থানী ফৌজ অকারণ হয়রান-পেরেশান হইবে। মাস দুই পরে গেলে কোনও ক্ষতি নাই, বরং আসা-যাওয়ার আরাম ও কাবুলের দিল-ফেরেব বাহার দেখার নসিব হইবে। বাদশার মত বদলাইয়া গেল। কাবুলের সুবাদারকে কান্দাহার দুর্গে পাঁচ হাজার সিপাহী ও পাঁচ লাখ টাকা পাঠাইবার হুকুম পাঠাইয়া তিনি দিল্লির শীত উপভোগ করাই স্থির করিলেন। লেপের আরাম কিংবা শরতের জ্যোৎস্না উপভোগ বিধাতা গরিব ও বাদশাহের ভাগ্যে লিখেন নাই। রাজমুকুট ফুলের টোপর নহে।
দশ জনে যাহা যুক্তিযুক্ত মনে করে না কিংবা যে-কাজে পিছু হটে, সেই কাজ করিয়াই মানুষ সাধারণ শ্রেণী হইতে উন্নীত হইয়া অনন্যসাধারণ পদবী লাভ করিয়া থাকেন। তৎকালীন ইউরোপের গতানুগতিক নিয়ম উপেক্ষা করিয়া শীতকালে সৈন্যচালনাপূর্বক এবং শত্রু-মিত্র দুই পক্ষকে ফাঁকি দিয়া ব্লেনহিম যুদ্ধ জয় করিতে না পারিলে মালবরো বড়জোর দ্বিতীয় শ্রেণীর যোদ্ধা ও রূপসী স্ত্রীর স্বামী বলিয়াই ইতিহাসে পরিচিত হইতেন।
পারস্য-পতি দ্বিতীয় শাহ আব্বাস ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর কান্দাহার অবরোধ করিলেন। দুর্গাধ্যক্ষ দৌলত খাঁর বয়স ষাটের উপর; সাহসের অভাব না থাকিলেও তিনি ঢিলা প্রকৃতির লোক ছিলেন। কান্দাহার দুর্গের রন্ধ্রতুল্য “চেহেল জিনা” পাহাড়ের ঘাঁটি ও সান্ত্রীগৃহে অল্পসংখ্যক প্রহরী রাখিয়া তিনি অন্য সমস্ত সৈন্যসহ দুর্গপ্রাচীরের ভিতরেই হাত-পা গুটাইয়া বসিয়া রহিলেন। ইরানীরা সেখানে কামান বসাইয়া অন্দর কেল্লা ও বাজারের উপর গোলা ফেলিতে লাগিল। এদিকে দুর্গমধ্যে নবনিযুক্ত দুইজন বিশ্বাসঘাতক তাতার-সর্দার দল পাকাইয়া বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র করিল। দৌলত খাঁ সরাসরি ইহাদের মাথা না কাটিয়া তাহাদিগকে যুক্তিতর্কের দ্বারা বুঝাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু ক্রমশ সিপাহীরা তাঁহার হুকুমের বাহির হইয়া পড়িল। ছাপ্পান্ন দিন অবরোধের পর দৌলত খাঁ আত্মসমর্পণ করিলেন; মোগল সৈন্যেরা চিরদিনের মতো কান্দাহার হইতে শেষ বিদায় লইয়া হিন্দুস্থান অভিমুখে যাত্রা করিল (১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৬৪৯)। ইহার পুরা তিন মাস পরে শাহজাদা আওরঙ্গজেব ও উজীর সাদুল্লা খাঁ পরিচালিত মোগল বাহিনী কান্দাহারে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কার্য সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে। মে হইতে আগস্ট মাস পর্যন্ত তাঁহারা কান্দাহার অবরোধ করিয়া অকৃতকার্য হইলেন, কারণ তাঁহাদের সঙ্গে ভারী তোপ ও অবরোধের সরঞ্জাম ছিল না। ইহার তিন বৎসর পরে, ১৬৫২ খ্রিস্টাব্দে শাহজাদা আওরঙ্গজেব দ্বিতীয় বার কান্দাহার অভিযানে প্রেরিত হইলেন। মানুষের বুদ্ধি, সাহস ও অক্লান্ত পরিশ্রমে যাহা সম্ভব, আওরঙ্গজেব সমস্তই করিলেন। তিনি হিন্দুস্থানের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অপরাজেয় যোদ্ধা; তবুও কান্দাহার দুর্গে তাঁহার চেষ্টা বিফল হইল। এই অকৃতকার্যতার জন্য দায়ী আওরঙ্গজেব নন; স্বয়ং দিল্লীশ্বর এজন্য সম্পূর্ণ দোষী। তিনি আওরঙ্গজেবকে যুদ্ধচালনার সর্বময় কর্তৃত্ব ছাড়িয়া দেন নাই। কাবুলে থাকিয়া উজীর সাদুল্লার মারফত চিঠিপত্র দ্বারা তিনিই এ যুদ্ধ চালাইয়াছিলেন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। আওরঙ্গজেব সৈন্যক্ষয় অগ্রাহ্য এবং প্রাণের মমতা ত্যাগ করিয়া তলোয়ার হাতে দুর্গপ্রাচীর দখল করিবার অনুমতি চাহিলেন। ইহা অনুমোদন করা দূরে থাক, আরও কিছু দিন অবরোধ চালাইবার প্রার্থনা তিনি না-মঞ্জুর করিলেন। ইহার উপর আবার বেচারা আওরঙ্গজেবকে উল্টা গালাগালি। শাহজাদার প্রতি এক্ষেত্রে তাঁহার আচরণ পিতা ও অপক্ষপাত রাজ-রাজেশ্বরের উপযুক্ত হয় নাই। আওরঙ্গজেব শেষ ভিক্ষা চাহিলেন— পরবর্তী অভিযানে তিনি অন্যের অধীনে সাধারণ মনসবদার হিসাবে কাজ করিতে প্রস্তুত; দিল্লীশ্বর যেন তাঁহাকে আর এক বার যুদ্ধ করিবার সুযোগ দেন। কিন্তু ইহার পরিবর্তে পিতার নিকট হইতে তিনি পাইলেন শুধু মর্মচ্ছেদী বাক্যবাণ, বিদ্রূপ ও শ্লেষ এবং সুদূর দাক্ষিণাত্যে সরাসরি বদলি হওয়ার শাস্তি। এই পরাজয়ে তিনি অকর্মণ্য দারার উপহাসের পাত্র হইলেন—ইহাই আওরঙ্গজেবের বুকে শল্যস্বরূপ বিধিয়া রহিল। এই সময় হইতে আওরঙ্গজেব যদি শাহজাহানকে পিতার ন্যায় ভক্তি না দেখাইয়া থাকেন, সে দোষ পুত্রের নয়; উহা পুত্রের প্রতি পিতার অবিচারের প্রতিক্রিয়া। যে কান্দাহার দুর্গে হিন্দুস্থানের পৌরুষ ও মোগলের পুরুষকার দুই-দুই বার প্রতিহত হইল, আওরঙ্গজেব-সাদুল্লার শৌর্য ও বুদ্ধিমত্তা নিষ্ফল হইল, উহার বিরুদ্ধে শাহজাহান কোন্ বুদ্ধিতে দারাকে পরবৎসর সেনাচালনার ভার অর্পণ করিয়াছিলেন বুঝা কঠিন নয়। বাদশাহ তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র শাহ শুজাকে সুবে বাংলা হইতে কান্দাহার-অভিযানে যোগ দেওয়ার জন্য হুজুরে তলব করিয়াছিলেন। কিন্তু শুজা সিন্ধুনদ অতিক্রম করিবার পূর্বেই তাঁহার প্রতি বাংলায় ফিরিয়া যাইবার হুকুম হইল। পাছে শুজা দারার বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে কোন কুপরামর্শ করে সেই জন্য শাহজাদাদ্বয়ের প্রতি হুকুম হইল, কুচ করিবার সময় বরাবর যেন দুই-তিন মঞ্জিল রাস্তা ব্যবধান থাকে। পিতা ও পুত্রদের এইরূপ পরস্পরের প্রতি সন্দিগ্ধ ভাব এই সময় হইতে স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। আওরঙ্গজেব ও শুজা সমস্ত পথ দূরে দূরে থাকিয়া অবশেষে দিল্লিতে যেন দৈবাৎ পরস্পরের সহিত মিলিত হইলেন। এ সময় (নভেম্বর, ১৬৫৪ খ্রিঃ) শুজার কন্যা গুলরুক্ বানুর সহিত আওরঙ্গজেবের পুত্র সুলতান মহম্মদের বাগ্দান সম্পন্ন হইল। দাক্ষিণাত্য যাত্রার সময়ে মালবের পথে গুজরাটের সুবাদার মোরাদ বক্শ আসিয়া দাদা আওরঙ্গজেবের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। এই ভাবে তিন ভ্রাতা তাঁহাদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচী স্থির করিয়া লইলেন; দারার ভাগ্যাকাশে কালবৈশাখীর মেঘ ঘনাইয়া উঠিল। (চলবে)