চতুর্থ অধ্যায়
শাহজাদা দারাশুকোর কান্দাহার অভিযান
দুই
১৬৫২ খ্রিস্টাব্দের ৯ই জুলাই হিন্দুস্থানের ফৌজ কান্দাহার হইতে কাবুল ফিরিয়া আসিল। স্থির হইল, আগামী শীতের শেষে শাহজাদা দারাশুকো কান্দাহার যাত্রা করিবেন। সুবা কাবুল ও মুলতানের শাসনভার তাঁহার উপর অর্পিত হইল। দারার নায়েব সুবাদার রূপে সুলেমান শুকো কাবুল এবং মহম্মদ আলি খাঁ মুলতানে থাকিবেন। দারা স্বয়ং লাহোরে গিয়া আগামী যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম ও সৈন্যাদির ব্যবস্থা করিবেন। এ-সময় নূতন দিল্লি শাহজাহানাবাদের নির্মাণকার্য প্রায় শেষ হইয়াছিল; সম্রাট দারাকে কাজ বুঝাইয়া দিয়া দিল্লিতে ফিরিয়া আসিলেন। শাহজাহানের ভাবী উত্তরাধিকারী দারা এত দিন পর্যন্ত সুফী ধ্যান-ধারণা, তত্ত্বজ্ঞানবোধিনী যোগপ্রদীপ ইত্যাদি ধরনের মুসলমানী সাধনতত্ত্ববিষয়ক রচনা এবং রাজ্যের সাধু-ফকির-দরবেশ লইয়া মশগুল ছিলেন। সুকুমার কলা, সঙ্গীত, সাহিত্য ও অধ্যাত্ম-বিদ্যানুরাগী বলিয়া শাহজাদা যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন; কিন্তু চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হইলেও তিনি লড়াইয়ের ময়দানে বাহাদুরি দেখাইবার সুযোগ পান নাই; তিনি ছিলেন পিতার সুবোধ বালক; গায়ে আঁচড় লাগিবার ভয়ে শাহজাহান পুত্রকে চোখের আড়াল হইতে দেন নাই। পিতার এই দুর্বলতা দারার সহজাত ক্ষমতা ও মনুষ্যত্বের পূর্ণবিকাশের পরিপন্থী হইয়াছিল। আশৈশব যুদ্ধ ও শাসনকার্যে অসীম দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াও আওরঙ্গজেবের মনসব বিশ হাজারীর উপরে উঠিল না। অথচ কোমরের কিরিচ না খুলিয়াই দারার মনসব সকলকে ছাড়াইয়া ত্রিশ হাজারী হইয়া গেল। এ সম্মান পিতার অন্ধ স্নেহের আত্মতৃপ্তির নিদর্শন মাত্র; যোগ্যতার পুরস্কার কিংবা তাঁহার কৃতিত্ব ও শ্রেষ্ঠতার পরিমাপ নহে—এই জ্ঞান দারার ছিল না।
শাহজাহান আজীবন পুত্রকে ঠোঁটে করিয়াই আহার জোগাইয়াছিলেন; স্বাধীনভাবে উড়িয়া বেড়াইবার শিক্ষা দেন নাই। দারাও কোনোদিন আত্মনির্ভরতার আবশ্যক বোধ করেন নাই; পিতার ডানার আড়ালে থাকিয়া শুধু পাখা ঝাড়িয়াছেন। অপ্রকৃষ্য রাজশক্তি-রক্ষিত সৌভাগ্যশৈলের উচ্চতম শৃঙ্গে সুখোপবিষ্ট শাহজাদা দারা মনে করিতেন, তিনিই হিন্দুস্থানের ভাবী ভাগ্যবিধাতা “হুমা” পাখি; বীর্য ও সাহসে তিনি শাহ-বাজ এবং জ্ঞান ও বুদ্ধিতে হীরামন তোতা।
ভ্রাতাদের তিনি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখিতেন। কাঠ-মোল্লা কপট আওরঙ্গজেব একটা ধূর্ত দাঁড়কাক; কায়দাদোরস্ত গর্বিত আয়েসী শুজা সেই চটক-ঝুঁটিদার শাহী কাকাতুয়া; এবং সদা রক্তচক্ষু, একগুঁয়ে মোরাদ বক্শ বুনো তিতির—ইহার বেশি তাহারা আর কিছুই নয়; ইহাই ছিল তাঁহার ভাব। আওরঙ্গজেবের পরাজয়ে তিনি মনে মনে সন্তুষ্ট হইয়া নিরস্ত থাকেন নাই। তিনি এবং তাঁহার মোসাহেবগণ ততোধিক নানা রকম নিন্দা-বিদ্রূপ করিয়া আওরঙ্গজেবের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়াছিলেন।
কান্দাহার অভিযানের সেনাপতি মনোনীত হইবার পর দিন হইতেই দারা সেই দুর্গজয়ের স্বপ্ন দেখিতে লাগিলেন। একদিন রাত্রিকালে তাঁহার স্বপ্নপ্রয়াগ হইল; গন্তব্যস্থানে পৌঁছিয়া তিনি দেখিলেন, একটি বড় রকমের দুর্গ এবং সেই দুর্গ সাত দিনে দখল করিয়া তিনি কাবুল ফিরিয়াছেন। ইহার পর হইতে তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস হইল, কান্দাহার ফতে হইয়া গিয়াছে; সেখানে পৌঁছিতে যা কিছু বিলম্ব। কিন্তু কি ভাবে দুর্গটি এত সহজে তাঁহার হস্তগত হইবে এ-বিষয়ে “গায়েবী দুনিয়া” হইতে কোনও ইশারা মিলে কি না ইহাই তিনি চিন্তা করিতে লাগিলেন। এমন সময়ে একদিন দুইজন সুফী দরবেশ গম্ভীরভাবে সোজা শাহজাদার খাস বৈঠকখানায় ঢুকিয়া তাহাদের শতচ্ছিদ্র সহস্ৰতালিযুক্ত লম্বা জোব্বা মুড়ি দিয়া ধ্যানস্থ হইল। ইহা এক রকম শাহজাদার দৌলতখানায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সাত হাজারী মনসবদার আসিলে হয়তো প্রবেশের অনুমতির জন্য ঘড়ি দেড় ঘড়ি দাঁড়াইয়া থাকিতে হইত; কিন্তু ঠিকমত ভেক থাকিলে সাধু-ফকিরদের জন্য কোনও হুকুম আবশ্যক ছিল না। ফকিরের খবর পাইলেই শাহজাদা আনন্দে অজ্ঞান হইতেন; ছুটিয়া আসিয়া সালাম- খুশ-আমদ করিতেন। বাহ্যত মৃতকল্প গভীর ধ্যানমগ্ন হইলেও, ফকিরদ্বয় শাহজাদা কখন বৈঠকখানায় নিঃশব্দে প্রবেশ করিলেন সেটা ঠিকমত টের পাইয়াছিল। কিছুক্ষণ পরে উহাদের মধ্যে একজন হঠাৎ আনমনা ভাবে মাথা তুলিয়া বলিল, “আমি এখন ইরানে পৌঁছিয়া সেখানকার হাল প্রত্যক্ষ করিতেছি; ইরানের শাহের দুনিয়াদারী খতম!” দ্বিতীয় দরবেশ মাথা না তুলিয়াই বলিল, “হাঁ ঠিক তাই; আমি কিন্তু শাহকে কবর না দিয়া আসিতেছি না।” দারা এই কথা শুনিয়া বলিলেন, “আমিও স্বপ্নে দেখিয়াছি, সাত দিনের বেশি আমাকে কান্দাহারে থাকিতে হইবে না; শাহ আব্বাস মারা যাওয়া বিচিত্র নয়।” বৈজ্ঞানিকের টেলিস্কোপ সাধু-ফকিরদের টেলিভিশনের কাছে কোথায় লাগে? কিন্তু দুঃখের বিষয় আলাম-ই-নাসুত (প্রত্যক্ষ জগৎ) অর্থাৎ মাটির পৃথিবী ছাড়িয়া শাহজাদার ন্যায় বাস্তবতার বহু ঊর্ধ্বে আলম-ই-মালাকুৎ বা স্বপ্নজগতে ঘোরাফেরা করিবার অধিকার ঐতিহাসিকের নাই। (চলবে)