পঞ্চম অধ্যায়
দারাশুকোর কান্দাহার-অভিযানের উদ্যোগ-পর্ব
শাহজাদা দারা ১৬৫২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের শেষে কাবুল হইতে লাহোর চলিয়া আসিলেন। সেখানে তিন মাস ধরিয়া উদ্যোগ পর্বের ধুমধাম চলিল; দারা লেখাপড়া ছাড়িয়া যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম সংগ্রহে মনোযোগ দিলেন। সব কাজেই তাঁহার উৎসাহ, ঐকান্তিক আগ্রহ ও পরিশ্রম করিবার ক্ষমতা ছিল; তবে তিনি ঝোঁকের মাথায় কাজ করিতেন। বিচক্ষণ সেনাপতির মতো সুস্থির বুদ্ধি ও চারি দিকে কড়া নজর রাখিয়া ভবিষ্যৎ প্রয়োজনানুযায়ী ছোটখাট জিনিসের বন্দোবস্ত করিতে তিনি পটু ছিলেন না; বিশেষত লড়াইয়ের কাজে তাঁহার পূর্ব অভিজ্ঞতা কিছুই ছিল না। দরবারী ঐতিহাসিক ওয়ারেস লিখিয়াছেন, এক বৎসরে যে আয়োজন অন্য কেহ করিতে পারে নাই শাহজাদা লাহোরে থাকিয়া তিন মাস নয় দিনে তাহা সুসম্পন্ন করিয়াছিলেন।
কান্দাহার দুর্গের সুদৃঢ় প্রাচীর ধ্বংস করার জন্য সর্বপ্রথমে দরকার বড় বড় কামান, ভারী তোপখানা ও উৎকৃষ্ট গোলন্দাজ। পূর্বে দুইবারই দেখা গিয়াছে ইরানী গোলন্দাজ ও তোপখানার সামনে হিন্দুস্থানী তোপখানা জোরে পাল্টা জবাব দিতে পারে না। তুর্কীদের সহিত অবিরাম সংঘর্ষের ফলে ইরানীরা তোপের লড়াইয়ে সুনিপুণ হইয়া উঠিয়াছিল। তাহাদের কামানের পাল্লা হিন্দুস্থানী তোপখানার পাল্লার চেয়ে অনেক বেশি এবং নিশানাও প্রায় অব্যর্থ। ভারতবর্ষের লোকেরা তোপখানার কাজে বরাবরই কাঁচা। এজন্য বেশি বেতন দিয়া বাদশাহী তোপখানায় রুমী বা ইস্তাম্বুলের তুর্কী ও ফিরিঙ্গি গোলন্দাজ ভর্তি করা হইত। ঠিক জায়গায় কামান বসান, গোলাবারুদ-ভরা, সলিতায় আগুন দেওয়া, তোপ ফাটিয়া মারা যাওয়া ইত্যাদি বিপদের ঝুঁকি ও মোটা কাজ সব হিন্দুস্থানী “খালাসী”রা করিত; রুমী ও ফিরিঙ্গিরা শুধু নিশানা ঠিক ও কামান দাগিবার হুকুম দিত। শাহজাদা এবার মোটা বেতনে ফিরিঙ্গি গোলন্দাজ ও কয়েকজন তোপখানার এঞ্জিনিয়ার নিযুক্ত করিলেন। লাহোরে কামানের কারখানায় তিনটি ভারি কামান ও সাতটি হালকা তোপ (তোপ-ই-হাওয়াই) তৈয়ার করা হইল; বড়গুলির নাম “ফতে মোবারক”, “কিশোয়ার-কুশা” ও “গড়-ভঞ্জন”। প্রথম দুটি ৪৫ সের ও ৩২ সের ভারী গোলা ছুঁড়িবার মতো মজবুত ছিল, ইহার চেয়েও ভারী একটি শাহী তোপ ছিল, নাম “কিলা-কুশা”; তাকত ৫২ সেরী গোলা। কান্দাহারের ভাবী সুনিশ্চিত পতনের স্বপ্নে বিভোর শাহজাদা নিজের বাহাদুরি কামানগুলির গায়ে আগেই খোদাইয়া নিলেন।
“ফতে মোবারক” তোপের উপর ফার্সি কবিতায় লেখা হইল-
তোপ-ই-দারাশুকো শাহই-জাহান
মি-কুনদ্ “কান্দাহার-রা বৈয়রান”
“কিলা-কুশা” তোপ-এ :-
তোপ-ই-দারাশুকো “কিলা-কুশা”
সর্-ই গর্জাসপ মি-বুরদ বে হাওয়া।
এই অভিযানের জন্য মোট সাতটি ভারী কামান, সতেরটি দূর-পাল্লাবিশিষ্ট হালকা তোপ (তোপ-ই-হাওয়াই), ত্রিশটি ছোট তোপ এবং এইগুলির খোরাক বাবদ ত্রিশ হাজার গোলা এবং ইহার উপযুক্ত পরিমাণ বারুদ, চৌদ্দ হাজার “হাওয়াই” আতসবাজি এবং বন্দুকের গুলি তৈয়ার করিবার জন্য ১৫০০ মান্ (প্রত্যেক মান্ প্রায় ৩ সের; ৪০ সেরী মণ নয় [ফার্সি “মান্”কে আমার পূর্ববর্তী ঐতিহাসিকগণ এবং আমি স্বয়ং এ যাবৎ ৪০ সেরী মণ বলিয়া ভুল করিয়া আসিয়াছি। বিভিন্ন বস্তুর মানের ওজন যথা, সোনা ও লোহা বিভিন্ন ছিল।]) সীসা বারুদখানায় জমা করা হইল। ইহা অবশ্য সরকারি কাগজপত্রের হিসাব; কিছু বাদসাদ দিয়া লইতে হইবে। সেকালে শক্ত পাথর গোল করিয়া কাটিয়া গোলা তৈয়ার হইত; শুধু বড় বড় কামানে লোহার গোলা ব্যবহৃত হইত। তাঁহার এক দারোগা আসিয়া বলিল, ‘হুজুর! লাহোর হইতে খামকা কান্দাহারে পাথরের গোলা বোঝা করিয়া লইয়া ফায়দা কি? ওইখানে বিস্তর শক্ত পাথর পাওয়া যায়। মিস্ত্রিরা সেখানে বসিয়া গোলা তৈয়ারি করিলে মেহনত কম হইবে।’ দারাকে চাটুকার ঠকবাজ কর্মচারীরা যাহা বুঝাইত তাহাতেই সায় দেওয়া ছিল তাঁহার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তাহাদের দ্বারাই এই ভাবে তাঁহার সব কাজ পণ্ড হইত। এক্ষেত্রে তাহাই হইল। তোপের ঠিক মতো গোলা সঙ্গে না লইলেও শাহজাদা ৬০০০ বাঁশ পূর্বেই মজুত করিয়া রাখিয়াছিলেন; প্রত্যেকটি বাঁশ দশ গজ (৪২ আঙুলে এক গজ) লম্বা ছিল। দেওয়াল চড়াও করিবার সময় অনেক বাঁশের মই দরকার হইবে, এই জন্য বাঁশের ব্যবস্থা।
সরকারি দপ্তরের হিসাবে কান্দাহার-অভিযানের মনসবদারী ফৌজ ৭০,০০০ সওয়ার ও ১৭০টি হাতি ছিল। প্রকৃত পক্ষে এই সওয়ারের অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ ছিল পায়দল সিপাহী। স্বয়ং শাহজাদা (ত্রিশ হাজারী মনসবদার) এবং ১১০ জন মুসলমান ও ৫৮ জন রাজপুত মনসবদারের সওয়ার একত্র করিয়া এই বাহিনী গঠিত হইয়াছিল। পাঁচ-হাজারী হইতে পাঁচ-শতী মনসবদারকেই শুধু এই হিসাবের মধ্যে ধরা হইয়াছে। এই সমস্ত মনসবদারী ফৌজ ব্যতীত হুজুর রিসালার পাঁচ হাজার বন্দুকধারী ও তিন হাজার তীরন্দাজ অশ্বারোহী আহদী সৈন্য, খাস তৈনাতী পদাতিক বাহিনীর দশ হাজার বন্দুকধারী বরকন্দাজ সিপাহী এবং বাদশাহী পিলখানার ষাটটি হাতি বাদশাহের হুকুমে এই লড়াইয়ে সামিল হওয়ার জন্য লাহোরে পৌঁছিল। পথঘাট মেরামত, বনজঙ্গল পরিষ্কার ও আশ্রয় পরিখা খননের জন্য ৬০০০ বেলদার, পাঁচ হাজার পাথর কাটা মিস্ত্রি ও পাঁচ হাজার ভিত্তি কান্দাহার যাইবার জন্য ভর্তি করা হইল।
এই সমস্ত লোকের রসদ সরবরাহ করার ব্যবস্থা শাহজাদা যথোপযুক্ত ভাবেই করিয়াছিলেন। আধুনিক সমর বিভাগের কমিসারিয়েট বাদশাহী আমলে ছিল না। এখনকার দিনে ফৌজী ঠিকাদারেরা রসদ জোগায়; টাকা সরকারি তহবিল হইতে দেওয়া হয়। সরকার প্রত্যেক সিপাহীর বেতন হইতে ছয়-সাত টাকা নির্দিষ্ট নিরিখে কাটিয়া রাখেন। প্রত্যেক কোম্পানি ও রিসালার সঙ্গে সঙ্গে পাচক, ধোপা ইত্যাদি থাকে। মাথাপিছু রসদ সরকারি ভাণ্ডার হইতে মাপিয়া দেওয়া হয়। খাওয়া এমন কি দাড়ি কামাইবার কোনও ভাবনাও সিপাহীর থাকে না; ঘোড়া, খচ্চর এবং বলদের খোরাক ও খেদমত সরকারি লোকেরাই করিয়া থাকে। সেকালের ব্যবস্থা ছিল অন্য রকম। সিপাহীরা সকলেই আপ্-খোরাকি; কাপড় পোশাক হাতিয়ার (বন্দুক গোলাগুলি বাদ) ঘোড়া জিন লাগাম সবই সিপাহীর। নিজের ও ঘোড়ার খোরাকের বন্দোবস্ত প্রত্যেককেই করিতে হইত। তবে সরকারি তরফ হইতে এই ব্যবস্থা করা হইত যে, সিপাহীরা যেখানেই থাকুক ন্যায্য দামে উর্দুবাজার হইতে সমস্ত খাদ্যদ্রব্য ঘাস-দানা প্রয়োজন অনুসারে খরিদ করিতে পারে। শহরের প্রায় সকল রকম আরাম, খাদ্যদ্রব্য ও জিনিসপত্র স্বাভাবিক অবস্থায় সফর ও লড়াইয়ের ছাউনিতে পাওয়া যাইত। যে যাহার ভড্ডু চড়াইয়া খিচুড়ি পাক করিয়া কিংবা রুটি সেঁকিয়া লইত। লোটা কম্বল বদনা পিঠে কিংবা জিনের পিছনে বাঁধিয়া পথ চলিত। পাকের সুবিধা না হইলে হয়তো ইংরেজের কনোজিয়া সিপাহীর মতো চানা চিবাইয়াই ক্ষুন্নিবৃত্তি করিত।
সে যুগে ভারতবর্ষের সর্বত্র “বন্জারা” (বণিজয়ারা) নামক এক জাতির লোক ছিল, তাহারা যুদ্ধের সময় উর্দুবাজারে এবং শহর ইত্যাদিতে সর্বদা খাদ্যশস্য জোগাইত। দলবদ্ধভাবে বনজারাগণ বলদ কিংবা খচ্চরের পিঠে যব গম ডাল চালের থলি বোঝাই করিয়া এক স্থান হইতে অন্য স্থানে যাইত; স্ত্রী-পুত্র-পরিবার সঙ্গে সঙ্গে থাকিত। এক-এক দলে হাজার দুই হাজার ব্যবসায়ী, আট-দশ হাজার বলদ ও খচ্চর থাকিত। তাহাদের সঙ্গে ভীষণ প্রকৃতির কুকুর ও যথেষ্ট অস্ত্রশস্ত্র থাকিত। মহারাষ্ট্র ও উত্তর ভারতে ইহারা এখন ছোটখাট ব্যবসা চালাইয়া থাকে। ইহাদের অগম্য কোনও স্থান ছিল না। যুদ্ধাদিতে খাদ্য সরবরাহের ঠিকাদারি ইহারাই লইত; এবং এজন্য সরকার হইতে টাকা দাদন লইত। শাহজাদা দারাশুকো লাহোরের বনজারাদিগকে এই অভিযানে খাদ্যদ্রব্য জোগাইবার ভার দিলেন; বনজারা চৌধুরীদের পরিবারবর্গকে জামিন-স্বরূপ শহরে নজরবন্দী করিয়া রাখা হইত। (চলবে)