সপ্তম অধ্যায় — দারাশুকোর কান্দাহার-অভিযান
যোগী ও হাজীর কেরামতি
শাহজাদা দারাশুকো গোলা বারুদ লস্কর তোপখানার উপর ভরসা করিয়া নিশ্চয়ই কান্দাহার-উদ্ধারের মতো দুষ্কর কার্যে হাত দেন নাই। দোয়া-দরুদ পড়িবার জন্য মোল্লা,তুকতাক-মন্ত্রতন্ত্র-জানা ওঝা ও জাদুবিদ এবং ভৌতিক উপায়ে কান্দাহারের দেওয়াল ভাঙিতে পারে এমন একজন হিন্দুযোগী ইন্দ্রগীরকে তিনি লাহোর হইতে অনেক খাতির তোয়াজ করিয়া সঙ্গে আনিয়াছিলেন। দারার মনে সিদ্ধবাবা দৃঢ়বিশ্বাস জন্মাইয়াছিলেন যে তিনি চল্লিশটি “দেও”র মালিক; তাঁহার হুকুমে ওইগুলি উঠে বসে। কান্দাহারের সুবিশাল দুর্গ-প্রাকার দেখিয়াই শাহজাদার সাত দিনে কেল্লা ফতে করিবার দিবাস্বপ্ন টুটিয়া গিয়াছিল।. তোপখানার দ্বারা কান্দাহারের দেওয়াল উড়াইতে অনেক দেরি হইবে; এজন্য শাহজাদা ৩রা মে তারিখে ইন্দ্রগীরকে আদেশ করিলেন, এবার আপনার “দেও” গুলিকে ডাকিয়া দুর্গের দেওয়াল ভাঙিতে আদেশ করুন। ইহাতে কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হইয়া ইন্দ্রগীর চিলম-চিমটা লইয়া সোজা কান্দাহার দুর্গের পরিখার কিনারায় উপস্থিত হইলেন। ইরানী সাস্ত্রী হাঁক দিল—”কোন্ হ্যায়?” জটা-কম্বলধারী হিন্দু যোগীর সাহস দেখিয়া ইরানীরা বিস্মিত হইল; ব্যাপারটা কি জানিবার জন্য তাহাদের কিছু ঔৎসুক্য জন্মিয়াছিল; না হইলে সন্ন্যাসীকে অক্ষত দেহে দুর্গ-পরিখা পর্যন্ত পৌঁছিতে হইত না। ইন্দ্রগীর সান্ত্রীকে কিছুমাত্র সমীহ না করিয়া জবাব দিল, “আমি শাহজাদার পিয়ারের লোক; আমি এই কেল্লার আন্দর গিয়া ওই বুরুজের উপর বসিয়া একটি চিলম তামাকু টানিব।” সান্ত্রী পথ ছাড়িয়া দিল; সন্ন্যাসী দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করিলেন। দুই-চার দিন হয়তো শাহজাদা রাত্রে স্বপ্ন দেখিতেছিলেন ইন্দ্রগীরের দৈত্যগুলি কান্দাহারের দেওয়াল ভাঙিতেছে। কিছু দিন পরে কয়েকজন পলাতক দুর্গরক্ষী সিপাহীর কাছে ইন্দ্রগীরের বাকি খবরটা শুনা গেল। ইরানী সিপাহীরা সন্ন্যাসীকে দুর্গাধ্যক্ষের কাছে উপস্থিত করিয়াছিল। তিনি সন্ন্যাসীর কথামত তাঁহাকে দুর্গের বিভিন্ন অংশ দেখাইবার এবং বুরুজের উপর বসিয়া তামাকু সেবনের অনুমতি দিলেন। ইন্দ্রগীরের দিনগুলি সেখানে ভালোই কাটিতেছিল––দৈনিক এক সুরাই শিরাজী ও দু-বেলা ইরানী কোপ্তাপোলাও! কিছুদিন পরে তাঁহার দুর্মতি হইল, তিনি মোগল-শিবিরে ফিরিয়া যাইবার জন্য ব্যস্ত হইলেন। ইহাতে দুর্গাধ্যক্ষের সন্দেহ হইল, হয়তো সন্ন্যাসী মোগলের গুপ্তচর। সন্ন্যাসীর হাত-পা খুঁটির সঙ্গে বাঁধিয়া তাঁহাকে তক্তাচিপা (শিকাঞ্জা) দেওয়া হইল। যন্ত্রণায় অধীর হইয়া ইন্দ্রগীর সব স্বীকার করিলেন। শাস্তিস্বরূপ “লাখা” উপদুর্গে জল জোগাইবার ভিস্তির কার্যে তাঁহাকে নিযুক্ত করা হইল। সন্ন্যাসী ফকিরদের অলৌকিক ক্ষমতা ও তুকতাকে ইরানীরাও হিন্দুস্থানীদের চেয়ে কম বিশ্বাসী ছিল না। দুর্গাধ্যক্ষ ইন্দ্রগীরকে ডাকিয়া বলিলেন, যদি তিনি কোনও জাদু করিয়া হিন্দুস্থানী ফৌজকে কান্দাহার হইতে ভাগাইতে পারেন তাহা হইলে তিনি মুক্তি পাইবেন। কয়েক দিন পরে ইরানীরা সন্ন্যাসীকে জামরুদশাহী পাহাড়ের উপর হইতে ধাক্কা মারিয়া নীচে ফেলিয়া দিল। ইন্দ্রগীর পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইলেন; কিন্তু তাঁহার সেই চল্লিশটি দৈত্য এখনও হিন্দুস্থান এবং হিন্দু-মুসলমানকে ছাড়ে নাই!
ইন্দ্রগীরের তিরোভাবের পর আর এক জন যোগী ৪০ জন চেলা সহ শাহজাদার ডেরায় হাজির হইলেন। তিনি জানাইলেন, তিনি এক বিশেষ স্বস্ত্যয়ন করিবার সঙ্কল্প করিয়াছেন; বিশ দিনের মধ্যে ইহার সাক্ষাৎ ফল পাওয়া যাইবে; যথারীতি যোগী ও চেলাদের খোরাক বাবদ সরকারি রসদখানা হইতে দৈনিক ডাল, চাল, আটা, ঘি এবং নগদ ১০০ টাকা অন্যান্য খরচের জন্য মঞ্জুর হইল। যোগীপ্রবর চেলাদের লইয়া এক নির্জন স্থানে আস্তানা গাড়িলেন। ইহার পরে শাহজাদা যোগীর কোনও খোঁজ লইবার অবকাশ পান নাই। কিছুদিন পরে কয়েকজন দাক্ষিণাত্যবাসী সাধুর আবির্ভাব হইল। ইহাদের পদবী ছিল “গুরু”, জাতিতে অবশ্য ব্রাহ্মণ, পেশা জুয়াচুরি ও ধোঁকাবাজি। ইহারা সপ্তদশ শতকের কাউন্ট জেপেলিন। শাহজাদাকে বুঝাইলেন, তাঁহারা এমন এক যন্ত্র তৈয়ার করিতে জানেন যেটা পাখাপালক ছাড়া স্বচ্ছন্দে হাওয়ায় উড়িবে, উহার ভিতরে দু-তিনজন লোক বসিয়া উপর হইতে “হুক্কা” (একরম গোলাবাজির মতো পোড়া মাটির খোলে কিংবা নারিকেলের কোলে বারুদভরা হাতবোমা) ছুঁড়িতে পারিবে। ঠগকে অবিশ্বাস করা দারার কোষ্ঠীতে লেখা ছিল না। তিনি সম্মতি জানাইয়া “সাধু”দের জন্য চাল ডাল (তেঁতুল?) ও নগদ রোজানা ৪০ টাকা বরাদ্দ করিলেন।
হিন্দুস্থানের মুসলমানেরা চিরদিন “হাজী” বলিতে অজ্ঞান; ধর্মপ্রাণ সরলবিশ্বাসী লোকেরা ইঁহাদিগকে সদ্যোজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ (মাসুম) হজরত রসুলআল্লার বরকত ও খোদার ফজলের দাবিদার বলিয়া মনে করে। তবে পৃথিবীর সর্বত্র এবং সর্বধর্মাবলম্বী লোকদের মধ্যে সকলেই একই মতলবে গঙ্গাস্নান, বিশ্বেশ্বর দর্শন, তুলসী রুদ্রাক্ষ ধারণ কিংবা জর্ডনের জলে অভিষেক, যীশুর জন্মভূমির মাটিতে গড়াগড়ি, মোটা চট পরিধান ও গো-ঘণ্টার মতো ভারী “ক্রুশ” গলায় ধারণ করে না; কিংবা হজযাত্রা ও কাবা পরিক্রমা করিয়া হাজী সাজে না। এমনও দেখা যায়, অতি পাষণ্ড ও মূর্খ ব্যক্তিও যে দুষ্কর্ম করিতে ঘৃণা বোধ করে, এমন সব কাজও মণিকর্ণিকার ঘাটে নিত্যগঙ্গাস্নায়ী কাশীর পাণ্ডা এবং যাহারা একাধিক বার হজ করিয়াছে এরূপ হাজীদের দ্বারাই সম্ভবপর হয়। মদিনা অনেকেই যায়, কিন্তু “সিনা” (অন্তঃকরণ) সকলের সাফ হয় না। (চলবে)