অষ্টম অধ্যায়
দারাশুকোর কান্দাহার দুর্গ আক্রমণ ও পরাজয়
কান্দাহার দুর্গের অবরোধকার্যে শাহজাদা তাঁহার মীর আতিশ জাফরের প্রতি প্রথম হইতে নানা রকমে পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করিতেছিলেন। অন্যান্য সৈন্যাধ্যক্ষগণ ইহাতে জাফরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ও শাহজাদার প্রতি বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিল। শের হাজী বুরুজের সম্মুখের পরিখা হইতে জল বাহির করিয়া উহার উপর দিয়া আক্রমণের রাস্তা প্রস্তুত এবং বড় বড় কামান হইতে গোলা দাগিয়া বুরুজের দেওয়াল ভাঙিবার জন্য কাসিম খাঁ, আবদুল্লা, ইজ্জৎ খাঁ এবং জাফর যথাসাধ্য পরিশ্রম করিতে লাগিল। কিন্তু ইহাদের মধ্যে মনের মিল বা সহযোগিতার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল না। শেষোক্ত তিনজন দারার নিজ তাবিনের মনসবদার। শাহজাদার প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য তাহারা একজন আর একজনের বিরুদ্ধে আড়ালে নিন্দা করিতে লাগিল। অবশেষে ইহাদের ঝগড়া চরমে উঠিল। একদিন ইজ্জৎ খাঁ প্রকাশ্যে শাহজাদাকে বলিয়া ফেলিল — বান্দা- পরোবর। জাফরের মতো পাজিদের উপর ভরসা করিলে ও অতিরিক্ত মেহেরবানি দেখাইলে কাজটাই পণ্ড হইবে। আবদুল্লা ও জাফর পাশাপাশি মোর্চা হইতে সুড়ঙ্গ কাটিয়া দুর্গ-পরিখার দিকে অগ্রসর হইতেছিল। আবদুল্লা জাফরকে অনুরোধ জানাইল, যে পর্যন্ত তাহার নিজের সুড়ঙ্গ জাফরের সুড়ঙ্গের বরাবর এক লাইনে না পৌঁছে, সে পর্যন্ত জাফর যেন কাজ স্থগিত রাখে। জাফর সরল বিশ্বাসে তদনুযায়ী কাজ বন্ধ রাখিল। চার দিন পরে আবদুল্লা চুপি চুপি জাফরের সুড়ঙ্গের চেয়ে আরও বেশি অগ্রসর হইয়া শাহজাদাকে জানাইল, “হুজুর! খন্দকের কাজে আমি জাফরের চেয়ে কয়েক কদম আগেই আছি!” একথা জাফরের কানে পৌঁছামাত্র সে ক্রোধে দিশাহারা হইয়া দরবারে আবদুল্লার সাতপুরুষের বাপাত্ত করিল, “গরিব নেবাজ আমি তুরানী; পেঁচপ্যাঁচ আমরা বুঝি না। আবদুল্লা হারামজাদা রাফিজী — বেইমান শিয়া ইরানী, হাড়ে হাড়ে বজ্জাত; সে আমাকে ফাঁকি দিয়া বাহাদুরি নিতে চায়, যাহার সঙ্গে পাশাপাশি নমাজ করিলে নমাজ কবুল হয় না, তাহার সঙ্গে আমি কাজ করিব না।” স্বয়ং শাহজাদা অনেক মিষ্ট কথা বলিয়াও জাফরকে শান্ত করিতে পারিলেন না।
যাহা হউক, আগস্ট মাসের মাঝামাঝি শের হাজী বুরুজ মোটামুটি আক্রমণের যোগ্য বলিয়া মনে হইল। পরিখার জল কিছু বাহির করিয়া গাছের ডালপালা ও মাটির বস্তা ফেলিয়া উহা ভরাট করা হইয়াছিল। ৬ই আগস্ট মরিয়ম, কিলাকুশা ও কয়েক দিন পরে ফতে-মোবারক তোপ শিবিরে আসিয়া পৌঁছিল। কিন্তু ভারী লোহার গোলা সঙ্গে না থাকায় ওইগুলি কোনও কাজেই আসিল না, কিলাকুশা হইতে নিক্ষিপ্ত নরম পাথরের গোলা হাওয়াতেই ফাটিয়া নিজ পক্ষের লোকগুলি জখম করিল। পাথরের গোলা শনের দড়ি দিয়া মুড়িয়া পরীক্ষা করা হইল— ফলাফল সহজেই অনুমেয়। ফিরিঙ্গি গোলন্দাজদের কয়েকজন শত্রুদুর্গে পলাইয়াছিল; বাকি কয়েকজন ছিল হিন্দুস্থানীদের মতোই ওস্তাদ। সর্বসুদ্ধ ২৭০০০ গোলা দাগিয়াও মোগল তোপখানা দুর্গ-প্রাচীরের বিশেষ ক্ষতি করিতে পারে নাই; ইরানী তোপ সমান জোরে জবাব দিতে লাগিল। কিন্তু দরবারী রিপোর্টে লেখা হইল শাহজাদার তোপখানা শের হাজী বুরুজের তিনশত গজ দেওয়াল ধূলিসাৎ করিয়াছে। জাফর ও ইজ্জৎ খাঁ শাহজাদাকে জানাইল তাহাদের মোর্চার সামনের দেওয়াল তোপের গোলায় ভাঙিয়া পড়িয়াছে; এখন দুর্গ আক্রমণ করা যাইতে পারে।
আগস্ট মাসের ২১শে তারিখে শাহজাদা দুর্গ আক্রমণের উদ্যোগ আরম্ভ করিলেন। সরকারি সিলাহ-খানা (অস্ত্রাগার) হইতে লৌহনির্মিত বখ্তর, জিরাহ ইত্যাদি নানা রকমের বর্ম অশ্বারোহী সৈন্যদের ব্যবহারের জন্য বিতরণ করা হইল। আক্রমণের সময় কোন্ কোন্ মনসবদার কোন্ মোর্চা হইতে সৈন্য পরিচালনা করিবেন শাহজাদা কাহারও সহিত পরামর্শ না করিয়া নিজেই তাহা ঠিকঠাক করিয়া ফেলিলেন। ঢোল সহরতে ডেরায় ডেরায় জানাইয়া দেওয়া হইল দুই-এক দিনের মধ্যেই দুর্গ আক্রমণ করা হইবে। যাহারা সিপাহী নয় এবং হামলায় শরিক হওয়ার হিম্মৎ যাহাদের নাই তাহারাও ঠিক সেই সময়ে নমাজ দোওয়া পড়িবার জন্য যেন তৈয়ার থাকে। শাহজাদা সিপাহীদিগকে উৎসাহিত করিবার জন্য মোটা নগদ পুরস্কার ঘোষণা করিলেন – প্রত্যেক লাল টুপিওয়ালা কিজিলবাশ সিপাহীর কাটা মাথার দাম ৫ এবং জীবন্ত ধরিয়া আনিতে পারিলে এক আশরফি ইনাম।
সমস্ত বন্দোবস্ত নিজের বুদ্ধিতে একরকম পাকাপাকি করিয়া শাহজাদা পরদিনই সকালবেলা (২২শে আগস্ট) সলাহপরামর্শ করিবার জন্য মনসবদারগণকে নিজ তাঁবুতে উপস্থিত হইবার জন্য আদেশ করিলেন। মহাবত খাঁ (ছোট), মির্জারাজা অম্বরপতি জয়সিংহ এবং নেজাবত খাঁ যথাসময়ে হাজির হইলেন। ইঁহারা সকলেই পাঁচ হাজারী। কিলিচ খাঁ খবর দিলেন তিনি জোলাপ লইয়াছেন, বিকালবেলা আসিবেন। যাঁহারা আসিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে পাঁচ হাজারীদের মুখ নিতান্ত গম্ভীর, দরবারী কায়দায় হাসি ও সৌজন্যের অন্তরালে অন্তরুদ্ধ রোষবহ্নি যেন ধূমায়মান। শাহজাদা প্রথমে মহাবত খাঁর দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “জাফর ও ইজ্জৎ খাঁর মোর্চার বিপরীত দিকস্থ দেওয়াল জায়গায় জায়গায় ভাঙিয়াছে; আক্রমণ করা সম্বন্ধে আপনার মত কি?” এই মহাবত খাঁ সেই মহাবৎ খাঁর পুত্র––যিনি অত্যন্ত রাজভক্ত হইয়াও জাহাঙ্গীরের মুখের উপর নূরজাহান সম্বন্ধে যা-তা বলিবার সাহস রাখিতেন এবং অবশেষে জাহাঙ্গীরকে কিছুকালের জন্য নজরবন্দী করিয়াছিলেন। বাপের মতো ছেলের মুখের আড় ছিল না, ইনি পরবর্তীকালে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের উপর মোল্লাদের মুরুব্বিয়ানাকে ইঙ্গিত করিয়া বলিয়াছিলেন, “জাঁহাপনা, কাফের শিবাকে শায়েস্তা করিবার জন্য আমাদের মতো গোলামের প্রয়োজন কি? শেখ-উল-ইসলাম সাহেব (আব্দুল ওহাব) নর্মদা পার হইয়া এক ফতোয়া জারি করিলেই কাজ হাসিল হইবে!” মহাবত খাঁ শাহজাদাকে কিছুমাত্র সমীহ না করিয়া জবাব দিলেন, “আমরা হুজুরের গোলাম; হুকুম তামিল করা ব্যতীত বান্দার আর কোনও কাজ নাই। রাজা-বাদশারাই কেবল বাদশাহকে পরামর্শ দিতে পারে।” শাহজাদা মহাবত খাঁকে বলিলেন, “আপনি দৌলতাবাদ দুর্গ বিজয়ী বীরশ্রেষ্ঠ মহাবত খাঁর পুত্র, আপনি কান্দাহার জয় করিয়া পিতার সুনাম রক্ষা করুন।” কিন্তু তোষামোদও বিফল হওয়াতে দারার ধৈর্যচ্যুতি হইল। দু-চার কথার পর তিনি উত্তেজিত ভাবে বলিয়া উঠিলেন, “কান্দাহার দখল না করিয়াই আপনি বাড়ি ফিরিবার ফিকিরে আছেন দেখিতেছি। এ-রকম বেহুদা খেয়াল ও বদ মতলবকে মনে জায়গা না দেওয়াই ভালো (বেহ্তর্)।”
ইহার পরে দারা দুর্গ আক্রমণ করা সমীচীন কিনা এ-বিষয়ে নেজাবত খাঁর মতামত জিজ্ঞাসা করিলেন। ইরানীয় রাজবংশের রক্ত ও আভিজাত্য-গৌরব নেজাবত খাঁর চরিত্র ও কার্যে তাহার বৃথা অহঙ্কার, অনুচিত ঔদ্ধত্য এবং দুঃসাহসিকতায় প্রকাশ পাইত। কান্দাহার-অভিযানের পূর্বে তিনি একবার কুমায়ুন গাড়োয়ালের নাক-কাটি রানীর রাজ্য আক্রমণ করিয়া চরম দুর্গতি ভোগ করিয়াছিলেন; তবে নাকটা কোনও রকমে রক্ষা পাইয়াছিল। কান্দাহারে আসিয়া নেজাবত খাঁ প্রথম হইতেই অবাধ্যতা প্রকাশ করিতেছিলেন; আবদোজদ দরজার সামনে তাঁহার নির্দিষ্ট স্থানে যাইতে অস্বীকৃত হওয়ায় শাহজাদা শাস্তিস্বরূপ তাঁহাকে রুস্তম খাঁ বাহাদুর ফিরোজ-জঙ্গের সৈন্যের সহিত বুস্ত দুর্গে যাইবার আদেশ দিলেন। এই আদেশও প্রথমে অমান্য করিয়া পরে অন্যান্য আমীরদের অনুরোধে তিনি সেখানে গিয়াছিলেন; পরে শাহজাদার সঙ্গে মিটমাট হওয়ায় কান্দাহারে আসিয়াছিলেন। এবার তাঁহার সুর কিছু নরম হইয়াছিল। তিনি নিবেদন করিলেন— আক্রমণ করার পূর্বে আরও তিন-চার দিন গোলাবর্ষণ করিয়া দুর্গের প্রাচীরের জমিন বরাবর করিলেই ভালো হয়। দারা ইহাতে বিষম চটিয়া গেলেন। তিনি বলিয়া উঠলেন, “তাহা হইলে আপনি বলিতে চান কেল্লার পর্দা এখনও ভাঙা হয় নাই? দেওয়াল ফুটা হউক আর নাই হউক আক্রমণ করিতেই হইবে।” (চলবে)