নবম অধ্যায়
দারাশুকোর পাণ্ডিত্য ও তত্ত্বজ্ঞান
শাহজাহান স্বয়ং বিদ্যোৎসাহী ও পাকা মুসলমান ছিলেন; পুত্র-চতুষ্টয়ের সুশিক্ষা ও শরিয়ত-অনুযায়ী নৈতিক ও ধর্মজীবন গঠনের জন্য তিনি শাস্ত্রজ্ঞ ও নিষ্ঠাবান মোল্লাদিগকে তাঁহাদের শিক্ষক নিযুক্ত করিয়াছিলেন। মোল্লা আবদুল লতিফ সুলতানপুরীর নিকট শাহজাদা দারার বিদ্যাশিক্ষা আরম্ভ এবং সম্ভবত তাঁহার কাছেই সমাপ্ত হইয়াছিল––অন্তত তাঁহার অন্য কোন শিক্ষকের নামোল্লেখ দরবারী ইতিহাসে নাই। দারা অসাধারণ মেধাবী ও মনীষাসম্পন্ন ছিলেন এবং জ্ঞানচর্চায় তাঁহার ঐকান্তিক আগ্রহ ও অসীম উৎসাহ ছিল। খেলাধূলা, কবুতরবাজী, শিকার কিংবা বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে আয়েস ও শরাব তাঁহার মনের উপর স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই; লেখাপড়ার নেশা ও তত্ত্বজ্ঞানের তৃষ্ণা বরং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বাড়িয়া চলিয়াছিল। তিনি মুসলমানের অবশ্য পঠিতব্য বিষয়গুলি, যথা—কোরান হদিস তফসীর বিশেষভাবে আয়ত্ত করিয়াছিলেন। ব্যাকরণ ও মুসলমানী আইন (ফেকা) অধ্যয়নে তাঁহার বিশেষ অনুরাগ ছিল বলিয়া মনে হয় না, গণিত অপেক্ষা ফলিত জ্যোতিষে তাঁহারা আগ্রহ ছিল অধিক। তর্কশাস্ত্র হয়তো তিনি পড়িয়াছিলেন; আরিস্ত (অ্যারিস্টটল) ও আফলাতুনের (প্লেটোর) সহিত তাঁহার মোটামুটি পরিচয় ছিল। বিধিনির্দিষ্ট সুনিশ্চিত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, পিতার অপার স্নেহ, মোগল দরবারে তৎকালীন বিবিধ বিদ্যাপারগ হিন্দু ও মুসলমান পণ্ডিতমণ্ডলীর অপূর্ব সমাবেশ ও তাঁহাদের সাহচর্য এবং নিজের সুদীর্ঘ অখণ্ড অবসর দারার জ্ঞানচর্চার পক্ষে বিশেষ অনুকূল ছিল। মুসলমান রাজাদের মধ্যে বিদ্বান ও বিদ্যোৎসাহী বহু ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু আব্বাসী খলিফা মামুন ও তৈমুর বংশে শাহজাদা দারা ব্যতীত অন্য কেহ প্রকৃত পণ্ডিত ও দার্শনিক বলিয়া প্রসিদ্ধিলাভ করিতে পারেন নাই।
জগতের জ্ঞানভাণ্ডারে মামুনের সর্বশ্রেষ্ঠ দান—আরিস্ত-প্রমুখ যবন-মনীষীগণের লুপ্তপ্রায় দর্শন ও তর্ক-শাস্ত্রসমূহের সংগ্রহ ও আরবী ভাষায় অনুবাদ। কিন্তু শাহজাদা দারাই সর্বপ্রথমে উপনিষদের অনুবাদ করাইয়া সভ্য জগৎকে হিন্দুর ব্রহ্মবিদ্যার সন্ধান দিয়াছিলেন। খলিফা মনসুর, হারুন ও মামুনের সময় ভারতীয় আয়ুর্বেদ, পাটীগণিত, বীজগণিত, জ্যোতিষ, পশুচিকিৎসা ও রসায়ন গ্রন্থের অনুবাদ ও আলোচনা আরম্ভ হইয়াছিল। ইহার পর খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে অলবেরুনী তাঁহার তহকিক-ই-হিন্দ গ্রন্থে ভারতীয় সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সহিত মুসলমান সমাজকে পরিচিত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বে দিল্লি সম্রাটগণ হিন্দুর জ্ঞানভাণ্ডার ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবান ছিলেন না; বরং উহা নিশ্চিহ্ন করিয়া হিন্দুজাতির মেরুদণ্ড ভঙ্গ করিবার জন্য অশেষ চেষ্টা করিয়াছেন। সম্রাট আকবরের সময় হইতে এক নূতন যুগের সূচনা হইয়াছিল। তাঁহার রাজত্ব ভারতীয় সংস্কৃতির পুনরভ্যুদয়ের যুগ। হিন্দুর ধর্মসাহিত্য ও গণিতসম্বন্ধীয় পুস্তকসমূহ সংস্কৃত হইতে পারস্য ভাষায় অনুবাদ কিংবা ওইগুলির সারসঙ্কলন করিয়া মুসলমানের জ্ঞানভাণ্ডার স্থায়ীভাবে সুসমৃদ্ধ করিবার আয়োজন তিনিই করিয়াছিলেন।
আকবরের রাজত্বে মহাভারত, রামায়ণ, অথর্ববেদ, লীলাবতী (বীজগণিত), দ্বাত্রিংশৎ পুত্তলিকা (বত্রিশ সিংহাসন) ইত্যাদির ভাবমূলক অনুবাদ হইয়াছিল। হিন্দুর ষড়দর্শন, জ্যোতিষ, পুরাণ ইত্যাদির অনুবাদ কিংবা সংক্ষিপ্তসারের সহায়তা ব্যতীত আবুল ফজলের পক্ষে ‘আইন-ই-আকবরী’ পুস্তকে উক্ত বিষয়সমূহের আলোচনা নিশ্চয়ই সম্ভবপর হয় নাই। কিন্তু শেষোক্ত পুস্তকগুলির ফার্সি অনুবাদের অস্তিত্ব এখন অনুমানের বিষয় হইয়াছে। পুণ্যশ্লোক সম্রাট আকবরের রাজনীতি, ধর্মমীমাংসা, শিক্ষানীতি, সমাজ-সংস্কার এবং জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ প্রভৃতি সমস্ত ব্যাপারের একটি প্রশংসনীয় মূলনীতি ছিল—হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের পরস্পরের ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি সুলতানী আমলের ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যভাব দূর করিয়া অভিনব সশ্রদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির প্রয়াস। জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের রাজত্বে রাজনীতিক্ষেত্রে আকবরের নীতি কথঞ্চিৎ বাধাপ্রাপ্ত হইলেও ইসলাম ও আর্য সংস্কৃতির ভাবধারাপুষ্ট যথার্থ ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার নবরোপিত অক্ষয়বট তাঁহাদের সযত্ন-সিঞ্চিত দাক্ষিণ্য-বারি দ্বারা পরিবর্ধিত হইতেছিল। শাহজাহানের পুত্র-চতুষ্টয়ের মধ্যে দারাশুকো প্রপিতামহ আকবরের স্বপ্ন সফল করিবার মহান উদ্দেশ্যে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। দারার পারিবারিক জীবনের সহিত তাঁহার শাস্ত্রালোচনা, ধর্মজীবন ও জ্ঞানচর্চার এবং ধর্মমতের সহিত তাঁহার রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রহিয়াছে। এইজন্য প্রথমে উহার কিঞ্চিৎ আলোচনা আবশ্যক।
১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের ১লা ফেব্রুয়ারি শুক্রবার শাহজাদা দারার সহিত তাঁহার জ্যেষ্ঠতাতপুত্রী নাদিরা বেগমের বিবাহ হইয়াছিল। ইহার এক বৎসর পরে তাঁহার একটি কন্যা জন্মিয়াছিল (১৯ জানুয়ারি, ১৬৩৪ খ্রিঃ); কিন্তু মাত্র তিন মাস পরে ওই বৎসর দিল্লি হইতে লাহোরে যাইবার সময় রমজানের ঈদের (ঈদ-উল-ফিতর) দিন মহাকাল নাদিরার ক্রোড় শূন্য করিয়া দারার প্রথম সন্তানকে হরণ করিল। উনিশ বৎসর বয়সে এই নিদারুণ শোকে শাহজাদার দেহ ও মন ভাঙিয়া পড়িয়াছিল। তিনি প্রবল জ্বর ও হৃৎকম্পে আক্রান্ত হইলেন। এই সময়ে শাহজাদা পিতার সহিত লাহোরে যাইতেছিলেন। সম্রাট অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইয়া লাহোর হইতে হেকিম উজীর খাঁকে আনাইলেন এবং শাহজাদার শুশ্রূষার সুবিধার জন্য জাহানারা বেগমের তাঁবু দারার তাঁবুর কাছে খাটাইবার হুকুম দিলেন।
জননীর প্রতিনিধি ভগ্নী জাহানারার স্নেহে তাঁহার ছোট ভাই-বোনেরা মায়ের শোক ভুলিয়াছিল। সকলের প্রতি সমান স্নেহশীলা হইলেও দারার প্রতি তাঁহার টান একটু বেশি ছিল। যৌবনে পদার্পণ করিলেও ভাই-বোন যাহাতে নিঃসঙ্কোচে মিলামিশা করিতে পারে, সেজন্য সম্রাট শাহজাহান দারাকে জাহানারার স্তন ধোয়া জল (স্তন্যের অভাবে) পান করাইয়া উভয়ের মধ্যে সে-যুগের প্রথানুযায়ী ধর্মের মাতা-পুত্র সম্বন্ধ স্থাপন করিয়াছিলেন। জাহানারার সান্ত্বনা-বাক্যে দারা শোকে শান্তি ও স্নেহস্পর্শে রোগমুক্ত হইলেন। মৃত্যু ও শোকের মহাশিক্ষায় উভয়ের জীবনের গতি পরিবর্তিত হইল; চিত্ত ভোগবিমুখ হইয়া বৈরাগ্যকে আশ্রয় করিল। সম্রাট শাহজাহান লাহোরে পৌঁছিয়া ৭ই এপ্রিল ও ৯ই এপ্রিল (১৬৩৪ খ্রিঃ) প্রসিদ্ধ সুফী-সাধক মিয়াঁ মীরের আস্তানায় পদার্পণ করিয়াছিলেন। এই সময় হইত মিয়াঁ মীরের প্রতি শাহজাদা ও জাহানারা অত্যন্ত আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন; তাঁহাদের শ্মশান বৈরাগ্য মোহমুক্ত সন্ন্যাসে পরিণত হইল। অসামান্যা রূপবতী বিদুষী জাহানারা যৌবনে যোগিনী সাজিয়া সেবাধর্ম অবলম্বন করিলেন; দারার চক্ষে বাদশাহী অপেক্ষা ফকিরিই স্থায়ী সম্পদ বলিয়া প্রতিভাত হইল। কাশ্মীর হইতে ফিরিয়া আসিয়া শাহজাহান ১৮ই ডিসেম্বর তৃতীয় বার মিয়াঁ মীরের সাক্ষাৎকার লাভ করিয়াছেন। পর বৎসর শীতকালে দারা সম্রাটের সঙ্গে লাহোরে ছিলেন; এই সময়ে (১৬৩৫ খ্রিঃ) মিয়াঁ মীর ও তাঁহার শিষ্য সম্প্রদায়ের সহিত দারার ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পায়। মিয়াঁ মীরের নিকট হইতে দারা ও জাহানারার দীক্ষালাভ করিবার সৌভাগ্য ঘটে নাই। দারার পত্নী নাদিরা বেগমও মিয়াঁ মীরের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। এবং বোধ হয় মনে মনে তাঁহাকেই গুরুরূপে বরণ করিয়াছিলেন; স্বামীর কাছে তাঁহার শেষ প্রার্থনা ছিল, যেন মিয়াঁ মীরের কবরের পার্শ্বে তাঁহার মৃতদেহ সমাহিত করা হয়। ১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে মিয়াঁ মীর দেহরক্ষা করেন। শাহজাদা দারার আধ্যাত্মিক জীবনের বিভিন্ন স্তরে তিনি অনেকগুলি পুস্তক ও পুস্তিকা লিখিয়াছিলেন। তাঁহার ধর্মমত ও সাধন পদ্ধতি তাঁহার রচনাবলী হইতেই সঠিক জানা যায়। অতঃপর আমরা এগুলির আলোচনা করিব। (চলবে)