নবম অধ্যায়
দারাশুকোর পাণ্ডিত্য ও তত্ত্বজ্ঞান
সফিনাৎ-উল-আউলিয়া। — ইহা দারাশুকোর প্রথম পুস্তক। ইহার পাণ্ডুলিপি ইংলন্ড ও ভারতবর্ষের অনেক প্রসিদ্ধ পুস্তাকাগারে রক্ষিত আছে এবং নওলকিশোর প্রেস হইতে এই পুস্তকের একটি লিথো-সংস্করণ বহু বৎসর পূর্বে ছাপা হইয়াছিল। Ethe-সঙ্কলিত তালিকায় (Catalogue of Persian Manuscripts, Vol 1, p. 274; No 647) উল্লিখিত পাণ্ডুলিপি অনুসারে শাহজাদার ২৫ বৎসর বয়সে ১০৪৯ হিজরীর ২৭শে রমজান তারিখে (২১ জানুয়ারি ১৬৪০ খ্রিঃ) এই পুস্তক রচনা সমাপ্ত হইয়াছিল। [আমার ইংরেজি Dara Shukoh পুস্তকে (পৃ. ১৪০ ) সফিনাৎ-উল-আউলিয়া’র সমাপ্তিকাল ১৬৩৯ খ্রিঃ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। আমার পুস্তকের অন্যত্র (পৃ. ১০৩) ‘সফিনাৎ ‘ রচনার তারিখ ১১ই জানুয়ারি ১৬৪০ খ্রিঃ দেওয়া হইয়াছে। মুসলমানী তারিখ ২৭শে রমজান ১০৬৯ হিজরী। নিউ স্টাইল এবং ওল্ড স্টাইলে ইংরেজি তারিখ গণনা করিলে কিছু তফাত হয়। সার যদুনাথের History of Aurangzib (i. 271, 2nd ed.) পুস্তকে ২১ স্থলে ১১ই জানুয়ারি লিখিত হইয়াছে।] হজরত মহম্মদ, চারি খলিফা এবং দ্বাদশ ইমাম হইতে আরম্ভ করিয়া শাহজাদার সমকালীন মিয়া মীর পর্যন্ত ৪১১ জন প্রসিদ্ধ ধর্মগুরু ও সুফী সাধক-সাধিকার অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয়––অধিকাংশ স্থলে কেবল জন্ম-মৃত্যুর তারিখ—এই পুস্তকে নিবদ্ধ হইয়াছে। ফরিদউদ্দীন আক্তর রচিত তজকিরাৎ- উল-আউলিয়া এবং অন্যান্য আউলিয়া জীবনী সংগ্রহ এবং হজরত ও খলিফাগণের সমকালীন ইতিহাস হইতে শাহজাদা তাঁহার পুস্তকের উপাদান সংগ্রহ করিয়াছেন। ইহা একাধারে দারাশুকোর ঐতিহাসিক গবেষণা এবং নিজের অধ্যাত্মজীবনের প্রাথমিক ইতিবৃত্ত। তারিখ অনুসারে জীবনীসমূহ পর পর সাজানো হইয়াছে। এই পুস্তকের বিশেষ সার্থকতা ও বৈশিষ্ট্য—যেখানে তারিখ সম্বন্ধে মতভেদ আছে, সেখানে মতান্তরে অমুক তারিখ যথারীতি সন্নিবিষ্ট করা হইয়াছে। হজরতের জন্ম তারিখ সম্বন্ধে মতভেদ উল্লেখ করিয়া তিনি সাহস ও ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়াছেন। সুফী সাধিকাগণের জীবনী আলোচনায় তাঁহাদের কৃচ্ছ্রসাধনার উল্লেখ পাওয়া যায়। মিশরের একজন নারী-উপাসিকা নাকি এক জায়গায় শীতগ্রীষ্মে অবিচলিত ভাবে এক স্থানে ত্রিশ বৎসর দাঁড়াইয়া ছিলেন এবং পঁচিশ বৎসর পর্যন্ত আহার-নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া ছিলেন। এই গ্রন্থ রচনার সময় মিয়া মীরের ভগ্নী বিবি জামাল খাতুন সিবিস্তানে (সিন্ধুনদের পশ্চিমে) একজন পুণ্যশীলা সাধিকা হিসাবে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন; তখন তাঁহার বয়স ৬০ বৎসর। ‘সফিনাৎ-উল-আউলিয়া’র ভূমিকাই [ইহার কিয়দংশ রায় বাহাদুর শ্রীশচন্দ্র বসু কর্তৃক অনূদিত (পাণিনি আপিস হইতে প্রকাশিত) দারাশুকোর ‘রিসালা-ই-হকমা’র পরিশিষ্ট হিসাবে ইংরেজিতে মোটামুটি অনুবাদ করা হইয়াছে।] ইহার সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় ও মনোরম অংশ। শাহজাদা লিখিয়া গিয়াছেন, এই গ্রন্থ আরম্ভ করিবার পূর্বে যখন তিনি সুফী মহাপুরুষগণের জীবনীধ্যানে তন্ময় ছিলেন, তখন একদিন তাঁহার স্বপ্নপ্রয়াণ হইয়াছিল। তিনি দেখিলেন, এক উচ্চ স্থানে হজরত রসুলাল্লা দাঁড়াইয়া আছেন; ঠিক তাঁহার নীচে প্রথম চারি খলিফা––আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী সমব্যবধানে দণ্ডায়মান। ‘সফিনাৎ-উল-আউলিয়া’ রচনার সময় পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে সুফী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রবেশ করেন নাই; সত্যানুসন্ধানের পরিশ্রম ও কষ্টের মধ্যে এ গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল; তখনও তাঁহার তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় নাই। সৎসঙ্গের মাহাত্ম্য, ফকিরদের বিভিন্ন সাধনার ধারা, আদর্শ ও উপদেশ, কোন্ অবস্থায় এবং কি ভাবে মহাপুরুষগণকে চেনা যায় এবং তাঁহাদের সাক্ষাৎকার লাভ হইলে কথোপকথনের সময় কোন্ কোন্ বিষয়ে সাবধান হওয়া উচিত—এ সমস্ত বিষয়ের চমৎকার আলোচনা এই পুস্তকের ভূমিকায় আমরা দেখিতে পাই। এই ভূমিকায় মুসলমান সাধকগণের যে সমস্ত উপদেশ শাহজাদা সংগ্রহ করিয়াছেন উহার প্রভাব তাঁহার দৈনন্দিন জীবনে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। দারা পাগল খুঁজিয়া বেড়াইতেন এবং তাঁহাদের সাহচর্য ভালোবাসিতেন— এইগুলি অবশ্য ভাবের পাগল; কেননা মহাপুরুষেরা অনেক সময় স্বেচ্ছায় পাগল সাজিয়া জনসমাজে আত্মগোপন করিয়া থাকেন। তিনি প্রার্থী ও ভিক্ষুককে কোনোদিন বিমুখ করে নাই; কারণ কৃপণ কোনোদিন নির্মল ভগবৎপ্রেম কিংবা তত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী হইতে পারে না। প্রাণদণ্ডের পূর্বে অত্যন্ত দীনবেশে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় যখন শোভাযাত্রা সহকারে দিল্লির রাজপথ দিয়া তাঁহাকে লইয়া যাওয়া হইতেছিল, ফকিরদের চিৎকারে স্থির থাকিতে না পারিয়া শাহজাদা নিজের ছোঁড়া ময়লা শালখানা তাহাদিগকে দান করিয়াছিলেন। দুনিয়াদারি কাহাকে বলে এ সম্বন্ধে তিনি একটি চমৎকার কথা এই পুস্তকের ভূমিকায় উদ্ধৃত করিয়াছেন—
Chist duniya az Khuda ghafil shudan;
Ne lebas wa naqra wa farzand wa zan.
—সংসারাসক্তি কি? পোশাক, ধনদৌলত কিংবা স্ত্রীপুত্র নয়; খোদার এবাদতে গাফেলী করাই দুনিয়াদারি।
এখানে ফকিরি ও আমিরির সামঞ্জস্য-সমস্যার সমাধান করা হইয়াছে। অবশিষ্ট জীবনে শাহজাদা এই পন্থাই অনুসরণ করিয়াছিলেন।
সকিনাৎ-উল-আউলিয়া। -এই পুস্তকের ভূমিকায় প্রকাশ, শাহজাদা দারাশুকো পঁচিশ বৎসর বয়সে (অর্থাৎ যে বৎসর তিনি প্রথমোক্ত গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত করেন) পরলোকগত পীর মিয়াঁ মীরের অন্যতম শিষ্য মহম্মদ শাহ লিসান্-উল্লার কাছে দীক্ষাগ্রহণ করিয়া কাদেরিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হইয়াছিলেন। দারার গুরু সাধারণত মৌলানা বদর্শী (বদশান নিবাসী) নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁহার উপাধি ছিল ‘লিসান্ উল্লা’ অর্থাৎ খোদাতালার জিহ্বা—পণ্ডিতদের ‘সরস্বতী’ উপাধির তুল্য। মৌলানা শাহ কাশ্মীরেই তাঁহার খাকা বা মঠ স্থাপন করিয়াছিলেন। দরবারী ইতিহাস ‘বাদশা-নামা’ হইতে আমরা জানিতে পারি, সম্রাটের সঙ্গে শাহজাদা ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাস হইতে ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত লাহোরে এবং ২২শে মার্চ হইতে ১৪ই সেপ্টেম্বর (১৬৪০ খ্রিঃ) পর্যন্ত কাশ্মীরে ছিলেন। সুতরাং লাহোরেই তাঁহার প্রথম পুস্তক সমাপ্ত হয় এবং কাশ্মীরে অবস্থানকালে তিনি দীক্ষাগ্রহণ করেন। ভূমিকায় শাহজাদা লিখিয়াছেন, ক্ষমতা ও অতুল পার্থিব ঐশ্বর্যের অধিকারী হইয়াও গুরুর কৃপায় তাঁহার মন ও মেজাজ খাঁটি দরবেশের মতো হইয়াছে। ১০৫২ হিজরী, অর্থাৎ ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত করেন।
‘সকিনাৎ-উল-আউলিয়া’র হস্তলিখিত পুথি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি (Ethe, Vol I, No. Or, 223 ) এবং খুদা বখ্শ ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরিতে রক্ষিত আছে। এই পুস্তকের এ-যাবৎ কোনও ইংরেজি বা বাংলা অনুবাদ হয় নাই। শাহজাদা দারাশুকোর দাদা-পীর (গুরুর গুরু) মিয়াঁ মীরের জীবন বৃত্তান্ত এবং তাঁহার মুরীদ (শিষ্য)-গণের সংক্ষিপ্ত পরিচয় এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। গ্রন্থকার প্রথমে তাঁহার স্ব সম্প্রদায় কাদেরিয়া পন্থীদের “সিলসিলা” (গুরুপরম্পরা কুলজী), চিন্তিয়া নকশবন্দীয়া ইত্যাদি সম্প্রদায়ের সিলসিলা হইতে যে শ্রেষ্ঠতর, ইহাই প্রমাণ করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। মিয়াঁ মীরের আসল নাম মীর মহম্মদ; তিনি ৯৩৮ হিজরীতে সিন্ধু দেশের অন্তর্গত সিবিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম কাজী সৈন্দতা (স্বামীদত্ত?), প্রপিতামহ কাজী কালন্দর। শাহজাদা ইতিহাসকে জবাই করিয়া স্বামীদত্তের পুত্র মিয়া মীরের কুলজী একেবারে খলিফা ওমর পর্যন্ত টানিয়া তুলিয়াছেন। আমাদের মনে হয়, তিনি মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত কোনও হিন্দু পরিবারের সন্তান; নামের শেষে “ফরুকী” থাকিলেই ওমরের অওলাদ হয় না। বেচারাম কিংবা ছেদিলালের বংশধরেরাও উদার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়া সিদ্দিকী (প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক) কিংবা ফরুকী হইতে পারে; শেখ সৈয়দের তো কথাই উঠে না। মিয়াঁ মীরের শিষ্যদিগকে গ্রন্থকার দুই ভাগে (ফিরকা) বিভক্ত করিয়াছেন, যাঁহারা ‘সকিনাৎ- উল-আউলিয়া’ রচনার পূর্বে মারা গিয়াছেন এবং যাঁহারা সমাপ্তির তারিখ পর্যন্ত বাঁচিয়া ছিলেন। প্রথম ফিরকার সর্বপ্রথম স্থান সুফী নিয়ামৎ-উল্লা সরহিন্দিকে (সরহিন্দ শহরবাসী) দেওয়া হইয়াছে; দ্বিতীয় ফিরকার প্রথম স্থানে আছেন মৌলানা শাহ লিসান্-উল্লা। (চলবে)