নবম অধ্যায়
দারাশুকোর পাণ্ডিত্য ও তত্ত্বজ্ঞান
‘সকিনাৎ-উল-আউলিয়া’ পুস্তকে তাঁহার নিজ গুরু-সম্প্রদায় অর্থাৎ কাদেরিয়া শেখদের অলৌকিক কার্যাবলী, তাঁহাদের ধ্যানধারণা, সাধনার বিভিন্ন স্তর বা মোকামের বিষয় আলোচনা করিয়াছেন। পুস্তকখানির কোনও ইংরেজি, উর্দু কিংবা বাংলা অনুবাদ হয় নাই। বাংলাদেশে কাদেরিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমান সংখ্যায় সর্বাপেক্ষা বেশি। দারার এই পুস্তকখানির বঙ্গানুবাদ হইলে ‘খোদা-প্রাপ্তিতত্ত্ব’ ইত্যাদি পুস্তকের ন্যায় মুসলমান সমাজে বিশেষ সমাদৃত হইবে।
রিসালা-ই-হমা (The Compass of Truth) শাহজাদা দারা ধর্মজীবনের সোপান অতিক্রম করিবার পর এই পুস্তিকা রচনা করিয়াছিলেন। ইহার ভূমিকায় তিনি লিখিয়াছেন—১০৫৫ হিজরীর ১৭ই [নওলকিশোর প্রেস হইতে প্রকাশিত সংস্করণে ৮ই রজব লেখা আছে। কিন্তু ওই তারিখ বুধবার ছিল; সুতরাং সম্ভবত ১৭ই রজব হইবে।] রজব শুক্রবার রাত্রিকালে তিনি এই পুস্তক লিখিবার জন্য খোদার হুকুম পাইয়াছিলেন। নিম্নলিখিত কবিতা দ্বারা তিনি পুস্তকের সমাপ্তি এবং পুস্তক রচনায় তাঁহার নিজ অভিপ্রায় নিবেদন করিয়াছেন —
ঈ / রিসালা-ই-হকমা / বাশদ্ / তামাম্;
দর্ / হাজার ওয়া পঞ্জা ওয়া যশ্ / শুদ্ / তামাম।
হস্ত / আজ / কাদের। মদাঁ / আজ / কাদেরী;
আঁচে / মা / গোপ্তেম্ / ফাফেহেম্ / ওয়া / আস্ সালাম্।
— ১০৫৬ হিজরীতে সত্য-স্বরূপ খোদাতালার পথে দিকনির্ণয় যন্ত্রস্বরূপ এই পুস্তিকা- রিসালা-ই-হনুমা রচনা সমাপ্ত হইল। ইহার রচয়িতা একজন সামান্য কাদেরী বলিয়া মনে করিও না; বস্তুতপক্ষে স্বয়ং যিনি কাদের, সর্বশক্তিমান আল্লা, এই পুস্তকে তাঁহারই অনুপ্রেরিত বাণী (এল্হাম) বলিয়া জানিবে।
কাদেরিয়া তরিকা বা সাধনা পদ্ধতিকে শাহজাদা কেন সর্বাপেক্ষা সুগম ও শ্রেষ্ঠ মনে করেন, তাহা তিনি বিশদভাবে বুঝাইয়া দিয়াছেন। কাদেরিয়ার রাস্তা “বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি”র পথ নয়; এই পথে কঠোর সন্ন্যাসের অগ্নিপরীক্ষা নাই; প্রেম-প্রীতি, দিলদারি ও আয়েস, অনাবিল ও অখণ্ড আনন্দ এই মার্গাবলম্বীর নিত্যসম্পদ। মৌলানা জালালউদ্দিন রুমী বলিয়াছেন-খোদাতালা তোমাকে এই পথ দিয়া আনিয়াছেন, অপরাধীর মতো তোমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; পরন্তু অতিথির মতো তোমার উপর মেহেমানির মেহেরবানি বর্ষণ করাই তাঁহার অভিপ্রায়। এই পুস্তকের চারি অধ্যায়ে সুফীদিগের কল্পিত নাসুৎ (স্থূল), মালাকুত্ (স্বপ্নময়), জাবরুৎ বা স্থির নির্বিকল্প, এই তিন আলম বা জগৎ এবং সাধকের অবস্থাত্রয়, মুসলমানী প্রাণায়াম (রেচন-পূরক), শরীরস্থ ত্রিচক্র (ষট্চক্র নয়) ইত্যাদি আলোচনা করিয়াছেন।
বস্তুতপক্ষে শাহজাদা দারার জীবনাদর্শ, মন ও চিন্তাধারা, সংস্কার ও বিশ্বাসপ্রবণতা, অসংযত উৎসাহ ও আশাবাদিতা (optimism), সদ্য যোগরহস্য -প্রাপ্তিতে বালকের নূতন জামা কিংবা সুন্দর খেলনা প্রাপ্তির মতো অধীরতা ও আনন্দের আতিশয্য ইত্যাদি দোষগুণ এই ক্ষুদ্র পুস্তিকায় সঠিক প্রতিবিম্বিত হইয়াছে। তিনি মহম্মদের সশরীরে নিমেষের মধ্যে সপ্তম স্বর্গে আরোহণ, খোদাতালার সহিত সাক্ষাৎ এবং পুনরায় নিজের গরম লেপের ভিতর প্রবেশ — যাহাকে মুসলমানেরা “মিরাজ-ই-জিমানী” বলে, উহার এক অভিনব ব্যাখ্যা ‘রিসালা-ই-হনুমা’ পুস্তকে দিয়াছেন। হজরত স্থূল শরীরে, কি সূক্ষ্ম শরীরে এই কার্য করিয়াছিলেন, ইহা লইয়া মুসলমান শাস্ত্রে বিস্তর তর্কবিতর্ক আছে। মোল্লাদের মতে “মিহরাজ্-ই-জিস্মানী” অক্ষরে অক্ষরে সত্য; ইহা মানিয়া চলা ইমানের অঙ্গস্বরূপ; যাহারা অন্যরূপ বিশ্বাস করে, তাহার নাস্তিক তার্কিক (জিন্দিক) কিংবা ধর্মদ্রোহী স্বাধীনচিন্তাপন্থী মোতাজেলা। একদিন আকবরের দরবারে এই লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মহাতর্ক চলিতেছিল; এমন সময় বাদশা এক পায়ের উপর খাড়া হইয়া বলিলেন, এ অবস্থায় আমি আমার অন্য পা-খানি মাটি হইতে উঠাইতে পারি না; তবে কেমন করিয়া হজরত বেমালুম নিজের দেহখানি হাওয়ায় উড়াইয়া মিরাজ করিলেন। বাদশা ভুলিয়া গিয়াছিলেন, তিনি হিন্দুস্থানের মালিক হইলেও হজরত রসুলাল্লার সমপর্যায়ে উঠিতে পারেন নাই। সেইজন্য তাঁহারই প্রপৌত্র হজরতের পক্ষে এ কাজ করা যে সম্ভব ছিল, সে কথা প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। দারা লিখিয়াছেন, হজরত হারার গুহায় বসিয়া যোগাভ্যাস ও প্রাণায়াম করার দরুন তাঁহার শরীরের ধর্মই অন্য রকম হইয়াছিল; প্রমাণ––হজরত রসুলাল্লার দেহের উপর কখনও মাছি বসে নাই কিংবা মাটিতে তাঁহার ছায়া পড়ে নাই। ইহার কারণ––মাটি, জল, আগুন ও হাওয়া (মুসলমানেরা আকাশকে স্বীকার করে না), এই চারি উপাদানে প্রত্যেক জীবের দেহ গঠিত হইলেও যোগাভ্যাসের দ্বারা মহাপুরুষগণ স্থূল দেহকে পরিবর্তিত করিয়া বায়ুধর্মী অথচ পরিদৃশ্যমান শরীর লাভ করিতে পারেন। দারাকে অনেকে পাগল মনে করিবেন, কিন্তু সেকালের পক্ষে দারার যুক্তি আজকালকার একাদশী কিংবা টিকির বৈজ্ঞানিক ভাষ্যকারগণের যুক্তি অপেক্ষা দৃঢ়তর বলিয়া গৃহীত হইবার যোগ্য।
এই পুস্তিকায় দারা একরকম ধ্যানযোগের উল্লেখ করিয়াছেন; ইহাকে সুলতান- উল্-আজাকের অর্থাৎ “জেকেরের সুলতান” বা শ্রেষ্ঠ বলা হইয়াছে। এই যোগের দ্বারা মানুষ অলৌকিক শক্তি লাভ করে; সে অনাহত ধ্বনি শুনিতে পায়; বাজারের গোলমালের মধ্যেও সাধকের কানে ইহা ভ্রমরগুঞ্জন কিংবা পিপীলিকাশ্রেণীর চলাচলের শব্দের ন্যায় ধ্বনিত হয়। শাহজাদা লিখিয়াছেন, মিয়াজী (মিয়া মীর) খোলাখুলি ভাবে এই যোগের রহস্য তাঁহার অতি অন্তরঙ্গ মুরীদ (শিষ্য)-গণের কাছেও ব্যক্ত করেন নাই। হজরত আখুন্দ (দারার গুরু মৌলানা শাহ লিসানুল্লা) মিয়াঁ মীরের নিকট হইতে ইহার ইশারা পাইয়া এক বৎসর অভ্যাসের পর সফলতা লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার গুরুও দারাকে উপদেশ মূলক গল্পচ্ছলে এই যোগের রহস্য ব্যক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু শাহজাদা ছয় মাসের মধ্যেই ইহার গুপ্ত তত্ত্ব আয়ত্ত করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছেন, “আমি (আমার গুরু অপেক্ষা) ইহা অধিকতর সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করিয়াছি; এমন কি যাহাদের কাছে আমি ইহার কথা বলিয়াছি, তাহারা তিন-চারি দিনের মধ্যেই ফল পাইয়াছে। ইহার কারণ, আমার পীর এবং দাদাপীর যাহা গল্প কিংবা ইশারার ছলে শিক্ষা দিয়াছিলেন, আমি তাহা পরিষ্কারভাবে কোনও প্রকার অস্পষ্টতার পর্দায় কিছু গোপন না করিয়া বলিয়াছি।
আমরা শাহজাদার সত্য ও সরলতা এবং প্রাপ্ত বিদ্যা অকুণ্ঠিতভাবে মনুষ্য সমাজকে দান করিবার প্রশংসা করিলেও তাঁহার লোকচরিত্রজ্ঞান ও সহজাত সাংসারিক বুদ্ধি এবং অধিকারী-অনধিকারী বিচারের উপেক্ষাকে প্রশংসা করিতে পারি না। উদ্দেশ্য সাধু হইলেও তিনি বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেন নাই। (চলবে)