দশম অধ্যায়
দারা-বাবালাল সংবাদ
দুই
অনিচ্ছায় ভগ্নহৃদয়ে শাহজাদা দারাশুকো কান্দাহার অবরোধ প্রত্যাহার করিয়া মুলতানের পথে ২২শে নভেম্বর (১৬৫৩ খ্রি’) লাহোরে ফিরিয়া আসিলেন। শাহজাদা আওরঙ্গজেবের সুপরিচিত রণকৌশল ও শৌর্য এবং হিন্দুস্থানের বুর্জজমিহির সাদুল্লার নীতি যে কার্যে দুই বার বিফল হইয়াছে, সম্রাট শাহজাহান দারাকে সেই দুঃসাধ্য ব্যাপারে অদৃষ্ট পরীক্ষার জন্য নিযুক্ত করিয়াছিলেন। আওরঙ্গজেবকে জব্দ করবার গোপন মতলবও হয়তো শাহজাহানের ছিল; কিন্তু দারার অপ্রত্যাশিত পরাজয়ে তিনিই অধিক বিব্রত হইলেন— ভাবী অমঙ্গলের ছায়া বরং ঘনীভূত হইয়া তাঁহার মনকে অভিভূত করিল। তাঁহার আদেশে পরাজিত দারা সর্বত্র বিজয়ী সেনাপতির ন্যায় সাড়ম্বরে সম্বর্ধিত হইলেন। কিন্তু স্নেহাতুর পিতার এই প্রলেপে দারার মনের ঘা শুকাইল না। স্বপ্নবিলাসী দারার মন বাস্তবতার প্রথম প্রচণ্ড আঘাতে সম্পূর্ণ ভাঙিয়া পড়িল; পরাজয়ের অপমান ও অবসাদ তাঁহাকে অপ্রকৃতিস্থ করিয়া তুলিয়াছিল। এক বৎসর পূর্বে অনুরূপ অবস্থায় পতিত হইয়া আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্য যাত্রার পথে হীরাবাঈর রূপের পেয়ালা পান করিয়া প্রকৃতিস্থ হইয়াছিলেন; ইহার পরে গোলকুণ্ডা-বিজাপুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্র তাঁহার প্রকৃতির অনুযায়ী মনের খোরাক যথেষ্ট জোগাইতেছিল। দারা ও আওরঙ্গজেবের রুচি ছিল বিভিন্ন; সুতরাং তাঁহাদের মনোব্যাধির ওষুধও স্বতন্ত্র। দারা প্রৌঢ় বয়স পর্যন্ত অধ্যয়ন, পুস্তক রচনা, সুফী ধ্যান-ধারণায় সময় কাটাইয়াছিলেন। তাঁহার ছিল ধর্মের বাতিক এবং সাধুফকিরদের সহিত তত্ত্বালাপ করিবার নেশা। বোধ হয় বিমর্ষচিত্ত দারাকে প্রকৃতিস্থ করিবার জন্য তাঁহার অনুগ্রহভাজন ফার্সি ভাষায় সুকবি মুনশী চন্দ্রভান ব্রাহ্মণ এই সময়ে সাধু বাবালালের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। এই সময় বাবালাল লাহোর শহরের বাহিরে কোতল-মেহরা [লাহোর গেজেটিয়র পুস্তকে (পৃ. ১৯২) কুই-মিরান্ নামক লাহোরের এক শহরতলীর উল্লেখ আছে। ইহাই সম্ভবত কোতলমেহরান।] নামক মহল্লায় অবস্থান করিতেছিলেন। রায় চন্দ্রভান বাবালালের একজন ভক্ত ছিলেন বলিয়া মনে হয়। লাহোরের নিউলা [লাহোরের রেলস্টেশন এবং নূতন শহরের চৌরাস্তা (Mall) মধ্যবর্তী স্থানে নৌলাখা মহল্লা অবস্থিত ছিল (লাহোর গেজেটিয়র, পৃ. ১৬৪)। ‘নিউলা’র কোনও উল্লেখ গেজেটিয়রে নাই। বোধ হয় নৌলাখাই নিউলার শুদ্ধ নাম।] (নৌলাখা) মহল্লায় অবস্থিত চন্দ্রভানের হাভেলিতে দারা ও বাবালালের সাক্ষাৎকার সম্ভবত এই বৎসরের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই ঘটিয়াছিল। প্রকাশ্য সভায় সকাল বিকাল দুই বার নয় দিন পর্যন্ত বাবালাল ও দারার শাস্ত্রালাপ ও তত্ত্বকথালোচনা হইয়াছিল। বিচারের প্রারম্ভে স্থির হইয়াছিল উভয়পক্ষ যেখানে শাস্ত্রবিষয়ক কোনও কথা উদ্ধৃত করিবেন, উহার নির্ভুলতা প্রমাণের জন্য দরকারি পুস্তক হাতের কাছে রাখা হইবে। তত্ত্বজ্ঞানী হইলেও শাহজাদার পাণ্ডিত্যাভিমান কিছু কিছু ছিল। কয়েক বৎসর পূর্ব হইতেই তিনি পণ্ডিতগণের সাহায্যে হিন্দুদর্শন ও অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করিতেছিলেন; এবং তাঁহার পুস্তকাগারে নানা ভাষার লক্ষাধিক পুস্তক সংগৃহীত হইয়াছিল। ইহার এক অংশ সফরের সময় শাহজাদার সঙ্গে সঙ্গেই থাকিত। প্রথম কয়েক দিন পুঁথি ঘাঁটাঘাঁটি করিয়া স্বয়ং শাহজাদাই হয়রান হইয়া পড়িলেন। অবশেষে তিনি বাবালালের কাছে প্রস্তাব করিলেন পুঁথির নজির প্রমাণ দরকার নাই। [“If it be necessary in every question and answer to quote word for word the terms mentioned in the book present here, where will we not be car- ried by this process? Because it will be necessary to persue them, to stop for a moment to search for them. Now over conversation is aimed at the heart, it is then in our hand to take rest, we will be satisfied by it, and the truth, when dis- covered will be precious to us.”] (চলবে)