দশম অধ্যায়
দারা-বাবালাল সংবাদ
তিন
দারা—রাবণ সীতাকে হরণ করিয়া নিজগৃহে রাখিয়াছিলেন; অথচ সীতার সহিত তাঁহার কোনও সংস্রব ঘটিল না, ইহা কি রকম?
বাবালাল — বস্তুত সীতা ছিলেন মূর্তিমতী অকৃত্রিম ন্যায়, রাক্ষসের সঙ্গে তাঁহার কোনও সংস্পর্শ ঘটে নাই।
দারা—রাবণ যখন নিজগৃহে সীতাকে কারারুদ্ধ করিয়াছিলেন তখন সীতা নিশ্চয়ই অত্যন্ত ভয় পাইয়াছিলেন। তবে রাবণ এই পবিত্র ন্যায়ের ক্রোধাগ্নি দ্বারা ভস্মীভূত হইয়া গেলেন না কেন?
বাবালাল—প্রকৃতপক্ষে সীতা ছিলেন পূর্ণা প্রকৃতি (সুফী মতে “ইনসান-ই-কামিল” —রাগ-দ্বেষ-বর্জিত পূর্ণ জীব)। সুতরাং তাঁহার ক্রোধের উদ্রেক হইতে পারে না।
দারা—ফার্সি পুস্তকে লেখা আছে সৃষ্টির উপাদান চারি ভূত—মাটি, জল, অগ্নি ও বায়ু দ্বারা খোদাতালা মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন; পরন্তু হিন্দুদের পুস্তকে দেখিতে পাওয়া যায় মানুষ পঞ্চভূতের সমষ্টি। পঞ্চম উপাদানটি কি?
বাবালাল — পঞ্চম ভূত “আকাশ” (শব্দগুণাত্মক) যাহাকে শ্রবণ শক্তি বলা হয় এবং যাহা দ্বারা ভালোমন্দ অনুভব করিতে পারি। শ্রবণ শক্তি আমাদিগকে খোদাতালার দিকে আকৃষ্ট করে।
দারা—যে ব্যক্তির কদর (পুরুষকার) আছে তিনি প্রকৃতই অসাধারণ মানুষ; পুস্তাকাদিতে ইহাও বলা হইয়াছে যাহার কদর আছে তিনি অতিশয় সুখী, কিন্তু কেমন করিয়া ইহা ব্যাখ্যা করা যায়?
বাবালাল – কদর নিজেই খোদাতালা এবং উহা খোদাতালা কর্তৃক সৃষ্টও বটে।
দারা—উভয় ক্ষেত্রে অর্থাৎ স্রষ্টা এবং সৃষ্ট জীবের মধ্যে আমরা কেমন করিয়া ইহার অস্তিত্ব নিশ্চিতরূপে জানিতে পারি?
বাবালাল—যতক্ষণ সন্তান মাতৃগর্ভে থাকে, ততক্ষণ কদর মায়ের মধ্যে থাকে….যখন ভূমিষ্ঠ হয় তখন কদর অর্ধেক সন্তানের মধ্যে চলিয়া যায়; অপর অর্ধেক খোদার রহমত রূপে মায়ের স্তনে দুগ্ধ সঞ্চার করে। সন্তান কাঁদিয়া উঠিলেই মা দুধ দিয়া থাকেন। শিশু যখন বয়স্ক হইয়া উঠে, রিপু ও বাসনার সহিত বিশেষ ভাবে পরিচিত হয় এবং ভালোমন্দের সংস্পর্শে আসে, তখন সে স্বয়ং পূর্ণ কদর হইয়া যায়। কারণ খোদাতালা ভালোমন্দের বহু ঊর্ধ্বে।
দারা— “দিল” (অন্তঃকরণ) যাহা দেখা যায় না, তাহার রূপ কি প্রকার?
বাবালাল — উহা বায়ু প্রবাহের ন্যায়।
দারা— ‘দিলে”র কার্য কি?
বাবালাল – ইহা আমাদের মনের দালাল (মন এবং ইন্দ্রিয়-গ্রামের মধ্যস্থ)।
দারা—দুনিয়ার মানুষ মাত্রেই শরীরের উপাদানভূত শক্তিসমূহকে বলবান করিবার নিমিত্ত পান, আহার, দর্শন, শ্রবণ, শয়ন ইত্যাদি কার্যে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গসমূহ পরিচালনা করে, এমন কি যাঁহারা বিশুদ্ধাত্মা তাঁহারাও এই সমস্ত বিষয়ে ইহাদের অর্থাৎ প্রাকৃত জনের সমধর্মী — যদিও মাত্রায় কিছু কম। তাহা হইলে সাধারণ মানুষ এবং বিশুদ্ধাত্মা ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য কি?
বাবালাল-মনের অবস্থার বিভিন্নতাই পার্থক্যের পরিমাপ। যাঁহারা বিশুদ্ধাত্মা তাঁহারা মনের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন এবং সাংসারিক ভাব ও চিন্তা পরিহার করেন। উদাহরণ—একজন যুবা এবং একটি বালক ইন্দ্রিয়াদির ব্যাপার অর্থাৎ ভোজন শয়ন দর্শন শ্রবণ ইত্যাদি কার্য সম্বন্ধে সমধর্মী; কিন্তু তৎসত্ত্বেও উহাদের মধ্যে পার্থক্য এই বিষয়ে দেখা যায়, যদি একজন অপরিচিত স্ত্রীলোক একটি বালককে কোলে করে উহা আপত্তিকর হয় না; কিন্তু পরিবারের সহিত অপরিচিত কোনও যুবক যদি তাহার প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করে তাহা হইলে শত পাপ হয়। তদ্রূপ যাঁহাদের আত্মা পাপশূন্য তাঁহাদের অবস্থা শিশুর মতো নিষ্পাপ।
দারা—কোন্ অবস্থায় বলা যায় ফকির দুনিয়া হইতে ফারেগ (বন্ধনমুক্ত) হইয়াছে। বাবালাল – প্রাণী মাত্রই ভোজন, পান, দর্শন, শ্রবণ, শয়ন ইত্যাদি নিত্যই করিয়া থাকে। তাহারা এ সমস্ত বিষয়ে অসহায়ভাবে আসক্ত এবং বদ্ধ। কিন্তু যিনি এই সমস্ত কার্য অনাসক্তভাবে করিয়া থাকেন এবং ভোজনাদির অভাব ঘটিলেও যিনি নির্বিকার থাকিতে পারেন, তাঁহাকে আমরা দুনিয়া হইতে “ফারেগ” বা মুক্ত মনে করি।
দারা—মালিক (খোদাতালা) বান্দার এবাদৎ (প্রার্থনা ও ধর্মকার্য) কবুল করিয়াছেন কি না কেমন করিয়া জানা যায়?
বাবালাল––ফকির যদি নিজের ফকিরীর বড়াই না করিয়া বলে–আমার এবাদৎ কিছুই নয়, অতি সামান্য; তখন আমাদের বুঝা উচিত এই ব্যক্তি যাহা হউক কিছু কাজ করিয়াছে। অন্যথা যে ধর্মকার্য করিয়াছে বলিয়া আত্মপ্রসাদ অনুভব করে এবং এ সম্বন্ধে বিশেষ সচেতন, তখনই আমরা মনে করিব এই ব্যক্তির এবাদৎ তাহার কাছেই রহিয়াছে—উহা কবুল হয় নাই (ইহা সুফীদিগের রীয়া বা আত্মাভিমান সম্বন্ধে প্রশ্নের উত্তর)। (চলবে)