দশম অধ্যায়
দারা-বাবালাল সংবাদ
চার
শাহজাদা প্রকৃত জিজ্ঞাসুর ন্যায় শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির সহিত বাবালালের সঙ্গে নানাবিষয়ক তত্ত্ব আলোচনা করিয়াছিলেন। ইহা ‘তজুক-ই-জাহাঙ্গীরী’ পুস্তকে বর্ণিত বাদশাহী দরবারে হিন্দু পণ্ডিতগণের মুণ্ডপাত, অথবা কবি ভারতচন্দ্র কল্পিত ধর্মবিষয়ে জাহাঙ্গীর কর্তৃক ভবানন্দ মজুমদারের জেরা ও মজুমদারের নির্ভীক পাল্টা জবাব নহে। এই সাক্ষাৎকারের ফলে দারা পরাজয়ের গ্লানি ভুলিয়া কিছুদিন পরেই একাগ্রমনে শাস্ত্রালোচনা এবং হিন্দুদর্শনাদি অনুবাদের কার্যে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। অপর পক্ষে বাবালাল পাইয়াছিলেন একজন ভক্তিমান উপযুক্ত শিষ্য। [দারা মুখ্যত হজরত মোল্লা সাহ বদশীর মুরীদ হইলেও তত্ত্বজ্ঞান আহরণে তিনি ভ্রামরী বৃত্তি অবলম্বন করিয়াছিলেন। তাঁহার একাধিক গুরু ছিল। বম্বে শহরের প্রিন্স অব ওয়েলস মিউজিয়মে দারার গুরুবৃন্দের একটি চিত্র দেখিয়াছিলাম। উহার মধ্যে একটি বাবালালের ছবি বলিয়া মনে হয়।]
বহুকাল হইতে শুনিয়া আসিতেছি, হিন্দু ও মুসলমান একেবারে বিপরীতধর্মী। তেল আর জলের মতো দুই সম্প্রদায় কিছুতেই মিশ খাইবে না। এ বিষয়ে মোল্লা ও পণ্ডিত উভয়েই একমত। বিরোধে ঘৃতাহুতি দেওয়া যত সহজ, হিন্দু মুসলমানের মধ্যে ধর্মে সাম্যমৈত্রীর মূলসূত্র আবিষ্কার করিয়া সমাজে ও রাষ্ট্রে উভয়ের মিলন কার্যকরী করিয়া তোলা তেমনই কঠিন ও বিঘ্নসঙ্কুল। বিংশ শতাব্দীর ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষবহ্নির ধ্বংসলীলা দেখিয়া মনে হয়, ভারতবর্ষে কবীর নানক, আকবর-আবুলফজল, দারা-বাবালাল, মজহর-রামমোহন [মির্জা জান-জানান্ মজহর দিল্লিবাসী ছিলেন। তাঁহার জন্ম ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে, ৮০ বৎসর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন। তিনি এক প্রসিদ্ধ সুফী-সাধক ও কবি ছিলেন। তাঁহার জীবনী ও রচনাবলী পড়িলে মনে হয়, শাহজাদা দারা যেন দ্বিতীয় বার দিল্লিতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন] বৃথাই জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। বৃথাই গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ ঐক্যের বাণী প্রচার করিতেছেন। এই সাম্প্রদায়িক ব্যাধির চিকিৎসাবিভ্রাটে ঐতিহাসিক স্থিরচিত্তে বসিয়া শুনিতেছে ইতিহাসের সেই অনাহত ধ্বনি— “নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়”—অন্য পথ নাই! আকবরের “সুলহ্-ই-কুল” (Peace with all) ব্যতীত হিন্দু-মুসলমানের দ্বিতীয় পন্থা নাই।
মনের বন্ধনদশা না ঘুচিলে সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা এ দেশে স্থায়ী হইবার নয়। শাহজাদা দারার নিগমবোধ প্রাসাদ দিল্লি নগরীর ধূলায় মিশিয়া গিয়াছে; কিন্তু তাঁহার উদাত্ত নিগমবাণী আজও ভারতের আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হইতেছে। দারার ছিন্নমুণ্ড হুমায়ু-মরার মিনার হইতে আজও যেন সকরুণ স্বরে আজান দিতেছে— “বিসমিল্লাহু… তাঁহারই নামে যাঁহার কোনও নাম নাই, কিন্তু যিনি যে নামে ইচ্ছা নিজকে প্রকটিত করেন; (দৃশ্যত) পরস্পর-বিরোধ ভাবাপন্ন ইসলাম ও হিন্দুধর্ম জুলফদ্বয়ের (অলকগুচ্ছ) ন্যায় যাঁহার নিরুপম মুখমণ্ডলে শোভা পাইতেছে, অথচ উভয়ের মধ্যে কোনও একটি পর্দার মতো তাঁহার মেহেরবান চেহারাকে ঢাকিয়া ফেলে নাই; ইসলাম ও হিন্দুধর্ম উভয়ই যাঁহার তালাশে ফিরিতেছে…।” [দারা-কৃত ‘মজমুয়া-অল্-বহারিন’ (দুই সাগর-সঙ্গম) পুস্তকের নমস্ক্রিয়া হইতে উদ্ধৃত।]
ইতিহাস কবির সুরের প্রতিধ্বনি তুলিয়া বলিতেছে, “রে মৃত ভারত, শুধু সেই এক আছে, নাহি অন্য পথ।”
[প্রবাসী — জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ও অগ্রহায়ণ ১৩৫৩ সংখ্যায় পূর্ব তিনটি অধ্যায় প্রকাশিত হইয়াছে।] (চলবে)