একাদশ অধ্যায়
ভ্রাতৃ-বিরোধের পূর্বাভাস
এক
১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে মে। আগ্রা দুর্গের পাদচুম্বিনী ক্ষীণতোয়া যমুনার প্রশস্ত বালুকা- সৈকতে নগরীর উৎসুক জনতার বিপুল সমাবেশ ও অস্ফুট উল্লাসগুঞ্জন। অশ্বপৃষ্ঠে স্বয়ং সম্রাট শাহজাহান কুমার দারা, শুজা, আওরঙ্গজেব, কচ্ছবাহপতি মির্জা রাজা জয়সিংহ প্রমুখ সেনানীমণ্ডল পরিবেষ্টিত হইয়া দুর্গপ্রাচীরের ছায়ায় স্থানগ্রহণ করিয়াছেন। দলিল না থাকিলেও অনুমান হয়, বাদশাহের অনুপস্থিতিতে অন্তঃপুরচারিণীগণ অবগুণ্ঠনাবৃতা হইয়া অন্তরালে ছিলেন; শাহীমহলের পূর্ব দিকের অলিন্দ হইতে মর্মর জালমার্গ-বিচ্ছুরিত কান্তা-মুখশ্রী নিম্নস্থ রঙ্গভূমিকে উদ্ভাসিত করিয়াছিল।
যথাসময়ে চলমান পর্বতসদৃশ সুধাকর এবং সুরতসুন্দর নামক হস্তিযুগল শাহী দর্শনঝরোকার নিচে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল। কিছুক্ষণ শুণ্ডে শুণ্ডে জড়াজড়ি ঠেলাঠেলি করিয়া মত্ত মাতঙ্গদ্বয় কিঞ্চিৎ পিছনে হটিয়া গেল, জনসমুদ্র চঞ্চল তরঙ্গায়িত, সর্বত্র প্রবল উত্তেজনা। অজাতশ্মশ্রু কুমার আওরঙ্গজেব যুদ্ধের দ্বিতীয় দফা ভালো করিয়া দেখিবার জন্য ঘোড়া দাবাইয়া সুধাকর হাতির খুব নিকটে আসিলেন। ক্রোধান্ধ সুধাকর সুরতসুন্দরকে সামনে না পাইয়া শাহজাদার উপর হামলা করিল, চারিদিকে হায় হায় পড়িয়া গেল। শোরগোল চিৎকার ও আতসবাজির আগুন উপেক্ষা করিয়া সুধাকর আওরঙ্গজেবের ঘোড়াকে ধরিবার উপক্রম করিল। ষোল বৎসর বয়সেই কুমার পাকা সওয়ার; ঘোড়া সামলাইয়া তিনি হাতিকে বর্শা ছুঁড়িয়া মারিলেন। হাতি হার না মানিয়া ঘোড়াকে শুঁড়ে জড়াইয়া ধরিতেই কুমার ভূমিতে লাফাইয়া পড়িয়া খোলা তলোয়ার হাতে রুখিয়া দাঁড়াইলেন। পলায়মান ছত্রভঙ্গ জনতার ভিড় ঠেলিয়া সম্রাট কিংবা অন্য কেহ সহসা সাহায্যার্থ অগ্রসর হইতে পারিলেন না। এই সময় কুমার শুজা এবং মির্জা রাজা জয়সিংহ দ্রুত ঘোড়া ছুটাইয়া সুধাকরের প্রতি বর্শা নিক্ষেপ করিলেন। ইত্যবসরে সৌভাগ্যক্রমে সুরতসুন্দর পুনরায় যুদ্ধার্থ উপস্থিত হইল। মানুষ ও প্রতিস্পর্ধী সুরতসুন্দরের সহিত একাকী যুদ্ধে ভরসা না পাইয়া সুধাকর শুঁড় তুলিয়া ছুটিয়া পলাইল। শাহজাদা রক্ষা পাইলেন — গরিবের খবর ইতিহাসে নাই।
এই বাহাদুরির জন্য সম্রাট ওইদিন আওরঙ্গজেবকে “বাহাদুর” উপাধি ও বহুমূল্য উপহার প্রদান করিলেন; সারাদিন তাঁহাকে কাছছাড়া করেন নাই। আওরঙ্গজেবের অসীম সৌভাগ্যে ভ্রাতাদের মন সেদিন ঈর্ষায় ব্যথিত হইয়াছিল, কিংবা পিতার প্রিয়তম পুত্র দারার মুখে বিষাদের ছায়া পড়িয়াছিল—এমন কথা ইতিহাসে লেখা নাই; তবুও আওরঙ্গজেব সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি বাপকে শুনাইয়া দিলেন — খোদাতালার হাতে মানুষের জান; আমি শুধু ভাইসাহেবদের আচরণে ব্যথিত ও লজ্জিত। তাঁহার শেষের একমাত্র লক্ষ্য দারা; ইহা দারার প্রতি তাঁহার জন্মগত বিদ্বেষ ও ঈর্যার ভাবী অমঙ্গলসূচক ঝাঁজ, সপশিশুর প্রথম বিষোদ্গার, শাহজাহানের আশঙ্কা আওরঙ্গজেবের পরবর্তী আচরণে আরও ঘনাইয়া উঠিল।
দুই
জাহানারা বেগমের ঠিক বারো মাস পরে কুমার দারা এবং কন্যা রোশনারার জন্মের চৌদ্দ মাস পরে (২৪শে আগস্ট ১৬১৭) আওরঙ্গজেব ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন। এই কারণে কিংবা অন্য কোন কারণে জাহানারা দারা এবং রোশনারা- আওরঙ্গজেবের ন্যায় পাল্টা জুড়ি ইতিহাসে বড় বেশি খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। লোকের ধারণা ছিল শাহজাহান জাহানারা-দারাকে এক মাপে এবং রোশনারা-আওরঙ্গজেবকে অন্য মাপে ভালোবাসিতেন ও বিশ্বাস করিতেন। শাহী পরিবারে এই “যোগ্যং যোগ্যেন যোজয়েৎ” ব্যাপার গতানুগতিক কিংবা অস্বাভাবিক নহে; কারণ জাহানারা এবং দারার স্বভাব ও জীবনাদর্শের যে রকম মিল দেখা যায়, রোশনারা এবং আওরঙ্গজেবের স্বার্থবুদ্ধি ও চরিত্রে তদ্রূপ সামঞ্জস্য ছিল। দারা এবং আওরঙ্গজেব শাহজাহান-চরিত্রের এপিঠ ওপিঠ; এইজন্য তিনি পুত্রদ্বয়কে লইয়া দোটানা স্রোতে পড়িয়াছিলেন। শাহজাহানের সংসারে এই সন্তান চতুষ্টয়কে আশ্রয় করিয়া ধর্মবুদ্ধি-পাপবুদ্ধি এবং লক্ষ্মী-অলক্ষ্মীর যুগপৎ সমাবেশ যেন একটি সুপরিকল্পিত বিয়োগান্ত নাটকের ভূমিকা।
মাতা মমতাজমহলের মৃত্যুর পর জাহানারা বেগম সমস্ত ভ্রাতা-ভগিনীগণকে স্নেহের সমান অংশই দিয়াছিলেন, চরিত্রগুণে এবং নিত্য সাহচর্যের জন্য হয়তো দারার প্রতি টান একটু বেশি ছিল। তিনি দারার ইষ্ট কামনা করিলেও অন্য কাহারও অনিষ্ট চিন্তা করিতেন না; সকলের নালিশ এবং পিতার কাছে সুপারিশ করিবার তাগিদ তাঁহার নিকটেই আসিত। আওরঙ্গজেব ভ্রাতা-ভগিনীদের মধ্যে একমাত্র জাহানারাকে শ্রদ্ধা করিতেন, কিঞ্চিৎ বিশ্বাসও করিতেন।
জাহানারা সাম্রাজ্যের সর্বপূজ্যা “বেগম সাহেবা”। অন্দরমহলে এবং দরবারের আড়ালে শাহী তক্তের ছায়ায়, পুত্রী হইয়াও তিনি সম্রাটের মাতার মর্যাদা ও ক্ষমতালাভ করিয়াছিলেন। গোলকুণ্ডা-বিজাপুরের রাজদূত, অর্থী-প্রত্যর্থী ও অভিজাতবর্গ ‘বেগম সাহেবা’র দরবারে কুর্নিশ করিতে আসিতেন, অভাব-অভিযোগ জানাইতেন। সেকালেও ঘুষ, নজর, তদ্বির এবং সুপারিশ ব্যতীত কাজ হাসিল হইত না। লোকে মনে করিত, বাদশাহের মর্জির চাবিকাঠি উজির সাদুল্লার হাতে নয়, দারা ও জাহানারার হেফাজতে। রোশনারা বেগম জ্যেষ্ঠ ভগিনীর সৌভাগ্যে হিংসায় জ্বলিয়া উঠিলেন; কিন্তু পিতা ও শাহজাদা দারা বাঁচিয়া থাকিতে জাহানারাকে স্থানচ্যুত করা দুঃসাধ্য, এইজন্যই আওরঙ্গজেব ও তাঁহার ভাগ্য একই সূত্রে গ্রথিত হইয়া পড়িল।
আওরঙ্গজেব, সুজা, মোরাদ– কেহই জাহানারার প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন ছিলেন না; তাঁহারা অভিমান করিতেন, অনিষ্ট কিংবা প্রতিহিংসার চেষ্টা করেন নাই। ইহার কারণ, জাহানারা কাহারও ন্যায্য দাবি এবং অধিকারের বিরোধিতা করেন নাই। দারার প্রতি তাঁহার অন্তরের টান কোনও ইহলৌকিক স্বার্থদুষ্ট ছিল না। রোশনারা জাহানারাকে ঈর্ষা নয়, দস্তুরমত হিংসা করিতেন। নারীর দুর্দমনীয় ক্ষমতাস্পৃহা অতি প্রলয়ঙ্করী, ক্ষমতার নেশা শরাবের নেশা হইতে শত গুণ মারাত্মক। মুসলমান ইতিহাসে নারী-চরিত্রের উল্টা পিঠ দেখিতে গেলে রক্ত জমাট হইয়া যায়, যেমন আবু সুফিয়ানের পত্নী এবং মারিয়ার মতো “হিন্দা” প্রথম যৌবনে প্রেম প্রত্যাখ্যানের প্রতিহিংসা পূর্ণ করিবার জন্য রণক্ষেত্রে শায়িত হজরত মহম্মদের খুল্লতাত বৃদ্ধ হামজার কলিজা চর্বণ করিয়াছিলেন। হারুণ-অল-রশিদের মাতা খাইজুরান স্বামীকে ভেড়া বানাইয়া সাম্রাজ্য শাসন করিতেন; পুত্র হাদি খলিফা হইয়া মাতাকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়াছিলেন—এই দোষে হাদিকে তিনি দাসীগণের দ্বারা হত্যা করাইয়া হারুণকে খলিফা করিয়াছিলেন। শাহজাহানের কন্যা রোশনারা এই জাতীয় স্ত্রী-চরিত্র, মূর্তিমতী অসূয়া ও লালসা জড়িত বিজীগিষা। (চলবে)