| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শাহজাদা দারাশুকো (৩নং কিস্তি) : কালিকারঞ্জন কানুনগো

Reporter
কালিকারঞ্জন কানুনগো / ২১৪ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২০ জুন, ২০২৩

দ্বিতীয় অধ্যায়

ছায়া পূর্বগামিনী

যৌবনে পিতৃদ্রোহী, প্রৌঢ়ে নবীন প্রেমিক, বার্ধক্যে বালস্বভাব, জাহাঙ্গীর বাদশাহ পিতা আকবর এবং পুত্র শাহজাহান অপেক্ষা ইতিহাসে নিকৃষ্ট চরিত্র। সুদীর্ঘ চারি বৎসরকাল প্রেমের আগুনে পুড়িয়া মেহেরুন্নিসাকে পত্নীরূপে লাভ করিবার পর তিনি যেন হাতে হাতে স্বর্গ পাইলেন (মে মাস, ১৬১১ খ্রিঃ)। নবীন প্রেমের উত্তাল তরঙ্গে হাবুডুবু খাইতে খাইতে দিল্লীশ্বর “এক টুকরা রুটি ও এক পেয়ালা শরাবের দামে” হিন্দুস্থানের বাদশাহী সুন্দরী নূরজাহানের পায়ে বিকাইয়া দিলেন, গোপনে নয় নিতান্ত প্রকাশ্যে। দরবারী “ষাট হাজারী” মনসবদার সম্রাজ্ঞী “নূরমহল” (কিছুদিন পর নূরজাহান) ১৬১১ হইতে ১৬২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অপ্রতিহত প্রভাবে সম্রাট এবং তাঁহার সাম্রাজ্য উভয়ই শাসন করিয়াছিলেন। জাহাঙ্গীর বাদশাহর বয়স বাড়িয়াছিল, দেহ অতিভোগজনিত অকালবার্ধক্যগ্রস্ত হইয়াছিল, কিন্তু চিরকাল তিনি নাবালকই রহিলেন। অন্তঃপুরে নূরজাহান বেগমের পদার্পণের পর আলা হজরতের নাবালকত্ব যেন আরও বাড়িয়া গেল; বে-সরকারিভাবে নবপরিণীতা পত্নী হইলেন শাহানশাহ্র “আতালিক” বা অভিভাবিকা। ঐতিহাসিকেরা জাহাঙ্গীর রাজত্বের এই একাদশ বৎসরকে “নূরজাহান-চক্রের” শাসনকাল আখ্যা দিয়াছেন। এই “চক্রে”র (Junta ) মধ্যে ছিলেন নূরজাহানের পিতা উজীর ইতমাদ-উদ্দৌলা, ভ্রাতা আসফ খাঁ এবং শাহজাদা খুর‌রম। নূরজাহান মনে করিয়াছিলেন জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর খুর‌রমকে শিখণ্ডীর মতো দিল্লির সিংহাসনে বসাইয়া বাকি জীবন তিনিই হিন্দুস্থানে সর্বেসর্বা থাকিবেন। এই আশায় নূরজাহান অগ্রণী হইয়া আসফ খাঁর কন্যা ভ্রাতুষ্পুত্রী আরজুমন্দ বানু বা মমতাজমহলের সহিত শাহজাদা খুর্রমের বিবাহ দিলেন (৩০শে এপ্রিল ১৬১২ খ্রিঃ)। ইরান-সম্রাট শাহ ইসমাইলের বংশধর মুজঃফর হোসেনের কন্যার সহিত দুই বৎসর পূর্বে (সেপ্টেম্বর ১৬১০ খ্রিঃ) খুর‌রমের প্রথম বিবাহ হইয়াছিল। [* শাহজাহান-রাজত্বের অসম্পূর্ণ দরবারী ইতিহাস বাদশাহ-নামায় লিখিত আছে, মমতাজমহলের সহিত খুর‌রমের বাগদান হইয়াছিল প্রথমা স্ত্রীর সহিত বিবাহের প্রায় তিন বৎসর পূর্বে। ওই স্ত্রীর গর্ভে থুরমের প্রথম সন্তান জন্মিল মমতাজের সহিত বিবাহের এক মাস পূর্বে। ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে খুর‌রমের সহিত মমতাজের বাগদান হইবার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখা যায় না। নূরজাহানকে বিবাহ করিবার পূর্বে সুদীর্ঘ পাঁচ বৎসরের মধ্যে পুত্রের সহিত বাগদত্তা কন্যার বিবাহ-কার্যটা নিষ্পন্ন করিবার অবকাশ জাহাঙ্গীরের হয় নাই— এইরূপ অনুমান করিবারও কোনও অজুহাত নাই। সর্বাপেক্ষা বিবেচ্য বিষয়, জাহাঙ্গীর এমন কোনও কথা তাঁহার তুজুকে উল্লেখ করেন নাই। সুতরাং সন্দেহ হয় মমতাজমহলকে প্রেমিক শাহজাহান দরবারী ইতিহাসে প্রথম এবং শেষ প্রণয়পাত্রী হিসাবে জাহির করিবার জন্যই এই বাক্যদান ব্যাপার উদ্ভাবন করিয়াছেন। আধুনিক ঐতিহাসিকগণ বাদশাহ-নামাকে অভ্রান্ত জ্ঞান করিয়া আমাদিগকে বিভ্রান্ত করিয়াছেন, যথা : —

Memoirs of Jahangir, Rodgers & Beveridge, Vol. I. p. 224, footnote, “the long-engaged pair…” (History of Shajahan, Banarasiprasad Saxena, p. 14)

বিনা বিচারে বিশ্বস্ত চিত্তে দরবারী ইতিহাস সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া গ্রহণ করা নিরাপদ নহে।] রাজনৈতিক স্বার্থের প্রেরণায় নিরপরাধিনী প্রথমা পত্নীকে ন্যায্য অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া খুর‌রম পরবর্তীকালে দিল্লির সিংহাসন লাভ করিলেও সুখী হইতে পারেন নাই। অবজ্ঞাতা অভিমানিনীর অশ্রুর বদলে শাহজাহানের যে শোকাশ্রু বিধাতার বিচারে অঝোরে ঝরিয়াছিল তাজমহলের শ্বেতমর্মর আজিও উহার সাক্ষ্য দিতেছে। যাহা হউক, এই বিবাহের পর শাহজাদা খুর‌রম আলালের ঘরের দুলাল হইয়া উঠিলেন। গর্ভধারিণী যোধপুর-রাজকুমারী যোধাবাঈর পুত্র খুর‌রম; যোধাবাঈ সম্রাট জাহাঙ্গীরের নজরে হইয়া পড়িলেন খুর্রমের “অন্যান্য” মাতৃস্থানীয়া এবং বিমাতাগণের মধ্যে একজন মাত্র; অপরপক্ষে নূরজাহান বেগম হইলেন “আসল মা”! ভাবাবেশে আলা হজরত লিখিয়া গিয়াছেন বাবা খুর‌রম দাক্ষিণাত্য জয়ের উপঢৌকন স্বরূপ “আসল-মা” (ওয়ালেদা-ই খোদ) নূরজাহান বেগমকে দিলেন দুই লাখ টাকা এবং অন্যান্য মা, বেগম ইত্যাদি সকলে মিলিয়া পাইলেন ষাট হাজার টাকা!” মুসলমান আমলে বিবাহাদির পর শাহীমহলে শাহজাদাগণের প্রবেশ অনুমতিসাপেক্ষ ছিল। পূর্বাপর প্রচলিত এই রীতি ভঙ্গ করিয়া জাহাঙ্গীর বাদশাহ বাবা খুর‌রমকে অন্দরমহলে যাতায়াত করিবার অবাধ অধিকার প্রদান করিয়াছিলেন। নূরজাহান বেগমের সম্মতি এবং বিশেষ অনুগ্রহ ব্যতীত খুর‌রম এই অধিকার হয়তো পাইতেন না। কিন্তু লোকচক্ষে ইহা বিসদৃশ এবং কটাক্ষের বিষয়ীভূত হইয়াছিল। বনিতা ও কবিতার ‘সাধুত্ব’ সম্বন্ধে ভবভূতির যুগ অপেক্ষা বাদশাহী আমলে মানুষ অধিক “দুর্জন” ছিল। স্যর টমাস রো রচিত পুস্তকে খুর‌রম-নূরজাহান সম্পর্কে অশোভন ইঙ্গিত আছে। সত্যমিথ্যা ভগবান জানেন, তবে সর্বম্ অত্যন্তগর্হিতম্।

এক

বন্দী খসরুকে আসফ খাঁর হাতে সমর্পণ করিয়া নূরজাহান বেগম চালে ভুল করিয়া বসিলেন, “নূরজাহান চক্রে” ভাঙন শুরু হইল। স্বার্থের সংঘাতে ভ্রাতা-ভগ্নীর মধ্যে ঐক্য ও স্নেহের বন্ধন শিথিল হইতে লাগিল। শাহজাদা খুর‌রম নূরজাহানের প্রভাব হইতে মুক্ত হইয়া দাক্ষিণাত্যে স্বাধীন ভাবে কার্য করিতেছিলেন; তবে ঘন ঘন বহুমূল্য উপহার পাঠাইয়া সম্রাজ্ঞী এবং সম্রাটকে খুশমেজাজে রাখিতেন। নূরজাহান-চক্রের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী খান-ই-খানান আব্দুর রহিমের পৌত্রীর (শাহ্ নওয়াজের কন্যা) সহিত খুর‌রম হঠাৎ পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইলেন। নূরজাহানের বিরুদ্ধে ইহাই খুর্রমের প্রথম পাল্টা চাল; বাদশাহ-নামায় আছে “কতিপয় রাজনৈতিক কারণেই” এই বিবাহ হইয়াছিল। ইহার প্রতিক্রিয়া-স্বরূপ অবজ্ঞাত শাহজাদা পরবেজ দরবারে আমন্ত্রিত হইলেন এবং তাঁহার মনসব বাড়াইয়া দেওয়া হইল। এই সময় হইতে সম্রাজ্ঞীর কূটনীতি খেলার নূতন ঘুঁটি হইলেন পরবেজ।

১৬২২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে নূরজাহান বেগমের পিতা বিচক্ষণ বৃদ্ধ উজীর-ই-আজম ইতমাদ-উদ্দৌলার মৃত্যুর তিন মাস পরে, শাহজাদা খুর্রম প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করিলেন। দাক্ষিণাত্য, মালব এবং গুজরাটের বাদশাহী ফৌজ খুর‌রমের বশ্যতা স্বীকার করিয়া শাহজাদার অধিনায়কত্বে রাজধানীর দিকে অভিযান করিল। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান একক এবং অসহায়; পিতা মহানিদ্রার ক্রোড়ে, ভ্রাতা আসফ খাঁ পার্শ্বে কণ্টকস্বরূপ, জাহাঙ্গীরের প্রিয়তম মোসাহেব মুতামিদ খাঁ শত্রুর গুপ্তচর। চতুর্দিকে অবিশ্বাস এবং ষড়যন্ত্রের ছায়া। শাহজাদা খুর‌রমের প্রতি একান্ত পক্ষপাতিত্ব করিয়া নূরজাহান বেগম সম্রাটের পুরাতন বিশ্বস্ত যোদ্ধৃগণের অপ্রিয়ভাজন হইয়াছিলেন। শাহজাদা মনে করিলেন, তিনি রাজধানীর উপকণ্ঠে উপস্থিত হইলেই সুবা লাহোর, দিল্লি, আগ্রার বাদশাহী মনসবদারগণ নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইবে। এইবার হিন্দুস্থানের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও কূটনীতিবিদ পুরুষসিংহের সহিত এক তেজোদৃপ্তা নারীর শক্তিপরীক্ষা আরম্ভ হইল। শাহজাদা পরবেজ এবং খসরুর পুত্র দাওয়ার বকশকে সম্মুখে বাড়াইয়া নূরজাহান খুর‌রমকে বেকায়দায় ফেলিলেন; দাওয়ার বকশের অভিভাবক সমরনিপুণ মির্জা আজিজ এবং পরবেজের পৃষ্ঠপোষক অসুর-বিক্রম মহাবত খাঁ সম্রাজ্ঞীর সহিত শত্রুতা ভুলিয়া তাঁহার প্রধান সহায় হইলেন; আম্বেরপতি মির্জা জয়সিংহ এবং দুর্ধর্ষ পাঠান সেনাপতি খানজাহান লোদী বিপন্ন সম্রাটকে রক্ষা করিবার জন্য সসৈন্যে রাজধানী অভিমুখে যাত্রা করিল।

দুই

মহাবত খাঁ ছিলেন আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জাহাঙ্গীরের পুরাতন বিশ্বস্ত অনুচর; হুকুম পাইলে ইবলিসকেও একহাত না দেখিয়া ছাড়িবার পাত্র নহেন। তিনি দিলখোলা জাঁহাবাজ সিপাহী; তাঁহার দোষ বা গুণ–মুখের উপর অপ্রিয় কথা শুনাইবার বেপরোয়া হিম্মত। তিনি একবার স্বয়ং দিল্লীশ্বরকে বলিয়া বসিয়াছিলেন, “আলা হজরত! জানানার আঁচলে দিনরাত ঝুলিয়া থাকিলে বাদশাহী ছারখার হওয়া কিছু তাজ্জব ব্যাপার নয়।” নূরজাহান বেগম মানুষ না চিনিলে পূর্ণ ষোল বৎসর জাহাঙ্গীর বাদশাহর বাদশাহী রক্ষা করিতে পারিতেন না। তিনি জানিতেন মহাবত খাঁ গোঁয়ার এবং দুর্মুখ হইলেও কাজের লোক-না চটাইলে নিমকহারামি করিবে না। জাহাঙ্গীর বাদশাহর বেয়াড়া বাঘ মহাবত খাঁ খুর্রমের সহিত সংগ্রামে অবতীর্ণা নূরজাহানের কূটনীতির জাদুগুণে সিংহবাহিনীর পশুরাজ হইয়া পড়িলেন।

দিল্লি হইতে কয়েক মাইল দূরে বিলোচপুর নামক স্থানে বিদ্রোহী খুর্রমের ভাগ্যপরীক্ষা হইল (এপ্রিল ১৬২৩ খ্রিঃ)। পুরাদমে যখন উভয় পক্ষের লড়াই চলিতেছিল তখন মহাবত খাঁর সহকারী সেনাপতি বিশ্বাসঘাতক আবদুল্লা খাঁ, পূর্ব ষড়যন্ত্র অনুসারে বাদশাহী ফৌজ হইতে পৃথক হইয়া সসৈন্য শাহজাদার সহিত মিলিত হইল। এই ষড়যন্ত্রের কথা খুর‌রমের বিশ্বস্ত সেনাপতি এবং বিদ্রোহমন্ত্রদাতা রাজা বিক্রমজিৎ ছাড়া অন্য কেহ জানিতেন না। খুর‌রমের অগ্রগামী বাহিনীর অধিনায়ক দারা খাঁকে এই শুভ সংবাদ প্রদানের জন্য রাজা বিক্রমজিৎ যখন ঘোড়া ছুটাইয়া চলিয়াছেন, সেই সময় বাদশাহী তোপখানার একটি গোলার আঘাতে তাঁহার প্রাণান্ত হইল। বাহিনীর পশ্চাৎভাগে আবদুল্লা খাঁর অপ্রত্যাশিত উপস্থিতির রহস্য খুর‌রমের সৈন্যগণ বুঝিতে না পারিয়া পরাজয়ের আশঙ্কায় হতোদ্যম ও ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল। শাহজাদা খুর‌রমের সৌভাগ্যসূর্য পিতার অভিশাপে রাহুগ্রস্ত হইল; তিনি ‘বে-দৌলত’ বা দুর্ভাগার ন্যায় দাক্ষিণাত্যে পলায়ন করিলেন। মহাবত খাঁ বিদ্রোহী শাহজাদাকে দম ফেলিবার অবকাশ দিলেন না; বিজাপুর, গোলকুণ্ডা তাঁহাকে আশ্রয়দান করিল না।

মমতাজ এবং তাঁহার শিশুসন্তানগণকে লইয়া কয়েক হাজার বিশ্বস্ত অনুযাত্রীসহ শাহজাদা খুর‌রম মহাবত খাঁর শ্যেনদৃষ্টি এড়াইয়া তৈলঙ্গ-ভূমির গভীর অরণ্যানীর মধ্যে আত্মগোপন করিয়াছিলেন। অসীম বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করিয়া তিনি অবশেষে উড়িষ্যায় উপস্থিত হইলেন। প্রাচীর দিগালরেখায় আবার সৌভাগ্যের মুহূর্ত রাগ তাঁহার প্রাণে নূতন আশার সঞ্চার করিল। অকর্মণ্য সুবাদার আহম্মদ বেগ বিনা যুদ্ধে উড়িষ্যা হইতে পলায়ন করিয়া রাজমহলের পথ ধরিলেন। শাহজাদা খুর্রম দ্রুতবেগে তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিয়া উল্কাবেগে রাজমহলের উপর আপতিত হইলেন। যুদ্ধে বাংলার বৃদ্ধ সুবাদার ইব্রাহিম খাঁ ফতেজঙ্গকে পরাজিত ও নিহত করিয়া খুর্রম রাজমহলে বাদশাহীর দিবা-স্বপ্ন দেখিতে লাগিলেন। সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকা-জাহাঙ্গীর নগর বিজয়ী শাহজাদাকে রামপালের নামকরা কলা (হয়তো অমৃতসাগর) কয়েক কান্দি ভেট পাঠাইয়াছিল। যাহা হউক কয়েক মাস পরে প্রয়োজনীয় অর্থ এবং সৈন্যদল সংগ্রহ করিয়া সুবে বিহার দখল করিবার জন্য শাহাজাদা খুর‌রম রাজা ভীম শিশোদিয়াকে পাটনার দিকে প্রেরণ করিলেন। পাটনা অধিকার করিয়া তাঁহার অগ্রগামী সেনাদল বিহারের পশ্চিম প্রান্তে টৌস (প্রাচীন তমসা) নদীতীরে শিবির সংস্থাপন করিল। শাহজাদা আসন্ন প্রসবা মমতাজমহলকে রোহতাস দুর্গে রাখিয়া সুবা এলাহাবাদ ও অযোধ্যা আক্রমণের পরিকল্পনা করিয়াছিলেন, এই সময়ে তাঁহার এক পুত্রলাভ হইল—নাম রাখিলেন মুরাদ বকশ্। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev