একাদশ অধ্যায়
ভ্রাতৃ-বিরোধের পূর্বাভাস
পাঁচ
বাপের ‘আলালের ঘরের দুলাল’, ভগ্নী জাহানারার ‘নয়নমণি শাহজাদা দারা পিতার জীবদ্দশায় কোনও কৃতিত্বের পরিচয় না দিয়াও অর্ধেক সাম্রাজ্যের অধীশ্বর, ছয় সুবার অনুপস্থিত সুবাদার। তাঁহার মনসব অন্য তিন ভ্রাতার মোট মনসবের প্রায় সমান। দরবারে সম্রাটের ময়ূর সিংহাসনের পার্শ্বে সোনার চৌকি একমাত্র তাঁহার জন্য নির্দিষ্ট—উভয়ের মধ্যে ব্যবধান পিতার পরমায়ু। সম্রাটের পৌত্রগণের মধ্যে দারার পুত্রদ্বয় তাঁহার সর্বাপেক্ষা অধিক স্নেহ ও অনুগ্রহভাজন, এমন কি তাঁহার কর্মচারীগণও অনুরূপ সৌভাগ্যের পাত্র। কেন পিতার, ন্যায়নিষ্ঠ গুণগ্রাহী সম্রাটের এই দুর্বলতা ও অবিচার?
দারাকে শাহানশাহ আদুরে বড় খোকাটির মতো গায়ে আঁচড় লাগিবার ভয়ে সর্বদা চোখে চোখে রাখিতেন, পারতপক্ষে যুদ্ধবিগ্রহে পাঠাইতেন না। যে বয়সে আওরঙ্গজেব বুন্দেলখণ্ড ও দাক্ষিণাত্য জয় করিয়া গুজরাটের সুবাদারি করিতেছিলেন সে বয়সে দারা দূর হইতেও লড়াই দেখেন নাই। ২৪ বৎসর বয়সে দুই ছেলের বাপ হওয়ার পর দারা কান্দাহার সুবা রক্ষা করিবার জন্য প্রথম অভিযানে প্রেরিত হইয়াছিলেন। শাহজাদা ময়দানে দুশমন খুঁজিয়া পাইলেন না, ফাঁকা মাঠে খেলা জিতিয়া বাহবা লইলেন। তিন বৎসর পরে আবার গুজব শুনা গেল, ইরানের শাহসফী বিরাট ফৌজ লইয়া কান্দাহারের দিকে কুচ করিতেছেন। তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য দিল্লীশ্বর দারাকে দ্বিতীয় বার মোগলবাহিনীর অধিনায়ক করিয়া পাঠাইলেন। বুলন্দ-ইকবাল শাহজাদার উঁচু কপাল; শাহসফী নিশাপুরের পথে বহুদূরে কাশান শহরেই কবরস্থ হইলেন। বিজয়-দামামা বাজাইয়া দারা লাহোরে ফিরিয়া আসিলেন, এবং পিতা কর্তৃক এমন বিপুলভাবে সম্বর্ধিত ও পুরস্কৃত হইলেন যেন তিনি গোটা ইরান-তুরান ফতে করিয়া ফিরিয়াছেন। সবই বরাতের জোর!
পাকা মুসলমান ও কাজের লোকের নজরে দারা হইলেন কুঁড়ের বাদশা; কোনও ঝকমারি নাই; দিলখোলা হাসি লইয়া আনন্দসাগরে গা ভাসাইয়া চলিয়াছেন। তাঁহার রোজা নাই; শুক্রবার ব্যতীত অন্যদিনে নমাজ নাই, আছে কেবল কোরান শরীফ লইয়া বেইমানী গবেষণা, ‘নাপাক হিন্দুয়ানী’র সহিত পবিত্র ইসলামের তুলনামূলক উদ্ভট বিচার। সকাল-সন্ধ্যা শাহজাদার মজলিশে যত রাজ্যের পাগলের আনাগোনা, অর্ধ উলঙ্গ কাফের যোগী সন্ন্যাসীর ভিড়। সেখানে মাঝে মাঝে পণ্ডিতরাজ জগন্নাথ সংস্কৃত প্রশস্তি পাঠ কিংবা কর্ণাটক ভাষায় গান শুনাইতেন; নিভৃতে চলিত তাঁহার হিন্দুগুরু কবীন্দ্রাচার্য সরস্বতীর সহিত দর্শন উপনিষদ আলোচনা। কবি, গায়ক, গুণী, চিত্রকর, শিল্পী, গরিব ফকিরদের নিকট তাঁহার দ্বার ও ভাণ্ডার সর্বদা উন্মুক্ত; যাহারা দশ দুয়ারে তাড়া খাইয়া ফিরে তাহাদের ফটক পার হইতে আপত্তি নাই,––তাহাদের কাছে তিনি মাটির মানুষ। শাহী দরবারে বড় বড় মনসবদার এমন কি উজির-ই-আজম সাদুল্লা খাঁর সহিত ব্যবহারে কিন্তু তিনি দ্বিতীয় ফরায়ুন (Pharoah)। ঈর্ষামূলক হইলেও এই চিত্র দারার চরিত্রের এক দিক সন্দেহ নাই।
ছয়
পিতা শাহজাহান আওরঙ্গজেবের মতো পাকা নমাজী; সুতরাং দারা হয়তো ভয়ে শুক্রবারের জুম্মা নমাজ খেলাফ করিতেন না। ওইদিন তিনি দরাজ হাতে ফকির গরিবকে দানখয়রাত করিতেন; তাঁহার সুফিয়ানা ব্যাখ্যায় দান এবং ক্ষমাই হইল খোদাতালার আসল ইবাদৎ। ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে শাহজাদা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ছিলেন; কেননা রাজজ্যোতিষী ভবানীপ্রসাদ কোষ্ঠী বিচার করিয়া বলিয়াছেন দারা নিশ্চয়ই বাদশাহ হইবেন; তাঁহার অন্যতম গুরু সুফী সরমদ বলিয়াছিলেন দারা দুনিয়ার মালিক হইয়া জন্মিয়াছেন। জ্যোতিষী ভবানীপ্রসাদকে তাঁহার এক বন্ধু সাবধান করিয়া বলিয়াছিল দারা বাদশাহ না হইলে তোমার মাথাটাই আগে যাইবে। ধূর্ত ভবানীপ্রসাদ বলিল, তোমার যেমন বুদ্ধি! বাদশাহ না হইলে নিজের মাথা বাঁচাইতেই শাহজাদা ফাঁপরে পড়িবেন, আমার মাথা লওয়ার ফুরসত কোথায়? আওরঙ্গজেবের হুকুমে শিরশ্ছেদ করিবার পূর্বে এক মোল্লা সাধু সরমদকে টিটকারি দিয়া বলিয়াছিল, দারার বাদশাহী গেল কোথায়? সরমদ নিতান্ত সপ্রতিভ ভাবে জবাব দিলেন, তিনি বেহেশতের বাদশাহ হইয়া গিয়াছেন!
সন্ধ্যাবেলা শাহীমহলে ডাক না পড়িলে দারা তত্ত্বজ্ঞানী সুফী সাধকগণের জীবনী সঙ্কলন, উপনিষদ এবং যোগবাশিষ্ট গ্রন্থের ফার্সি অনুবাদ প্রভৃতি কাজে ব্যস্ত থাকিতেন, কিংবা শাহমুহবীবুল্লা এলাহাবাদী, সরমদ এবং অন্যান্য ছোট বড় সাধু ফকিরগণের কাছে বস্তা বস্তা চিঠি লিখিতেন, সৃষ্টিছাড়া প্রশ্ন করিতেন। নিশীথ রাত্রে তিনি কাদেরিয়া কীর্তন পদ্ধতি অনুসারে দিলের উপর জেকের-ফেকেরের “জবর” (জপে “ধ্বনির” আঘাত) মারিতেন; কখনও প্রাণায়াম করিতে করিতে “গায়েবী আওয়াজ” (“অনাহত” ধ্বনি) শুনিতেন। ঘুমাইয়া পড়িলেও তিনি রাজযোগ সম্বন্ধে পুস্তিকা (যথা স্বরচিত রিসালা-ই-হক্মা) লিখিবার জন্য ফেরেশতার মারফত খোদার হুকুম পাইতেন। কোন কোন রাত্রিতে তাঁহার স্বপ্নপ্রয়াণ হইত, জঙ্গলে বশিষ্ঠ ঋষি ও রামচন্দ্রের সাক্ষাৎলাভ করিয়া জাগিয়া উঠিতেন।
এই সমস্ত ব্যাপারের উপর আরও ছিল শাহজাদার কুণ্ডলিনী ভেদ প্রক্রিয়া। লাহোরের হজরত মিঞা মীরের মুরীদ হজরতশাহ বদশী দারার মন্ত্রগুরু। তাঁহার কৃপায় নিজের কুণ্ডলিনী ছাড়াইয়া তিনি পরের কুণ্ডলিনী ভেদ করাইবার ক্ষমতা লাভ করিয়াছিলেন। ধর্মচর্চায় তিনি সাধিকা জাহানারার অন্যতম গুরুস্থানীয়। কাশ্মীর সফরের সময় জাহানারা গুরু বদশীর কাছে বসিয়া তিন দিন এই সাধনা (untying the knot) করিয়া সফলতা লাভ করিয়াছিলেন। দারা পরের মুখে স্তোকবাক্য শুনিতে শুনিতে নিজেও বিশ্বাস করিতেন তিনি বাস্তবিক একজন দৈবানুগৃহীত “ইসান-ই-কামিল বা “পূর্ণপুরুষ”।
দারা ও আওরঙ্গজেব পরোক্ষে পরস্পরের প্রতি বাছা বাছা বিশেষণ প্রয়োগ করিতেন। দারা বলিতেন ভাই আওরঙ্গজেব নমাজী বকধার্মিক; আওরঙ্গজেব বলিতেন কাফের শাহজাদা দরবারী মোসাহেব, মতলববাজ পাগল। আওরঙ্গজেবের অষ্টপ্রহর দুশ্চিন্তা ইসলাম ও মোগলসাম্রাজ্য; ইসলাম বিপন্ন করিয়া ভগ্নী জাহানারার সহায়তায় তৈমুরের শাহীতক্তে বসিবেন দারা? আর আওরঙ্গজেব? (চলবে)