একাদশ অধ্যায়
ভ্রাতৃ-বিরোধের পূর্বাভাস
সাত
প্রথম বয়স হইতেই দারা দৈবে দারুণ বিশ্বাসী, সাংসারিক ব্যাপারে বাস্তবদৃষ্টি ও দৃঢ়তাশূন্য; উপায়-অপায় নির্ণয়ে অপারগ, লেখাপড়া ব্যতীত অন্য কার্যে পরমুখাপেক্ষী; পরের মুখে ঝাল খাওয়া তাঁহার স্বভাব। আওরঙ্গজেব ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ এবং স্বভাব-চরিত্র, বুদ্ধি ও জীবনযাত্রায় দারার সম্পূর্ণ বিপরীত। বাল্যকাল হইতে তিনি বাপের বাড়া পাকা সুন্নি, ইমাম আবুহানিফার মতানুগামী। লড়াইয়ের ময়দান কিংবা সফরেও তাঁহার রোজা নমাজ আমরণ বাদ পড়ে নাই। ইসলামীয় ধর্মশাস্ত্র ও ব্যবহারশাস্ত্রে তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন, সর্বদা হরাম-হালাল জায়েজ-নাজায়েজ, বিধি-নিষেধ বিচার করিয়া চলিতেন। এই বিচারের ফাঁকিও তিনি জানিতেন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রয়োগ করিতেন। আওরঙ্গজেব শিকার ব্যতীত সর্ববিধ ব্যসন বর্জন করিয়াছিলেন, তাঁহার জীবনে ছন্দ ও প্রাণে সঙ্গীত ছিল না, কঠোর সংযম ও নিয়মানুবর্তিতা ছিল। তাঁহার দাড়ির দৈর্ঘ্য, পায়জামার ঝুল, জামার সুতা ও রং শরিয়তের অনুমোদনসাপেক্ষ ছিল। বাদশাহ হইয়াও তিনি ফকির, হিন্দুস্থানের জিন্দাপীর খ্যাতিলাভ করিয়াছিলেন। রাজকোষের অর্থ তিনি হারাম মনে করিতেন। রুজি (উপার্জন) হালাল করিবার জন্য তিনি নিজে কোরানশরীফ লিখিয়া বিক্রয় করিতেন। কফনের কাপড় ও দফনের খরচের জন্য ওই টাকা জমাইয়া রাখিতেন। সারা জীবনে শরাবের পেয়ালা তিনি দুই বার স্পর্শ করিয়াছিলেন, গলাধঃকরণ করেন নাই—একবার সুন্দরী হীরাবাঈয়ের নিকট প্রেমের পরীক্ষায়, এবং দ্বিতীয় বার মথুরায় নৈশ ভোজের পর পেয়ালার পর পেয়ালা ভাই মোরাদের মুখে তুলিয়া দিয়া অচৈতন্য অবস্থায় তাঁহাকে বন্দী করিবার অভিপ্রায়ে। বাদশাহ হইয়া তিনি শাহীমহল ও রাজধানী হইতে নৃত্যকলা ও সঙ্গীতকে নির্বাসিত করিয়াছিলেন, পাপ-ব্যবসায় দমন করিবার জন্য নাচওয়ালী ও রূপোপজীবিনীগণকে শরিয়ত মতে স্বামী গ্রহণে বাধ্য করিয়াছিলেন।
আট
ইতিহাসে আওরঙ্গজেব মূর্তিমান পুরুষকার। দারার সহায়কারী দৈব এবং মানবীয় শক্তিকে পরাজিত করিবার জন্য তিনি ক্ষেত্র প্রস্তুত করিতেছিলেন। জাহাঙ্গীরের তৃতীয় পুত্রের পক্ষে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে ডিঙাইয়া সিংহাসন লাভ যদি পাপকার্য না হয়, শাহজাহানের বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী তাঁহার তৃতীয় পুত্র কেন ওই সিংহাসন হইতে সরিয়া দাঁড়াইবেন?
মুখে সর্বদা আল্লা ভরসা আওড়াইলেও আওরঙ্গজেব সম্পূর্ণ নিজের উপর ভরসা রাখিয়া চলিতেন। আল্লার উপর অটুট বিশ্বাস থাকিলেও আল্লার সৃষ্ট জীবের প্রতি কোনোপ্রকার মমতা কিংবা বিশ্বাস তাঁহার প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল। আওরঙ্গজেব মাটির পৃথিবীর উপর দিয়া চলিতেন। এক পা ফেলিয়া আগে কি আছে আর এক পা দিয়া দেখিতেন; দারার ন্যায় ভাবের ডানায় ভর করিয়া কল্পনাপরীর রাজ্যে উড়িয়া বেড়াইতেন না। মানুষ হিসাবে দারার সদর-অন্দর প্রায় এক ছিল; কিন্তু আওরঙ্গজেব যেন দৌলতাবাদ দুর্গ। মনের দুয়ার মানুষ দূরের কথা, খোদাতালার কাছে খুলিয়াছিলেন কিনা তিনিই জানেন। স্বার্থ, বিবেক ও ধর্ম তাঁহার মধ্যে গোল পাকাইয়া এমন এক গোলকধাঁধার সৃষ্টি করিয়াছিল যাহার মধ্যে ঐতিহাসিক খেই খুঁজিয়া পায় না।
ধর্মের দিক দিয়া দেখা যায় দারা এবং আওরঙ্গজেবের “আল্লা” বিপরীতধর্মী দুইটি বিভিন্ন সত্তা। আওরঙ্গজেবের আল্লা একমাত্র মুসলমানের আশ্রয় ও সহায়। মুসলমানের ভোগের জন্য আল্লা দুনিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। কাফেরগুলি ইহকালে মুসলমানের গোলামি ও খোদার গজব বরদাস্ত করিয়া মরণের পর অনন্তকাল দোজখের আগুনে পুড়িবার জন্যই সৃষ্ট হইয়াছে। কাফেরগণকে আঁধার হইতে গলায় শিকল দিয়া আলোকে আনিবার ভার, এমন কি বেহেশতে উঠাইবার অধিকার আল্লাতাল্লা ইমানদারকে সোপর্দ করিয়াছেন।
অপর পক্ষে দারা আল্লাকে সচ্চিদানন্দ স্বরূপ, বাক্যমনের অগোচর পরব্রহ্ম রূপে উপলব্ধি করিবার দাবি করিতেন; চিঠিপত্রে শিরোনামার উপরে (যথা মির্জা রাজা জয়সিংহের কাছে লিখিত পত্র) ফার্সি অক্ষরে “সচ্চিদানন্দ” লিখিতেন। সুফীভাবে বিভোর হইয়া দারা “মাশুক” অর্থাৎ অশরীরী আল্লার চেহারা বর্ণনা করিতে গিয়া লিখিয়াছেন- জ্যোতিস্বরূপ আল্লার মুখমণ্ডলের শোভাবর্ধন করিয়া দুইটি অলকগুচ্ছ বা জুলফি ঝুলিয়া রহিয়াছে : উহার একটি ইসলাম, অপরটি হিন্দুর ধর্ম—মূর্তি ও বহু দেব উপাসনা।
মোট কথা, আওরঙ্গজেবের আল্লা তৌরীত (Old Testament) এবং উহার আরবীয় সংস্করণ কোরানশরীফের “সেমেটিক” কুলপতিধর্মী “আল্লা” (tribal god); দারার আল্লাকে আর্য বা হিন্দুস্থানী আল্লা বলা যাইতে পারে। ভ্রাতৃদ্বয়ের “আল্লা”র স্বরূপ এবং উঁহার কোন কোন “সিপৎ” বা গুণ আসল এবং কোনটি প্রক্ষিপ্ত—ইহা তর্ক অপেক্ষা তলোয়ারের ধারে পরীক্ষা করিবার পক্ষপাতী ছিলেন আওরঙ্গজেব এবং যুযুৎসু মোল্লাসমাজ।
ইতিহাসে দেখা যায় শাহজাহান মনেপ্রাণে, নীতি ও ধর্মানুশাসনে, মন্দির মূর্তি ধ্বংসসাধনে, হিন্দুকে মুসলমান করিবার উৎসাহে এবং আদর্শ মুসলমান হিসাবে কেবল আওরঙ্গজেব অপেক্ষা এক ধাপ নিচে ছিলেন। পনেরো বৎসর বয়স হইতে প্রৌঢ়ত্বের অবসান পর্যন্ত ইসলামের খেদমত করিয়া এহেন পিতার নিকট হইতে তাঁহার যোগ্যতম পুত্র আওরঙ্গজেব পুরস্কার তেমন কিছু পান নাই, অধিকন্তু পাইয়াছেন সকল কার্যে বাধা ও তিরস্কার। (চলবে)