দ্বাদশ অধ্যায়
দোটানা স্রোতে দিল্লীশ্বর তথা মোগল সাম্রাজ্য
ছয়
সম্রাট শাহজাহানের ত্রিশ বর্ষব্যাপী রাজত্বকালে মধ্যযুগের ইতিহাসে ভারতীয় সংস্কৃতি ও শিল্পকলা, হিন্দুর প্রতিপত্তি এবং হিন্দি সাহিত্যের জোয়ার কানায় কানায় ভরিয়াছে— ভাটার বিলম্ব নাই।
আকবর বাদশাহ মুখে মুখে হিন্দি দোহা রচনা করিয়াছেন; শাহজাহান হাতেকলমে আওরঙ্গজেবের অবোধ্য হিন্দি ভাষায় চিঠিপত্র লিখিতেন, কায়েতী হিসাব পরীক্ষা করিতেন। উদারচিত্ত শাহজাদা দারা আরও ঊর্ধ্বে উঠিয়াছিলেন, হাতের আংটিতে পবিত্র আরবী হরফে “আল্লাহ” খোদাই না করিয়া মোল্লাটা মুসলমানের চক্ষুশূল দেবনাগরী অক্ষরে “পরভু” খোদাই করাইয়া ভাবী অমঙ্গল ডাকিয়া আনিয়াছিলেন। তিনি মনে করিতেন আল্লা অক্ষরাতীত; হিব্রু, আরবী, দেবনাগরী প্রভৃতি মানুষের সৃষ্ট বর্ণমালা সবই তাঁহার অশরীরী দৃষ্টিতে এক সমান, ইতরবিশেষ নাই। একমাত্র আরবী খোদাতালার ভাষা, আদমসন্তানকে কোন ভাষা না শিখাইলে আল্লার প্রিয়তম জবান আরবী আপনা হইতেই তাহার নিষ্পাপ জিহ্বায় আসিয়া পড়িবে- মোল্লাদের এই দাবি তাঁহার প্রপিতামহ আকবর বুংগামহলের নৃশংস পরীক্ষার দ্বারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছিলেন। সুতরাং আরবী অল-রৌব্ এবং হিন্দি পরভুর মধ্যে ধার্মিকের দৃষ্টিতে কোন প্রভেদ নাই; যিনি স্বয়ং নামরূপবর্জিত তাঁহাকে যে-কোন নামে ডাকিলেই তিনি সাড়া দিয়া থাকেন। শাহজাহান ও আওরঙ্গজেব ইসলামে সনাতনপন্থী, তাঁহারা আল্লা ব্যতীত God, পভু কিংবা পরব্রহ্মকে আমল দেওয়ার পাত্র নহেন। স্নেহের দৌর্বল্যবশত হাল ছাড়িয়া শাহজাহান পুত্র দারার শরিয়ত-বিরুদ্ধ ভাবের পাগলামি, শুজার শিয়া-প্রীতি, মোরাদের জাহেলী (ধর্মবিমুখতা) সবই সহ্য করিতেন। আওরঙ্গজেব “আল্লা-আল্লা” করিয়া সুযোগের প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, পাইলেই খোদাতালার নামে প্রথমেই বেইমান দারার মাথা হাতে লইবেন।
সম্রাট শাহজাহানের দরবারে অনেক হিন্দি কবি রাজানুগ্রহ লাভ করিয়াছিলেন। তখন সুরদাস, তুলসীদাস ও কেশবদাসের যুগ অতীত হইয়াছে। বিহারীলালের প্রতিভা স্ফুটনোন্মুখ, হিন্দি সাহিত্যের অগ্রগতির স্রোতে ভাটা পড়ে নাই। সে যুগের হিন্দি সাহিত্যাচার্যগণ ঈর্ষা করিয়াই যেন দরবারী হিন্দি কবিদিগকে বিশেষ আমল দেন নাই; দুঃখ করিয়া বলিয়াছেন : —
সুর সুর, তুলসী সমী, উডুগণ কেশবদাস।
অব্ কে কবি খদ্যোৎ সম, জঁহ তঁহ করে প্রকাশ।।
অর্থাৎ, সুরদাস (কাব্যগগনের) সূর্য, তুলসীদাস চন্দ্রমাতুল্য, এবং কেশবদাস (সপ্তর্ষিমণ্ডল), আজকালকার কবি জোনাকি পোকা, যেখান সেখানে ঝিকমিক করেন।
দরবারী ইতিহাসে দুইজন হিন্দি কবির নাম পাওয়া যায়। ইহাদের মধ্যে আদিরসাত্মক সুন্দর-শৃঙ্গার কাব্য-প্রণেতা কবি সুন্দর সম্রাটের নিকট হইতে প্রথমে “কবিরায়” এবং পরে শ্রেষ্ঠ সম্মান “মহাকবি রায়” উপাধি পাইয়াছিলেন। আকবরী দরবারের হিন্দি কবি নরহরি মহাপাত্রের বংশজগণ মোগল দরবারে বংশানুক্রমে রাজকবি ছিলেন। নরহরি-পুত্র [*হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাস লেখকগণের সমসাময়িক ইতিহাসের সহিত পরিচয় আছে কিনা বলা যায় না। “মিশ্ৰবন্ধুবিনোদ” অনুসারে হরিনাথ নরহরির পুত্র; দুই পুরুষে প্রায় এক শত বৎসর পার হওয়া সম্ভব বলিয়া মনে হয় না। “কবিতা-কৌমুদী” সঙ্কলয়িতা শ্রীরামনরেণ ত্রিপাঠী দোহা উদ্ধৃত করিয়া প্রমাণ করিয়াছেন, লাখ টাকাটা কবি রাজা মানসিংহের নিকট হইতে পাইয়াছিলেন। এই শ্রেণীর হিন্দিপ্রেমীগণের কাছে দোহা, কিংবদন্তি আবদুল হামিদ লাহোরী অপেক্ষা অধিক নির্ভরযোগ্য।] কিংবা পৌত্র হরিনাথ ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে জানুয়ারি সম্রাটের নিকট হইতে একটি ঘোড়া, একটা হাতি এবং নগদ এক লক্ষ দাম (২৫০০ টাকা) পুরস্কার লাভ করিয়াছিলেন। বিক্রমাদিত্য কিংবা রাজা ভোজের দরবারেও হাতি-ঘোড়া ইনাম কোন কবি পাইয়াছিলেন কিনা জনশ্রুতিতেও জানা যায় না। সম্রাট শাহজাহান সুপাত্রেই দান করিয়াছিলেন। কথিত আছে, হরিনাথ মহাপাত্র যখন ভারী ইনাম লইয়া দরবার হইতে ফিরিতেছিলেন, তখন এক ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ ভিক্ষাপ্রার্থনা করিয়া একটি দোহা মহাপাত্রকে শুনাইয়াছিল; তিনি এক লক্ষ দাম পথিমধ্যে দান করিয়া শূন্য হাতে ফিরিলেন, বাদশাহী হাতি ও ঘোড়ার কি গতি হইল জানা নাই।
শাহজাদা দারা হিন্দি ভাষার সমাদর করিতেন, স্বয়ং চর্চাও করিতেন। তাঁহার লিখিত দুইখানি হিন্দি পুস্তিকার পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়াছে। এইগুলির নাম দোহাস্তব সংগ্রহ এবং সারসংগ্রহ। দরবারের বাহিরে সামন্ত নৃপতি এবং মনসবদারগণ হিন্দি কবিগণের পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন, কয়েকজন মুসলমান হিন্দি কবিতা লিখিয়াছেন। মির্জা-রাজা জয়সিংহ, মহারাজা যশোবন্ত সিংহ রাঠোর, যশোবন্তের নির্বাসিত জ্যেষ্ঠভ্রাতা ভীমকর্মা অমর্ষপরায়ণ রাও অমরসিংহ রাঠোর [অমরসিংহ নাগোরের রাও এবং উচ্চ মনসবদার ছিলেন। আগ্রা শহরে দারার প্রাসাদে সম্রাটের সম্মুখে প্রকাশ্য দরবারে মীর বকসী সলাবৎ খাঁকে একটি অর্ধ উচ্চারিত শব্দের জন্য জমঢাড়ের এক কোপে দ্বিখণ্ডিত করিয়া যুদ্ধ করিতে করিতে এই রাঠোর শার্দুল বীরগতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অমরসিংহের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্রী এবং মির্জারাজা জয়সিংহের ভাগিনেয়ীর সহিত দারার জ্যেষ্ঠ পুত্র কুমার সুলেমান শুকোর বিবাহ হইয়াছিল।] কাব্যরসিক এবং হিন্দি কবিগণের আশ্রয়দাতা ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথমে ইতস্তত লিপিবদ্ধ এবং চারণ ভাটের মুখে মুখে প্রচলিত পৃথ্বীরাজ-রাসো মহাকাব্য সংগ্রহ এবং সঙ্কলিত করিয়াছিলেন (নাগরী প্রচারিণী সভা সংস্করণ)।
কবিতার গুণাগুণ অপেক্ষা কাব্যে স্তুতি প্রশংসা এবং নামপ্রচারের আশা সম্রাটের বদান্যতার পরিমাণ নির্ধারিত করিত। ইহাই সেকালে এবং একালেও বড়লোকদের দানের রীতি, মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতাও বটে। নিজের এবং পূর্বপুরুষের সত্যমিথ্যা যশোগান নিত্য চারণের মুখে শুনিবার জন্যই রাজপুত আধপেটা খাইয়া চারণকে আধা রুটি দিত। ইউনানী ফলিত জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ জুলকরনাইন ফিরিঙ্গি (আর্মানী খ্রিস্টান) সম্রাটের নামে এমন কিছু লিখিয়াছিলেন যাহার জন্য তিনি পাঁচ শতী মনসব পাইয়াছিলেন (লাহোরী)।
এইরূপ দানে এবং গুণগ্রাহিতায় সম্রাট জাতি ধর্ম কিংবা দেশ বিচার করিতেন না। ইহা আকবরশাহী আমলের ধারা।
সাত
দুনিয়া যেমন আজকাল একটা পোশাকী pose বা ঢঙে আসলকে চাপা দিয়া সোয়াস্তি লাভ, মতলব হাসিল কিংবা দেমাক জাহির করিয়া চলিয়াছে পূর্বে বিশেষত মোগলাই আমলে খোদ বাদশাহ বইতে ঝাড়ুদার পর্যন্ত কেহই লোকচক্ষুর সম্মুখে একটা পোজ বা চেহারা না করিয়া চলিত না। দরবারী ইতিহাসে এইজন্যই সে যুগের সহজ মানুষ বিচক্ষণ ঐতিহাসিকের নজরেও সহজে ধরা পড়ে না। আত্মজীবনী (তজুক) মধ্যে তবুও একটা মাত্র পোজ; কিন্তু যে সমস্ত ইতিহাসের (যথা, আকবরনামা এবং বাদশাহনামা) প্রত্যেক পৃষ্ঠা আকবর কানে শুনিতেন কিংবা শাহজাহান নিজে পড়িয়া উহার উপর কলম চালাইতেন সেখানে আমরা উক্ত সম্রাটদ্বয়কে উভয় ‘পোজেই’ দেখিতে পাই—একটি ঐতিহাসিকের মনোবৃত্তির পোজ, অন্যটি মানব কিংবা মুসলমানসুলভ সম্রাটের অহমিকার পোজ। শাহজাহানের দরবারী পোজ আরও জটিল, ইহার মধ্যে “আসল” তিনি আছেন এবং তদুপরি একটা গতানুগতিক ইমাম মেহদী বা কল্কি অবতারের পোজও রহিয়াছে।
বাদশাহনামা পড়িয়া মনে হয়, সম্রাট শাহজাহান ছিলেন প্রতাপে সোলেমান বাদশা, বুদ্ধিতে বুজুগ মেহের, ন্যায়বিচার ও ইসলামের প্রতি অখণ্ড নিষ্ঠায় হজরত ওমর এবং কাফের নিধন ও মূর্তি ধ্বংসে মামুদ গজনভী। লাহোরী কেবল মন্দির ধূলিসাৎ ইত্যাদি হিন্দুধর্ম-নির্যাতনের কথাই বলিয়াছেন; কিন্তু হিন্দুদের কাছে “পাথুরে প্রমাণ” [Jaina Inscriptions, শ্রীপূরণচাঁদ নাহার কৃত] রহিয়াছে- পশ্চিম ভারতে জৈন সম্প্রদায় শাহজাহানের রাজত্বকালেই একাধিক মন্দির প্রস্তুত করিয়াছিলেন। গোকুলস্থ বল্লভাচার্য গোসাঁইগণ আকবরের সময় হইতে শাহজাহানের রাজত্বের অবসান পর্যন্ত গোকুলে গোবর্ধন এবং সাহার পরগণায় বিশেষ অধিকার পুরুষানুক্রমে ভোগ করিয়া আসিতেছিলেন। তাঁহাদের কাছে যে সমস্ত বাদশাহী ফরমান ও নিশান (সরকারি চিঠি) আছে সেগুলি হইতে জানা যায় তাঁহাদের ভূমির উপর রাজস্ব ও অতিরিক্ত কর, মাশুল ইত্যাদি মাপ ছিল, গোকুল গোবর্ধনে অবাধ গোচারণের অধিকার দেওয়া হইয়াছিল, ময়ূর ও অন্যান্য প্রাণী শিকার মুঠসমূহের সম্পত্তির এলাকায় নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল। [দাতার নাম – সংখ্যা
সম্রাট আকবর – ৪
হামিদা বানু (আকবরের মাতা) – ১
খান-খানান আবদুর রহিম (আকবরের সেনাপতি) – ১
জাহাঙ্গীর – ০
শাহজাহান (সম্রাট) – ২
দারাশুকো – ৪
মোয়াক্রামত খাঁ (শাহজাহানের কর্মচারী) – ১
ইসহাক খা (ঐ) – ১
আওরঙ্গজেব – ০
প্রথম শাহ আলম – ১
মির্জা নজক খাঁ (দ্বিতীয় শাহ আলমের সেনাপতি) – ১
দ্রষ্টব্য- Imperial Farmans by K. M. Jhaveri, Bombay.]
১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসেই বাদশাহী শিলমোহরযুক্ত এইরূপ দুইখানা ফরমান বল্লভাচার্য সম্প্রদায়কে দেওয়া হইয়াছিল। অথচ তিন বৎসর পরে মুর্শিদকুলি খাঁকে মথুরার ফৌজদার নিযুক্ত করিয়া শাহজাহান হুকুম দিলেন ওই অঞ্চলে বিদ্রোহ এবং মূর্তিপূজা যেন কঠোর হস্তে দমন করা হয়। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পরেও দেখা যায় গোসাঁইগণের অধিকার স্বীকার করিয়া শাহজাদা দারা চার খানা ও অন্য দুইজন স্থানীয় ফৌজদার সম্রাটের অনুমোদিত দুইখানা নিশান জারি করিয়াছিলেন।
এই পরস্পরবিরোধী অস্থির নীতির মূলসূত্র কোথায়? অজ্ঞাতসারে কোনও দোটানা- স্রোতে না পড়িলে শাহজাহানের রাষ্ট্র ও ধর্মনীতি পালন ও দমন, মতসহিষ্ণুতা ও নির্যাতন স্পৃহার মধ্যে এমন ঘুরপাক খাইত না। মোগলসাম্রাজ্যে সম্রাটকে মধ্যবিন্দু করিয়া দারা এবং আওরঙ্গজেবের মধ্যে প্রথম হইতেই যেন একটা দড়ি টানাটানি চলিয়াছিল; দারা মোগল সাম্রাজ্যের পূর্বস্মৃতি এবং আওরঙ্গজেব উহার ভাবী নিয়তির অঙ্গুলি-সঙ্কেত। (চলবে)