ত্রয়োদশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের কারণ ও দায়িত্ব
এক
মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে দারার দুর্ভাগ্য, শাহজাহানের বন্দীদশা, শুজা ও মোরাদের শোচনীয় পরিণাম—ইহার জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্ন নিতান্ত সহজ নহে। ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে একতরফা রায় দেওয়া সেকালের কাজীর বিচার, একালে ওইজাতীয় ঐতিহাসিক বিচার গবেষণার নামে ওকালতি। বোধ হয়, আওরঙ্গজেবের মনে সন্দেহ হইয়াছিল খোদাতালা ছাড়া পাপিষ্ঠ মানুষও হয়তো কোনদিন তাঁহার কাজের বিচার করিবে। এইজন্য প্রাথমিক সাবধানতাস্বরূপ তিনি দরবারী ইতিহাস রচনা এক রকম বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন; দ্বিতীয়ত গৃহযুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পিতার সহিত শাসনসংক্রান্ত ও পারিবারিক ব্যাপারে যে সমস্ত চিঠি লেখালেখি হইয়াছিল এবং শাহী দরবারে দারার চক্রান্তে বিপন্ন
ইসলামের স্বার্থরক্ষার নিমিত্ত নিজে কিরূপ প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছিলেন, তৎসমুদয় দলিল দস্তাবেজে প্রস্তুত রাখিয়া গিয়াছেন। যুদ্ধের ছয় মাস পূর্ব পর্যন্ত দারা তাঁহার দিল্লিস্থ “নিগমবোধ-মঞ্জিল” প্রাসাদে উপনিষদের ফার্সি অনুবাদকার্যে মহা ব্যস্ত ছিলেন; ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধপ্রস্তুতি কিংবা মোকদ্দমা সাজাইবার তাঁহার সময় কোথায়? দারা মানুষকে বড় বিশ্বাস করিতেন; বিশ্বাস করিয়া ঠকিয়াছিলেন, বিচারের ভার মানুষের উপরই ছাড়িয়া গিয়াছেন। নিরপেক্ষ সত্য অনুসন্ধিৎসায় যাহা সম্ভব, এই প্রশ্ন মীমাংসায় আচার্য যদুনাথ চূড়ান্ত রায় দিয়াছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসমূহের উপর গৃহযুদ্ধে দায়িত্বের অংশ ন্যায্যমত বণ্টন করিয়াছেন। [*বর্তমানে কয়েকজন লেখক ইতিহাসের নামে ‘অজুহাত নামা” (Apologia) লিখিয়াছেন, যথা—মৌলানা শিবলী নুমানী (উর্দু); কোরেশী – History of Aurangzib.] সম্প্রতি আমরা সংক্ষেপে শাহজাহান এবং তাঁহার পুত্র চতুষ্টয়ের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ আলোচনা করিব।
দুই
পুত্রের পিতা এবং সম্রাট হিসাবে শাহজাহানের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেবের প্রধান অভিযোগ—
ক) স্নেহ ও অনুগ্রহ বণ্টনে দারার প্রতি অযৌক্তিক পক্ষপাতিত্ব।
খ) দারার ষড়যন্ত্রে আওরঙ্গজেবের কার্যে বাধাদান ও তাঁহাকে অপমান।
গ) আওরঙ্গজেবের প্রতি বিদ্বেষ ও অযথা সন্দেহ। ইহার সহিত ইতিহাসের দুইটি অতিরিক্ত ধারা-
ঘ) সম্রাটের দোষ ত্রুটি পুত্রগণের বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ কি না।
ঙ) আসন্ন গৃহযুদ্ধ নিবারণের জন্য সম্রাট সমস্ত সম্ভাব্য উপায় অবলম্বন করিয়াছিলেন কি না।
শাহজাহান পুত্র চতুষ্টয়ের প্রতি বিশেষ স্নেহাসক্ত ছিলেন, কিন্তু অনুগ্রহ সমান ভাবে বণ্টিত হয় নাই—ইহা ঐতিহাসিক সত্য। তিনি আওরঙ্গজেবকে শাসনকার্যে দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার জন্য যথোচিত প্রশংসা করিতেন এবং কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য সুযোগ দানে কার্পণ্য করেন নাই। “প্রশংসা” শত্রুমিত্র সকলের নিকট হইতে জবরদস্তি করিয়া আদায় করা যায়, কিন্তু “ভালোবাসা”র উপর আবদার চলিতে পারে, জবরদস্তি চলে না। আওরঙ্গজেবকে ভালোবাসার পাত্র হইবার মতো, কিংবা দুনিয়ায় স্ত্রী পুত্র মিত্রকে বিশ্বাস ও ভালোবাসিবার ক্ষমতা খোদাতালা দেন নাই। নিজের পুত্রগণের প্রতি আওরঙ্গজেবের নির্মম কঠোরতা এবং সতর্ক দৃষ্টি যদি শাহজাহানের থাকিত তাহা হইলে পুত্রের মতো তিনিও গৃহযুদ্ধ নিবারণ করিতে পারিতেন, বন্দীদশায় তাঁহার মৃত্যু হইত না। গুণ ও কার্যের অনুপাতে দারা অপেক্ষা আওরঙ্গজেব কম জায়গীর ও মনসব পাইয়াছিলেন; কিন্তু বিচার্য বিষয়, দারা অপেক্ষা বেশি পাইলে তিনি কি করিতেন? জাহাঙ্গীর তাঁহার প্রিয়তম এবং যোগ্যতম তৃতীয় পুত্র শাহজাদা খুররমকে (পরে সম্রাট শাহজাহান) ত্রিশ হাজারী মনসবদারী প্রদান করেন এবং প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্রকে বাদ দিয়া তাঁহাকেই যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিয়াছিলেন—এইরূপ সুবিচারে খুর্রমের পিতৃদ্রোহ নিবারিত হইল না কেন? আসল কথা, শাহজাহান পুত্রকে চিনিয়াছিলেন।
আওরঙ্গজেব যে “সুবিচার” দাবি করিতেন, দিল্লিসাম্রাজ্য এবং অন্যান্য পুত্রের জীবন বিপন্ন করিয়া উহা পূর্ণ করিলে শাহজাহান রাজধর্মচ্যুত হইতেন, মাতা মমতাজ বাঁচিয়া থাকিলেও আওরঙ্গজেব ময়দান সাফ করিয়া ফেলিতেন। অন্যান্য পক্ষপাতিত্বের নমুনা : —
১। সুবা মুলতান এবং সুবা লাহোরের সীমামুখে ইসমাইল হুত নামক এক বেলুচ জমিদার মুলতান-সুবাদার আওরঙ্গজেবের আদেশ অমান্য করিয়া লিখিয়াছিল, সে লাহোরের সুবাদার শাহজাদা দারার প্রজা এবং অজুহাত স্বরূপ দারার চিঠিও দাখিল করে। আওরঙ্গজেব দারার বিরুদ্ধে নালিশ করিলেন। সম্রাট স্বয়ং দুই সুবার সীমা নির্দেশ করিয়া আওরঙ্গজেবের সপক্ষে রায় দিয়াছিলেন।
২। ইহার দুই বৎসর পরে আওরঙ্গজেব যখন দ্বিতীয়বার দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত হইয়া বদলি হইলেন তখন মুলতান সুবা দারাকে দেওয়া হইয়াছিল। সুবাদার বদলি হওয়া সুবার প্রজাগণের পক্ষে এক মহা উৎপাত। যিনি বদলি হইতেন তাঁহার কর্মচারীগণ জবরদস্তি করিয়া কিস্তির খাজনা আগাম উসুল করিত; তখন সুবার অবস্থা যেন পররাজ্যে দখলকারী ফৌজের পশ্চাদপসরণের আনুষঙ্গিক অরাজকতা। অপর পক্ষে, নূতন সুবাদারের পাইক বরকন্দাজ দেওয়ান ফৌজদার দখল কায়েম করিবার জন্য সুবার অবস্থা নববিজিত দেশের ন্যায় করিয়া তুলিত। মুলতানে দারার কর্মচারীগণ অভিযোগ করিল, পূর্ববর্তী সুবাদারের আমলারা মুলতান শহরে সরকারি ইমারতগুলি ভাঙিয়া কড়িবরগা ও চৌকাঠ পর্যন্ত বিক্রি করিয়া গিয়াছে। দারা কিছুমাত্র সন্দেহ না করিয়া সরাসরি ওই অভিযোগ দরবারে পেশ করিলেন। আওরঙ্গজেবের কাছে কৈফিয়ত তলব হইল। আওরঙ্গজেব এইরূপ কাঁচা কাজ করিবার লোক ছিলেন না; বিচারে দারার কর্মচারীগণও দোষী সাব্যস্ত হইল। (চলবে)