ত্রয়োদশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের কারণ ও দায়িত্ব
তিন
আওরঙ্গজেবের প্রতি শাহজাহানের সন্দেহ ও অবিশ্বাস অধিকাংশ স্থলেই অমূলক ছিল না। তবে একটি ব্যাপারে আওরঙ্গজেবের প্রতি তিনি নিঃসন্দেহ অবিচার এবং অশোভন সন্দেহ করিয়াছিলেন যাহা “যাটি বুদ্ধি নাটি” ছাড়া কিছুই নহে।
বুরহানপুরের শাহীবাগে একটা আমগাছ ছিল— নাম বাদশাপছন্দ। ওই আমগাছের জন্য দাক্ষিণাত্যের সুবাদারকে শাহী খেদমতের ব্যবস্থা করিতে হইত এবং আম পাকিলে কিস্তি করিয়া জরুরি ডাকচৌকি মারফত দিল্লি আগ্রা পৌঁছাইবার ব্যবস্থা করিতে হইত, আমের ঝুড়ি কোথায়ও মাটিতে রাখিবার হুকুম ছিল না। দ্বিতীয়বার আওরঙ্গজেবকে দাক্ষিণাত্যে বদলি করিবার সময় শাহজাহান পুত্রকে এই আমগাছের কথা বিশেষভাবে বলিয়া দিয়াছিলেন। ওই গাছের তদারক করিবার জন্য নূতন সুবাদার এক অতি বিশ্বস্ত কর্মচারীকে বুরহানপুরে রাখিয়া গিয়াছিলেন। আমের প্রথম ঝুড়ি দরবারে পৌঁছিবার পর আম খাইয়া আলা হজরত বলিলেন, এইবার আম ঠিক সময়ে তোলা হয় নাই। দ্বিতীয় ঝুড়ির উপর মন্তব্য হইল, আম বোধ হয় আসিবার সময় মাটিতে রাখা হইয়াছিল। তৃতীয় ঝুড়ি দেখিয়া সম্রাট বলিলেন, আম এই বৎসর যেন সংখ্যায় কম; জাহানারা ভাইকে এই কথা জানাইয়া দিলেন। আওরঙ্গজেব প্রমাণাদিসহ কৈফিয়ত দিলেন ঝড়ে একটা বড় ডাল ভাঙিয়া গিয়াছে এবং আমও কম ফলিয়াছে। ইহাতেও নিস্তার নাই। পরের কিস্তি পৌঁছিবার পর আলা হজরত বলিলেন, আমের ঝুড়ি বোধ হয় বুরহানপুর হইতে দৌলতাবাদ ঘুরিয়া আসে!
এইরূপ উক্তি সম্রাটের সমাগত দ্বিতীয় শৈশবের ছায়া।
আওরঙ্গজেবের চিঠিপত্র হইতে দেখা যায়, দ্বিতীয়বার দাক্ষিণাত্যে আগমনের পর হইতেই শাহজাহান এবং দারার বিরুদ্ধে তাঁহার বেশির ভাগ অভিযোগ। এই সমস্ত অভিযোগ সত্য হইলেও ওইগুলিকে গৃহযুদ্ধের কারণ বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। ১৬৫২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসেই শুজার সহিত দিল্লিতে এবং মোরাদের সহিত মালবে দেখাসাক্ষাৎ করিয়া আওরঙ্গজেব দারার বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধ করিবার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা স্থির করিয়া ফেলিয়াছিলেন এবং ইহার পর হইতে এই গুপ্ত “ত্রিবর্গ” মিত্রশক্তির তিনিই সেক্রেটারি এবং পোস্টআপিস স্বরূপ কাজ করিতেছিলেন, সুতরাং দাক্ষিণাত্যের ব্যাপার আওরঙ্গজেবের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি––উহাকে “কার্য” বলা যাইতে পারে, “কারণ” নহে। দাক্ষিণাত্যের ব্যাপার সংক্ষেপে এইরূপ : —
ইরান দেশের ইস্পাহান শহর হইতে এক তেলীর ছেলে (তবুও সৈয়দ!) গোলকুণ্ডায় আসিয়া ক্রমে হীরা-জহরত-ব্যবসায়ী এবং পরে সুলতান আবদুল্লা কুতব শাহের উজির- আজম হইয়াছিলেন—ইহার ইতিহাসবিখ্যাত নাম মীরজুমলা। অতঃপর তেলী-নন্দনের কোথায়ও একজন স্বাধীন সুলতান হইবার বাসনা হইল। তিনি পুত্র মহম্মদ আমিনকে গোলকুণ্ডায় নায়েব-উজির রাখিয়া গোলকুণ্ডার সৈন্য ও অর্থবলের সাহায্যে কুতবশাহের নামে পূর্বকর্ণাটক অঞ্চল জয় করিয়াছিলেন এবং ওইখানেই স্বাধীনভাবে বাস করিতে লাগিলেন। এদিকে মহম্মদ আমিন কুতবশাহের জীবন অতিষ্ঠ করিয়া তুলিয়াছিল। কুতবশাহ দিলদরিয়া লোক; সঙ্গীত ও সুফীতত্ত্ব লইয়াই থাকিতেন। একদিন নায়েব-উজির মহম্মদ আমিন পানোন্মত্ত অবস্থায় মসনদের উপর শাহী গালিচায় শুইয়া কুতবশাহের জন্য অপেক্ষা করিতে করিতে গালিচার উপর শরাব বমি করিয়া ফেলিলেন। ভালোমানুষ কুতবশাহ হঠাৎ রাগিয়া নায়েব-উজিরকে কারারুদ্ধ করিলেন এবং কর্ণাটক হইতে মীরজুমলাকে প্রত্যাবর্তনের আদেশ দিলেন। আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে আসিয়াই মীরজুমলার সহিত কুতবশাহের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছিলেন এবং গোলকুণ্ডা আক্রমণের অছিলা খুঁজিতেছিলেন। আমিনকে মুক্তি দিবার জন্য শাহজাহান যে ফরমান আওরঙ্গজেবের সঙ্গে লিখিত চিঠির সহিত পাঠাইয়াছিলেন, তিনি উহা জঘন্য ভাবে চাপা দিয়া সম্রাটের আদেশ অমান্যের অজুহাতে গোলকুণ্ডা রাজ্য আক্রমণ করিলেন, আসল ব্যাপার কুতবশাহ বা সম্রাট কাহাকেও জানিতে দিলেন না (১০ই জানুয়ারি ১৬৫৬)। কুতবশাহের দূত অনন্যোপায় হইয়া প্রভুকে এই অন্যায় আক্রমণ হইতে রক্ষার জন্য দারার শরণাপন্ন হইলেন। দারার নিকট হইতে প্রকৃত অবস্থা জানিতে পারিয়া কুতবশাহকে ক্ষমা করিয়া সম্রাট এক ফরমান পাঠাইয়াছিলেন (৮ই ফেব্রুয়ারি ১৬৫৬)। আওরঙ্গজেব উহাও চাপা দিয়া যুদ্ধ চালাইতে লাগিলেন। দারা ও জাহানারা উভয়েই এইবার কুতবশাহকে রক্ষা করিবার জন্য আবেদন জানাইলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের উপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া কড়া আদেশ পাঠাইলেন, যুদ্ধ তৎক্ষণাৎ বন্ধ করিয়া বাদশাহী ফৌজকে গোলকুণ্ডা রাজ্য হইতে সরিয়া আসিতে হইবে (৩০শে মার্চ, ১৬৫৬)।
আওরঙ্গজেব মনে করিলেন ইহা দারার ষড়যন্ত্র, পিতার অবিচার।
বাঘের মুখ হইতে শিকার কাড়িয়া লওয়া বিপজ্জনক হইতে পারে; কিন্তু এইরূপ কার্যকে কেহ বাঘের প্রতি অবিচার বলিবেন কি? দুই দুই খানা শাহী ফরমান বেমালুম গায়েব করিয়া ফেলিবার অপরাধের জন্য আওরঙ্গজেবকে বদলি করিলেই সুবিচার হইত।
চার
সম্রাট শাহজাহানের লোভে পাপ এবং পাপে যাহা হইয়া থাকে তাহাই হইয়াছিল। এই লোভের বশেই তিনি পুনরায় আওরঙ্গজেবের ফাঁদে পড়িলেন। পুত্রের চিঠিতে গোলকুণ্ডার প্রতি বিশ্বাসঘাতক মীরজুমলার গুণরাশি শুনিয়া তিনি তাঁহাকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ করিলেন এবং মৃত উজির সাদুল্লার স্থলে প্রধান মন্ত্রিপদে নিযুক্ত করিলেন (জুলাই ১৬৫৬ ইং)। সম্রাট কিছুদিন তাঁহার পরামর্শ অনুসারে চলিতে লাগিলেন; দারার কথায়ও আমল দিতেন না। ওই বৎসর (৪ঠা নভেম্বর, ১৬৫৬) বিজাপুরের পরাক্রান্ত এবং শাহজাহানের বন্ধুস্থানীয় সুলতান মহম্মদ আদিল শাহের মৃত্যু হওয়ার পর ওই রাজ্যে গোলযোগ দেখা দিয়াছিল। আওরঙ্গজেব এই সুযোগে বিজাপুর জয় করিবার আয়োজন করিতে লাগিলেন এবং সম্রাটের কাছে লিখিলেন, আদিল শাহের উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় আদিল শাহ তাঁহার আসল পুত্র নহে। মীরজুমলা সম্রাটকে বুঝাইলেন বিজাপুর অতি সহজে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করিবার ইহাই সুবর্ণ সুযোগ। শাহজাহান এই লোভ সংবরণ করিতে পারিলেন না; বিজাপুরের বিরুদ্ধে এই “অধর্ম” যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের কাছে একেবারে সাদা চেক পাঠাইয়া দিলেন। মালব এবং অন্যান্য সুবার বাদশাহী ফৌজ লইয়া মীরজুমলা আওরঙ্গজেবের সাহায্যার্থ ১৬৫৭ খ্রিঃ জানুয়ারি মাসে শাহজাদার সহিত মিলিত হইলেন। আওরঙ্গজেবের উদ্দেশ্য সফল হইল।
আলা হজরত জহরত ভালো চিনিতেন; কিন্তু এই ইরানী শিয়া জহুরি তাঁহাকে ঠকাইয়া গেল। আট মাস পরে বিজাপুরের রাজদূত শাহজাদা দারার মারফত সন্ধিপ্রার্থী হইলেন। ইতিমধ্যে মোহগ্রস্ত সম্রাট চৈতন্যলাভ করিয়াছিলেন। আওরঙ্গজেবের কুমতলব আশঙ্কা করিয়া তিনি হুকুম পাঠাইলেন, তাঁহার নির্দিষ্ট শর্তে সন্ধি করিয়া ফরমান পাওয়া মাত্ৰ যেন যুদ্ধ বন্ধ করা হয়, অধিকন্তু হিন্দুস্থানের বাদশাহী মনসবদারগণের কাছে সোজাসুজি ফরমান প্রেরিত হইল তাঁহারা যেন অবিলম্বে ফৌজসহ দরবারে ফিরিয়া আসেন (সেপ্টেম্বর, ১৬৫৭)। দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধ জিয়াইয়া রাখিয়া হিন্দুস্থানের বাদশাহী ফৌজ তাঁহার অধীনে যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকিলে দারা আত্মরক্ষার উপায় হইতে বঞ্চিত হইবে– এই মতলবেই আওরঙ্গজেব বিজাপুর-গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অন্যায় যুদ্ধপঙ্কে সম্রাটকে প্রলোভিত করিয়াছিলেন।
সম্রাট এই অন্যায় কার্যে অসঙ্গত দৃঢ়তা অবলম্বন করিয়া আওরঙ্গজেবের হাতে ক্রীড়নক হইলেও অনিবার্য গৃহযুদ্ধ তিনি নিবারণ করিতে পারিতেন না। (চলবে)