ত্রয়োদশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের কারণ ও দায়িত্ব
সাত
“রাজতন্ত্র”-মতে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে বিপরীত সাধনায় নিমগ্ন কুমার আওরঙ্গজেবের মধ্যে ঐতিহাসিক “মহা”-পুরুষের সমস্ত লক্ষণ দেখিতে পাওয়া যায়। রাজধর্মের প্রথম সূত্র, “মনস্যন্যদ্ বচস্যন্যদ্ কর্মণ্যন্যৎ—” তাঁহার চরিত্রে সুপরিস্ফুট। তিনি চিরকাল মনে এক, কথায় অন্য এবং কাজে আর কিছু। তৎকালীন সমাজে কিংবা মোগলদরবারে বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণের দৃষ্টিতে এই নীতি দোষাবহ কিংবা নিন্দনীয় ছিল না। বর্তমান যুগেও বিশ্বের দরবারে কার্যোদ্ধারের জন্য এই নীতি কেহ কেহ অপরিহার্য বিবেচনা করিয়া থাকেন।
আওরঙ্গজেব স্থির করিয়া ফেলিয়াছিলেন তিনি কাহারও হাতে “কোরবানে”র উট হইবেন না; তাঁহার ভাগ্যে হয় দরবেশী, না হয় বাদশাহী। তিনি জানিতেন আল্লা তাঁহার একমাত্র প্রকৃত সহায়, শুজা-মোরাদ ভগ্নী রোশনারা, মাতুল শায়েস্তা খাঁ কিংবা মেসো জাফর-খলিল উল্লা নহে; জীবনে যদি ঈদ কখনও আসে উহাতে আল্লার নামে উৎসর্গীকৃত তাঁহার ঈদের উট ছাগল হইবে দারা শুজা ও মোরাদ। সরল জীবনযাত্রা, সরলতা বর্জিত সৌজন্য ও প্রিয়ভাষিতা এবং শরিয়তে সুবিধাবাদী নিষ্ঠায় কুমার আওরঙ্গজেব প্রথম হইতেই উদীয়মান “জিন্দাপীর”—মুখে ফকিরি ছাপ ও দরবেশী বুলি, ইসলামের জন্য প্রচারমূলক আশঙ্কা, পিতার প্রতি ভক্তির বাণী এবং শুজা ও মোরাদের প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেম ও হিতচিন্তার ফোয়ারা। কার্যে তাঁহার অতি প্রশংসনীয় শাস্ত্রোক্ত “আফল-কর্মোদয়” নীতি ফলপ্রসূ না হইলে তিনি কি করিবেন তাহারও সন্দেহ কিংবা অনুমান করিবার সাধ্য ছিল না—ফলপ্রসূ হইবার পূর্বে কেহ জানিতে পারিত না। শাহজাহানের রাজত্বে অভিনীত বীভৎস-বিয়োগান্ত গৃহযুদ্ধ নাটিকার নটগুরু কিন্তু স্বয়ং আওরঙ্গজেব। তিনিই প্রযোজক, তিনিই প্রথম অঙ্কে শুজা ও মোরাদের উপদেষ্টা সাজিয়া তাঁহাদের দুরাকাঙ্ক্ষাবহ্নিতে ইন্ধন যোগাইয়াছিলেন— এই অভিয়োগ অস্বীকার করিবার উপায় নাই। পিতার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বিদ্রোহী হইলেও শুজা ও মোরাদের দায়িত্ব আওরঙ্গজেব অপেক্ষা অনেক কম।
শাহজাহানের পুত্র চতুষ্টয়ের মধ্যে প্রত্যেকেই নিজেকে অপর অপেক্ষা বেশি “লায়েক” মনে করিতেন। ইহাদের মধ্যে কনিষ্ঠ মোরাদ ছিলেন চরিত্রে আওরঙ্গজেবের ঠিক বিপরীত। চিন্তা-ভাবনা ভয়-কপটতা সংযম-ধর্মনিষ্ঠা মোরাদের ছিল না। “বলং বলং বাহুবলম্” বলিয়া সর্বদা বাহ্বাস্ফোটন — শাহীপরিবারে তিনি যেন “বলভদ্রে”র তুর্কী অবতার-বুদ্ধিতে হলধর, পান-ভূমিতে মদিরালোলাক্ষ স্খলিতপ্রয়াত কাদম্বরী পানোদ্ধত-পৃথুশ্রী রেবতীরমণ, যুদ্ধক্ষেত্রে এবং বিক্রমে সঙ্কর্ষণ। তিনি প্রায় প্রকৃতিস্থ থাকিতেন না, হয় রক্তপাত না হয় শরাব ও সুন্দরী তাঁহাকে অপ্রকৃতিস্থ করিয়া রাখিত। দাদা আওরঙ্গজেব বলিয়াছিলেন, তিনি তাঁহাকে দিল্লির তক্তে বসাইয়া মক্কাযাত্রা করিবেন। তাঁহার কথায় বিশ্বাস করিয়া এবং ষড়যন্ত্র জালে আবদ্ধ হইয়া মোরাদ প্রথমেই যুদ্ধে নামিয়া পড়িয়াছিলেন। মোরাদের অসুর-বিক্রম আওরঙ্গজেবের ইঙ্গিতে চালিত হইয়া দারার শক্তি ধূলিসাৎ করিয়াছিল, দিল্লীশ্বর ও দিল্লিসাম্রাজ্যকে আওরঙ্গজেবের হাতে তুলিয়া দিয়াছিল। দাদাকে তিনি সরল মনে নিজের মাথায় কাঁঠাল ভাঙিতে দিয়া মাথাটাই হারাইয়াছিলেন। গৃহযুদ্ধে আওরঙ্গজেব মুখ্য এবং মোরাদ গৌণ অপরাধী; শুজা ও আওরঙ্গজেবের মধ্যে প্রায় সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি।
সুলতান শাহশুজা শাহজাদা দারার তেরো মাস পরে ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন। বারো বৎসর বয়স পর্যন্ত পিতামহ জাহাঙ্গীরের আদরে লালিত-পালিত হইয়া তাঁহার দোষ গুণ অনেক কিছু তিনি পাইয়াছিলেন; কোন নূরজাহানের হাতে পড়িলে বোধ হয় নাতি-ঠাকুরদার মধ্যে ইতিহাসে কোন তফাত থাকিত না। নির্বিবাদে দিল্লির সিংহাসনে বসিতে পারিলে সম্রাটের পুত্র-চতুষ্টয়ের মধ্যে শুজাই যোগ্যতম উত্তরাধিকারী হইতেন। দারার দাক্ষিণ্য, উদারতা ও চরিত্রমাধুর্য এবং আওরঙ্গজেবের বাস্তব দৃষ্টি, মাত্রাজ্ঞান, ব্যবহারিক বুদ্ধি, নীতিপ্রয়োগ, শৌর্য ও শাসনক্ষমতার একত্র সমাবেশ তাঁহার মধ্যেই ছিল; অথচ কোন প্রকার ভাবের পাগলামি, ছেলেমানুষি, গোঁড়ামি, ভণ্ডামি কিংবা সহজাত দুষ্টবুদ্ধি ছিল না। বয়সে ছোট হইলেও তিনি দারার পূর্বেই প্রথম মনসবদার ও সুবাদার হইয়াছিলেন। আওরঙ্গজেবের মতো একটানা কঠোর পরিশ্রমে উৎসাহ ও দৃঢ়তা, প্রারব্ধ কার্যে একাগ্রতা ও ধৈর্য কিংবা ব্যসন-সংযম তাঁহার ছিল না। বাল্যাবধি কূটনীতি চর্চা, শাসনকার্য ও যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের প্রশংসনীয় গুণসমূহ পূর্ণভাবে বিকশিত হইয়াছিল; কিন্তু সুযোগের সদ্ব্যবহার না হওয়ায় শুজার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিভা বাংলা দেশে পঙ্গু ও মলিন হইয়া পড়িয়াছিল, তাঁহার কোষবদ্ধ তরবারি শান ও পান দুইটাই হারাইল।
প্রায় একটানা সতেরো বৎসর সুবা বাংলার নিরুপদ্রব সুবাদারি শুজার পক্ষে শুভ হয় নাই। বাংলার দোজখে ভালো ভালো ভোগের জিনিসের অভাব ছিল না; আকাশে-বাতাসে আরাম-আয়েস ভাসিয়া বেড়াইত। আওরঙ্গজেবের মতো পদে পদে খোদাকে ভয় কিংবা শরিয়তের পা-বন্দী হইয়া তিনি চলিতেন না। তিনি অতি মার্জিত রুচি, সঙ্গীতপ্রিয় এবং কাব্যরসিক ছিলেন; শিয়া-সুন্নির সঙ্কীর্ণতা তাঁহার ছিল না। তাঁহার শাসনকালে দিল্লি আগ্রা হইতে অনেক বিশিষ্ট শিয়া পরিবার ঢাকায় স্থায়ী উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিল। তাঁর দরবারী বিশ্বস্ত অনুচরগণের মধ্যে অধিকাংশই ছিল ইরানী শিয়া। লোকে আওরঙ্গজেবকে একটা “ভয়স্থান” মনে করিত; শুজাকে রাজোচিত গাম্ভীর্যের জন্য সমীহ করিত, মানুষ হিসাবে বিশ্বাস করিত এবং ভালোবাসিত। শুজা দারাকে ঈর্ষা করিতেন, হিংসা কিংবা অসৌজন্য তাঁহার প্রতি কখনও প্রকাশ করেন নাই। ছোট ভাই আওরঙ্গজেবকে পিতা তাঁহার সমান মনসব দিয়াছিলেন এইজন্য তিনি কখনও অভিযোগ করেন নাই, জাহানারা এবং পিতার উপর অভিমান তাঁহার থাকিলেও আক্রোশ ছিল না। দারার বিরুদ্ধে এক পথের যাত্রী হইয়াও শাহশুজা “শুভচিন্তক” আওরঙ্গজেবকে বিশ্বাস করিতেন না, মোরাদের লম্ফঝম্প দেখিয়া হাসিতেন।
শাহশুজার চরিত্রে “একোহি দোষো গুণরাশিনাশী” হইয়াছিল। এই দোষ তাঁহার মজ্জাগত আলস্য এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যসন। সেকালে বাংলা দেশে যদি কোনও কালিদাস থাকিতেন তাহা হইলে রঘুরাজ অগ্নিবর্ণের ভোগবিলাসের ছায়া ঢাকা-রাজমহলে শাহশুজার অন্তঃপুরে দেখিতে পাইতেন। মহারাজ অগ্নিবর্ণের মতো এই মোগলরাজকুমার ছিলেন “রাত্রিজাগরো দিবাশয়ঃ” অর্থাৎ :
“বামাস্পর্শ সুখে যাপিয়া যামিনী
হতেন নিদ্রিত দিনে নরমণি।”
(নবীনচন্দ্র দাস)
শাহশুজার হারেম ছিল একটি নিত্যনূতন ভ্রাম্যমাণ বেহেশত; অন্দরমহলে পালে পালে হুর-পরীর নাচগান, শরাবের নহর। ঢাকা ও রাজমহলের অলস অপরাহ্ণ তিনি বুড়িগঙ্গা কিংবা জাহ্নবীর ঢেউ গণিয়া কাটাইয়াছেন, হয়তো দেখিয়াছেন অদূরে নর্তকীর বিলসিতানুকারিণী তন্বী তরঙ্গ-নীবিবদ্ধা সঞ্চারিণী বলাহকমালা-বিলম্বী বেলাভূমির নিতম্বভঙ্গি। নাচওয়ালীর রূপের হাটে তিনি রাত্রি প্রভাত করিয়া দিনকে রাত করিতেন; ভোগের ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করিবার জন্য কয়েকদিন শাসনসংক্রান্ত বকেয়া ও হালের যাবতীয় কার্য ঊর্ধ্বশ্বাসে অথচ নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করিয়া আবার কিছুদিন আরাম-আয়েসে ডুবিয়া থাকিতেন। ইহার ফলে তিনি অকালে জরাগ্রস্ত হইয়া চল্লিশের এপারেই চামেলি ফুল অপেক্ষা কোনও ছোট জিনিস চোখে দেখিতেন না। সুশাসন ও দানশীলতার গুণে বাংলার লোক তাঁহাকে প্রাণ ভরিয়া ভালোবাসিত, পূর্ববঙ্গ “নকল শুজার” জন্য আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়াছিল। শুজার শোচনীয় পরিণামের জন্য দায়ী তাঁহার ব্যসনপ্রবণ স্বভাব-বাংলার মাটি নহে। সুযোগের অভাব প্রায় ক্ষেত্রে অলস ব্যক্তির অজুহাত। শুজার পরিবর্তে সম্রাট যদি আওরঙ্গজেবকে বাংলা দেশে রাখিতেন তবুও তাঁহার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আক্রমণাত্মক স্বভাব এবং ময়ূরসিংহাসনের স্বপ্ন নিশ্চয়ই অনুকূল কর্মক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া লইতে পারিত। গোলকুণ্ডা-বিজাপুরের মতো সমৃদ্ধিশালী রাজ্য বাংলার সীমান্তে না থাকিলেও অবিজিত আসাম, ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম, মগ-পর্তুগীজ ছিল; সুতরাং বাংলার সুবাদারের তলোয়ারে মরিচা ধরার কোন সঙ্গত কারণ ছিল না। (চলবে)