ত্রয়োদশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের কারণ ও দায়িত্ব
আট
পিতৃসিংহাসনের আশা আলস্যপরায়ণ শাহশুজার ধ্যানে বহু বৎসর “আচ্ছন্ন” অবস্থার স্তরে ছিল। তিনি চাহিয়াছিলেন সম্রাটের জীবদ্দশায় তিক্ততার সৃষ্টি না করিয়া সুবা উড়িষ্যা এবং বিহার যেন বাংলার সহিত তাঁহার অংশস্বরূপ নির্দিষ্ট করা হয়; পরে কাড়াকাড়িতে গোটা বাদশাহী পাওয়া না গেলে অন্তত তিনি “উড়িষ্যা মগধবঙ্গ ত্রিদেশ-ঈশ্বর” থাকিয়া স্বাধীনভাবে রাজত্ব করিবেন। কয়েক বৎসর পরে উড়িষ্যা তিনি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সুবা বিহার এবং তাঁহার মধ্যে ব্যবধানস্বরূপ হইয়া রহিলেন দারা। মনের এই অবস্থা লইয়া ১৬৫২ খ্রিস্টাব্দে শুজা লাহোর গিয়াছিলেন, পথশ্রম ও কান্দাহার অভিযানে সেনাপতিত্ব লাভের আশাভঙ্গজনিত অপমান ব্যতীত তাঁহার কোনও লাভ হইল না। ফিরিবার পথে সম্রাট আদেশ দিয়াছিলেন তিনি ও আওরঙ্গজেব যেন এক মাইল আগে পিছে লাহোর হইতে দিল্লি পর্যন্ত পথ অতিক্রম করেন, অর্থাৎ কেহ কাহারও সহিত দেখা সাক্ষাৎ না করেন। এই দুই পুত্রের প্রতি সমান আচরণ এবং সমান অবিশ্বাস তাঁহাদিগকে দারার বিরুদ্ধে একজোট হইবার প্রেরণাই জোগাইয়াছিল। ইহার পূর্ণ সুযোগ লইলেন আওরঙ্গজেব। রাস্তায় না হইলেও দিল্লিতে পিতার আদেশ উপেক্ষা করিয়া তাঁহারা কয়েকদিন পরস্পরকে ভোজে আপ্যায়িত করিয়া ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা স্থির করিয়া ফেলিলেন। পিতার অনুমতির অপেক্ষা না করিয়াই শুজার কন্যা গুলরুখ বানুর সহিত আওরঙ্গজেবের জ্যেষ্ঠপুত্র মহম্মদ সুলতানের “সগাই” (বাগদান) পাকাপাকিভাবে সম্পন্ন হইয়া গেল। পরে এই ব্যাপার লইয়া আওরঙ্গজেব এবং সম্রাটের মধ্যে কড়া চিঠিপত্র লেখালেখি হয়। শাহজাহান শুজাকে স্বপক্ষে আনিবার জন্য তাঁহার কাছে আওরঙ্গজেবের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া চিঠি লিখিলেন, এবং জানাইলেন আওরঙ্গজেবকে সরাইয়া তিনি দক্ষিণের পাঁচ সুবা বাংলা ও উড়িষ্যার পরিবর্তে তাঁহাকে দিতে প্রস্তুত আছেন। আওরঙ্গজেবের সঙ্গে সাক্ষাৎকার এবং গুপ্ত সন্ধি হওয়ার পূর্বে হয়তো সম্রাটের এই অনুগ্রহ তিনি প্রত্যাখ্যান করিতেন না; কিন্তু পরে শাহশুজা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিলেন।
শুজার দিল্লির সিংহাসনের আশা “আচ্ছন্ন অবস্থা” হইতে ভাই আওরঙ্গজেব একেবারে “কূটস্থচৈতন্য” অবস্থায় উঠাইয়া দিয়াছিলেন; কোহিনূরখচিত মুকুট তাঁহার কাছে তখন হস্তামলকবৎ। আওরঙ্গজেব তাঁহাকে বুঝাইয়াছিলেন রাজ্যে তাঁহার স্পৃহা নাই, পুত্রের ভবিষ্যৎ দাদার হাতে তুলিয়া দিয়া নিশ্চিন্ত; তবে বেয়াড়া মোরাদকে বাগ মানাইতে হইবে এবং সেই ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ করিয়া তিনি নর্মদা অতিক্রম করিবেন। মালবের পথে দো-রাহা নামক স্থানে কয়েকদিন পরে (২৩শে ডিসেম্বর ১৬৫৭ ইং) গুজরাট হইতে আসিয়া মোরাদ আওরঙ্গজেবের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন—ইহা কাকতালীয়বৎ ঘটনা নহে। শুজা আওরঙ্গজেব এবং মোরাদের মধ্যে পিতার অজ্ঞাতসারে একযোগে দারাকে আক্রমণ করিবার পরিকল্পনা গৃহীত হইয়াছিল; আওরঙ্গজেবের মারফত কিংবা তাঁহার সুবার মধ্য দিয়া তেলেঙ্গানার পথে শুজা ও মোরাদের মধ্যে গুপ্ত ডাকের ব্যবস্থা, সংকেতলিপির কোড আওরঙ্গজেবের মাথা হইতে বাহির হইয়াছিল। শুজা আওরঙ্গজেবকে বিশ্বাস করিতেন না; কিন্তু উপায় কি? দারার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা এবং স্বার্থসাধনের জন্য আওরঙ্গজেবের সাহায্য আপাতত তাঁহার প্রয়োজন; তিনি শাহীতক্তে বসিতে পারিলে হয় নিজ নিজ সুবা লইয়া আওরঙ্গজেব ও মোরাদকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে, না হয় তাহাদের বরাতে যাহা আছে তাহাই হইবে।
মোটামুটি বলা যাইতে পারে, গৃহযুদ্ধের দায়িত্ব আওরঙ্গজেব হইতে শুজার কিছু কম। তিনি নিরপেক্ষ থাকিলে আওরঙ্গজেব ও মোরাদ এত সহসা হয়তো যুদ্ধ বাধাইতেন না, বাধাইলে পরাজিত হইতেন—দারার নিকট হইতে তিনি স্বাধীনতা না পাইলেও সুবিধাজনক শর্ত পাইতেন, নির্বাসনে শোচনীয় দশাপ্রাপ্ত হইতেন না। (চলবে)